Dark/Light Mode


।। প্রাথমিক বিবরণ ।।


খাল-বিলের আখ্যান (প্রথম খণ্ড)
মমতা বিশ্বাস



____________________


____________________


Khal-Biler Aakhyan
A novel by Mamata Biswas

প্রথম ই-বুক সংস্করণ: মার্চ, ২০২৫

© লেখক কর্তৃক গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত। All Rights Reserved.


সমন্বয়, করুণাময়ী সমন্বয় সমিতি, জি-১২/১, করুণাময়ী হাউজিং এস্টেট, ইডি ব্লক, সেক্টর-দুই, সল্টলেক সিটি, কলকাতা-৭০০০৯১ থেকে সুদীপ কুমার ধর কর্তৃক প্রকাশিত।

অক্ষর বিন্যাস: মমতা বিশ্বাস ও সমন্বয়

প্রুফ সংশোধন: মমতা বিশ্বাস

E-mail: samanwoy23wm@gmail.com

Website: www.samanwoy23.com

প্রচ্ছদ: গৌরব মুখোপাধ্যায়

লেখায় ব্যবহৃত আলোকচিত্র: মমতা বিশ্বাস

____________________


।। উৎসর্গ ।।


গ্রামবাংলার প্রাণভোমরা খাল-বিল ও নদী-নালাই যাদের জীবিকা সেইসব প্রান্তিক মানুষদের প্রতি

____________________


।। ভূমিকা ।।

পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ একটি জেলা হল নদিয়া ('নদীয়া')। অতীতে নবদ্বীপের অপর নাম ছিল 'নদীয়া'; তবে প্রথমে কোন নামটি ছিল সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। নাম দুইটির অর্থ একাধিক। বিখ্যাত বৈষ্ণব গ্রন্থকার নরহরি দাস নবদ্বীপকে 'নয়টি দ্বীপের সমষ্টি' বলেছেন তাঁর গ্রন্থ 'নবদ্বীপ পরিক্রমা পদ্ধতি'-তে।

"নবদ্বীপ পৃথক গ্রাম নয়।
নবদ্বীপে নব-দ্বীপ বেষ্টিত যে হয়।"

যারা নবদ্বীপের 'নতুন দ্বীপ' অর্থ করেন তাঁদের মতে অতীতে গঙ্গা মধ্যবর্তী চরভূমিকে চারিদিক বেষ্টণ করে গঙ্গা জলঙ্গি প্রবাহিত হত। পরবর্তীকালে, নদীর গতি পরিবর্তিত হওয়ায় ওই চরভূমি বিস্তারলাভ করে এবং মানুষের বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। দ্বীপের উপর নতুন গ্রাম গড়ে ওঠায় নব-দ্বীপ নামে খ্যাত হয়।

'নদীয়া' নামের উৎপত্তির অপর মতটি হল পূর্বে প্রদীপকে দিয়া বলা হত। গঙ্গা মধ্যস্থিত সুবিস্তীর্ণ চরে একজন সাধু বাস করতেন। তিনি প্রতি রাত্রে নয়টি দীপ জ্বেলে তান্ত্রিক সাধনায় রত হতেন। দূর থেকে লোকে দেখে ওই চরকে ন-দিয়ার চর অর্থাৎ নদীয়ার (নদিয়া) চর বলে অবিহিত করেছিল। পরবর্তীকালে ঐশ্বর্যশালিনী বঙ্গের রাজধানীতে পরিণত হয় নবদ্বীপ।

ভূতত্ববিদগণ বহু গবেষণায় স্থির করেছেন যে সমগ্র নদিয়া পুণ্যসলিলা ভাগীরথীর বহু পুরানো সুবিস্তীর্ণ ও সমুন্নত চরভূমি এবং প্রাচীনকাল হতেই অধ্যুষিত। কালের নিয়মে গঙ্গা, জলঙ্গী এবং তাদের শাখা-প্রশাখা, ধারা-উপধারা গতিপথ পরিবর্তন করেছে। নদী, খাল, বিলের বিলোপ যেমন ঘটেছে; তেমনি নতুনের উদ্ভবও ঘটেছে। পূর্বের ছেড়ে যাওয়া নিম্নভূমিই খাল-বিল, ছোটো-বড়ো জলাশয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। খাল-বিল-জলাশয় বাহিত জলেই পুষ্ট হয় নদী। মানুষের তৈরি বাঁধ, সেতু, বাঁধালের বাঁধনে এবং কালের নিয়মে পলি পড়ে নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। গতি রোধ ও নাব্যতা হারানোর ফলে গতিবেগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক ভাবে নদী ও জলাশয়ের জলধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। বহু খাল, বিল আবাদযোগ্য হয়ে উঠেছে। সরকারি বা ব্যক্তিগত হাজার হাজার একর জমিতে বর্ষাকাল ছাড়া প্রচুর শীতকালীন ও চৈতালী ফসল উৎপাদন হয়। পলি সমৃদ্ধ হওয়ায় চাষের খরচ অনেক কম। সার, ঔষধ এবং জলের খরচ খুবই কম; অথচ ফলে, সোনার ফসল।

বৃষ্টির জল নদী-নালা-খাল-বিলে গিয়ে পড়ে। প্রধান নদ-নদী সেই জল বহন করে নিয়ে যায় সাগরে। খাল-বিল-নদী-নালা, সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে মেঘ সৃষ্টি করে। মেঘ, বৃষ্টি হয়ে ঝ'রে পড়ে ধরাতলে। এইভাবে আবর্তিত হয় জলচক্র। বঙ্গদেশ নদী-নালার দেশ। জালের মতো বিস্তার করে আছে। তারা পরস্পর হাত ধরাধরি করেই চলছিল। আধুনিকতা ও মানুষের আগ্রাসী লোভের ফাঁসে প্রধান নদী সহ তার শাখা-প্রশাখা ধুঁকতে শুরু করেছে। স্লথ গতির জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পরস্পরের থেকে। বড়ো ধরণের চুরিকে পুকুর চুরি বলে। এখন মানুষ রাতারাতি নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয় চুরি করছে। শুধু রাতারাতি নয় দিনের আলোতেও বুজে যাচ্ছে খানা, খন্দ, পুকুর, খাল, বিল, নদী, নালা।

প্রকৃতির উপর মানুষের নির্মম অত্যাচারের ফল ফলতে শুরু করেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এবছরে ফলটা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। করোনা অতিমারির কোপে অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারে ভেঙে পড়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও ভালোমতো প্রভাব পড়েছে। ২০২১-এর মার্চ মাস থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে প্রত্যেক মাসেই নিম্নচাপের বৃষ্টি হচ্ছে। নদিয়ার হাজার হাজার একর জমি; বিলের জল খাল দিয়ে যথা সময়ে নেমে যেতে না পারায় শীতকালীন বা চৈতালি ফসল মার খেল। চাষীদের মাথায় হাত। একটু উঁচু জমির ফসলও একাধিক বার বপন করলেও নিম্নচাপের বৃষ্টির ফলে বারবার নষ্ট হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মনুষ্য সৃষ্ট ভেড়ি ও বাঁধাল চাষীর সংকটকে আরো সংকটজনক করে তুলেছে।

প্রায় দুই বছর ধরে নদিয়ার জেলার কিছু অঞ্চল ঘুরে গ্রাম-বাংলার প্রাণ; খাল-বিল, নদী-নালার গুরুত্ব কতটা - সে অভিজ্ঞতা কথায় বলার চেষ্টা করব। আমার শিকড়ও গ্রাম; তার কথা তো বলবই। কোনো কোনো স্থানে একাধিক বার গেছি। কোনো স্থানের সঙ্গে আজন্ম সম্পর্ক। খাল-বিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনধারার টুকরো টুকরো ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের কথা। বর্তমানের অনেককিছুই ধরা থাকবে এই আখ্যানে।

মমতা বিশ্বাস

১৬ ফাল্গুন, ১৪৩১
১ মার্চ, ২০২৫

____________________


।। লেখক পরিচিতি ।।


নদিয়া জেলার আসাননগরে পৈত্রিক নিবাস। পড়াশোনা আসাননগর হাইস্কুল, চন্দননগর আর.ডি.পি., কৃষ্ণনগর মহিলা মহাবিদ্যালয় এবং কল্যাণী মহাবিদ্যালয়ে। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, পেশা শিক্ষকতা। 'পরম্পরা প্রকাশনী' থেকে গল্পগ্রন্থ 'চোরাবালির স্রোত' বইটি প্রকাশিত হয়েছে। 'আনন্দবাজার' দৈনিক পত্রিকায় ভ্রমণ বিষয়ক লেখা ও 'নদিয়ার পাতা'য় সম্পাদক সমীপেষুতে লেখেন। 'কলেজ স্ট্রিট' পত্রিকা, 'বাক্ প্রতিমা', 'বিশ্ববাণী', 'উড়িধান', 'কথা', 'নদী সংবাদ' ইত্যাদি পত্রিকায় গল্প, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনি নিয়মিত প্রকাশিত হয়। রেডিও শোনা ও আকাশবাণী ও 'মৈত্রীকথা'র বিভিন্ন বিভাগে নিয়মিত চিঠি লেখার অভ্যাস। পাহাড়, সমুদ্র, ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ যেমন ভালোবাসেন, তেমনি গ্রামবাংলার লৌকিক সংস্কৃতি ও ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহের নেশা আছে। ভালোবাসেন প্রকৃতির ছবি তুলতে। সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন গ্রামের পথের টানে।

সম্প্রতি 'মুদ্রা' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক বই 'পায়ের তলায় সর্ষে'।

____________________


।। পর্ব-১ ।।



দামোদরের বিল

মেঘলা আকাশ। কুয়াশায় ঢাকা চারিধার। টুপটুপ করে সারারাত হিম পড়েছে। টিনের চাল চুঁইয়ে পড়ছে মাটিতে। মাটি মোমোর মতো ফুলে উঠেছে। সপ্তাহ খানেক ঠাণ্ডাও পড়েছে জাঁকিয়ে। নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে; আবারও বৃষ্টি হবে। কাজ ফেলে রাখলে চলে না চাষার। পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে যায় মণিকুমারের। বউকে ঠেলে উঠিয়ে দেয়। মাটির হাঁড়িতে সের খানেক চাল, আলু, বেগুন, সিম, কুমড়ো সিদ্ধ ভাত ফুটিয়ে একথালা গরম ভাত মণিকুমারের সামনে ধরে দেয়; এক খাবলা নুন, তেল, গোটা চারেক কাঁচা লঙ্কা দিয়ে। ভাতের উনুনে জ্বাল দিতে দিতে মণিকুমার হাত পা গরম করে নিয়েছে। বউ সকালের বাসি কাজ সেরে এসে ভাত বেড়ে দেয়। হাত ধুয়ে কাঁসার বগি থালা বাঁ-হাতে চেপে ধরে; আলু, বেগুন, কুমড়ো, সিম হাতের তালু দিয়ে ঠেসে ঠেসে নুনের উপর লঙ্কা মুড়িয়ে মুড়িয়ে ভেঙে সব ভাত এক সঙ্গে মেখে বড়ো বড়ো দলা পাকিয়ে মুখের মধ্যে ছুড়তে থাকে। ফুলটুসি উনুনের উপর দাঁড়িয়ে ঘসির আঁচে হাত-পা, সর্বশরীর ছেঁকে নেয়। শরীর মন চনমনে হয়ে ওঠে। আলপথের শিশিরবিন্দু; কাদা পা ধুইয়ে দিলেও ঠাণ্ডায় কাবু করতে পারে না।

ফুলটুসি প্রত্যেকদিন ভোরে ভাতের হাঁড়ি উনুনে বসিয়ে মণিকুমারকে জ্বাল দিতে দেয়; ঘর-উঠোন ঝেঁটিয়ে, থালা-বাসন ধোয়। গোয়াল পরিষ্কার করে বিলের জলে কাপড়-চোপড় ধুয়ে উপরে উঠতে ঠাণ্ডায় হাতে-পায়ে টাস ধরে যায়। এর মধ্যে ভাত হয়ে যায়। মণিকুমারকে ভাত বেড়ে দিয়ে, নিজেও একথালা বেড়ে নেয়। বাঁকী ভাতটুকু সিলভারের বড়ো কেটলিতে ভরে নেয়।

গত রাতে ল্যাঠামাছের ঘেচুর (শালুক বা শাপলার স্কন্দ) বাসি তরকারি কালাকে দিয়ে এল। না, না তাই বলে সে বধির নয়। গায়ের রং কালো তাই সবাই কালা বলে ডাকে। গায়ে অসুরের শক্তি। দেড় কুইণ্টাল জিনিস মাথায় করে এক মাইল রাস্তা অনায়াসে যেতে পারে। বলা ভালো যেতে হয় তাকে। বাংলাদেশের পাঁচখানা কাঁথা একবার নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে পারলে পনেরো দিন নিশ্চিত। এক, একটি কাঁথার মূল্য কুড়ি হাজার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা। গেট থেকে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে পারলেই মোটা টাকা পেয়ে যাবে। ও, হাজার হাজার টাকাতেই খুশি। নেশার জিনিস পাচারে লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখতে চাই না; কারণ জীবনহানির ঝুঁকি থাকে প্রতিমুহূর্তে। না হলে জেলের ঘানি! ভোর-রাতের ঘণ্টা তিনেকের কাজ; তারপর সারাটা দিন দামোদরের বিলে মাছ ধরে কাটে। ডোঙায় করে বিলের এমাথা, ওমাথা ঘুরে বেড়ায়। গলা ছেড়ে গান ধরে ভাটিয়ালি। আঠারো ছোঁয়া ছেলেটির উপর গোটা পরিবার নির্ভরশীল। ঠাকুরমা, মা, অবিবাহিত দুই দিদি, পঙ্গু দাদা। ব্লাকের কারবার করতে গিয়েই পঙ্গু হয়েছে। ১২ বছর পর্যন্ত রাখালি করেছে কালা। তারপর আস্তে আস্তে চোরা কারবারে পোক্ত হয়ে উঠেছে। লকডাউনের সময়ে ভোর আড়াইটের সময় গেট খুলে দিলে ওপারের জিনিস এপারে নিয়ে আসে; এ পারের জিনিস ওপারে নিয়ে যায়। খুব দ্রুত কাজ সারতে হয়।

ফুলটুসি ও মণিকুমার সন্তানের মতো স্নেহ করে কালাকে। বিলে ধান রোঁয়ার কাদা করার সময় সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সঙ্গে থাকে। অসুখ-বিসুখের সময় কালাই হাতের লাঠি হয়ে ওঠে।

দুই লিটারের জলের বোতলটায় মণিকুমার জল ভরে, ব্যাগে ভাতের কেটলির পাশে বসিয়ে নেয়। কেটলি, কাঁচি, নিড়ানি সমেত ব্যাগ এক হাতে; অন্যহাতে খুটো সমেত গাইগরু দুটোর দড়ি ধরে একটু আগেই বাড়ি থেকে বের হয়। পাকা রাস্তার পাশের বাচড়ায় গোচড় দেয়। ফুলটুসি ছাগলের পাল তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে রাস্তার ওপারে ছেড়ে দেবে। কাঁটাতারের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে পেট ঢাক করে ঘাস খেয়ে; মালকিন বিল থেকে ফিরে আসার আগেই হাজির হবে পাকা রাস্তায়। আজ বিলের ওপারেই কাজ। পাঁচকাঠা সর্ষের জমি নিড়াবে। দোপের (নীচে) জমিতে এক হাঁটু জল। কলমি, হেলঞ্চ শাক লকলক করছে। জলে নেমে শাকের ডগা মটমট করে ভেঙে ব্যাগের মধ্যে চালান করে দেবে মণিকুমার। সকালে পেতে রাখা রাবানি, দোয়ড়ি, আটল জল থেকে তুলে ঝাঁকিয়ে কেটলির মধ্যে জিয়ল, ল্যাঠা, পুঁটি মাছ ঢেলে নেবে। রাতে টাটকা মাছের ঝোল দিয়ে আধ সের চালের ভাত সাবাড় করে দেয়। নুন-ঝাল চড়া করে ফুলটুসি রাঁধে ভালো। কাজের তাড়া না থাকায় উনুনের ধারে বসে ধীরে ধীরে চেটেপুটে খাবে।

জমি নিড়ানো শেষ হলে আলের ঘাস কেটে বস্তা বোঝাই করে নেবে। বিচুলি কেনার খরচ বেঁচে যায়। স্বামী-স্ত্রী গুটি গুটি পায়ে কেউ সাতের দশকে হাঁটছে; কেউ ছ'য়ের দশকে। কঠোর পরিশ্রমী দুজনে। সারাদিন মাঠে-ঘাটে পড়ে থাকে। জন-মুনিষের জন্য একটা পয়সাও খরচ হয় না। রূপসী মেয়েরা আঠারো বছর বয়সের অনেক আগেই নিজেদের পছন্দে পর-ঘরি হয়েছে। দামোদরের বিলের পাড়েই বটগাছের নীচে টিন, পাটকাঠির বেড়ার ঘর। গোটা বিশেক হাঁস। বাঁশের চটা আর টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরের কাঠের দরজা খুলে দিলেই প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে বিলে নেমে যায়। উঠোন থেকে নীচে নামতে নামতে ফ্যাচ, ফুচ করে ছড়াতে ছড়াতে যাবে। লাঠি দিয়ে তাড়িয়ে নামাতে নামাতে কাজ সেরে ফেলে দেয় প্রায় প্রত্যেকদিন। পিচকিরিতে ছড়া দেওয়ার মতো আর কী! জল ঢেলে ঝাঁটা দিয়ে ঝাঁট দেওয়ার কাজটা বেড়ে যায় ফুলটুসির। হাঁসের দল সন্ধ্যে পর্যন্ত বিলের জলে ভেসে বেড়াবে। কচুরিপানা বা জলের মধ্যে মাথা চুবিয়ে ঠোঁট গুঁজে দিয়ে গুগলি, শামুক, ঝিনুক খাবে। কখনো পট কচুরির বড়ো ঝাঁকের উপর পালকের মধ্যে ঠোঁট গুঁজে ঘুমিয়ে নেবে। ইয়া বড়ো বড়ো ডিম ৩৬৫ দিন কী আর এমনিতে পাড়ে? গুগলি ঝিনুক, শামুক খাওয়া হাঁসের ডিম কিনা! একটা সাত টাকা! বাজারে দশ টাকা পিস। ডাঙালি দেশের ফুলটুসি ১২ বছর বয়সে এই গ্রামের বউ হয়ে আসে। বউ হয়ে আসার পর শাশুড়ি পাঁচখান হাঁসের ছা দিয়ে বলেছিল, "বৌ-ধনদৈলত, সুনা-দানা আমার কিচ্চু নাই। আছে শুদু একপাল হাঁস-মুরগী, দুডে ছাগল। তুমার শ্বশুরির এক ছটাক জমি নেই মাটে! বিলির মাচ, শাক, সাপলা, কচু, ঘেচু পেটের আদ্দেক খুরাকির যোগায়। দেশেরতে আসার পরতে ঐ পারের শিব মুন্দির বাড়ির বারোমেসে মুনিসির কাজ করে গিয়েচে। তার মুকি ঐ গিরামের কত গল্প যে শুনিচি; তার ঠিক নেই। এই যে বিলডা দ্যাকচো বসষার সুময় সুমুদ্দুর হয়ে যায়। ঐ যে বিরিজ দেখচো ও তো এই সেদিন হোলো। উসার (চওড়া ) ছিল ডপল। ঘোনো দলক নামলি দাড়গাচা বিলির জলের এই এত উঁচো ঢেউ আঁচড়িয়ে আঁচড়িয়ে পড়ত। গজরাইত কী? বুক কাইপে উটতো। চারিদিক জলে জলাকার। জাহাজ চইলত নাকি আগে। সাহেবরা নীল বুজাই করে নিজিগের দেশে নিয়ে যাইত। বড়ো বড়ো পালতুলা নৌকা যাতি দেকিচি। এখন ছোটো ছোটো নৌকা চলে। বাংলাদেশের একশ পাঁচটা বিল-খালের জল নাইমে আইসে এই বিলি পড়ে। শীতকালেও জলে ছোত থাইকত। মিশমিশে কালো জল। খাওয়া, রান্দা, থালপাতর ধুয়া, জামা-কাপুড়, মানুষ-গরুর ছ্যান করা, খাওয়া সবই বিলির জলে। উই যে দ্যাকচো উঁচো উঁচো ইটির মতো; ও হচ্চে সাহেবগের পাকা বান্দাল। একেনতে ভালো দেকা যাচ্চে না। মণিকুমারের সাতে একদিন যায়ে দেকে আইসো।"

"পাকা বান্দাল; সে আবার কী?"

"আগে নীলচাষ হোতো না? সেই নীল গাচ, পাট গাচের মতো জাগ দিতো ঐ বান্দালে। ইট দিয়ে বানানো; তাই পাকা বান্দাল। ঐ খালও নীল চাষের সুবিদের জন্ন্যি সাহেবগের কাটা। পাকা রাস্তা ছাড়া চারিদিক জলে জলাকার। সাহেবগের নীল বুজায় জাহাজ খাল, বিল, নদী দিয়ে সুমুদ্দুরি পইড়ত। আমার মাসির বাড়ি চৌগাছায়। ফেডি সাহেবের ঘাট দেকিচি। সেই সাহেবের নাকি বিশে ডাকাতির দল বলি দিতি যাচ্চিল। ফেডি সাহেব হাত জোড় করে পরাণ ভিক্কে চাওয়ায় বিশে ডাকাত ছাইড়ে দিতি বোলে। খুব ভালো মানুষ ছিল। ডাকাতি কোইরতো দীন-দুখিগের জন্ন্যি। এসব গল্প ফুরোয় না। কেরমে কেরমে জানতি পারবা। ও যা কচ্চিলাম, কিই বা দিই? হাঁস তায়ায় (ডিমে তা দেওয়া) বয়েচে; ছা ফুটলি দিবানে পাঁচটে। ঠিক মতো পালতি পাল্লি বিশ-পঁচিশটে হোতি সুমায় নাগবে না। বিয়ানে খাঁচা-বাক্সোর মুক খুলে দিলি পিলপিল করে বিলি চলে যাবে। সন্দেবেলায় আয়, আয় টি-টি-টি করে ডাক দিলি উটে আসপেনে। কিচ্চু খাতি দিয়া নাগে না। অ্যাট অ্যাট্টা ডিমির দাম আট আনা। গুগলি খায়ে ডিম পাড়ে হাতের থাবা ভরা। নিজির শক-আহ্লাদের জিনিস, সুংসারের ইডা-সিডা কিনার খরচ হয়ে যায়।"

ফুলটুসি হাঁসের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া এই বাড়িতে এসে প্রথম দেখল। আদর করে ওর বর ওকে টুসি বলেই ডাকে। ছাগলের ঘরের এক কোনায় ছিকেয় একটা ডালা ঝোলান। নতুন বৌ টুসি সকালে ছাগল বের করতে গিয়ে কৌতূহলবশত উঁকি দিয়েছে। হাঁস ফোঁস করে উঠে নতুন বৌয়ের নাকে কামড়। সে কী বিপদ! ক'দিন আর ওমুখো হল না টুসি। শাশুড়ি বলেছিল, "তায়ায় বসা হাঁস খেপে থাকে। কেউ কাচে গেলি ভাবে ডিম নিয়ে যাবে তাই কামড়িয়ে দেয়।"

ডালায় মোটা করে চুষ (ধানের খোসা) বিছিয়ে কুড়িটা ডিম সাজানো আছে। একমাস তা দেওয়ার পর ডিম ফুটে বাচ্ছা বেরিয়ে আসবে। গরমকালের সময় তখন। তা দেওয়া হাঁসটি রোজ দুপুরে ঝাঁপ দিয়ে নেমে বিলের জলে স্নান করে। রোদে গা শুকিয়ে ডাঙায় উঠে পাখনা ছড়িয়ে ডিমে তা দেয়। ২৮ দিন হয়ে গেলে ডালা নীচে নামিয়ে রাখল ফাতোবুড়ি। হাঁস স্নান করতে গেলে ফুলটুসির শাশুড়ি এক একটা ডিম হাতে তুলে কানের কাছে ধরে। টিকটিক করলে বোঝে বাচ্ছা ঠোঁট দিয়ে গুতিয়ে শক্ত খোলা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এবার কপাল ভালো, একটা ডিমও নষ্ট হয়নি।

"একজুড়া ছা বেচলি পাঁচটে টাকা।"

সন্ধ্যে হতেই একটা বাচ্ছার আর্ধেকটা বেরিয়ে এল শক্ত খোলা ভেদ করে। সাবধানে ছার গলা ধরে টেনে বের করে নিয়ে এল ফাতোবুড়ি। হলুদগুঁড়ো, সর্ষের তেল হাঁসের ছার নাভিতে টিপে টিপে দিয়ে রাখলো পলোর নীচে। একটা মালাইতে আটা গুলে দিল; অন্যটায় খুদ ভিজিয়ে। সকাল হতেই ছ'টা ছা বেরিয়ে এলো ডিম থেকে। ডিম ফেটে ঠোঁটটা বের করতে পারলেই হল, অদ্ভুত কায়দায় শরীর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সুড়ুৎ করে বেরিয়ে আসে খোলা থেকে। সারাদিনে বাকীগুলোও। ফুটফুটে হলুদ, সাদা, কালো ছোপ দেওয়া ছা (বাচ্ছা)। পালক শুকিয়ে যাবার পর ভারি সুন্দর দেখা যায়। ঘুরঘুর করে পলোর মধ্যে (মাছ ধরার বাঁশের শলার তৈরি যন্ত্র বিশেষ) হেঁটে বেড়াচ্ছে। মা-হাঁস ডালা ছেড়ে পলোর চারপাশে ঘুরছে। মানুষ দেখলেই তেড়ে যাচ্ছে কামড়াতে। টুসির শাশুড়ি সন্ধ্যেবেলায় মা হাঁসের ডানা ধরে জোর করে ঢুকিয়ে দিল বড়ো হাঁসদের ঘরে। সপ্তাহ খানেক পরে পলো উঁচু করে বাচ্চাদের ছেড়ে দেয় কেঁচো খাওয়ানোর জন্য। কেঁচো খেলে বাচ্চা বাড়ে তাড়াতাড়ি। মা আগে; ছা পিছনে।

টি-টি ডাক শুনে এগিয়ে যায়। কোদাল বা নিড়ানির কোপে কিলবিল করে বেরিয়ে আসে কেঁচো। ঠোক মেরে ছোটো হলে একবারে কপাৎ; বড়ো হলে একটু একটু করে গিলে শরীর দুলিয়ে পেটের মধ্যে চালান করে দেয়।

শাশুড়িবুড়ি নেই, কিন্তু যাওয়ার আগে সংসারের আয় উন্নতির আট-ঘাট শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছে ফুলটুসিকে। ঘসির আঁচের ওমটুকু বুড়ি শাশুড়ির কপালে জোটেনি। পাতাপুতি, নাড়ার জ্বালের আগুন সরায় তুলে পাশে রাখা বা উনুনের উপর দাঁড়াতে দাঁড়াতে আঁচ মিইয়ে যেত। জাড়কালে এক সরা ঘসির আগুনের ওমের জন্য কত হা-পিত্যেশ করত ফলটুসির 'বুড়ি শাউড়ি'।

"এট্টা গাইও যদি থাইকত, তাহলি ঘসি-মশালের আগুনির তাপে সারা শরীল ছেঁকে নিতি পাত্তাম। ব্যতা-বিষ এত থাইকত না। খদ্দরের চাদরে শীত যায় না; হাত-পা টাল হয়ে থাকে। পাতলা নেপের নীচে হাত-পা গরম হোতি চাই না। ঘোম আসতি আসতি রাইত একপার হয়ে যায়।"

ভাগ্যিস খরানির কালে (অনাবৃষ্টির কালে) ফুলটুসির বাবা একটা বকনা বাছুর দিয়েছিল। বছর বিয়ানি। বছর পাঁচের মধ্যে ফুলটুসির ছোট্ট গোয়াল ঘর ভরে উঠল।

ফাতোবুড়ি খুব ভালো কাঁথা সেলাই করতে পারত। কুটি কুটি ফোড়। গাদানো সুতো। যে কাঁথায় জল ছেঁকে তোলা যায়। কাখালিতে কাঁথার ধামা নিয়ে ছাগল চরাতে গিয়ে গাছের নীচে বসে কাঁথায় ফুল, পাতা, পাখি, গাছ, ফুল ফুটে আছে এমন লতানো গাছের নক্সা আঁকত লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা পাড়ের সুতো দিয়ে। সেই সঙ্গে গুনগুন করে 'ভিটে কুমারীর' গান। সন্ধ্যে হলেই ফাল্গুনের পয়লা থেকে সংক্রান্তি পর্যন্ত নাতনির দলের সঙ্গে গান গাইতে হবে। তালিম না দিলে কী হয়? সুর করে গাইতে না পারলে নাতনিদের কাছে মান থাকে? সুর তুলে গায়। শোনে - পথচারী, গাছ, পাখি, আকাশ, বাতাস।

"ভিটে কুমারীর মা লো; তোর ভিটে বাইন্দে দে, ভিটে বাইন্দে দে।
তোর ছাওয়ালের বিয়ে হবে সাঝনা আইনে দে, সাঝনা আইনে দে।
বুড়ি গেলোরে সাজনা আনতি, পথে পোলো কাদা; পতে পোলো কাদা।
সেও কাদা ধুয়ে নিল চৈতনপুরির দেয়ায়, চৈতনপুরির দেয়ায়।
বরেরা বরেরা কী কী আইনোচো?; কী কী আইনোচো?
আর কিচ্চুই আনিনি, মেয়ের নাকের নত আনিচি, নত আনিচি।
ও নত ভালো না; টান দিয়ে ফেলিচি, টান দিয়ে ফেলিচি।
সেই নত, কল্লা শাউড়ি বেচে খায়েচে, বেচে খায়েচে"
ভিটে কুমারীর মা লো; তোর ভিটে বাইন্দে দে, ভিটে বান্দে দে।
হ্যাচড়ার মা লো; তোর ফ্যাচড়া ফ্যাচড়া চুল, ফ্যাচড়া ফ্যাচড়া চুল।
তাই দিয়ে বানবো আমরা রাই সরষের ফুল, রাই সরষের ফুল।
আগে যদি জানতাম ডোল, ডালি ভরে থুতাম ফুল সারি সারি; ফুল সারি সারি।
ও-মালোনি কুড়োস্ নি ফুল; হাতেও তোর ফুলির সাজি, কাঁখেও তোর জলের কলসি।
কেমন করে কুড়োবি ফুল, চাপা সারি সারি, চাপা সারি সারি।"


স্কুলে যাওয়ার আগে নাতনিরা ঝুড়ি বোঝাই করে তুলে আনবে পুজোর ফুল। পাকড়াফুল, পালসে মান্দা, পিওফুল, ভাঁটিফুল, কুলেখাড়া, হ্যাঁচড়া ইত্যাদি অকুলীন ফুল। এ সকল গরিমাহীন ফুল বসন্ত প্রকৃতির রূপবর্ধন করে যথেষ্ট পরিমাণে; যদিও লোক সমাজে মর্যাদা পায় না।। প্রত্যেকটা ফুলের আলাদা আলাদা গান আছে।

তাতেও একটু সুর তোলে,

"ভাঁটি ফুলি মারলাম বাড়ি সে ফুল পোলো থলি থলি, ও মালোনি ভালো না, ফুলগুলো তো তোলে না।"

গান শেষে নমষ্কার করে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে ফুল দেবে। প্রত্যেকটা ফুলই গান করে এইভাবে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে নিবেদন করবে।

প্রসাদ হবে আতপচাল, পাকাকলা, খেজুরের গুড়/পাটালি আর দুধ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় দল বেঁধে খেজুরের পাটিতে বসে পরস্পর পরস্পরের গলা ধরে দুলে দুলে গান করবে। প্রতিটি গানের শেষে উলুধ্বনি।

ভিটেকুমারী ঠাকুর ঘা-পাঁচড়ার লৌকিক দেবতা। মাটির তিনটি স্তরের উপর একটি শিবলিঙ্গের মত দণ্ড বসানো। দণ্ডের মাথায় কাঁটা সমেত কুলের ডাল। সর্ষের তেলে গোলা কালি, সিঁদুরের টিপ পরাতে হয় সপ্তাহে একদিন। বিসর্জনের দিন স্নান করে পরমান্ন রান্না করে কাঁটা বেগুনের পাতায় ঠাকুরকে নিবেদন করে ঠাকুর বিদায়ের গান ধরবে,

"এবার ঠাকুর যাও তুমি ঘা-পাঁচড়া নিয়ে, ঘা-পাঁচড়া নিয়ে।
সামনের বছর আইসো ঠাকুর শঙ্খ-শাড়ি প'রে; শঙ্খ-শাড়ি প'রে।"


জমানো এক মাসের ফুল ও ঠাকুর তুলে বিলের জলে ভাসিয়ে দিয়ে স্নান করে উঠে আসবে মেয়েরা। কলাপাতায় গরম খিচুড়ি আর পরমান্ন তৃপ্তি করে খাবে। ফাতোবুড়ি নতুন করে তার ছোটোবেলাকে খুঁজে পায় এদের মধ্যে। এই এক মাসের সন্ধ্যেবেলাটা খুব আনন্দে কাটে। ফাতোবুড়ি নেই, নাতনিরা বরের ঘর করছে। এখন গ্রামের কোনো বালিকারা একমাসের ভিটে কুমারী পুজো করে না। সময়ের বড্ডো অভাব যে! সকালে বিকালে প্রাইভেট পড়া। সন্ধ্যেবেলায় দূরদর্শনের অনুষ্ঠান। গ্রামও ঘরের মধ্যে বোকা বাক্সে বন্দী জীবনযাপনে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে।

ফুলটুসি রান্নাঘর গুছিয়ে হাত-পা ধুয়ে উনানের ঘসির আগুন খুঁচিয়ে হাত-পা গরম করার সময় ভাবে তার শাশুড়ি মোটেও কল্লা ছিল না। অল্পবয়সে স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরে অভাবের সঙ্গে লড়াই করেছে - লেখাপড়া শেখাতে পারেনি। সে আফসোস খুবই ছিল। আক্ষেপ ছিল শীতে একটা তুলোর লেপ না থাকার, আর ছিল ঘসির আগুনের উষ্ণ ওমের। দেরি দেখে মণিকুমার হাঁক পাড়ে, "কই রে টুসি দেরি করিস ক্যান? লেপ গরম করে ফেলিচি। আয় তাড়াতাড়ি।" আড়ষ্ট ফুলটুসিকে কাছে টেনে এনে বলে, "আমায় একটু ঠান্ডা কর দেখি।" ফুলটুসি এত পাওয়ার ধাক্কা সামলাতে না পেরে কেঁদে ফেলে।

____________________


।। পর্ব-২ ।।



ফুলটুসি

ফুলটুসির গায়ের রং ছিল পাকা, নাক বাঁশির মতো খাড়া। মণিকুমার বৌ-পাগলা। নিজে তো কিছু বলে না; কেউ বললেও সহ্য করে না; সেই কারণে মাঝেমাঝে ঝুট-ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে। রক্তারক্তি হয়ে গেছে কয়েকবার পাড়ার লোকের সঙ্গে। ফুলটুসি বোঝায় অহেতুক ঝগড়া গণ্ডগোল না করতে। শোনে না। সাধারণ জিনিসও ওর মোটা মাথায় সহজে ঢুকতেই চায় না। বিরক্ত হয়ে ফুলটুসি মাঝে-মধ্যে রাগ দেখিয়ে বলে,

"সাদে কী আর কয় নাবালি দেশের মানুষ নাবাল"।

মণিকুমার গায়ে মাখে না। স্বীকার করে বৌ তার বুদ্ধিমতি। চৌখস। পেটে কালির অক্ষর আছে। বর্ডারে ফন্দি-ফিকিরওয়ালা মানুষের চলাচল। ব্লাকপার্টির মানুষদের সঙ্গে একটু-আধটু ভাব আছে। তবে ঢলানি নয়! সংসারী বুদ্ধিমতী বলেই না বিলে দুই বিঘে জমি কিনতে পেরেছে। না হলে মুনিষ খেটে বিলে দুই বিঘে জমি করা মণিকুমারের হিম্মত হতো? মোটেও না। ব্লাকের জিনিস-পত্তর একটু সেরে সামলিয়ে রাখলেই মোটা টাকা হাতে এসে যায়। একবার হয়েছিল কী; গাই-বাছুর পাচার হবে। বিএসএফ-রা তাড়া করেছে। অবিনাশ ফুলটুসির উঠোনের আমগাছে গাই বেঁধে অনুনয়-বিনয় -

"বৌদি, বাছুর ছেড়ে দিচ্ছি, বালতি নিয়ে এসে যদি দুধ দোয়াও, তাহলে এ যাত্রা বেঁচে যায়। সত্তর হাজার টাকা ওপারে পাচ করতে পারলেই। তোমাকে হাজার পাঁচেক দিয়ে দেব।"

ফুলটুসি বালতি নিয়ে এল। গাই ফাটকে তুলে ছাদন দড়ি দিয়ে বেঁধে দুধ দোয়াচ্ছে। তিনজন বিএসএফ এসে গাই দোয়ানো দেখে; স্থির বিশ্বাস হল এ গাইটি বাংলাদেশে পাচার হবে না। তারা ভুল খবর পেয়েছিল। এই রকমই সম্পর্ক পাচারকারীদের সঙ্গে ফুলটুসির।

মণিকুমার বৌকে আদর করে টুসি বলে। বৌয়ের কাছে হেরে গেলেও আলাদা একটা সুখ অনুভব করে সে। ফুলটুসি তার জানের জান। সেদিন তেমন কাজ ছিল না। অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিলের জল উঠোন ছুঁই ছুঁই। স্নানের আগে জাল, বালতি হাতে নিয়ে বৌকে ডেকে গেল,

"আয় মাচ ধরতি যাচ্চি। পুকোর ভাসা রুই, কাতলা পাচ্চে নাকি সবাই। দু'কানে যায়ে শুনে আলাম।"

ফুলটুসিকে সেদিন ডাবসে ওঠা ধানক্ষেতের মতো মনে হচ্ছিল। যে ধানক্ষেত চাষীর বুকে অপার আনন্দের হিল্লোল তোলে; ফুলটুসি যে প্রথম মা হবে! কানায় কানায় ভরে উঠেছে ফুলটুসি, যেমন ভরে উঠেছে দামোদরের বিল। ইলিশ, রুই, কাতলা কিনে খাওয়ানোর সঙ্গতি নেই মণিকুমারের। কোনো ক্ষেপে যদি নওলা (রুইমাছ) মাছ ওঠে; বৌটা খেতে পারবে।

"এই সময় ভালো-মোন্দ কত কিচুই তো খাতি ইচ্চে করে, শুনি। সবাই কয়"।

এমন বর্ষণমুখর দিনে মণিকুমারের বৌয়ের সঙ্গে মশকরা করতে ইচ্ছে করছিল। একথা-সেকথা বলার পর তার ঠাকুর দিদির বলা একটা ধাঁধা বৌকে ধরে বসল,

"উঠতি পাখি ঝুপুর ঝুপুর,
বসতি পাখি ন্যাদা।
আহার করতি যায়রে পাকি
ন্যাজ থুয়ে যায় বাঁধা"।
উত্তরটা ক'তো টুসি, কেমন পারিস?

টুসি উত্তর দিতে পারেনি। মণিকুমার তোড়ো জাল জলের মধ্যে ঝপাং করে ছুঁড়ে ফেলে বলল,

"আমার হাতে দড়ি বাঁদা মানে ন্যাজ এইডে, আহার কত্তি গেল মানে; জাল জলে ছুঁড়ে দিলুম মাচ ধরার জন্যি। আস্তে আস্তে জাল টাইনে উপরে তুলে থ্যাপ করে মাটির উপর রাখলুম মানে ন্যাদা হয় বসে পইড়ল। জাল হাতে গুটিয়ে নিয়ার সুমায় লুহার জালের কাটি ঝুম ঝুম শব্দ করে না? তাই উঠতি পাখি ঝুপুর ঝুপুর"।

তার মানে হলো - "খ্যাপলা জাল, খ্যাপলা জাল"।

উত্তরটা বলে মণিকুমার খুশির হাসি হেসে উঠেছিল। এখন সে খ্যাপলা জালে মাছ ধরে না। মাছও নেই, জলও নেই। বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তালের ডোঙায় উঠে কচুড়িপানা বিলি কাটতে কাটতে একটু গভীর জলের দিকে এগোয় পাতজাল ছড়াতে ছড়াতে। ডোঙায় চড়ে এদিক-ওদিক করে। শাপলা টেনে তোলে, লকলকে কমলির ডগা ভাঙে। জাল গোটাতে গোটাতে পাড়ে চলে আসে। ডোঙা বাঁধা দড়ির খুঁটো মাটিতে পুঁতে রাখে। উঠোনে এসে জাল থেকে মাছ ছাড়ায়। ডোঙায় চ'ড়ে জাল পাতা-তোলার কাজে আগ্রহ দেখে বৌকে কতদিন বলেছে,

"যা টুসি শরীলে তেমন জুত নেই; জালখান তুই পাইতে থুয়ায়"।

টুসির মুখ আলো হয়ে ওঠে। পাতজাল, লগি (ডোঙা বেয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত শক্ত লাঠি) নিয়ে সড়সড় করে বিলের ধারে বাঁধা ডোঙার দড়ি খুলে; ব'সে পড়ে। কচুরি পানা বিলি কাটতে কাটতে এগিয়ে যায়। পুঁটি, খলসে, জিয়ল, ল্যাটা, শোল মাছ পায়।

____________________


।। পর্ব-৩ ।।



কার্তিক মাসের প্রথম থেকেই বিলের জমিতে সারাদিন পড়ে থাকতে হয় দামোদর তীরবর্তীর বাসিন্দাদের। হাঁটু সমান জলের কচুরিপানা, আগাছা, শেওলা টেনে এনে গাদা মেরে রাখে বিলের পাড়ে ও আল বরাবর। পায়ের পাতা ডোবা জলে কাদা করে বোরো ধান রোপন করার কাজ শুরু হয় অগ্রহায়ণ মাস থেকে। কাদা করার কাজটা কঠোর পরিশ্রমের। চারবার চাষ দেওয়ার পর বিদে যাবে একবার। তারপর মই টানা। মই টানার কাজটা মণিকুমার নিজেরাই করে। মই-এর উপর গাছের মোটা ডাল চাপিয়ে মই-এ বাঁধা দড়ি কোমরে কষে বেঁধে হাটুর নীচ অবধি কাদার মধ্যে সর্বশক্তি দিয়ে পা টেনে তুলে জমির এমাথা-ওমাথা করে। শরীরে কাদার একটা প্রলেপ পড়ে যায়। শুকিয়ে উঠলে চামড়ায় টান ধরে। হাত-পা কুটকুট করে। ফুলটুসি মই টেনে হাঁফিয়ে গেছে। জিরিয়ে নিচ্ছে কচুরিপানার স্তূপের উপর বসে। ছোটো সরকারবাবুর একদিন মই-চড়ার সখ হয়েছে। এদিকেই এগিয়ে আসছে মনে হচ্ছে। এসেই বায়না করবে, "রাঙাঠাম্মি আমি মই-এ উঠব।"

আহা-রে, দুধের ছেলে মা-হারা হল! ছেলেটার মুখের দিকে তাকালে বুকটা ফেটে যায় ফুলটুসির। এই সেদিন ওদের বাড়ি বিদে আনতে গিয়ে দেখে, অপুর ওলের তরকারিতে গলা কুটকুট করছে, সেকথা কাকি, নতুন মা'কে সাহস করে বলতে পারছে না, বকুনি খাওয়ার ভয়ে। এক এক গরাস করে গিলছে আর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।

"কী অপু তরকারিতে খুব ঝাল বুঝি? ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে।"

"গলা চুলকাচ্ছে?"

"ও বৌমা - তোমরা ছেলেটাকে মোটেই খেয়াল কর না। গলা ধরেছে, সে কথা মুখ ফুটে বলতে পর্যন্ত পারছে না। কেমন ধারা মা-কাকিমা তোমরা? দাঁড়া ভাই, দাঁড়া তেঁতুল নিয়ে আসি। তেঁতুল খেলে সেরে যাবে।"

ফুলটুসি ঘর থেকে তেঁতুল এনে অপুর হাতে দিয়ে বলল, "খা দাদা, গলা ধরা সেরে যাবে।"

ফুলটুসিদের বিলে কাজের সময় অপু এসে হানা দিচ্ছে মাঝে মাঝে। কতরকমের বায়না করে। কাদা-মাটি নিয়ে খেলা করে। ফুলটুসির নিষেধ মানে না। নিষেধ বেশি করলে কাদা জলে নেমে গিয়ে খলখল করে হাসে। এমন শিশুকে ভালো না বেসে পারা যায়?

অপু বিলের পাড় ধরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে একজন শহুরে মহিলা। গলায় ক্যামেরা ঝুলছে। ফটাফট ছবি তুলে যাচ্ছে। অপু কাছে এসে বলল, "এ হল কুন্তি দিদিমণি। আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছে। সকালবেলায় বিলের শালুকফুলের অনেক ছবি তুলেছে। আগে কখনও এত শালুকফুল দেখেনি কিনা! পাখির ছবি তুলবে তাই ওই দিকে নিয়ে যাচ্ছি।"

মণিকুমার বলে, "এখনও তেমন একটা পাখি আসেনি। জাঁকিয়ে শীত পড়লে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি নামে, উড়ে যায়। বাতাসে শোঁ শোঁ আওয়াজ হয়।"

বেশ কয়েকটি শামুকখোল এই বিলেই আস্তানা গেড়েছে সারাবছরের জন্য। ‌কয়েকদিন আগে ভাণ্ডি শামুকখোল ধরে রান্না করে খেয়েছে। একটুকরো মাংস বিষ মাখিয়ে বর্শীতে গেঁথে দিয়েছিল। বিষ মাখানো মাংসের টুকরো গিলতে গিয়ে গলায় আটকে সে কী আছাড়ি বিছাড়ি। অপু খুব কেঁদেছিল। মা'কে হারানোর কান্নার তোড়ের মতো। রাঙাঠাম্মি অনেক বুঝিয়ে, ভালোবেসে কান্না থামিয়ে ছিল। শামুকখোলের দল ঝুপ করে বিলের জলে নেমে খুঁটে খুঁটে খায়। সারাদিনের এক এক সময় জলে ছায়া পড়ে এক এক রকমের... অপু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে। নিজের ছায়াও দেখে কাদাজলে। গরু, মোষ, ছাগল চরে বেড়ায় পাড় দিয়ে। বক, ফিঙে, শালিকপাখি - গরুর পিঠে উঠে ঘুরে বেড়ায়। অপুর খুব ইচ্ছে করে গরু-মোষের পিঠে উঠে চরে বেড়াতে - কী মজাটাই না হতো।

পড়ন্ত বিকেলের সূর্যরশ্মি বিলের জলে রং গুলে দেয়। ডোঙার খোলের জলটুকু পর্যন্ত রঙিন হয়ে ওঠে। লাল টুকটুকে সূর্যিমামা তালগাছের মাথার ওপাশে ডুব দেয়। জল - যে কে সেই হয়ে যায়। অপু তার ডাগর চোখ মেলে বিশ্বপ্রকৃতির অপূর্ব রূপের বদল দেখে। সকালে নীল-সাদা মেঘের ছায়া তার মন ভালো করে দেয়। মায়ের উপর অভিমান হয়। কেন যে মা তাকে একা রেখে চলে গেল? কত কষ্ট হয় তার। মা কেন আবার ফিরে আসে না? দুগ্গা ঠাকুরের মতো তার মা'কে চওড়া করে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে, পায়ে আলতা পরিয়ে, নতুন কাপড়ে ঢেকে কাঁধে করে নিয়ে গেল। কতগুলো লোক... দুগ্গাঠাকুরকে মায়ের মতো করে সিঁদুর পরালো কত মানুষ। ঠাকুরের মুখে সন্দেশ দিয়ে কানে কানে কী যেন বলছিল সবাই। অপু জিজ্ঞেস করছিল রাঙাঠাম্মিকে, "ঠাকুরের কানে কী বলছে সবাই?"

উত্তর এল, "মা - তুমি আবার এসো। সেইজন্য ঠাকুর প্রতিবছর আসে।"

"আমার মা'কে কেউ বলে দেয়নি বলে আসে না - তাই না ঠাম্মি?"

ফুলটুসি বোবা হয়ে যায়। কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। অপুকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। এ- দৃশ্য দেখে অন্যরা অবাক হয়ে যায়। ছোটো সরকারবাবুকে কোলে তুলে নেয় সে। ডাগর চোখের ছেলেটির জন্য বুকের মধ্যে হু-হু করে ওঠে। ও পৃথিবীর আলো দেখার দিন ফুলটুসি ছিল হাসপাতালে। ভগবানের বিচার নাই! এমন ছেলের; এমন কপাল! ভালোবাসে সবাই; কিন্তু মায়ের ওম? কেউ দিতে পারে না। কেউ না। বাবা তার নতুনমাকে নিয়ে ব্যস্ত! অপুকে এই বিল পাঁচ মাসে অনেক আপন করে নিয়েছে।

ডোঙাদাদু প্রতিদিন আটি বেঁধে শালুক তুলে আনে। অপু সঙ্গী হয়। বেলা হয়ে গেলেও হেমন্তের হিম ধানের চারার উপর টলমল করে। অপু বড়ো একটা পাটকাঠি দিয়ে শিশির বিন্দু সরিয়ে দেয়। ঠাকুরদাদার কাছে শুনেছে বেশি শিশির পড়লে ধানের চারা নষ্ট হয়ে যায়। মাতৃহীন ছয় বছরের অপু বিলের বুকে ঘটে চলা ঘটনার মস্তবড়ো দর্শক। ডাগর চোখ মেলে দেখে। বিস্মিত হয়। কখনও তাদের একজন হয়ে ওঠে। অঙ্কুরিত ধান কাদার উপর ছড়িয়ে দিলে সকালে-বিকালে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি চলে আসে। দল বেঁধে নামে। পাখিদের শাঁ করে নামা শাঁ করে উড়ে যাওয়া অপুর ভীষণ ভালো লাগে। দিন দশেক পাখিদের তাড়াতে হয়। অপু যেচে সাথ দিয়েছে দাদুর। সবুজ পাতা বেরিয়ে গেলে পাখির উৎপাত কমে আসে। ধান থেকে ধানগাছ হওয়া ওকে বেশ কয়েকদিন মাতিয়ে রেখেছিল। ধান রোদে দেওয়া, জলে দুই দিন ভিজিয়ে রাখার পর জল ঝরানো, বিচুলি বিছিয়ে তার উপর তাবু, কলাপাতা বিছিয়ে জল ঝরানো ধান ছড়িয়ে দিল। কলাপাতা দিয়ে ঢেকে বিচুলি বিছিয়ে আবার তাবু দিয়ে ঢেকে দিল। অপু রোজ কোনার কলাপাতা উঁচু করে গাছ বেরিয়ে আসা দেখার লোভ সামলাতে পারেনি। বকুনি দুই-একবার খেতে হয়েছে। আট/দশ দিন পর মুখ ফেটে সাদা অঙ্কুর বেরিয়ে এলে কাদার উপর ছিটিয়ে দিলেই ধানগাছ হয়ে গেল। বীজ থেকে চারা হয় জানে, কিন্ত এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা আগে ছিল না। মা করোনায় মারা না গেলে; অজানাই থেকে যেত। রাজস্থানের ছোট্টো শহরে দু-কামরার ঘরে মা-বেটার সময় কেটে যেত, স্কুলের সময়টুকু ছাড়া। বাবা রুগী নিয়েই ব্যস্ত। ঠিক সময়মতো চিকিৎসা করলে তার মা মারা যেত না... ঠাকুরমার মুখে শোনে... বাবার উপর রাগ হয়। তাইতো ডাকলেও কাছে যায় না।

অপুর নোয়া ঠাম্মি সর্ষে, ছোলা, মটর, মুসুরি, মুগ, তিল, তিসি, পালং শাকের বীজ, লাল শাকের বীজ উঠোনে পাটি বিছিয়ে রোদ দেয়। রঙ্গোলি মনে হয় অপুর। রাজস্থানে কত রঙ্গোলি দেখেছে দেওয়ালির সময়।

এইসব বীজ ছড়িয়ে দিলেই মাসখানেকের মধ্যে বিলের বুক ফসলে ভরে ওঠবে। চাষের দরকার নেই কাদা মাটিতে ছড়িয়ে দিলেই হল। পড়ন্ত বিকেলে রঙ-বাহারি বিলের অপরূপ সৌন্দর্যে ফুলটুসি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিশোরীবেলায় তার বাপের গাঁয়ের শীতকালের মাঠ আর এই বিলের সাজ একাকার হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় রাখাল পরিকে। মণিকুমারের প্রতি টানে কোনো ফাঁক নেই, কিন্তু পরিদাদাকে ভুলতে পারেনি আজও। বিয়ের পরে তাদের দেখা হয়নি কত যুগ!

____________________


।। পর্ব-৪ ।।



আগাম অতি বৃষ্টি না হলে গভীর জলা জায়গাটা ছাড়া চারপাশে পাট, আউশ ধান হয়। আমন ধানের বীজও ছড়িয়ে রাখে কেউ কেউ। শীতে জল থাকে না। সোনার ফসল ফলে। সার, জলের খরচ হয় না বললেই চলে। এবার নিম্নচাপের বৃষ্টির ফলে জল জমে আছে। কোমরের উপরে জল। সে জল বেরিয়ে পলদা খালে বা খালবোয়ালিয়ার খাল দিয়ে বেরিয়ে যাবার রাস্তা বন্ধ। পলদার মুখে বাঁধাল দেওয়া। খালের মুখেও তাই। অল্প জলে পানা আর আবর্জনার স্তূপ মাঝে মাঝে। একটু উঁচুতে কিছুটা জায়গায় ধানের বীজতলা। আর বৃষ্টি না হলে হয়তো রোপন করতে পারবে চাষীরা। সকাল হলেই এখানকার নারী-পুরুষেরা দল বেঁধে কাঁটাতারের বেড়ার গেটে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ওপাশের জমিতে চাষ-আবাদ করতে যাবার জন্য। কাঁটাতার আর দাঁড়গাছা বিলের মধ্যবর্তী মাঠে চাষ করে ফসল তুলে আনতে বেড়ার এ-পাশের মানুষের হয়রানির শেষ থাকে না। দাঁড়গাছা বিলের ধার দিয়ে বেশ কয়েক ঘর মুসলিম পরিবারের বাস। ঘরবাড়ির কাঠামো তাদের দারিদ্রতার চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাড়ার যুবকরা ভিন্ রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে বিভিন্ন কাজে। কাদা প্যাচপ্যাচানি। মাটির মেঝের ডোয়া রসে ড্যাবড্যাবে হয়ে আছে। খালের পাশ দিয়ে বিএসএফ জওয়ানরা টহল দিচ্ছে। একই খালের জলে পাট জাগ দেওয়া আর ছাড়ানোর কাজ করে। এ-পারে ভারতের মানুষ আর ও-পারে বাংলাদেশিরা। পয়লা বৈশাখের দিন দুই দেশের মানুষ একসঙ্গে মাছ ধরে। ওই একটা দিনই। দাঁড়গাছা খালের ধারের অধিবাসীরা অতিথিপরায়ণ। কাদা প্যাচপ্যাচানি উঠোনে চেয়ার এগিয়ে দেয়। কুন্তি বসে পড়ে। বৃদ্ধা ফরিদাবিবি নকসী কাঁথা সেলাই করছে একহাত ঘোমটা দিয়ে। ঘোমটায় ঢাকা মুখ নাড়িয়ে শোনালো তাদের সুখ-দুঃখের গাঁথা। দরিদ্র ভিন্-ধর্মী মানুষদের এমন আপ্যায়নে কুন্তি অবাক। আরও অবাক হল এ-পাড়ার ছেলে-মেয়েরা ও-দেশের স্কুলে পড়তে যায় শুনে। ফরিদা, আকবর, রুকসানা, আজমল, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরল। টহলদারি বিএসএফ-দের চোখে ফাঁকি দিয়ে যাওয়া-আসা করে। ওদের বিয়েও হয় ও-দেশে। অনেকে ও-দেশ থেকে বিয়ে করে নিয়ে চলে আসছে হামেশাই!

"বিয়ে কেমন করে হয়?" প্রশ্ন করে কুন্তি।

"অসুবিদে নেই। হয়ে যায়। খালের পাড়ে সব কুটুম রয়েচে। ছেলে ক্যান? ছেলের বাপকে পর্যন্ত বিয়ে দিয়ে নিয়ে আসতে পারে করিম চাচা।" হাসতে হাসতে বলল ফজর আলী।

সঙ্গী ফুলটুসি পাড়ার সবাইকে বলল, "তোমরা সবাই আমাদের পাড়ায় নাচ, গান-বাজনা হবে দেখতে যেও।"

ফুলটুসির ভাষা মার্জিত। সাত বছর বয়স থেকে বিয়ের আগ পর্যন্ত দমদমে দুঃসম্পর্কের পিসির বাড়ি ছিল। অক্ষর জ্ঞান ওই সময়ে হয়।

২০১২ সালের দুর্গাপুজোর কয়েকটা দিন কুন্তি হুদোয় ছিল। তখন ফুলটুসির সঙ্গে পরিচয় হয়। করোনার সময়ে সীমান্তের লোকেরা কেমন আছে জানার জন্য আবার এসেছে। ফুলটুসিদের কাছাকাছি হতেই বুঝল এই সেই বউটি। ধুনুচি নাচ নেচে একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছিল। তখন এসেছিল সীমান্তের দুর্গাপুজো দেখতে। বিলপাড়ে শরিকানা উঠোনে পুজোর ব্যবস্থা হয়েছিল। ছোট্ট প্যাণ্ডেল। পাশে স্টেজ। দুপুরবেলা থেকে উঠোনে, খামারে চুড়িমালা, খেলনা, মিষ্টিমিঠাই, তেলেভাজা, ফুচকা, বাদাম, হরেক রকম জিনিসের দোকান বসে গেল। সন্ধ্যে নামার আগেই জমজমাট হয়ে উঠল পুজো খোলা। তারস্বরে মাইক বেজে যাচ্ছে। একটা গানই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে। "ও টুনির মা তোমার টুনি কথা শোনে না..." ইত্যাদি ইত্যাদি।

এসো-জন, বসো-জন প্রত্যেকটি বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজন এসেছে। এসেছে মেয়ে-জামাই। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট এবং দিল্লিতে হাতুড়ে ডাক্তারি আর কোয়াক ডাক্তারি করতে যাওয়া ছেলেরা সপরিবারে। আর্মিতে দু'-চারজন চাকরি করে তারাও এসেছে। উচ্চশিক্ষিত বা উচ্চপদস্থ চাকুরে এই গ্রামে কেউ নেই। এরা সবাই বছরে একবারই আসে। প্রতিটি বাড়ি হয়ে উঠেছে উৎসবমুখর। শহর থেকে আসবে নাচ-গানের দল। ৫ ঘণ্টা নেচে, গেয়ে মাতিয়ে দেবে ৩০ হাজার টাকায়। রঙিন জলের ফোয়ারা ছুটবে বাঁ-হাতের পয়সায়। রাতের অন্ধকারের দরকার পড়বে না রঙিন পানীয় পানে। সন্ধ্যারতির ঢাকের বাদ্যিকে পাল্লা দিতে হয় 'টুনির মা' গানের সঙ্গে। সন্ধ্যারতি হচ্ছে, সঙ্গে 'টুনির মা' গান। কুন্তি দুই একজনকে বলেছিল গানটা বন্ধ করতে। উত্তর এল, "ওদের মাইকটা বাজছে; আমাদেরটা বন্ধ করা যাবে না।"

গ্রাম্য মহিলাদের ধুনুচি নাচ শুরু হল একটু পরেই। ঘোমটা দেওয়া রমণীরা ঢাকের তালে তালে দু'হাতের তালুতে ধুনুচি নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে কী নাচটাই না নাচল, তবে ফুলটুসির সঙ্গে কারও তুলনা চলে না। গলগলে ধোঁয়া ওঠা ধুনুচি মুখে ফুলটুসির সেকি নাচ! ধুনুচি নাচের সময় মাইক ক্ষ্যান্ত দিয়েছিল। বৌদের কোমর দুলুনির টানে পুরুষ মানুষের ভিড়! নির্মেদ একহারা চেহারার ফুলটুসির নাচের ভক্ত পুরুষেরা চোখ দিয়ে গিলছিল। নাচ শেষে হাততালিতে ফেটে পড়ল পুজো খোলা। অন্য নারীরা হিংসে করে টুসিকে। ভ্রু কুঁচকে ওঠে তাদের! তাকে সবকিছুই ভালো করতে হবে? - "সব পুরুষমানষির মন ভুলাতি হবে?"

সন্ধ্যে সাতটায় দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল বঙ্গজননী বন্দনা দিয়ে। সুন্দর পরিবেশনা। শেষ হতেই "নাচের গান হোক... নাচের গান হোক..." বলে চিল চিৎকার। জনতার রায়ই শেষ কথা। ছ'টি বাড়ির ঘরের বারান্দা, উঠোন কোথাও একফোঁটা পা ফেলার জায়গা নেই। নিমন্ত্রিত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পদস্থ কর্তাব্যক্তিদের বসার এবং আপ্যায়নের আলাদা ব্যবস্থা হয়েছে। উঠোনে পাতা তাঁবুতে বসে কুন্তি সেদিনের অনুষ্ঠান দেখেছিল। একের পর এক নাচের গান হচ্ছে - সিটি আর উল্লাসে ফেটে পড়ছে তরুণ-যুবকের দল। সুন্দরী মেয়েদের নাচে স্টেজে টাকা উড়ে আসছে! গ্রাম্য সংস্কৃতিতে টাকা উড়ছে! কুন্তির মামাবাড়ি ছিল গ্রামে। ছোটোবেলায় খুব আসত। সেখানে টাকা দিতে দেখেছে অষ্টকগান, যাত্রা, নাটকের সেরা কুশীলবদের। সেপটিপিন দিয়ে শাড়ি/জামায় আটকে দিয়েছে দশ/বিশ টাকা। ও তো বাণ্ডিল বাণ্ডিল! গুজরাটি ভাংড়া গানের নাচনেওয়ালী মুখের মধ্যে আঙুল দিয়ে সিটি দিতেই টাকার বাণ্ডিল ছুড়ে দিলেন একজন কমাণ্ডার। অধিকাংশ যুবকদের পা টলছে। বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় স্টেজের সামনেটা আবছা আবরণ। মায়েদের, বৌদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। পুরুষ মানুষেরা কোনো অঘটন ঘটিয়ে না বসে। গতবছর ফুলটুসির ছোটোজামাই মেজ সরকারের ছাদ থেকে টাল সামলাতে না পেরে নীচে পড়ে গিয়েছিল। ইটের কোনায় চোখ লেগে সেকি বিপদ! দুই পাড়ার তরুণ যুবকদের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে পুজোর কয়দিন। গণ্ডগোল হওয়ার সম্ভাবনায় বাড়ির কর্তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। লাল-সবুজের পুজো। দুই দলের একটাই লক্ষ্য নিজেদের সেরা প্রমাণ করা। দুশ্চিন্তা সেই কারণে অনেক বেশি। দু'চারজন বিলের পাড়ে কাদা-মাটি মেখে পড়ে রইল সারারাত। পরের দিন সকালে খালি বোতলের ছড়াছড়ি বিলের পাড় দিয়ে। এ উন্মাদনা যেন সারা বছরেরটা উসুল করে নেওয়া। শহরের আলো ঝলমলে জাঁকজমকপূর্ণ পুজো দেখার সৌভাগ্য হয় না তাদের। সদর মফঃস্বলের পুজো দেখতে হলে দুপুরে বেরিয়ে সন্ধ্যেয় ফিরে আসতে হবে। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব এইভাবেই পালন করে সীমান্তের মানুষ। গ্রামবাসীদের আতিথেয়তা তুলনাহীন। মাথা গুনে রান্না হয় না কোনো পরিবারে। যদিও চিড়ে, মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, নাড়ুকে পাল্লা দিতে হচ্ছে লুচি, ঘুগনি, সুজি, ফ্রাইড রাইস, পোলাও, চিকেন, মাটনের সঙ্গে। শহুরে হাওয়া লেগে গেছে পল্লির দ্বারে দ্বারে।

হুদো দিগম্বরপুরের সব পরিবার ও-পার বাংলা থেকে এসে ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কার করে বাস করতে শুরু করে। পতিত জমি আবাদযোগ্য করে তুলতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আশপাশের গ্রামে ঘোষ, মাহিষ্য ও মুসলমানদের বাস। বিলের অপর পাশে একচেটিয়া ব্রাহ্মণদের বাস ছিল অতীতে। তাঁরা ও-পার বাংলার নিম্নবর্ণের মানুষদের, মানুষ বলেই গণ্য করত না। দীঘির ও-পারের গ্রাম দিগম্বরপুরের রায়বাড়ির বর্তমান বংশধর একটু বিনয়ের সঙ্গেই সেজো সরকারকে বললেন "কাকা, কিছু মনে কোরো না; তোমরা বলেই পেরেচো ঝোপ-জঙ্গলে বাস করতে। আমরা হলে কিছুতেই পারতাম না। বাবা গল্প করত বন্য জীবজন্তুর আখড়া ছিল তোমাদের হুদো"।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলতে পারেন যারা (যদিও কথাগুলো বলার মধ্যে যথেষ্ট বিনয় ছিল); তাহলে ও-পার বাংলা থেকে সদ্য আসা মানুষদের স্থানীয় মানুষ; বিশেষ করে উচ্চবর্ণের মানুষদের কাছে কত হেনস্থা হতে হয়েছে? এসব বাড়িতে সকল বাঙালদের অন্দরমহলে প্রবেশের ছাড়পত্র মেলেনি এখনও। গ্রামবাসী এক যুবক বলেই বসল, "আরে বাপরে ঐ ঠাকুর বাড়ির চাতালে বসে কথা বলেছো? বসতে দিল? চেয়ার দিয়েছে? বিশাল ব্যাপার। মন্দিরে দোল উৎসব খুব ভালো হয়। কাছে যেতেই দেয় না আমাদের। কলে হাত ধুতে গেলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়।"

প্রতিদিন কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক গলে গরু-ছাগল বাংলাদেশে চ'রে বিকালে ফিরে আসে।

বিএসএফ কমাণ্ডের কানে যেতেই কড়া নির্দেশ জারি হয়েছে। জনসাধারণের চলাচল নিষিদ্ধ। তার উপরে চলছে ওমিক্রন।

হুদো দিগম্বরপুরের গ্রামবাসীদের দুর্গতি বেড়েছে আরও এক ধাপ। খালবোয়ালিয়া ছেড়ে বিষ্ণুপুরের রাস্তায় গাড়ি উঠতেই একটা গা-ছমছমে পরিবেশ। কোন বসতি নেই। রাস্তার দু'ধার দিয়ে আম-কাঁঠাল ও সেগুন বাগান। আগাছার ঝোপ-জঙ্গল। দিনেরবেলায় একটানা ঝিঁঝিঁর ডাক। বিএসএফ-দের রোডের উপর দিয়ে কিছুটা যেতে হবে। গ্রামের মেম্বার আগে থাকতে বলে রাখায় কোনো বাধা এল না। খড়ের ছাউনির নীচে রাইফেল হাতে পাহারারত জওয়ান হাত নেড়ে চলে যেতে বললেন। রাস্তার ডানদিক দিয়ে কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার ওপাশে দাঁড়গাছা বিলের পাশ দিয়ে হলুদ রঙা ফুলে সর্ষেক্ষেত আলো হয়ে আছে। এই সময়ে অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি জল আছে বিলে। বিলটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় মানুষদের মুখে শোনা বাংলাদেশের ১০৫টা খাল-বিলের জল দাঁড়গাছা বিল দিয়ে নেমে আসে দামোদরের বিলে। অতীতে দাঁড়গাছা বিলের সঙ্গে গোবিন্দপুরের পরে তালদহের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার পর জেগে ওঠা চরে চাষ হয়। দাঁড়গাছা বিলের ওপাশে বাংলাদেশের বড়ো বুন্দেলিয়া এবং ছোটো বুন্দেলিয়া। বিলের ডানদিকের গ্রাম হুদো দিগম্বরপুর, কাঁদিপুর, কাদাঘাটা। পলদা তীরবর্তী গ্রামগুলো হল কাদাঘাটা, মহেশপুর, বোয়ালিয়া, হুদো বোয়ালিয়া, কড়ুইগাছি, কুলতলা, গাটরা, শাকদা, ভগবানপুর, ট্যাংরা, পিঁপড়েগাছি, ময়দানপুর, মুড়াগাছা। দামোদর বিলের বাঁদিকে দিগম্বরপুর, প্রতাপপুর, মুকুন্দপুর। সব প্রাচীন গ্রাম। ছ'সাত পুরুষের বাস। বর্ণ-হিন্দু, মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি শহরমুখি। শিক্ষা-দীক্ষায় ও আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্ণের সঙ্গে উচ্চবর্ণের মানুষের কোনো উন্নতি হয়নি। কেউ কাউকে মান্যি করে না। শাসনহীন পল্লিসমাজ অবক্ষয়ের চরমে! আর্থিক অনটন নেই বললেই চলে। অন্তত দিনে দুইবার উনুন জ্বলে সব বাড়িতে।

দাঁড়গাছা বিল ও দামোদরের বিলের সংযোগস্থলে একটা ব্রিজ তৈরি হওয়ায় হুদো দিগম্বরপুর, কাঁদিপুরের মানুষদের সুবিধা হয়েছে। বেশী উপকৃত হয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

একবারই মাত্র দামোদর বিলের জল দাঁড়গাছা বিলে গিয়ে পড়েছিল। সেটা ২০০০ সালের বন্যার সময়। বন্যার সময় এতদঞ্চলের মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল বিএসএফ-দের সড়ক পথের উপর। বাংলাদেশের লোকেরা পানীয় জল ও খাবার দিয়ে গেছে ভারতীয়দের।

দামোদর বিলের আয়তন ৬,০০০ একর। বিলের পাশ দিয়ে দিগম্বরপুর যাচ্ছিল কুন্তি প্রাক্তন পঞ্চায়েত সদস্যের সঙ্গে। যিনি বিলের শেষ মাথা থেকে তালদহ খালের সংস্কার করার দায়িত্ব পান। এ অঞ্চল কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের অন্তর্গত। ব্রিজের এপারের গ্রামটির নাম দিগম্বরপুর। প্রাচীন গ্রাম। রায় পরিবারের ষষ্ঠ বংশধর সৌমেন রায় তাঁর পরিবার নিয়ে আছেন। অনেকটা রাস্তা হাঁটতে হয়েছে। মন্দির চাতালে এসে বসে পড়ল কুন্তি। রায় পরিবারের শেষ বংশধর এগিয়ে এল।

"কী ব্যাপার সেজদা এই ভরদুপুরে? ও-ও-মা তিনটে চেয়ার নিয়ে আয় মা। বসতে দে"।

কিশোরী তিনটি চেয়ার এনে পেতে দিল।

"আপনাদের গ্রাম দেখার জন্য এসেছি। নীলবিদ্রোহের নেতা দিগম্বর বিশ্বাসের বাড়ি দেখতে এলাম।"

"নীলবিদ্রোহী দিগম্বর বিশ্বাসের বাড়ি? এই গ্রামে তো নয় তাঁর বাড়ি? কোনোকালেই ছিল না। তাঁর বাড়ি পোড়াগাছায়। বিপ্লবী বসন্ত বিশ্বাসের মেজঠাকুরদাদা। আরে, কারামন্ত্রী যাঁদের বংশধর। লোকে বলে বসন্ত বিশ্বাসকে ওঁর ঠাকুর দাদাই ধরিয়ে দিয়েছিল। এখন তাঁর নাতি বসন্ত বিশ্বাসকে নিয়ে কত আদিখ্যেতা দেখাচ্ছে! থু-থু ঘেন্না ধরে গেল। এই গ্রামের পত্তন করেন শ্রীপতি ব্যানার্জি। সেই বংশের লোক আমরা। 'রায়' উপাধি পাওয়া। একচেটিয়া ব্রাহ্মণদের বাস ছিল। নীলবিদ্রোহী দিগম্বর বিশ্বাস কৈবর্ত্য ছিলেন। তাঁর নামানুসারে দিগম্বরপুর নাম হয়নি। ওই যে বিলের ধারে বটগাছ দেখলেন ওখানে একজন দিগম্বর সাধু থাকতেন। তাঁর নামানুসারেই গ্রামের নাম দিগম্বরপুর নাম হয়েছে। আমার পুর্বপুরুষেরা রাজা রুদ্র রায়ের সময় লেখাপড়া শিখে অধিকাংশই শহরমুখী হয়েছেন শিক্ষা আর চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য। অবস্থা ভালো নয় আর লেখাপড়ায় পিছিয়ে থাকারা গ্রামে পড়ে রয়েছে। এই আমি যদি চাকরি করতাম পড়ে থাকতাম এই গ্রামে? কখনও নয়। আমার মেয়ে ওকালতি পড়ছে, পড়া শেষে ও কী থাকবে এখানে? না। থাকা সম্ভবও না। যারা গ্রামের সামাজিক পরিবেশের উন্নতি করবে, গ্রামের সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকিয়ে শহুরে বাবু হয়ে যাচ্ছে। ক্যাট মালরা গ্রামে পড়ে থেকে নীচে টেনে নামাচ্ছে পল্লিগ্রামের সমাজকে।"

"প্রবীন লোকেদের মুখে শুনেছি বিলের পাশে প্রাচীন বটগাছের নীচে একজন দিগম্বর (বস্ত্রহীন) সন্ন্যাসী থাকতেন। নির্জন বটগাছের কোটরে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন। সেই কারণে জনবসতি গড়ে ওঠার পর গ্রামটির নাম হয়ে যায় দিগম্বরপুর। লোকে জানে না তাই উল্টোপাল্টা বলে। বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল। শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকেও অনেক এগিয়ে; তার সাক্ষ্য বহন করছে, দেখছেন না, ঐ যে প্রাচীন লাইব্রেরী, পোষ্ট-অফিস।"

"মন্দিরটির বয়স কত হতে পারে?"

সৌমেনবাবু উত্তর দিলেন, "শিব মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে প্রায় আড়াই'শ বছর আগে। নিত্য পূজারী আছে। ধুমধামের সঙ্গে দোলোৎসব হয়। ভগ্ন বাড়ি-ঘর চোখ এড়ালো না কুন্তির। জমিদারদের পতনের মূল তাদের অলসতা, বিলাস-ব্যসন এবং চারিত্রিক স্খলন। তিনি দ্বিধাহীনভাবে ব্যক্ত করলেন। কয়েক হাজার বিঘে জমির মালিকদের বংশধরকে মুনিষ খাটতে হচ্ছে! একজনের হাতেই ত্রিশ বছরেই শেষ হয়ে গেছে ২০০ বিঘে জমি। নীল বিদ্রোহের অন্যতম নেতা বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের ষষ্ঠ বংশধর ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছিলেন কুন্তিকে। এ ক্ষোভ ছিল তাঁর পিতার প্রতি। ১০০ টাকার নোট সিগারেট বানিয়ে খেয়েছে। খাজনা বাকী আছে, ৫০/১০০ টাকায় ৫/১০ বিঘে জমি লিখে দিয়েছে। বস্তা বোঝাই দলিল-দস্তাবেজ আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। সেই জমিদার বাড়ির কিচ্ছুই অবশিষ্ট নেই; দুর্গা দালানের ভগ্ন গেট ছাড়া।"

যিনি এত কথা বললেন তিনিও মুনিষ খাটেন। তাঁর পরের প্রজন্ম অষ্টাদশী হেসেই গড়িয়ে পড়ছে; নীল বিদ্রোহের নেতা বিষ্ণুচরণ বিশ্বাসের নাম শুনে। ভাবখানা এমন; কী আর করেছে সে, তার জন্য গর্ব অনুভব করতে হবে? তার সম্পর্কে জানার জন্য শহর থেকে ঠা-ঠা রোদের মধ্যে এসে হাজির হয়েছে।

হায়! কয়েক লক্ষ কৃষককে ঐক্যবদ্ধ করে, ইংরেজ নীলকর সাহেবদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তাঁর নামটা কোথাও স্থান পায়নি। স্কুল, ক্লাব, পাড়া, রাস্তায় কোত্থাও না। লেখা হল 'নীলদর্পন' নাটক। খবর পৌঁছে গেল ইংল্যান্ডে। টনক নড়ল শাসকের। আইন করে বন্ধ হল নীলচাষ। ইতিহাস সৃষ্টিকারী মানুষটি ইতিহাসে ঠায় পাননি সেইভাবে। দেয়নি শাসকশ্রেণি। শেষ পরিণতি কী হয়েছিল সেই বিষয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। স্বাধীন দেশবাসী যেমন মনে রাখেনি; তেমনি মনে রাখেনি বা রাখার চেষ্টা করেনি তাঁর উত্তরসূরিরা, গ্রামবাসীরা। ব্রাত্যই থেকে গেছেন তিনি।

দিগম্বরপুরের বিলের পাড় বরাবর পাকা বাঁধালের কিছু অংশ এখনো দেখা যায়। ওদিকে দাঁড়গাছা বিলের পাশ দিয়ে নীলকুঠিতে যাতায়াতের রাস্তা রয়ে গেছে গোবিন্দপুরের মধ্যে দিয়ে। দিগম্বরপুর থেকে ২ কিলোমিটার দূরত্বে নীলকুঠির গুদাম ঘর খালবোয়ালিয়াতে। ভগ্নস্তূপের প্রতি খাঁজে কত গাঁথা গেঁথে আছে। গোবিন্দপুরের কুঠিবাড়িটি বিএসএফ-দের ক্যাম্প হয়েছে। সাহেবপুকুর রয়েছে খালবোয়ালিয়াতে। সে পুকুরের ইতিহাস মস্ত বড়ো ইতিহাস!

____________________


।। পর্ব-৫ ।।



দুলে দুলে অপু বর্ষাকাল রচনা পড়ছিল। "আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল। এই সময় ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে থাকে। মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে একটু পরিষ্কার হয়ে আবার মেঘ করে বৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে ঘরের বাইরে বেরোনো যায় না। নদী-নালা-খাল-বিল ভরে যায়।"

অপু, হঠাৎ পড়া থামিয়ে ঠাকুরদাদাকে প্রশ্ন করে, "আচ্ছা দাদু এটা তো শ্রাবণ মাস। কই এমন বৃষ্টি তো হল না? আমাদের বিলে তো জলই নেই। বই-তে কী ভুল লেখা?"

দাদু বলে, "ভুল লেখা হবে কেন? আগে বইতে লেখার মতো বর্ষাকাল ছিল। প্রকৃতি ক্ষেপে গেছে। সব উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে। অবশ্য মানুষই প্রকৃতিকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছে। তুমি পড়।"

সালটা ছিল ২০২২। গ্রীষ্মের খরায় প্রাণ হাঁসফাঁসিয়ে ওঠে। ৪৫ ডিগ্রী তাপমাত্রা। গরমের এমন দীর্ঘ দিন শেষ হতেই চায় না। চাষের কাজে বিরাম নেই। চাষীর বিশ্রাম নেই। পয়লা চৈত্রে বৃষ্টি হওয়ায় পাট বুনেছিল। দুই একটা সেচ দিয়েছে কেউ। উপর ঝরা না হলে পাট বাড়ে না। খাল-বিল শুকিয়ে ঠাঠা করছে। মণিকুমার উপর মাঠে একবিঘে ভাগে চাষ করেছিল। সেচ দিতে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে। এত তাপে পাটগাছ মরে যাচ্ছে। চাষীদের মাথায় হাত। পাট জাগ দেবে কোথায়? উপায় একটা বের করেছে, জমিতেই হাঁটু পর্যন্ত গর্ত কেটে পলিথিন বিছিয়ে স্যালোমেসিনের সাহায্যে সরকারি নিয়ম অগ্রাহ্য করে জল তুলে, পাট জাগ দিল অধিকাংশ চাষী। খরচের টাকা উঠে আসবে না পাট বিক্রি করে। ফুলটুসির দাদা ফোন করে বলেছে, তাদের গ্রামে বেশ কয়েকটি বাড়িতে টিউবয়েলে জল উঠছে না। কী যে হবে? গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ কেনা জল পান করে। ব্যবহারের জলও কী কিনতে হবে?

শরতের শেষে বৃষ্টি হয়ে চৈতালি ফসলের দফারফা হয়ে গেল। শীতকালও লুকোচুরি খেলেই কেটে গেল। শীতে চাষীদের নগদ অর্থের যোগান দিয়ে আসছে খেজুরের রস, গুড়, পাটালি। যত্নের অভাবে খেজুর গাছ অনেক কমে গেছে, গাছি অর্থাৎ শিউলীদের বড্ডো অভাব। কঠোর পরিশ্রমের কাজ। দুই/একজন কাজটি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

মণিকুমার এমনই একজন গাছি। সরকার আর মণ্ডল বাড়ির খেজুর গাছ ভাগে কাটে। নিজের দশটি খেজুর গাছ আছে। অকালে বৃষ্টি হওয়ায় গাছের ডাটা কেটে নলি পুততে অঘ্রাণের শেষ হয়ে গেল । রস নামতে পৌষের শেষ। শীত না পড়ায়, রস তেমন নামল না। বিশটা গাছে পাঁচ ভাঁড় রসও হয় না। অর্ধেক গৃহস্থকে দিয়ে আসতে হয়। ফুলটুসি রস জ্বালিয়ে গুড়-পাটালি বানায়। খাঁটি জিনিস। দর বেশি হলেও পাটালি একবেলাও পড়ে থাকে না। আবহাওয়ার পরিবর্তন হওয়ায় রস-গুড়ের স্বাদ-সুগন্ধ আগের মতো নেই। কয়েকটি গ্রামের মধ্যে ওই একটি বাড়িতে খাঁটি জিনিসটি পাওয়া যায়, তাই গাছি মণিকুমারের এলাকায় পরিচিতি বেশি। অন্য গাছিদের বক্তব্য - চিনি ছাড়া পাটালি হয় না। হাসে মণিকুমার। আখের গুড়, আলু সিদ্ধ ভেজাল দেয় তারা।

কুন্তী শীতকালে খাঁটি খেজুরের রস-গুড়ের টানে অপুদের গ্রামে যাবে বলেছিল। সে অপুর পিসির ননদ। বিয়ে-থা করেনি। মাস্টারি করে। ছুটি পেলেই গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে, ব্যাগপত্তর নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। পাহাড় -সমুদ্র-মরু অঞ্চলে প্রতি বছরই ঘুরতে যায়। করোনার সময় 'আপনজন' স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে ত্রাণ নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে গেছে। তারপর থেকে দূর ভ্রমণের থেকে গ্রাম ঘোরার নেশায় পেয়ে বসেছে। অপুদের গ্রামে ২০০০ সাল থেকে আসছে। এখন বছরে দু'বার আসেই। রবি ঠাকুরের গ্রামে বাঁধা বাংলাদেশের মূলসুরের সন্ধানে ফেরে। লেখালেখিও করে। 'সানন্দা'য় পূজাবার্ষিকীতে উপন্যাস বেরিয়েছে। কলকাতা বইমেলায় 'আনন্দ' থেকে বই বেরোবে। কুন্তী অপুর ঠাকুরমাকে ফোন করে জানিয়ে দেয় পৌষ পার্বণের আগের দিন আসছে। কুন্তীর আগমন-বার্তায় বাড়ির সবাই খুব খুশি। মেয়েটি খুব সহজে সকলকে আপন করে নিতে পারে। বাচ্চাদের জন্য কতকিছু নিয়ে আসে। কুন্তী মাজদিয়ায় দশটার ট্রেনে নেমে কাঁদিপুরের অটোয় উঠে বসল। রাস্তার দুই ধারে সর্ষে ফুলে মাঠ হলুদ হয়ে আছে। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। কুয়াশা চাদর সরিয়ে ঝট করে রোদ উঠে গেল। সর্ষে ফুলে বিন্দু বিন্দু শিশির ঝলমলিয়ে উঠল। একজোড়া হলদেরঙা পাখি কাঁঠালগাছের ডালে বসে দোল খাচ্ছে। বাবুইপাখির ঝাঁক জলার উপর দিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। ছাতারের কিচিরমিচির, আমবাগানের মধ্যে ঝিঁঝিঁর রব - কুন্তীকে আনমনা করে দেয়। বুনো গন্ধ নাকে এসে লাগে। এত সবুজ! প্রকৃতির কোমল স্পর্শ পেতেই ছুটে আসে বারেবারে। পিচের রাস্তা ছেড়ে ইঁটের রাস্তায় অটো নামতেই প্রবল ঝাঁকুনিতে কুন্তীর সম্বিৎ ফিরে আসে। অটোওয়ালা বলে, "দিদি এসে গেছি নামুন।" বাড়ির সামনে কুন্তী অটো থেকে নামতেই অপু দৌঁড়ে এল।

"আমার রেলগাড়ি এনেছো?"

"এনেছি, বাবা এনেছি।"

অপু কুন্তীকে জড়িয়ে ধরে বলল, "তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো?"

কুন্তী উত্তর দেয়, "খুব ভালোবাসি।"

অপু বলে, "আজ আমাদের গাছ কাটার পালা। তোমাকে খেজুরগাছ কাটা দেখতে নিয়ে যাব।"

"অপু ওকে একটু বসে জিরিয়ে নিতে দে। ছ্যান-খাওয়াটা করে নিক। মা কুন্তী, বাথরুমে জল তোলা আছে। ছ্যান করে ভাত খায়ে নেও। কাল সংক্রান্তি। রাজ্যির কাজ পড়ে রয়েছে। জামাকাপুড় কাচা ধোয়া, ঘরদোরের ঝুল ঝাড়া, ল্যাপাপোছা । পিঠেপুলি বানানোর আয়োজন। কাজের কী শেষ আছে মা?"

অপু রেলগাড়ি পেয়ে খেলায় মেতে উঠল। কুন্তী স্নান-খাওয়া করে অপুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ফুলটুসিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। সুন্দর সুন্দর বাড়ি তৈরি হয়েছে এদিকে। শহুরে অনুকরণে। ফুলটুসিদের টিনের চালের বেড়ার ঘর। মণিকুমার বাঁকে ভাঁড় ঝুলিয়ে খেজুর গাছ কাটতে যাচ্ছে। কুন্তী ও অপু সঙ্গে চলল মণিকুমারের।

কাঁধ থেকে বাঁক নামিয়ে মণিকুমার তরতর করে গাছে উঠে হেঁসো দিয়ে খেজুর গাছের চোখ কেটে, নলির মুখ পরিষ্কার করে ভাঁড় ঝুলিয়ে দিল। ওমনি ফোঁটা ফোঁটা রস নলি বেয়ে ভাঁড়ে পড়তে লাগল।

কী অদ্ভুত! কুন্তী অবাক হয়ে যায়। এমন শুষ্ক গাছের মাথা মিষ্ট রসে ভরা! আসার সময় ফাঁকা মাঠে রসের ভাঁড় গাছের মাঝামাঝি জায়গায় ঝুলতে দেখল। নলি থেকে একটা সুতো ভাঁড়ের মুখে ঝোলানো। পরে জানতে পারে রস নামানোর কষ্ট কমাতে এমন ব্যবস্থা। গাছ থেকে নেমে মণিকুমার, কুন্তিকে বলে, "দিদিমণি, রস খাওয়ার নেমন্তন্ন থাকল। সকালে চলে আসবেন।"

কুন্তী বলে, "টাটকা রস খাওয়ার নেমন্তন্ন ছাড়ছি না। সক্কালবেলায় হাজির হব। তোমার টুসি আমাকে পাগলাতলায় নিয়ে যাবে বলেছিল। বলে দিও আগামীকালই যাব।"

গাছ থেকে রস পাড়ার ছবি তোলার জন্য মোবাইলে ভোর পাঁচটায় অ্যালার্ম দিয়ে রাখল। বাড়িতে রাত বারোটা-একটায় ঘুমোলেও এখানে আসলে দশটায় ঘুমিয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষের রাত আটটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যায়। টিভি সিরিয়াল পল্লিকে জাগিয়ে রাখে দশটা পর্যন্ত। ভোর চারটেয় মোরগ ডেকে উঠল কোঁ-কোঁ-ক-র-র-কোঁ করে। ঘুম ভেঙে গেল কুন্তীর। "রাই জাগো, রাই জাগো" - প্রভাতী সঙ্গীত গেয়ে গেল শ্যামা বোষ্টমী। প্রাণ জুড়িয়ে গেল। কী মধুর সুর! টিনের চালে টুপটুপ করে শিশির পতনের শব্দ। পাখির কলতান - শিমুলতুলোর লেপের উষ্ণতা - না, কলকাতার ফ্লাটে যা শুধুই কল্পনা বিলাস! পৃথিবী জেগে ওঠার সাড়া পড়ে গেছে চতুর্দিকে। বাড়ির বড়োরা উঠে পড়েছে। কুন্তি উঠে পড়ল। হাতমুখ ধুয়ে ক্যামেরা নিয়ে চলল মাঠের দিকে। সঙ্গে ফুলটুসি। ঘন কুয়াশা। একটু দূরের জিনিসও অস্পষ্ট।

মণিকুমার গাছে উঠে রসের ভাঁড় খুলে খালি ভাঁড়ের কানাচ গোঁজে আটকে দিয়ে নেমে আসছে। কুন্তী রস পাড়ার ভিডিও বানিয়ে নিল। ঠাণ্ডার মধ্যে গাছ থেকে রস পাড়া খুবই কষ্টের। খালি পা, সামান্য একটা শীতের পোশাক। রস পাড়া শেষ হলে ভাগের ভাগ আড়াই ভাঁড় রস হল। রস জালের উনুন পাড়ে কুন্তিকে একটা টুল এগিয়ে বসতে দিয়ে, কাঁচের গ্লাসে রস ঢেলে দিল। কুন্তী এত ঠাণ্ডা রস কী করে খাবে ভাবছে, এর মধ্যে অপু এসে হাজির। উনুনের গরম হয়ে ওঠা রস স্টীলের গ্লাসে হাতা দিয়ে তুলে দিল অপুকে। অপু দৌঁড়ে পাটকাঠি ভেঙে নল বানিয়ে নিল। কুন্তীকেও একটা দিল। কুন্তীর দৃষ্টি জালার দিকে। শোঁ শোঁ আওয়াজ হচ্ছে । উপরটা সাদা ফেনায় ঢেকে গেল। হাতা দিয়ে কেটে ফেনা ভাঁড়ে তোলার পর রস গাঢ় লালচে হয়ে উঠল। ফুলটুসি বলে, "তাতরসে ভেজানো পিঠে খুব সুস্বাদু - বলে খানিকটা তুলে রাখল একটা পাত্রে।"

রস আরও গাঢ় হয়ে সোনালী বর্ণ ধারণ করল। বীচকাঠি দিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে উনুন থেকে নামিয়ে, আরও ঘেঁটে ঘেঁটে গাঢ় হাল্কা হলুদ বর্ণ করে থালায় ঢালার পর পাটালী হয়ে গেল। নলেন গুড়ের গন্ধে বাতাস ম-ম করছে।

কলাপাতায় খানিকটা গুড় তুলে মণিকুমার কুন্তীকে দিয়ে বলল, "খেয়ে দেখেন দিদিমণি নলেন গুড়ের স্বাদ কেমন?"

কুন্তী আঙুলের ডগায় গুড় তুলে মুখে দিয়ে বলল, "অপূর্ব। পাটালী বানানোর পুরো প্রসেসটা ভিড়িও করে নিয়েছি। দারুণ অভিজ্ঞতা হল।"

"পাগলাবাবার থানে কীভাবে যাবে?" বলে কুন্তী।

"টোটোয় করে যাব। বারোটার সময় আসতে বলেছি।"

পাগলাবাবার থান মানে পাগলাখালি। পলদা নদীর তীরে অবস্থিত। হুদো নারায়ণপুরের ও-পারে পলদা নদীর তীরে বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।‌ এই তাবৎ অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাস খুব জাগ্রত স্থান এটি। পাগলা বাবা সকলের মনোবাঞ্ছা পূরণ করে। টোটো এসে গেল বারোটায়। কুন্তী, অপু, ফুলটুসি চলল পাঁচ লিটার দুধ নিয়ে পাগলাবাবার পুজো দিতে।

____________________


।। পর্ব-৬ ।।



মার্চ মাসের শেষে ভোটের দামামা বেজে উঠল। ত্রি-স্তর পঞ্চায়েত ভোট। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে জেলা শহরে নমিনেশনপত্র জমা দেওয়া শুরু হয়ে গেল। রাস্তা-ঘাটের দুই ধারে কলাফুলের ফেস্টুনে ছয়লাপ। ক্লাবে সন্ধ্যে হলেই রঙিন জলের বোতলের পেটি আসছে। যে ভাবেই হোক অঞ্চল তাদের দখলে নিতেই হবে। দলের দাদারা বোঝাচ্ছে ক্ষমতায় তারাই আছে অন্যদল পঞ্চায়েত পেলে কোনো উন্নয়ন হবে না। গত পাঁচ বছরে শালুকফুল পঞ্চায়েত পেয়ে কী দিয়েছে মানুষকে? তারা, এবার কেউ পায়তারা ভাজলে সুদে-আসলে উশুল করে নেবে। রাস্তা-ঘাটে-মাঠে-দোকানে একটাই আলোচনা - 'ভোট'। খুবলে খুবলে ইট উঠে পড়া রাস্তায় তরুণ যুবক বাইক-বাহিনী ধুলোর ঝড় তুলে হুস্ হাস করে যাতায়াত করছে। কঞ্চিতে বাঁধা ফেস্টুন বোঁ-বোঁ করে ঘোরে বাতাসে। আমজনতাকে এভাবেই ঘোরাতে চাই। তাদের মর্জি মতো। ক্ষমতার জাহির এভাবেই দেখায়। শালুকফুল পঞ্চায়েত পেল বলে, গ্রামের রাস্তাটায় পিচ পড়ল না। দুর্ভোগ সবাইকেই ভুগতে হচ্ছে। বিলের খালটা সংস্কার হল না। যেটা খুব জরুরী ছিল। কেউ বলে টাকাটা ফেরৎ গেল, কেউ বলে পকেটে ঢুকল। খালটা সংস্কার হলে পাট নিয়ে এ অঞ্চলের চাষীদের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। রেশন, ঘর, বিভিন্ন ভাতা, শ্রী-র টাকা সুষ্ঠু বণ্টন হয়নি - এসবই ভোটপর্বে আলোচনার বিষয়। আলোচনা থেকে তর্ক-বিতর্ক। হাতাহাতিতে পৌঁছে যায় কখনও কখনও। মণিকুমার শ্রোতা। গণ্ডগোল জোরালো হয়ে উঠলে সরে যায় সেখান থেকে। বৈশাখের পয়লায় প্রচণ্ড বৃষ্টিতে তিলের জমিতে জল জমে গেল। জল বেরিয়ে যাওয়ার একমাত্র রাস্তার মুখে কলাফুলের নেতার জমি।

সরকার বাড়ির মেজকর্তা বলছিল, "ছবিরউদ্দিন তোমার জমির আলটা কেটে দিলে জল বেরিয়ে খালে পড়বে; নাহলে পেকে ওঠা তিল নষ্ট হয়ে যাবে। অনেক চাষীর ক্ষতি হয়ে যাবে।"

দুই এক কথায় তর্কাতর্কি। মাঠে দুইপক্ষের লোক জড়ো হয়ে বিশাল গণ্ডগোল। শেষে রক্তারক্তি হয়ে গেল। জল জায়গায় বসে গেল। অপুষ্ট তিল গাছ, শিকড় পচে হলুদ হয়ে গেল।

ভোটের নমিনেশন জমা দেওয়ার আগে এই বুথের কাস্তে সমর্থকরা মিটিং-এ বসেছিল। আগেরবার তারায় পেয়েছিল, ফলে মণিকুমারদের বুথে কোনো কাজ হয়নি। পঞ্চায়েতে গিয়ে পিছনের সারিতে চুপ করে বসে থাকতে হয়েছে মেম্বারকে। কোনো কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। শালুক ফুলের হাওয়া ভালো‌, তাই কাস্তে ছেড়ে শালুক ফুলের দলে যোগ দেবে তারা। তাছাড়া দলের মধ্যে একটা ধর্মীয় ধর্মীয় ভাব আছে। যে ভাবের মোহে বহু মানুষকে খুব সহজে একছাতার তলায় আনা যায়। আফিম-এর মতো। মণ্ডলবাড়ির পাঁচটি পরিবার দল বদল করলেও একটি পরিবার কাস্তেতে থেকে গেল, ফলে রেষারেষি চরম পর্যায়ে। বাবা-ছেলের দল আলাদা। এক সপ্তাহ পরেই ভোট।

বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলল। ৪৫ ডিগ্রী। তার সঙ্গে জুড়ে গেল ভোটের গরম। গ্রামে-গঞ্জে মানুষ মরার হিড়িক লেগে গেল। পড়ছে কী মরছে, বা রাত্রে শুয়ে আর উঠছে না। বয়স সব ৩০ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। প্রচুর মৃত্যুর অভিঘাতে শোক ক্ষণস্থায়ী! শোকের রেশ তাড়াতাড়ি কাটিয়ে ভোট মহোৎসবে মেতে উঠেছে। বঙ্গে অদ্ভুত একটা সময় চলছে।

মণিকুমার সন্ধ্যেবেলায় মাঠ থেকে এসে হাত-পা ধুয়ে টিভিটা অন করে বসেছে সবে। 'ABP আনন্দ' চ্যানেলে খবর শুনবে। ভোটের সাতকাহন। ভালো না লাগলে সিরিয়াল দেখবে।

"মণিকুমার বাড়ি আছো নাকি? বলে ডাকল মেজ সরকার।"

"আছি।" বলে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে তার সঙ্গে পাড়ার আরও পাঁচ/সাত জন উঠোনে দাঁড়িয়ে। মণ্ডল মশাই বলে ওঠে, "ভোট দুটো আমাদের দিও। তোমার খুড়িমা আমাদের বুথে দাঁড়িয়েছে। এবার মহিলা সিট কিনা। শালুক ফুলেই ভোটটা দিও। আগেরবারের মতো এবারও শালুক ফুল পঞ্চায়েত পাবে। কাস্তের দল আমরা ছেড়ে দিয়েছি। কাস্তের দল আর কোনোদিন পঞ্চায়েত পাবে না। নিজেদের সুবিধে পেতে আর রাস্তাঘাটের উন্নতি করতে হলে পুরোনোকে আঁকড়ে ধরে থাকলে চলবে না। বউমাকে বোলো ভোটটা আমাদের যেন দেয়।"

মণিকুমার ঘাড় নেড়ে সায় দেয় ঠিকই কিন্তু শালুকফুলে ভোট সে দেবে না। ফুলটুসিও রাজি হবে না। বিলের খাসের জমির দখলদারি কাস্তের দলের লোকেরা দিয়েছিল। বড়ো সরকারের দল লড়েছিল বলেই না বসতবাড়ির জন্য তার বাবা পাঁচ কাঠা জমির পাট্টা পেয়েছিল। মণিকুমারের মা গল্প করত সরকার বাড়ির ফ্যান জলে তারা ভাই-বোনেরা বড়ো হয় উঠে। বড্ডো দয়ালু ছিল বড়ো সরকার মশাই। উনি পঞ্চায়েত প্রধান থাকাকালীন এই বিলের মাঝ বরাবর খাল কেটে গ্রামবাসীদের কতবড়ো উপকার করেছিলেন। দুই ফুলের গুঁতোগুঁতিতে কাস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। ন্যায়-সততা ধুলোয় লুটোচ্ছে। এই সব রান্নাঘরে ঢোকা রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে না পারলেও; মণিকুমারের ভালো লাগে না। ভোট আসলে পাড়ার মানুষরা কেমন হয়ে ওঠে। চেনা যায় না। কখন যে, কে কোনদিকে গড়াবে বোঝা যায় না। উঠোনে দাঁড়িয়ে মণিকুমার এইসব কথা ভাবছিল।

"অত ভাবার কী হল? আমি শালুক ফুলে ভোট দেব না। তেমন হলে ভোটই দেব না। সন্ধ্যের পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাসানি, টাকার লোভ দেখাচ্ছে। ভোট কেনা-বেচা বাপের জন্মে শুনিনি।"

"ভোট না দিলি গ্রামে বাস কত্তি পারব? চারপাশতে ছিঁড়ে খাবে না। তিনদলের মদ্দি গণ্ডগোল। কেউ, কারও বাড়ি যায় না। যে কুনু একটা দল ধরে থাকতি হবে। মণ্ডল বাড়ির পাঁচ গেরস্ত দুই দল হয়েছে। কাঁচি আর শালুকফুল। ছোটো ছোটো ছানাপুনারা কাকি-জেঠির সাতে কতা কয় না।"

"ভারি খারাপ। কী মিল ছিল সব। কাকি-জেঠির ঘরে না খেলি পেট ভরিনি। আর একন মাথায় ঠুল লাগলিও কতা কয় না।"

"শোন ফুলটুসি কালু ৫০০ টাকা নিয়ে সাধাসাধি করচে কলাফুলে ভোট দিয়ার জন্যি।"

"খবরদার টাকা নেবা না। পছন্দ যাকে তাকে ভোট দেবা। কলাফুলের নেতারা সরকারের ঘর করে দেবে বলে লিখে নিয়ে গেল। আশায় ছিলাম সরকারেরতে পাওয়া টাকার সাথে সমিতির জমানো টাকা দিয়ে দুই খোপ দালান দেব। পোড়া কপাল আমার। সেই টাকা নাকি কলাফুলির দলের হারু মিস্ত্রী পায়েচে।"

"সে তো দেবেই। কলাফুলির নেতার ল্যাজ ধরে ঘোরে। বিডিও আইসেই বা কি হল? কিচ্চু না। তনুর বিয়েতে চার হাজার টাকা কাটমানি দিয়ে, তবে রূপশ্রীর টাকা পায়। এ সব তো আর কারও অজানা নেই।"

"ওই পাড়ায় এত হৈচৈ হচ্ছে ক্যান ?"

"দাঁড়া দেকে আসি। মনে হচ্চে মণ্ডল বাড়ি গণ্ডগোল লাগেচে।"

গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোটের উত্তাপে গ্রামবাসীদের একটাই আলোচনার বিষয় ভোট। বুথ দখল, পঞ্চায়েত দখল, পঞ্চায়েত সমিতি দখলের লড়াই-এ গ্রামের আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে ওঠে; সীমান্তবর্তী স্পর্শকাতর আর পাঁচটা গ্রামের মতো। গণ্ডগোল হচ্ছে মণ্ডল বাড়িতে। হাঁড়ি পৃথক হলেও উঠোন একটাই। কর্মসূত্রে ছেলেরা উত্তরপ্রদেশে থাকে। ভোট দেওয়ার জন্য বাড়ি এসেছে। জড়িয়ে পড়েছে ভোট আবর্তে। বাবা একদলের সমর্থক, ছেলে অন্যদলের।

না হলে এমন কাণ্ড হয়? ছোটোদের মনে বিষ ঢোকায় কেউ! একান্নবর্তী পরিবারের উঠোনের এ-মাথায়, ও-মাথায় ডিজের গুঁতোগুঁতি চলে রাত বারোটা পর্যন্ত! সেজোর নাতি আর মেজোর নাতির মানতের কালীপুজো। একই দিনে করতে হল? করুণা পাল পর্যন্ত তাজ্জব বনে গেছে। ভিন্ন হলেও একই বাড়িতে একই দিনে মায়ের আরাধনা ! ঠাকুর বায়নার সময় ছোটো মণ্ডলকে করুণা পাল বলে, "দশ-বারোটি গ্রামের সব ঠাকুর আমি বানাই কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এমন অভিজ্ঞতা হবে স্বপ্নেও ভাবিনি। ভায়ে ভায়ে পাল্লা দিয়ে পুজো? ভালো কাজ নয় মণ্ডলের পো। এই আমাদের গ্রামে দেখ তিন দলের সমর্থকরা আছে। কোনো গণ্ডগোল নেই। রাসোৎসব গ্রামের সবাই মিলে করে। মত আলাদা হতেই পারে, তাই বলে ভায়ে ভায়ে এমন রেষারেষি! ভালো নয়, ভালো নয়!"

সেদিনের গণ্ডগোলে কালুর মাথা ফেঁটে পাঁচটা সেলাই পড়েছে। আসলে কালুকে নিয়েই গণ্ডগোল। রক্ত প্রচুর বেরিয়ে গেছে। ভীষণ দুর্বল। বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। ফুলটুসি ওকে দেখতে গিয়ে বলেই ফেলল, "মাথা ফেটে তোর ভালোই হয়েছে। তোকে নিয়ে একটা চাল চালতে চেয়েছিল কলাফুলির নেতারা। শোনা যাচ্ছে তোকে শেষ করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছিল। ভোটের দিন কলাফুলের দল কাজ হাসিল করে একটা অস্থির অবস্থার সৃষ্টি করে ছাপ্পা ভোট দেবে। তুই, ওদের ভোট কেনার কাজ নিয়েছিলি। সন্দেহের তালিকায় আর থাকল না ওরা। উল্টে প্রচার করত ব্লাকপার্টির লোকেদের কাজ। একটু বুদ্দি নিয়ে চল।"

"এট্টু ভালো করে বুজিয়ে যা রাঙাবউ, তোর কতা একটু মান্যি করে। কানা, খোড়া তিনডে পেট ওর উপর। ও, না থাকলি, না খায়ে মরে যাব না?"

"কীরে কালু, তোর বুদ্ধি কবে হবে বল তো? গরীব মানুষগের ওসবের তে দুরে থাকতে হয়। এই বুড়োমানুষটার আর কষ্ট দিসনে। কালু ভোট বুজেসুজে দিস। দিদি, তুমিও তোমার ভোট দিবা। অন্য কেউ ভোট দিয়ে দিতি চালি রাজি হবা না। খালের জিয়োলমাছ দিয়ে গেলাম, কাঁচকলা, পেঁপে দিয়ে ঝোল করে দিও। যায় রে কালু। সাবধানে থাকিস।"

বাড়ি ফিরে ফুলটুসি তুলসীতলায় সন্ধ্যেবাতি দিয়ে চাল ধুয়ে হাঁড়ি উনুনে বসিয়ে দিল। রান্না শেষের মুখে মণিকুমার বাড়ি এল। টুসিকে বলে, "ভোট করতি আসা লোকগের রাতির রুটি তরকারি করে দিতি হবে। ওগের একজন দু'কানে মোমবাতি কিনতি আইসে আজ রাতির আর কাইলকের সকালের আর দুপুরের খাবার বানিয়ে দিয়ার লোকের খোঁজ কচ্চিল। কেউ কোনো কথা কয় না। মুক দেকে বড্ড মায়া হল না খায়ে থাকপে, আমিই আগ বাড়িয়ে বললাম, কয়জনের খাবার, কী খাবে? জানলি - আমার বউকে দিয়ে বানিয়ে দেব।" তা লোকটি বলল, "পাঁচজনের।"

____________________


।। পর্ব-৭ ।।



পরির বাড়ি থেকে ঠনঠনের বিল তিন কিলোমিটার। সে কিছুটা সাইকেল চালিয়ে কিছুটা সাইকেল ঠেলে জমিতে পৌঁছালো। ধানের জমিটা আজকে হাটকিয়ে ফেলতে হবে। পরের দিন সর্ষে কাটবে। ধানের চারার গোড়ার মাটি দশ আঙুলে হাল্কা আলগা করে দিচ্ছে। আলগা মাটিতে গুচ্ছমূল বেরিয়ে ধানগাছের গোছা মোটা হয়ে ওঠে। ঝাড় যত মোটা হয়; ফলন তত বেশি। আগাছা উপড়ে তুলে আলের উপর রেখে দিচ্ছে। মেঘলা আকাশ। রোদ ওঠেনি। ভ্যাপসা গরমে শরীরটা আনচান করছে। খিদেয় পেট চুইচুই করছে। একটু জিড়িয়ে নিতে পারলে হতো। কোমর ধরে গেছে। খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পরি। দুই হাতে চোখ আড়াল করে দেখছে তিনু আসছে কিনা।

ওই তো তিনুর মাথাটা সর্ষেক্ষেতের উপর ভাসতে দেখা গেল। আর দুটো ক্ষেত পেরোতে পারলেই পুকুর পাড়ে উঠে আসতে পারবে। আজ একটু কড়া কথা বলতেই হবে তিনুকে। মাঠের ভাত এতবেলায় আনলে বাঁচা যায়? মুখ ঝামটা দিলে সেও শুনিয়ে দেবে। পুকুরের পাড় বেয়ে উপরে উঠে এল পরি। কলে হাত-পা ধুয়ে চালার মধ্যে মাটির উপরে বসে পড়ল। তিনু গামছার গিট খুলে থালা সরিয়ে ভাতের গামলা সামনে এগিয়ে দিল। নাতি তিনুকে কিছু বলতে পারল না। গরম ভাত দেখে সব রাগ জল হয়ে গেল। গোগ্রাসে গিলছে ভাতের গরাস। কিছুটা ভাত থেকে গেল। পুকুরে ফেলতেই মাছের ঝাঁক ভেসে উঠল। শোল মাছের ঝাঁক।

এই বিলে বছর দুয়েক আগে দেশি মাছের রমরমা ছিল। মার্চ মাস থেকে বৃষ্টি হওয়ায় নদী, খাল-বিলে বেশ জল ছিল। পরি আশ মিটিয়ে মাছ ধরছে। রোদ উঠলে মাছ লাফিয়ে পাটের জাগে উঠে আসে। জলে দাঁড়িয়ে পাট ধোয় যারা পা নাড়াতে হয় ঘনঘন। মাছে এসে ঠোকরায়। জোঁক লাগলে অবশ্য বোঝা যায় না।। মাছ কোথা থেকে এল। বিগত বেশ কয়েক বছর পর এই অঞ্চলের মানুষ খয়রা, খলসে, পাটা, পুঁটি, শোল, লাঠা, জিয়োল, বেলে, পাঁকাল প্রচুর পরিমাণে ধরে খেয়েছে। পরি বিক্রি করেছে; অন্যদের দিয়েছে। টিনের ডোঙা জিকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখত। ডিঙি খুলে জাল, রাবানি দোয়াড়ি, আটল নিয়ে ভেসে পড়ত। ফেরার পথে সাপলা, পাট, পাটকাঠি বোঝাই করে নিয়ে এসে ডাঙায় তোলে।

পরিদের পাড়ার সেচ দপ্তরের আধিকারিক বিলের মাঠে অনেক জমি কিনেছে। ছুটিতে বাড়ি এসে মাঠের কাজে লেগে যায়। পেঁয়াজের সময় তোলা, কাটা, বস্তা বোজায় করার কাজে মুনিষদের সঙ্গে হাত লাগায়। পাল্লা দিয়ে পরির সঙ্গে মাছ ধরে। ছিপ দিয়ে মাছ ধরার ভয়ানক নেশা। বাড়ির পাশে খালে ছিপ ফেলে সারাদিন বসে থাকে। চাকরি করে লোকটা টাকার কুমির হয়ে গেছে; তবুও মাছ ধরার এত বাতিক কেন - কে জানে? কার্তিক মাস। পলদার জল ঝোর নদী হয়ে থগবগের ব্রিজের নীচ দিয়ে কুলকুল করে খালে এসে পড়ছে। জনা তিনেক থগবগের ব্রিজের ওপাশে খ্যাপলা জালে মাছ ধরছে। মাছ ধরা একরকমের নেশা। মাছ ধরা দেখাও নেশা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ছিপ নিয়ে পরির সঙ্গে কোথায় কোথায় মাছ ধরতে চলে যায়। বিলের জল শুকিয়ে আসায় থগবগের ব্রিজের এখানে পরি প্রতিদিন মাছ ধরে। ছোটোবেলার নেশা। মেছো পরি বলে ডাকত অনেকে। বালক পরি এখন বয়ষ্ক লোক। ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়েছে। নাতি হয়ে গেছে। তার আগের মতোই নির্মেদ শরীর। তেল চোয়ানো কুচকুচে কালো চামড়া বয়সের কারণে অথবা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে তামাটে হয়ে গেছে। কদম ছাঁট চুলের মধ্য থেকে দুই, একটা সাদা চুল উঁকি-ঝুকি মারছে। কটা গোঁফ। থ্রি কোয়ার্টার প্যাণ্টের উপর কষে গামছা বাঁধা কোমরে। বালক বয়সে পরির খেলার সঙ্গীর থেকে মাছ ধরার সঙ্গী বেশি ছিল। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া সারাদিন টো-টো করে ঘুরত। মাছ ধরা, খাপড়া খেলা, কাঁচের গুলি, হাড়ের গুটি, ডাঙ্গুলি খেলায় মেতে থাকত সারাক্ষণ। পড়াশোনার প্রতি খুব অনীহা ছিল। প্রাইমারি স্কুলটাও টপকাতে পারেনি। সরল আর সৎ হওয়ায় বড়ো বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল। আম, জাম, কাঁঠাল, নারকেল পেড়ে দেওয়ার জন্য ডাক পড়ত। কাঠবিড়ালীর মতো তরতর করে যে কোনো গাছে উঠে যেত। অন্ধকার রাতে চোখগুলো জ্বলজ্বল করত।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ না হওয়ার বিশেষ কারণ ছিল। কাশীপুর পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মারামারি হওয়ার পর পড়া ছেড়ে দেয়। ও-পাড়ার বদ ছেলেরা ছুটির ঘণ্টা বাজলেই আসনের এক কোনা ধরে অন্য পাড়ার ছেলে-মেয়েদের সপাৎ সপাৎ বাড়ি মেরে দে দৌড়। পরি মার খেয়ে হজম করার পাত্র ছিল না। পুলিশের ছেলেকে মেরে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল। তারপর আর স্কুলে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারেনি। অভাবী সংসার। বড়ো বাড়িতে বেশ কয়েক বছর রাখালি করে। আর একটু বড়ো হয়ে মাঠের কাজ করতে হতো। বিশেষ করে শীতের সময়। আমন ধান ওর বাবা আগা পেড়ে কেটে আঁটি বেধে দিত। পরি দুই হাতে দুই আঁটি ধান জলের মধ্য দিয়ে টেনে এনে ডাঙায় গাঁদা দিত। জল ঝরে গেলে মাথায় করে বাড়ি।

বালক পরি শীতের শুরুতে পাড়ার কয়েকজন জুটিয়ে নিয়ে কৈমারি, ডিগ্রী, ঠনঠনের বিলে মাছ ধরতে যেত। নারকেলের মালাই ঢাকনাওয়ালা ভাঁড় মোটা লাঠির মাথায় ঝুলিয়ে। হাতে থাকত খেজুরের ডাটা। পাতাগুলো ছোটো ছোটো করে কাটা। আমন ধান মাথা পেড়ে কাটা। জমির বুক নাড়ায় ঢাকা। উপর মাঠের জল শুকিয়ে গেলেও নীচের দিকে মানে ফরেস্টের দিকে চিকচিকানি জল। কাঁকড়ায় মাটি তুলে ডাই করে রাখে। পরিদের দল মাঠে এসে এমন গর্তের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ে। যে গর্তের মাটি কাঁচা অর্থাৎ শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়নি; সেই গর্তে খেজুরের ডাটা ঢুকিয়ে দিয়ে উপর-নীচ করবে কিছুক্ষণ। খেজুরের ডাটা দিয়ে গর্তের ভেতর ঘোলানোর ফলে ভেতরে থাকা কাঁকড়ারা পিলপিল করে উঠে আসে। জিয়ল মাছ গর্তের মুখের কাছে এসে তুগবুগ করে। পরি টপাটপ মাছের মাথাটি সাবধানে ধরে মালায় সরিয়ে ভাঁড়ে রাখে। বিকাল পর্যন্ত ভাঁড়টার অনেকটা ভরে ওঠে। ওদিকে পরির সঙ্গে যারা গিয়েছে তারা কেউ দু'চারটে পেয়েছে; কেউ পায়নি। কোন গর্তে মাছ আছে সেটা পরি খুব ভালো বুঝতে পারে। জলের স্রোত দেখেই বোঝে মাছ আছে কী নেই। ছোটোবেলায় তার শরীরের কোথাও না কোথাও মাছের আঁশ দু'চারটে লেগে থাকত। জলের গতি দেখে বুঝেছে মাছ আজ তেমন ধরা পড়বে না; তবুও সকালের মাছটা হয়ে গেলে বাজারে যেতে হবে না। সব খেপে মাছ উঠছে না। খ্যাপলা জাল দিয়ে তিনজন মাছ ধরছে। মাছ বাজারের খরচটা বেঁচে যায়। খেত-খামারে, নার্সারিতে কাজে যাবার আগে যা হয় আর কী! মাছ ধরার নেশা সাংঘাতিক। তার উপর জ্যান্ত মাছের ঝোল দিয়ে গরম ভাতের স্বাদই আলাদা! টানে টানে দে'ড় জনের ভাত খেয়ে ফেলে এক একদিন পরি।

স‌জনী তাই চাল একটু ধরেই নেয়। পরির জালটাকে ছড়িয়ে ফেলার একটা কায়দা আছে; সবাই পারে না। তার কঞ্চির মতো দড় তামাটে ডান হাতে দড়ি পেঁচিয়ে ধীরে ধীরে গুটিয়ে তুলে নিয়ে এসে জাল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নেয় মাছ ধরা পড়েছে কিনা। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে খুব মাছ হল। সারা রাত-দিন দশ-পনেরোটা জাল জলে ঝপাঝপ পড়েছে থগবগের খালে। প্রত্যেকে জল থেকে জাল তুলে সরে দাঁড়িয়েছে অন্যজনকে জাল ফেলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। ঘুল্লি দিয়ে ঝোরের জল ব্রিজের তল দিয়ে বগবগ করে এসে পড়ছে থগবগের খালে। খাল, জল নিয়ে খেড়োদাড়ির মাঠে ঢেলে দেয়। বর্তমানে খালটি অনেক জল বহন করে নিয়ে গিয়ে ঢেলে দেওয়ার বল, শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। বছর বছর বাঁধাল দেওয়ায় খালে চরাট পড়েছে। দু'ধার থেকে আল ঠেলে খালটাকে কোণঠাসা করেছে চাষীরা।

রাতে টর্চ জ্বেলে মাছ ধরে মানুষ। জলের তোড়ের শব্দের সঙ্গে মানুষের কোলাহল মিলেমিশে থগবগে গমগম করে। কার্তিক মাস পড়তেই জলের তোড় কমে এসেছে। পরি পাট কাটা, ধোয়া শেষ হতেই দুইবেলা বিলে পাড়ি দেয় ডোঙা নিয়ে মাছ ধরতে। অধিকাংশই নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের লোক। মাহিষ্য, কপালিরা কিছু আছে। মাছ ধরার কাজটি একচেটিয়া জেলেদের পেশা নেই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পালটে যায় রুটি রুজি।

২০২১ সালের ২৬শে জানুয়ারি থগবগের পুরোনো ব্রিজ ভেঙে ফেলা হয়। নতুন ব্রিজ তৈরির জন্য পাশ দিয়ে মাটির রাস্তা বেঁধে দিয়েছে। ব্রিজের কাজ শুরু হলেও ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। স্থানীয় মানুষদের দাবিতে জল নিষ্কাশনের জন্য তিনটি সেকশান হল। পরি সন্ধ্যেবেলাটা ব্রিজে ঠেক করতে আসে। পুরোনো ব্রিজের সঙ্গে তার একটা ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। দলবেঁধে স্নান করতে আসত। বর্ষায় দুরন্তবেগে ছুটে চলা জলে ব্রিজের উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে লাফিয়ে পড়ত। পাঁচ/সাতজন লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাসতে ভাসতে খালের শেষ মুখে গিয়ে ডাঙায় উঠে পায়ে হেঁটে আবার ব্রিজে চলে আসত। এক আধবেলা কাটিয়ে দিয়েছে কতদিন। চোখদুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে। কালো চামড়ার উপর সবুজ শেওলার আস্তরণ পড়ে গেছে। জিয়ল মাছের মতো কিলবিল করে বেড়িয়েছে। এখন যা জল হয় গাই-গরুর গা ধোওয়ায়। কলের জলে নিজে স্নান করে। ক্লাবের ছেলেরা কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে ক্রিকেট খেলে। ব্রিজে বসে পরি দেখে। ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০০০ সালের বাঁধ ভাঙা বন্যা। ব্রিজের উপর চার ফুট ঘোলা জল। স্রোতের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে গৃহপালিত পশু। চারিদিকে হাহাকার। মাটির দেওয়াল ভেঙে পড়ার ঝপঝপ আওয়াজ। বুক কেঁপে ওঠে। রাতে চোর ডাকাতের ভয়। পনেরো দিন বাড়ি ছাড়া। ওরা আশ্রয় নিয়েছিল বাজারের জেগে থাকা ডাঙায়। পরির দুশ্চিন্তা হয় যদি আবার কখনও ওই রকম বাঁধভাঙা বন্যা হয়; তাহলে খাল-বিল দিয়ে জল বেরিয়ে নদী হয়ে সমুদ্রে পড়তে কতদিন লাগবে - এক মাস? দুই মাস? না, ছয় মাস? এ চিন্তা পরির মাথায় ঘুরপাক খায়।

____________________


।। পর্ব-৮ ।।



কৃষ্ণনগর-মাজদিয়া সড়কপথের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম আসাননগর। গ্রামটিকে বেষ্টন করে আছে ঝোরনদী, থগবগের খাল, ছয়টি বিল। জেলা শহরের দিক দিয়ে গেলে গ্রামের শুরুতেই পড়বে থগবগের ব্রিজ। অতীতে জায়গাটি ঠগ দস্যুদের আস্তানা ছিল। বর্ষার সময় ঝোরের জল তোড়ে ব্রিজের নীচ দিয়ে বগবগিয়ে খালে পড়ত। ঠগী দস্যুদের 'ঠগ' আর বগবগিয়ের 'বগ' - মিলে হয়ে গেল ঠগবগে। ঠগবগে পরিবর্তিত হয়ে থগবগে হয়েছে। থগবগের পাড়ের উত্তর-পশ্চিম দিকে গড়ে ওঠা পাড়া থগবগিয়া পাড়া নামে পরিচিত। থগবগিয়া পাড়ার বাসিন্দা বিন্দু। বিয়ে হলেও বাবার বাড়িতে থেকে গেছে। বিন্দুর একটা হাত অকেজো। শোনা যায় পরিতে নিয়ে গিয়েছিল। এক হাতই দশ হাত হয়ে উঠেছে। সামলেছে সকল দিক। বর ঘরজামাই ছিল। কয়েক বছর থাকার পর কলকাতাবাসী হয়ে বৌ-ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছে বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যে। দুই বোন। বাবা ক্ষুদ্র চাষি ছিলেন। হাঁপানির জন্য কাজকর্ম করতে পারতেন না। ভাই না থাকায় লেখাপড়া শেখার সঙ্গে মাঠ-ঘাটের সব কাজ করতে হয়েছে। কাজ মানে কাজ - ছেলে-মেয়ে হিসেবে নয়; অর্থাৎ মাঠ-বাজার ঘাটের সব কাজে পোক্ত হতে হয়েছে। পাকা রাস্তার পাশে বাড়ি। বাড়ির ধ্বজে আপার (ছোটো পুকুর) পাশে থগবগের খাল। আপা ছোট্টো হলেও তাদের সংসারের ভার কিছুটা বহন করে। দেশি মাছের জোগান, ধানচাষের সেচের জল, মাছ বিক্রির টাকায় হাটবাজার ইত্যাদি ইত্যাদি। উষ্ণ শরীরের ও মনের তাপ জুড়ায় আপার জলে অবগাহন করে বা নিরিবিলিতে তার পাশে বসে অশান্ত মনকে শান্ত করে। পায়ের পাতা ডুবিয়ে পা নাচিয়ে তার দুঃখ-কষ্টের ভার খানিকটা হাল্কা করে নেয় মাঝেমধ্যে। জলে পা স্থির করে রাখলে শোল, ল্যাঠা, পুঁটি ঠোকরায়। ছোটো মাছের ঠোকরানিতে পায়ে সুড়সুড়ি লাগে। কয়েকটি বর্শি ফেলা থাকে। চোখ সেদিকে নিবদ্ধ। ফাতনা জলে ডুবতেই লাঠির হাতল ধরে এক ঝটকায় টান দেয়। পাড়ে নিয়ে এসে বর্শি থেকে মাছ ছাড়িয়ে বালতিতে রাখে। ডেয়ো পিঁপড়ের ডিম ছিপে লাগিয়ে জলে ফেলে অন্যগুলোর দিকে নজর দেয়। চালাক মাছ আলগোছে খাবার খেয়ে চলে যায়, ধরা দেয় না। মাছের পছন্দ কেঁচো বা আটার চার।

বর্ষার সময় আপাকে আলাদা করে বোঝার কোনো উপায় থাকত না। জলে একাকার হয়ে যেত। আপার পাশ দিয়ে ওদের কিছু জমি ছিল। জল শুকিয়ে গেলে দুই বোন লাঙলের চাষ হয়ে যাওয়ার পর কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে জমি ঠিক করেছে। বিদে, মই হাতে টেনে কাদা করে বোরোধান চাষ করেছে। থালায় করে আপা বা খাল থেকে জল সেচে ধানচাষ করেছে। টিউবওয়েল চেপে ধানের জমিতে জল দিয়েছে। ঘোড়াপীরতলার মাঠের ও বাঁশবেড়িয়া মাঠের জমি লাঙলে চাষ দেওয়ার পর আল কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ঠিক করেছে। গম, ধান, ছোলা, মটর, মুসুরি, সর্ষের ফলন মন্দ হতো না। ফসল উঠলে কাঁকালিতে বা মাথায় করে বাড়ি নিয়ে এসেছে। কাজকে কাজ হিসাবে দেখেছে। লজ্জার লাজুকলতা কখনও ছিল না। ধান-গম ঝাড়ায়-মাড়ায় নিজেদের। চৈত্র-বৈশাখে খালের মাটি ঝুড়ি বোঝাই করে বাড়ির পাড় বেঁধেছে সবাই মিলে। এখন হ্যাণ্ড ট্রাক্টর হওয়ায় এবং আইসিডিএস কর্মী হওয়ায় কঠোর পরিশ্রম আর করতে হয় না। বয়স ষাট ছুঁতে চলল। তিন ছেলে-মেয়ে উচ্চশিক্ষিত।

থগবগের গল্প বিন্দু তার ঠাকুরমা এবং প্রবীন লোকেদের মুখে শুনেছে। সন্ধ্যেবেলায় পাটিতে শুয়ে ঠাকুরমার গলা জড়িয়ে ধরে কত গল্প যে শুনেছে তার ইয়ত্তা নেই। থগবগে ও ঝোর পঞ্চাশ বছর আগে কেমন ছিল, কথার ছবি দিয়ে সাজানো তার। ঝোরের ধারে কাশীপুর পাড়ায় দুর্গাতলার ওখানে বিশাল বট গাছের তলায় ষষ্ঠীপুজো, নীলপুজো হতো। পয়লা বৈশাখে মেলা বসত। মেলা থেকে রান্নাবাটির খেলনা কিনত ছোট্ট মেয়েরা। সবাই কী আর কিনতে পারত? না। খেটে খাওয়ার মানুষের সংখ্যাই যে বেশি ছিল। দু'আনা, চার আনার জিনিস - তাও মহার্ঘ ছিল। কজনই বা জোটাতে পারত! বট-পাকুড় গাছ কিছুই নেই। জায়গাটায় ঈদগা হয়েছে। মালিতাপাড়ার মুসলিমরা নামাজ পড়তে আসে। বিন্দু ছোটোবেলায় রাত্রে ভুলেও তাকাত না ওদিকে। গল্প শুনেছে এক সাহেব নিশুতি রাতে ঘোড়া টগবগিয়ে ঝোরের এপার-ওপার করত জলের উপর দিয়ে। সাওয়ারি মস্তকহীন। সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য কল্পনা করলে ছোটো কেন; বড়োদেরও হাড় হিম হয়ে যেত। কাশিপুর পাড়ার শেষে ঝোরের ধার দিয়ে বিরাট তিনটে পাকুড় গাছ ছিল। সন্ধ্যের পর আলো জ্বলত আর নিভত। ভয়ে সন্ধ্যের পরে ওদিক কেউ মাড়াত না। বিন্দু, বাঁশবেড়িয়ার মাঠ থেকে ফিরতে সন্ধ্যে লেগে গেলে ঐ ফাঁকা জায়গায় এসে চোখ বন্ধ করে এক দৌঁড়ে পাকা রাস্তায় উঠেছে। 'আলেয়' (আলেয়া) ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে ঘাড় মটকিয়ে দেবে সেই ভয়ে।

থগবগের খালের উৎসস্থানটির গুরুত্ব অতীতেও ছিল, এখনও আছে। অপ্রশস্ত রাস্তার দুই ধারে ঝোপ-জঙ্গল। লুকিয়ে থাকত ঠগী দস্যুরা। এই রাস্তাটিই ছিল অবিভক্ত বঙ্গদেশের মানুষদের পায়ে হেঁটে নবদ্বীপে গঙ্গাস্নানে যাওয়া বা মৃতদেহ দাহ করার জন্য অন্যতম একটি রাস্তা। চোর-ডাকাতের খুব উৎপাত ছিল। ঠগী দস্যুরা বা ফাঁসুড়ে ডাকাতরা পথচারী, তীর্থযাত্রী বা শবদাহ করার দলকে রেয়াত করত না। মেরে ধরে কেড়েকুড়ে সব নিয়ে নিত। প্রয়োজনে মানুষ মেরে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করত না। থগবগে শুধু ঠগী দস্যুদের আস্তানা ছিল তা নয়, সেখানে ছিল মহাশ্মশান। বিন্দুদের পুকুর কাটার সময় মাটির স্তরে স্তরে পাটি জড়ানো কঙ্কাল, কাজললতা, মাথার খুলি বেরিয়ে এসেছে। ২০১৪ সালে পুকুর সংস্কারের সময় একটি বিশাল আকৃতির দাঁতসহ মাথার খুলি উঠে আসে। খুলিতে কোপের অস্পষ্ট দাগ ছিল। আগেরবার সংস্কারের সময় রুপোর গহনা পেয়েছিল কিছু।

নিত্যপ্রয়োজনী জিনিপপত্র, চাল, আটা, কয়লা, তেলের টিন, সিমেণ্ট, চিনির বস্তা ইত্যাদি ট্রাক থেকে থগবগেই নামত; তারপর নৌকায় করে চলে যেত বিভিন্ন গ্রামে। আবার সেই সকল গ্রামে উৎপাদিত ফসলাদি নৌকা বোঝাই হয়ে থগবগের খালে এসে নামত। নৌকায় জিনিসপত্র ওঠানো-নামানোর সুবিধার জন্য ঝোরের জলের তোড় থাকায় নৌকা ব্রিজের নীচ দিয়ে থগবগের খালের পাড়ের গাছে দড়া দিয়ে বেঁধে মালপত্র ওঠানো-নামানো করত। একবার থগবগের মাঝে নৌকাডুবি হয়েছিল। নৌকা যদিও তিন মানুষের বেড় ধরা পাকা রাস্তার পাশের নিম গাছে বাঁধা ছিল দড়া দিয়ে। নৌকায় বোঝাই ছিল তেলের টিন, সিমেণ্ট, চিনি আরো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। নিম গাছে বাঁধা দড়া ছিঁড়ে যাওয়ায় নৌকাডুবি। তেলের টিন ভেসে গেছিল। চিনি জলে গুলে যায়। জল শুকিয়ে গেলে দেখা গেল বস্তায় সিমেণ্ট জমাট বেঁধে আছে। ১৯৪৬ সাল থেকে থগবগের দুই পারে এক/দুই ঘর মানুষ বসত করতে শুরু করে। পায়রাডাঙা পাড়ার পশ্চিমদিকে প্রথম বাংলাদেশের যশোর জেলার পায়রাডাঙা চকের সনাতন বিশ্বাসের বংশধরেরা বসবাস করতে শুরু করে। তারপর দুই এক ঘর করে বসতে বসতে পাড়া জমজমাট হয়ে ওঠে। সেই সময় শিশুমৃত্যুর হার অত্যাধিক ছিল। সাধারণ লোকেরা মৃতদেহগুলি খালের পশ্চিমে পুঁতে দিত। আর রাখত তেমাথা ছেড়ে এসে পতিত জমিতে। যেখানে ধরনী গোঁসাই-এর বৈষ্ণব আখড়া গড়ে ওঠে। গোঁসাই-এর গানে মুগ্ধ হয়ে পাড়ার মাতব্বররা ঝোপ-জঙ্গল কেটে আশ্রম গড়ে তোলায় হাত লাগায়।

বর্ষার সময় ১৫/২০ ফুট জল হতো ব্রিজের মুখে। দল বেঁধে ভেসে আসত বোয়াল মাছ। বিশাল বিশাল আড় মাছ। বোয়াল মাছ সার বেঁধে চলাচল করে। এক বোয়াল আর এক বোয়ালের লেজ কামড়ে থাকে। পলো চাপা দিয়ে ওইসব মাছ ধরত। এখন মাছও নেই, পলোর ব্যবহারও নেই। বিন্দুদের পাশের বাড়ি ছিল রেডিও শিল্পী কমলার বাবার বাড়ি। ওনার মা অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন; কিন্তু কানটি গেছিল বাঘের পেটে। বন্যপ্রাণীর আক্রমণের কত গল্প ছড়িয়ে রয়েছে থগবগের দুই পাড়ের পাড়ায়। টিনের ছাপড়ার বারান্দায় শুয়ে ছিলেন বড়োবাড়ির বুড়িমা। শিয়ালে কামড়ে ছিল। কৃষ্ণনগরের খ্রিস্টানদের হাসপাতালে এসে নাভির চারপাশে চৌদ্দটা ইনজেকশন নিতে হয়েছিল। ছোটো শিশু বারান্দায় শোয়ানো আছে। সন্ধ্যেবেলায় পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ পড়তেই দেখা গেল ঘরের পিছনে শেয়াল মুখ থেকে নামিয়ে রেখে, বাচ্চাটির হাত-পা নাড়া দেখছে। শেয়ালের কামড়ের দাগ থেকে গেল, জন্মদাগের মতো।

ঝোর ও থগবগের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের পেশা ছিল চাষ আর মাছ ধরা। চাষের কাজের অবসরে মাছ ধরার যন্ত্র তৈরি করত তালের ডাটার আঁশ, লতা আর বাঁশের চটার শলা দিয়ে। মেয়েরা পাট দিয়ে বুনত হরেক রকমের ছিঁকে। পাড়ের সুতো দিয়ে সেলাই করত কাঁথা। মেয়েরা আসন সেলাই,পাটি বোনা, কাঁটা-ক্রশে উলের জিনিস। বারোমাসে বিভিন্ন ব্রত যেমন ভগবতী পুজো, পুণ্যিপুকুর ব্রত, বৃষ্টি না হলে ব্যাঙের বিয়ে, অক্ষয় তৃতীয়া, বট ষষ্ঠী, মনসা পুজো, বিশ্বকর্মা পুজো, গার্সি, মুলো ষষ্ঠী, পৌষ পার্বন, ভিটেকুমারী পুজো ইত্যাদি। বেশিরভাগ ব্রত গল্পকথা। ধীরে ধীরে অনেক পুজো-পাঠ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে নতুন কিছু সংযোজন হয়েছে।

১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্থানের মুক্তিযুদ্ধের সময় থগবগের ব্রিজের একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। ভারতীয় মিলিটারিরা থগবগের ব্রিজের ওখান থেকে নৌকায় করে জলপথে বঙ্গদেশে যাতায়াত করত। শরণার্থীরা থগবগের মাছে অর্ধেক পেট ভরিয়েছে। চাঁদপুর, রামপুর, গোবিন্দপুর, কৃষ্ণপুর, মথুরাপুর, বাঘমারা, সিমলে, নারায়ণপুর, গাটরা, আমঝুপি... মোটকথা পলদা, ঝোর ও কলিঙ্গ নদীর দুই তীরে অবস্থিত গ্রামের মানুষের জেলা শহর, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষিজাত দ্রব্য বিক্রির যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল থগবগে। নৌকা বোঝাই পাট, উৎপাদিত অন্যান্য ফসল ব্রিজের উত্তর-পশ্চিমে বা পূর্ব-পশ্চিমে নামত। আসাননগরের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর দিকের অসংখ্য খাল-বিল, নদীর জল নেমে আসে এই খালে। থগবগে খালের জল প্রথমে পড়ে দুবলোর বিলে, তারপর ঠনঠনের বিলে। ঠনঠনের বিল থেকে সোতার মাঠ হয়ে কৈমারির বিল, তারপর দোবিলে। দোবিল থেকে রতির বিল এবং উসকুমরীর বিল দিয়ে তারিণীপুরের দু'পাশ দিয়ে গিয়ে ভৈরবের খাল হয়ে চূর্ণীতে পড়ে।

____________________


।। পর্ব-৯ ।।



'থগবগে' খালের জল যেসব বিল ‌বাহিত হয়ে ভৈরবের খালে গিয়ে পড়ে, সে সমস্ত বিলগুলো বর্তমানে আবাদ যোগ্য কয়েক হাজার একর জমি। পরির চোখের সামনে বিলগুলো এক ফসলি থেকে দো-ফসলি/তিন ফসলি চাষের জমি হয়ে গেল। মাছ ধরতে গিয়ে ধীরে ধীরে জানতে পারে বিলের জমির দখলদারির ইতিহাস। কাজের চাপ না থাকলে ছিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। চাষা, অফিসার, ব্যবসায়ী, মাস্টার - চারজনের দল। এই চতুর্ভুজ গোটা ত্রিশেক খাল-বিলে মাছ ধরতে যায়। বাহন সাইকেল। দূর হলে মোটর বাইক। নেশায় ছুটে বেড়ায়! মাছ ধরার নেশা বেজায় নেশা! মাছ ধরতে যাওয়ার জোটটা প্রাইমারিতে পড়ার সময়ই হয়েছে। এই নেশায় তাদের বেঁধে রেখেছে।

বিস্তৃর্ণ অঞ্চলটি ওপার বাংলার মানুষ আসার আগে গভীর জঙ্গল আর জলাভূমি ছিল। হিংস্র পশু নির্ভয়ে বিচরণ করত। থগবগের খালের দক্ষিণ-পশ্চিমে ডিগ্রীর বিলের চারপাশ দিয়ে ফরেস্ট। ফরেস্টের উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে ছিল খড়ের মাঠ। হয়ে গেল খেড়ো দাড়ি। তখন খড়ের খুব চাহিদা ছিল। খড়ের ছাউনির আটচালা ঘর করার ক্ষমতা খুব কম লোকের ছিল। খড়ের চালের ঘর গরমে ঠাণ্ডা, শীতে গরম। একবার ছাইতে পারলে ৪/৫ বছর নিশ্চিন্ত। খড়ের চালের ঘর আর ঘরামি এখন গল্প কথা। 'ঘরামির ঘরে শোন থাকে না' প্রবাদ প্রবচনটির খুব চল ছিল; কারণ ঘরামি লোকের ঘর ছাওয়ার কাজে এত ব্যস্ত থাকত যে, নিজের ঘর ছাওয়া হয়ে উঠত না। ওপার বাংলা থেকে অনেকে এসে খড়ের মাঠ কিনে ব্যবসা করে পরিবার প্রতিপালন করেছে। পিলপিলিয়ে ওদেশের মানুষ আসার ফলে বন-বাদাড় সাফ হতে থাকে। বাড়তে থাকে চাষের জমি। বেনা ঝাড় আর খড়ের শিকড় থেকে মাটি ছাড়াতে কালঘাম ছুটে গেছে চাষির, দিন-মজুরের। লাঙলের ফালে উঠে আসা এক এক চাঙড় মাটি ভেঙে টুকরো করতে ন্যাংটের মতো মার্কেনি ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। খড়ের মাঠের জমির দাম কম ছিল; কারণ ফসল চাষের উপযোগী হয়ে উঠতে বেশ কয়েক বছর লেগে যেত। মাঠে গো-চারণের ফলে মাটি ছিল উর্বর। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ছিল না। উলুখড়ের শিকড় নিকেশ করতে পারলেই একহাত শিষের আমন ধান। বয়স্কদের গল্প শুনে পরি এসব জেনেছিল। গোবিন্দ জেঠা কাছারি ঘরে বসে পাড়ার বয়স্ক লোকেদের সঙ্গে ও-দেশ থেকে এ-দেশে এসে বসতি গড়ে তুলতে কত যে কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে, সেই আলাপ-আলোচনা করত হুঁকো টানতে টানতে। বালক পরি গল্প শুনত আর হুঁকোর কল্কেয় রান্নাঘর থেকে ঘসির আগুন নিয়ে আসত। একদেশ থেকে অন্যদেশে আসার যন্ত্রণার আঁচ তার বালক হৃদয়কে ব্যথিত করত।

বড়ো বাড়ির রাখাল থাকার সময় দেখেছে বিলের ধান কেটে গোলায় তোলার জন্য আসত মুর্শিদাবাদের দাওয়াল (মুসলিম দিনমজুর)। খামারের এক কোনায় বাঁশ বেঁধে তাঁবু টাঙিয়ে থেকে যেত মাসখানেক। গৃহস্থকে দিতে হবে চাল, ডাল, আনাজপাতি। সঙ্গে করে আনা হাঁড়িতেই রান্না করত ভাত, ডাল, তরিতরকারী। ভোরবেলায় আর সন্ধ্যেবেলায় দু'বার। নাদায় ডাল আর ধামায় বা ঝুড়িতে ভাত। বিলের হাঁটু/কোমর সমান জলে আঁটি আঁটি ধান কেটে ডাঙায় আনার কঠোর পরিশ্রমের ক্লান্তি ভুলতে সন্ধ্যেবেলায় খাওয়ার আগে ও পরে আগুন পোহানোর সঙ্গে সুর ধরত মানিকপুরের গানের। পরি গলা মেলাত ওদের সঙ্গে। ধানের আঁটি স্তরে স্তরে সাজিয়ে মলন ঘোরাত তিন/চারটি গরুর গলার দড়ি পরস্পরের সঙ্গে বেঁধে দিয়ে। ঘুরতে ঘুরতে পরির ঘোর লেগে যেত।

ধান কাটা শেষ হয়ে গেলে কোনো কোনো বার যত জল, তত মাছ। ধান ডাবসে ওঠার পর থেকেই পাখিদের আনাগোনা। দেশি ও পরিযায়ী পাখি। মাছরাঙা, শামুখখোল, হাঁস-পাখি, ডোমকুর, বক, কাদাখোঁচা, কামপাখি, ফিঙে (ফ্যাচা), ভরুই... ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি । তারা সাঁ-আ-আ করে উড়ে গিয়ে চক্কর লাগাত আকাশে। পরি হাঁ করে চেয়ে থাকত। মাছের মতো পাখি যারা জালে ধরত পরি তাদের একদম সহ্য করতে পারত না। তাই সুযোগ পেলেই জাল কেটে কত পাখি ছেড়ে দিয়েছে। পরিযায়ী পাখিরাও আর আগের মতো আসে না; চারিদিকে কারেণ্টের আলো আর মাছ ধরার লোকের চলাচল বেশি হওয়ায়। পাখিদের নিরিবিলিতে ডিম পেড়ে; ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা তোলার কাজটি ব্যাহত হয়; বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির এটাও একটা কারণ। তার উপর পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে পরপর তিন বছর বিল ফেটে চৌচির। ভূ-গর্ভের জল তুলে চাষ হচ্ছে; সরকারি নিয়মকে অগ্রাহ্য করে। পরিরা ভাবে সরকারি নিয়ম মানতে গেলে না খেয়ে মরতে হবে। আজ তো বাঁচি। কালকের ভাবনা কাল ভাববে। দোকান-বাজারের জিনিসের দর আকাশছোঁয়া।

বিলগুলো নাব্যতা হারানোয় অকাল বর্ষণ না হলে যথা সময়ে জল শুকিয়ে যায়। পলি সমৃদ্ধ জমিতে পেঁয়াজ, রসুন চাষ হয়। লাভজনক পেঁয়াজ চাষই বেশি। সর্ষে, কালো জিরে, ধনে, ফুল চাষ হয় অল্প পরিমাণে। ২০২১ সালে সারাবছর বৃষ্টির কারণে পেঁয়াজ, রসুন, কালো জিরের চাষ মার খেয়েছিল। উঁচু জমিতে পেঁয়াজ বীজ চাষিরা একাধিকবার ছড়িয়েছিল। বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে। সেবার বিলের জমিতে বীজ বুনতে বা চারা লাগাতেই পারল না। একবিল থেকে অন্য বিলে জল বেরিয়ে যাবার জায়গায় বড়োবড়ো মাছের ভেড়ি, বাঁধাল। সরু নালা দিয়ে ধীরে ধীরে জল বের হতে দেয়। এই বিলের জমিগুলোতে চৈতালি ফসল ওঠার পর ধান, পাট চাষ হয়। আগাম জোরালো বৃষ্টি হলে ধান-পাট সব নষ্ট হয়ে যায়; বৃষ্টির জল বেরিয়ে যেতে না পারায়। বোরো ধান অধিক ফলনশীল হওয়ায় আমন ধানের চাষ উঠে গেছে কবেই। তাছাড়া মোটা ধানের লাল চালের ভাত হজম করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে আধুনিক মানুষ। বর্তমানে পেঁয়াজ চাষ লাভজনক হওয়ায় বোরো ধানের চাষ প্রায় উঠে গেছে। এই দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের চারপাশ ঘিরে আছে কুড়ি/বাইশটি গ্রাম। অবস্থাপন্ন চাষী বাড়িতে গোলার পরিবর্তে পেঁয়াজ সংরক্ষণের বড়ো বড়ো টিনের বেড়ার ও চালের ঘর। হাঁসখালি, কৃষ্ণগঞ্জ বিডিও অফিস পেঁয়াজ সংরক্ষণের এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সরকার থেকে যারা পায়নি; নিজে থেকে করে নিয়েছে। গোলার সংখ্যায় চাষীর আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির দিন শেষ। উঠতি চাষীদের স্বপ্ন ছিল উঠোনে থাকবে সার সার গোলা ও গোয়াল। শোবার ঘর থাক না কেন পাটকাঠির বেড়ার। তখন গোলা দেখেই বাপ-জেঠারা মেয়ের বিয়ে দিত। ধান্যলক্ষ্মীর কদর কমে গেছে; পয়সার পেঁয়াজের কাছে।

নিধিরপোতার হঠাৎ পাড়ার কাছে রানীর দীঘি বা পদ্ম দীঘির পাশ দিয়ে পাঁচ-সাতটা বিলের জল বেরিয়ে ভৈরবের খালে পড়ে; তারপর চূর্ণীতে। জল তারিণীপুর ঢোকার আগে খালের জল বেরিয়ে আসে হাত দেড়েক নালার মধ্যে দিয়ে। নালার মুখেও বাঁশের চটার বেড় ও নেট পাতা। পাশ দিয়ে কোনোরকমে জল বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই নালাতেও আবার বাঁধাল। গুটি কয়েক বাহুবলীর লাভ এতে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে হাজার হাজার চাষী। ভেড়িগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তির বা তাদের মদতপুষ্ট ব্যক্তিদের, দাদনদারদের। কোন চাষীর ঘাড়ে ক'টা মাথা আছে যে, ভেড়ির পাড় কেটে জল বার করার কথা ভাববে? এখন পল্লিসমাজের মহানুভব ছোটোবাবুরা গ্রামে ফিরে আসে না। কারো ফেরার ইচ্ছা থাকলেও স্ত্রী, সন্তানরা ফিরে আসতে চায় না। বেচারারা পড়ে যায় মহাফাঁপড়ে। চাষীদের মধ্যে সুর উঠছে থগবগের খাল থেকে ভৈরবের খাল পর্যন্ত বিলগুলোর ভিতর দিয়ে একটা খাল হলে খুব ভালো হয়। প্রকৃতির খাম-খেয়ালিপনায় নাহলে পতিত জমিতে পরিণত হয়ে যাবে আবাদ যোগ্য হাজার হাজার বিঘে জমির মাঠ।

পরপর দুই বছর খাল-বিল জলশূন্য। বৃষ্টি হয়নি। পাট নিয়ে চাষীর দুর্গতির শেষ নেই। অধিকাংশ পাট জমি দাঁড়িয়ে পুড়েছে। রাসায়নিক সার ও ঔষধের দাম আকাশছোঁয়া। এবছরও তাপপ্রবাহে জনজীবন জেরবার। পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে জগৎ-সংসার। পরিপড়ন্ত বিকালে এমন পরিস্থিতিতেও আড়বাঁশিতে সুর তোলে। বাঁশির মিঠে সুর ভেসে যায় দূর হতে দূরে। এ-তার সুন্দরের সাধনা। অসুন্দরের মাঝে খুঁজে নেয় তার সুন্দরকে।

‘মানব জমিন’ বিল পাড়ায় মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদযাপন করল। তিনটি মঞ্চে হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা পরিবেশিত হয়। অমর ভাষা শহিদ মঞ্চে পরির বংশীধ্বনি তাক লাগিয়ে দিয়েছে দর্শকদের। রঞ্জন রায়ের পরিবেশনায় এই মঞ্চে পরিবেশিত হয় পুতুল নাচ। অনেক বছর পর বহু মানুষ একসঙ্গে প্রাণ খুলে হাসল। আসলে পটলবাবুর চরিত্রের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরি পুতুল নাচ ছোটোবেলায় দেখেছে প্যাণ্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে। একের পর এক তিনটি মঞ্চে আলোচনা সভা, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান প্রদর্শনী, ঝাপান গান, ঝুমুরগান, ভাদুগান, টুসুগান, নাটক, কবিগান, লোকগান, পালাবাউল, লালনগীতি - সকাল আটটা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত।

আইলা বিবি ও ফুলটুসি সম্প্রদায় গাইতে এসেছিল বিয়ের গান। তারা দুপুরে পৌঁছে গেলেও আসর পেতে বিকেল গড়িয়ে গেল। লোকগানের বংশীবাদককে খুব চেনা মনে হল। মনের অতল থেকে উঠে আসছে কেউ একজন। যে তাকে বাঁশির সুরে বেঁধে ছিল। পরিদা! কিন্তু তখন পরির গায়ের রং কুচকুচে কালো ছিল। তামাটে নয়। এই সেই পরি, নিশ্চিত হল মাইকে নাম ঘোষনা হওয়ার পর।

পরি আগেই জেনেছিল কিশোর পরির প্রথম কদমফুল আসছে বিয়ের গান গাইতে। গান শেষে ফুলটুসিকে সামনাসামনি পরি জিজ্ঞাসা করে, "কী - চিনতে পার?"

"পেরেছি । তুমি পরিদা। তোমার বাঁশি আবার শুনব স্বপ্নেও ভাবিনি। আশার আলো সংগঠনের দাদা-দিদিদের উৎসাহে বিয়ের গানের দল গড়ে তুলেছি। এই সংগঠন গ্রামবাংলার প্রাণভোমরা খাল-বিল, জলাশয় বাঁচানোর সংগঠন গড়ে তুলেছে। আমাদের পলদা বিল বাঁচানোর কমিটিতে আমি আছি। তোমরাও দল গড় খাল-বিল বাঁচানোর। ঝোর বাঁচলে চূর্ণী বাঁচবে।"

"ঠিকই বলেছো। সুর আমাদের এদিকেও উঠেছে। জোট বাঁধছে সব। ভোটের আগেই বিশ গ্রামের মানুষ ডাকা হবে। যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে নদী-নালা, খাল-বিল, জলাশয় বাঁচানোর সংগঠনের সঙ্গে। প্রশাসনকে জোর ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে।

____________________


।। পর্ব-১০ ।।



ছুটি নেই। তাই ভোরের পাঁচটা সাতের ট্রেন ধরে কুন্তী। সাড়ে আটটার মধ্যে দমদমের ফ্লাটে পৌঁছে যাবে; তাহলে স্নান-খাওয়া করে সাড়ে দশটায় স্কুলে পৌঁছে যেতে পারবে। টোটো থেকে নেমে মাজদিয়া স্টেশনের ১ নং প্লাটফর্মের সামনের দিকে এগিয়ে গেল। জনা পাঁচেক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন এসে থামল। মহিলা কামরা একেবারে ফাঁকা।। হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল যাত্রীরা। কুন্তী গতকাল পাগলাতলায় যে জটাবুড়িকে দশটা টাকা দিয়েছিল; সে বাঁ দিকের সিটে চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। সুন্দরী বৈষ্ণবী সিটে হেলান দিয়ে কোলের উপর ব্যাগ রেখে পা দুটো মেলে দিল। পাগলাখালিতে ওই বৈষ্ণবী কপালে রসকলি এঁকে ভিক্ষে করছিল। গায়ে সাদা উলিকটন। পরণে সাদা ধবধবে থান। গায়ের চাদরটাও সাদা। গৌরবর্ণের বৈষ্ণবীকে মানিয়েছে বেশ। গুনগুন করে হরিনাম গাইছে। কুয়াশা মোড়া সকাল। কামরার ভিতর থেকে মাঝে-মধ্যে কুন্তীর চোখ জানালায় আটকে। বহিরগাছি স্টেশনে এক ঝাঁক মহিলাযাত্রী উঠল। শিবাদাসী পা দুটো গুটিয়ে মাসি, দিদি বলে বসার জায়গা ছেড়ে দিল। ঝোলা থেকে মুড়ির প্যাকেট বের করে মুঠো মুঠো তুলে চিবোচ্ছে। কুন্তী সিটে বাবু হয়ে বসে বৈষ্ণবীকে খুঁটিয়ে দেখছিল। গতকাল এইভাবে দেখার অবকাশ মেলেনি কিনা! কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে বৈষ্ণবী নিত্যযাত্রীদের পরিচিত। সপ্তাহে দুই দিনের সহযাত্রী কিনা!

মাছ, সবজি নিয়ে উঠেছে বেশ কয়েকজন। বৈষ্ণবী গলা সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "ও, মাসি তোমরা মাছ নিয়ে এই কামরায় উঠলে ক্যান? ভেণ্ডারে উঠতে পারতে।”

“ভেণ্ডারে উঠলে অনেক ঝামেলা। টিটি, রেল পুলিশ হাড়ির মাছ অর্ধেক নিয়ে নেয়। বহিরগাছির খাল-বিলের দেশি ছোটোমাছ! লোভ সামলাতে পারে না। মাছ বেচে সংসার চালাই। বুড়ো কষ্ট করে মাছ ধরে। আমি ভোরের টেন ধরে বিক্রি করতে যাই। বিলই বাঁচিয়ে রেখেচে গো আমাদের। রানাঘাটে নেমে পড়ব। গেটের একপাশে বসে থাকছি।”

“ভালো করে ঢাকা দিয়ে রাখো। গন্ধে গা গোলায়। আমাকে তোমাদের বিলের হেলঞ্চ শাক এনে দিও দিকিনি।”

মেছুনি ঘাড় নেড়ে সায় দিল।

দেশি মাছের কথা শুনে কুন্তী অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "তোমাদের বিলে বারোমাস জল থাকে? আমন ধান হয়? লাল মোটা চালের ধান?”

“হ্যাঁ-থাকে। আমন ধান হয়। বিল থেকে খাল কেটে ইছামতীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। জোয়ারের জল ঢোকে মাঝে-মধ্যে। বর্ষায় বিল সাপলাফুলে আলো হয়ে থাকে। ফাল্গুন-চোতে কই, মাগুর, জিয়ল, শোল কুইন্টাল কুইন্টাল ধরা পড়ে। চুনো মাছ ঝুড়ি ঝুড়ি।"

দেশি চুনো মাছের কথায় কুন্তী নড়েচড়ে বসল। তাহলে; এখনও দুই একটা বিল আছে যেখানে দেশি মাছ প্রচুর পাওয়া যায়। দু’দিন ধরে মুমূর্ষু খাল-বিল দেখে ও শুনে মন খারাপের গুমোট হাওয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছিল কুন্তী। মেছুনির কথা শুনে গুমোট ভাবটা কেটে গেল। সে শুনেছে বেশিরভাগ খাল-বিল বড়োলোক বাহুবলীদের দখলদারিতে চলে গেছে। গতকাল পলদা পার হওয়ার সময় নৌকোর মাঝি দেশি মাছের গল্প করার সময় বলেছিল যে, “পলদা তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ দেশি মাছের স্বাদ ভুলেই গিয়েছে প্রায়।"

আসলে পলদায় দেশি মাছ নেই বললেই চলে। একসময় পলদার সুস্বাদু ছোটোবড়ো দেশিমাছ দূরের শহরে বিক্রি হতো। মাঝির বাবা-ই কত গেছে মাছ বিক্রি করতে।

"সেই পলদা কী আর আছে দিদিমণি? মহিষপুরের পালেরা পলদার বুকের পলি দিয়ে ঠাকুর গড়ত। সেই ঠাকুর নৌকা বোঝাই হয়ে কলকাতায় যেত। ২০০০ সালের বন্যার পর থেকে ‘পলদা’ ঠাকুর গড়ার মাটি দিতে পারে না। পাঁক দিয়ে তো আর ঠাকুর গড়া যায় না। ভেড়ির মালিকরা মাইনে দিয়ে লোক রেখেছে; তারাই দেখাশোনা করে। যে সব খাবার খাইয়ে মাছ বড়ো করে, দেখলে মাছ খাওয়া ছেড়ে দেবেন দিদি। মাছ ধরে যারা; তাদের পাঁচড়া হয়ে যায়। সাধ হলেও ছান করা যায় না। কত লাফাঝাপা করেছি এই জলে।"

কথা শেষ না হতেই নৌকা সান বাঁধানো ঘাটে নামিয়ে দিয়েছিল। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে এসেছিল কুন্তীরা। বাঁ দিকের স্টেজে লোকগান গাইছে তরুণী গায়িকা। হরিনাম সংকীর্তনের দল মন্দির পরিক্রমা করছে। ফুলটুসি ভিড়ের মধ্যে একটু জায়গা করে নিল। ব্যাগ থেকে ফুল-বেলপাতা, বাতাসা ও ফল পাগলাবাবাকে নিবেদন করে পাঁচ কিলো দুধের জারের ঢাকনা খুলে ঠাকুরকে স্নান করিয়ে দিল। ধুপকাঠি গুঁজে দিয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালো। কুন্তী অপুর হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। প্রতিদিন এত দুধ ও ধূপ-ধুনোর অত্যাচারে বটগাছের আয়ু কতদিন? হিসাব করছিল। হাতে টান পড়তে তাকিয়ে দেখে মলিদি। কতবছর আগে দেখেছে। চেহারার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্ডার লাগোয়া মলুয়াপাড়ায় বিয়ে হয়েছিল মলিদির; কিন্তু কুন্তির সঙ্গে এইভাবে দেখা হবে এখানে এসে ভাবতেই পারেনি।

“মলিদি? কেমন আছো?”

“ভালো আছি।”

“তুই এখানে? পাশেই আমাদের গ্রাম। থাকি শিমুলিয়া বাজারে। খুব জাগ্রত জায়গা। পাগলাবাবা সবার মনস্কামনা পূরণ করেন। বেলাও শেষ, এখানকার মেলাও শেষ। কেউ রাত্রে থাকতে পারে না বাৎসরিক অনুষ্ঠানের তিনদিন ছাড়া।”

“কেন থাকতে পারে না?”

“পলদার জলের মধ্যের থেকে অদ্ভুত কী উঠে আসে। প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়ে যায়।”

“ওসব আজগুবি কথা। মানুষকে ভয় দেখানোর ফিকির। অন্য কোনো ব্যাপার আছে। বর্ডার এলাকা না।”

“ঠাকুর-দেবতায় বিশ্বাস নেই দেখছি। বাবার থানে দাঁড়িয়ে ওসব কথা বলতে নেই। চল প্রসাদ নিবি। পাঁচ’শ লোক খাওয়াব। রান্না হচ্ছে ওই দিকে।”

“ঠিক আছে যাও। আসছি। ঘুরে দেখে নিই। খালের মতো দেখা যাচ্ছে; চল, অপু দেখে আসি কী আছে ওদিকটায়।”

ফুলটুসি বলে, "দেখবে চলো মানতের কত জিনিস। শ্বেত পাথরের সব। গাড়ি করে কলকাতা থেকেও লোক আসে। শহরের বাবু মানুষরা বেশি দেয়।"

কুন্তী তাজ্জব বনে গেল মানতের দেওয়া অসংখ্য দামি মূর্তি, মঞ্চ দেখে। খালের পাড় দিয়ে মাঠের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড়োলোক ভক্তদের কাণ্ডকারখানা। জ্যৈষ্ঠ মাসের সোমবার ও বৃহস্পতিবার ২০/৩০টি বাস ও গাড়ি বোঝাই হয়ে মানুষ আসে। যাত্রী নিবাস, পানীয় জলের কল, পায়খানা-বাথরুম প্রতিবছর বেড়ে যাচ্ছে। দিনদিন পলদা সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে পাগলা বাবার মাহাত্ম্যে! নাম সংকীর্তনের বড়ো একটি দল পাগলা বাবার থান পরিক্রমা করছে। খোল করতাল, ঘণ্টাধ্বনি, উলুধ্বনিতে গমগম করছে। কানে সহ্য হচ্ছে না। কুন্তীরা বাইরে বেরিয়ে এলো। আখের রস বিক্রি হচ্ছে। সকলে এক গ্লাস করে খেয়ে নিল। ওদের পাশ দিয়ে পলদায় স্নান করে দণ্ডি কেটে এগিয়ে আসছে দুইজন মহিলা। ছবি তুলছেন একজন। ফটোগ্রাফারকে খুব চেনা মনে হল। কাছে এগিয়ে গিয়ে কুন্তী জিজ্ঞেস করল, “সম্পদদা না?”

“হ্যাঁ আমি সম্পদ। কিন্তু আপনি?”

“আমি কুন্তী। নীতার বান্ধবী।”

“ও এবার চিনেছি। অনেক বছর পর দেখা তো, তাই চিনতে পারিনি। দণ্ডি কাটার ছবিটা তুললাম। ভক্তির নামে এক ধরনের আত্মপীড়ন।”

“সত্যিই তাই। আজকের দিনে এমন কুসংস্কারের বশবর্তী হয় মানুষ? ভালো আছেন তো? তোমার ফোন নাম্বারটা দাও। আমাদের ফেরার তাড়া আছে। এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে এক আত্মীয় বাড়িতে এসেছি। একদম বর্ডার। দেরি করতে পারছি না। প্রয়োজনে পরে যোগাযোগ করে নেব।”

“লিখে নাও। ৯৪৬৪৮৭৩২৪৩। আমিও অফিস থেকে এসেছি। কৃষ্ণগঞ্জে অফিস।”

“আসি তাহলে।”

“এসো।"

বাঁদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখে মলি খাবার দেওয়ার তদারক করছে। কুন্তীকে দেখে এগিয়ে এল।

“পৌষ পার্বণের দিন এখানে লোক খাওয়ানো শ্বশুরের ইচ্ছেতেই শুরু হয়েছিল। উনি উঠে যাবার পর থেকে চালিয়ে যাচ্ছি। এই পলদায় ট্রলার চলত। যুগীন্দা ঘাট থেকে উঠতাম; নামতাম শিমুলিয়ায়। দেড় মাইল বর্ষায় কাদা; অন্যসময় ধুলো রাস্তা পেরিয়ে সেই পুটির বিলের ধারে মলুয়াপাড়ার বাড়ি যেতে হতো। কী কষ্ট করে যে ছেলেমেয়ে মানুষ করলাম বলার নয়। ছেলেমেয়েরা শ্যামনগরে থাকে। ছেলে, দুই জামাই চাকরি করে। সবার ছেলেমেয়ে হয়ে গেছে। ব্যবসা ছেড়ে তোর জামাইবাবু কোথাও যায় না। আমি দুই দিকেই সামাল দিই।"

রান্নাঘরে ডাক পড়ায় মলি চলে গেল। একটু পরে পাতায় খিচুড়ি প্রসাদ এনে দিল কুন্তীকে। সন্ধ্যের আগেই ফিরতে হবে। বাঁশের ব্রিজ দিয়ে পার হবে; তাই নদী পাড় ধরে হাঁটতে লাগল ওরা। ফুলটুসি আঁশ শেওড়ার পাঁকা ফল তুলে মুখে পুরে দিল। অপুকেও একটা দিল। কুন্তীর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "খাবে নাকি একটা? আসটেলি ফল। মধুর মতো মিষ্টি।”

এই বুনো ফল খেতে কুন্তীর সাহস হল না। তিনটে ফল হাতের তালুতে নিয়ে ছবি তুলে নিল। কী মিষ্টি রং! মরে আসছে রোদ। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসের দাপট বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি শীত এবার। কুয়াশা জড়িয়ে ধরছে ধীরে ধীরে। কান মাথা ঢাকা থাকলেও একটা সুন্দর গন্ধ বাতাসে ভাসছে। কিছুটা সোঁদা গন্ধের মতো। ফুলটুসি জানিয়েছিল এ-গন্ধ সরা পিঠের। নতুন মাটির ছাঁচে পিঠে হচ্ছে, তাই সোঁদা গন্ধ মিশ্রিত। অন্য পিঠে না হলেও সরা পিঠে গ্রামের সবার বাড়িতে হচ্ছে। আজ যে পৌষ পার্বণ!

____________________


।। পর্ব-১১ ।।



চাকদা স্টেশনে যত মানুষ নামল; উঠল তার তিনগুণ। ভালোভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সবাই। হৈচৈ, ঠেলাঠেলিতে কুন্তীর পাগলাখালি মানস ভ্রমণে ছেদ পড়লো। তিনজনের সিটে চারজন বসতে হল। কুন্তীর পাশে এসে বসেছিল একজন বয়স্ক মহিলা। বোষ্টমীর পাশে বসা যুবতীর কানে হেডফোন। কথা বলছে ঘনিষ্ঠ কোনো মানুষের সঙ্গে। সকালবেলায় মেক-আপ করেছে। কুর্তি-প্লাজোর উপর সোয়েটার পরেছে। বাঁ-হাতে ঘড়ি, ডান হাতে পলা। চুলে ঢাকা সিঁদুরের বিন্দু উঁকি মারছে। পায়ের উপর পা তুলে নাচিয়ে নাচিয়ে কথা বলছে। ওরা দু’জন কালীনারায়ণপুর স্টেশন থেকে গেদে লোকাল ধরে। বসার জায়গাটা পেয়ে যায়। জানালার ধারে চারজন মুখোমুখি বসে আছে।

বয়ষ্ক মহিলাটি বলে উঠল, "কী গো মা-গোঁসাই শরীল ভালো তো?”

“হ্যাঁ গো মা ভালো আছি। তোমারে অনেকদিন পর দেখলাম। সব ভালো তো?”

“ভালো আর থাকি কী করে? অনেক টাকা-পয়সা খরচ করেও মেজো মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলাম না। মেয়ের শোকে কাহিল হয়ে পড়েছি।”

ওদের কথাবার্তা শুনে প্রশ্ন ছুড়ে দিল কুন্তী, "তোমরা কি প্রতিদিন এই ট্রেনে যাও?”

বৈষ্ণবী বলে, “আমি শনিবার আর রবিবার যাই। ওরা দুইজন রোজ যায়। এই ভোরের টেন ধরে যায়; আসি সন্দের টেনে। বাড়ি ফিরতি রাত হয়। আমার গুসাইও যায়। পরের বগিতি রয়েচে।”

“তোমার বাড়ি কোথায়?"

"বিলপাড়ায়।"

"বিলের ধারের পাড়া বুঝি? নাম কী?” কুন্তি বলে।

“দোবিল। জলটল নেই। চাষ হয়। বর্ষায় বিষ্টি হলে ডোঙা চলে। মাছ হয়, কিন্তু আগের মতো না। এই দুই বচর হল জল নেই।”

"সপ্তাহের আর পাঁচদিন ভিক্ষেয় বেরোও না?”

“শরীর ভালো থাকলি দুইদিন রেলবাজারে ভিক্ষে করি। একদিন শিবনিবাসে আর একদিন চলে যাই পাগলাখালি। একদিন বেরোয়নে। জিরোনের তো দরকার।”

“ধকল তো ভালোই হয়?”

“তা তো হয়। জিনিসির যা দাম বেড়েচে। খায়ে-পরে বাচে থাকতি তো হবে। আগে গুসাই বিলির মাছ ধরে সংসার চালাত। খাল-বিলি জল নেই। মাটের কাজে খাটনি বেশি। গুসাই কাজে কুমা। মুনিষ-পাটে কেউ নিতো না; তাই এই পথে আসা। কলকাতায় আসার দুইদিন খাটনি বেশি হয়। রাত তিনডেয় উটি। বাসীকাপড় ছাইড়ে, ঠাকুর সিবা দিয়ে টোটো ধরি। অনেক রাস্তা। একঘণ্টা লাগে যায়। রাতে শুয়ার আগে সব গুছিয়ে রাকি। ভোরে বেড়িয়ে পড়ি। সারাদিন খাবার-দাবারের অভাব হয় না। দোকানদাররা চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কুট, ছাতু দেয়। বিহারী চাওয়ালা এত্ত বড়ো এক গিলাস দুধ চা দেয়।”

কুন্তী বলে, “সপ্তাহে দুইদিন কলকাতায় আসো, রোজগার ভালোই হয়?”

“তা হয়। ওই যে জটাবুড়িরা হিংসে করে। টাকা-পয়সা বের করে গুনতি পর্যন্ত পারিনে। ওরা কয়, আমার রুপি ভুলে সবাই বেশি টাকা দেয়! দেয় তো, দেয়। তাতে তোদের কী! এই রুপীর জন্যি বিপদ কী কোম? প্রথমে কলকাতায় আইসে এক মাসির পিচনে পিচনে ঘুরতাম। পনেরো বছরে অনেক চালাক হয়েচি। এখন আর কেউ বিপদে ফেলতি পারবে না। কথার মারপ্যাঁচ শিখে ফেলেছি। মুক নাড়লি বুঝতি পারি কী বলতি চাচ্চে।”

“তুমি এক কামরায়, গোঁসাই অন্য কামরায় - কেন?”

“পনেরো বছর ধরে যাওয়া-আসা করচি। তকন বয়স কম ছিল। নানান জনে নানান কথা বলত। শুনা যায় না; তাই লেডিসে উঠি। ভিড় কম। আরামে যাওয়া-আসা যায়। ভিক্কেও আমরা আলাদা আলাদা দুকানে যাই। আমি রাস্তার ধারের দুকানে যাই। গুসাই চার/পাঁচ তলায় যেয়ে ভিক্কে করে। আমার চাইতে বেশি টাকা হয়। মেয়ে মানুষ না, উপরে যাতি ভয় করে। গুসাইও মানা করেচে। দরজা বন্দ ঘরে ঢুকে বিপদে পড়ব নাকি?”

“মেয়ে মানুষির পদে পদে ভয়। আমি কিন্তু চার/পাঁচ তলা পর্যন্ত কাকে করে সিমেণ্ট তুলি। একসঙ্গে অনেক মানুষ কাজ করে। ভয় কম। রঙের কাজে খাটনি কম; টাকা বেশি। ২৯ বছর এক মালিকের কাজ করছি। আগে ভয় করত। এখন তো বয়স হয়েছে। সবাই মামী মামী করে। কেউ খারাপ চোকে দেখে না।” - বলে বয়স্ক মহিলা। নাম বলল শিখা। ছোটো-বড়ো সকলের শিখা মামি হয়ে গেছে।

“রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ের কাজ খুব পরিশ্রমের... এই কাজে এলে কেন? অন্য কাজ করতে পারতে?”

“অন্য কাজে পাঁচজনের পেটের ভাত, পরনের কাপড় জুটত না। পাড়ার এক দিদি রাজমিস্ত্রীর লেবারের কাজ করত। সেই আমাকে এই কাজে নিয়ে আসে। প্রথমদিন সোদপুর ইস্টিশনে লেবারদের দলে বসিয়ে রেখে চলে গেল। এতদূর কোনোদিন আসিনি। ভয় করতি লাগল। কানচি আর ঠাকুরকে ডাকচি। একজন হিন্দী-বাংলা মিশিয়ে বলল লেবারের কাজ করব কিনা? কী কাজ না বুঝেই হ্যাঁ বলে দিলাম। মাথায় করে ইট তুলতি হবে চার তলায়। মাথায় ব্যারাম। কাঁখে করে তুললাম। প্রথমদিন ২৫ টাকা পাই। চাল, তেল, তরি-তরকারি কিনে ঘরে ফিরে বুঝলাম ছেলেমেয়েরা না খেয়ে মরবে না। বিটা আমার মাছ ধরার জাল বুনতো। আটল-রাবানি-পোলো বানাতো। নুন ভাতের অভাব হতো না। কঠিন ব্যাধিতে পড়ল। গরীব মানুষ। ভালো চিকিৎসে করতি পারিনি। অকালে চলে গেল। নতুন কাজে ঢুকে অসুবিধে হয়েছে। কষ্ট করে কাজ শিখিছি। টিকে থাকার জন্যি কী কষ্টটাই না করিচি। যে দিদির কাছে কাজ শিকিচি; প্রথম দিকি টাকা কম দিত। খাঁটিয়ে নিত বেশি। মুখ বেজার করিনি। মালিক খুব ভালো। বেইজ্জত হওয়ার ভয় কম। রঙের কাজে ভালো থাকা খুব কঠিন। বড়ো বড়ো ফ্লাট বাড়িতে এক/দুইজন পুরুষ মানুষের সঙ্গে কাজ। ভালো থাকে না কেউ - গল্প তো শুনি। কয় দিনিই তাদের সাজ-পোষাক, ভাব-ভঙ্গি পাল্টিয়ে যায়।”

পা নাচানো থামিয়ে যুবতীটি বলে ওঠে “এই তো আমি ৫০০ টাকা নিয়ে ঘরে যাচ্ছি। হেডমিস্ত্রী ব্যাগ বোঝাই করে বাজার করে দিয়ে ট্রেনে তুলে দিল। আধ ঘণ্টা পরপর ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে। রাজমিস্ত্রীর হেলপারের কাজে এই সুবিধা পেতাম? আমার বরের ওষুধ কিনে দেয়। ফল কিনে দেয়। একটা ফ্ল্যাটবাড়ি রং করে ২৫ হাজার টাকা লাভ করল। ১৬ হাজার টাকা দিয়ে এই মোবাইলটা কিনে দিয়েছে। বারো হাতে ঘোরার থেকে একহাতে থাকাই ভালো।”

“বাড়িতে কে কে আছে?” কুন্তী জানতে চাইল।

“পঙ্গু স্বামী আর ১২ বছরের ছেলে। আমার স্বামী চূর্ণীতে ট্রলার চালাত। বাবা তাই দেখে বিয়ে দিয়েছিল। চূর্ণীর যা অবস্থা - ট্রলার চলা বন্ধ হওয়ার পর থেকে রানাঘাট স্টেশনে লটারি বেচতো। নেশা করা ধরল। দিনেরবেলায় নেশা করে বাইক চালাতে গিয়েই তো এই বিপত্তি। লোকের বাড়ি কাজ করে রুগী টানব? না পেটের খিদে মিটাব? আমাদের পাড়ার একটা মেয়ে রঙের কাজ করত সোদপুর। ওই আমাকে এই লাইন ধরিয়ে দেয়। সাড়ে তিন’শ টাকা রোজ। ১০০ টাকা রেখে ২৫০ টাকা দিত। একমাস কাজ করার পর এ লাইনের আটঘাট বুঝে গেলাম। দুই বছর এই হেডমিস্ত্রীর সঙ্গে কাজ করছি। ওর বউও আমাকে ভালোবাসে। এমনি এমনি তো আর বাসে না। আগে টাকা হাতে পেলি সাট্টা খেলে, স্ফূর্তি করে খালি হাতে বাড়ি ফিরত। আমি তা হতে দিইনে। মালিক টাকা দিলে আমি ওর বউকে খবর দিই। সে এসে নিয়ে যায়।”

চাকদা থেকে ওঠা দিদিমণিদের জায়গা করে দিল শিবাদাসীরা। নিজেরা দাঁড়িয়ে পড়ল। কাঁধে হাতে পিঠে ঠাসা জিনিসের ব্যাগ নিয়ে বসে পড়ল তারা। কোনার জায়গাটা পাওয়ায় জন্য একজন বৈষ্ণমীকে ‘থ্যাঙ্ক ইউ ‘ জানাল। বসার পর হাতের ব্যাগ থেকে খাবার বেরোচ্ছে। চেরি, কাজু, পেস্তা, বাদাম, কিসমিস। সেটা বন্ধ করে বেরোল ফলের কৌটো। একজন পিঠে বের করল। টিফিনবাটি এগিয়ে দিচ্ছে একে অপরের দিকে। পাটিসাপটা খেয়ে সবাই প্রশংসা করল।

“বনিদি তুমি বানিয়েছো?”

“নারে। আমার কাজের দিদি। খুব ভালো। একবার মুখে বললেই হল!”

“আমার কাজের লোকের কথা আর বোলো না। দেরি করে আসে। কোনো কাজ করতে চায় না। শুধু কামাই আর টাকা দাও, টাকা দাও। তার উপর বুড়িটা যা জ্বালাচ্ছে না? জীবন একেবারে অতিষ্ট হয়ে গেল। তিনজন কাজের লোক। যে সারাদিন থাকে খাবার-দাবার খেয়ে শেষ করে দেয়। বাধ্য হয়ে সিসি টিভি লাগালাম।”

“বুড়িটা আবার কে?”

“আমার মা।”

একজন স্কুল শিক্ষিকার মুখে মা-কে বুড়ি বলে সম্বোধন করা শুনে কুন্তী অবাক হল। কল্যাণীতে তেমন কেউ নামল না। চারটি বিরাট ট্রলি ও ব্যাগ সমেত কন্যাসহ দুইজন মহিলা উঠল।

“পা তুলুন, পা তুলুন ট্রলিগুলো সিটের ওপরে নীচে দিয়ে দিই।”

“এত ভিড়ে পা তুলব কোথায়? অফিস টাইমে এত বড়ো ট্রলি নিয়ে কেউ ওঠে? অত হুটোপাটা করছেন কেন?”

“একদম জ্ঞান দেবে না। কখন বেরোব, না বেরোবো আমার ব্যাপার। বেড়াতে আসবো জামাকাপড় আনব না? নিত্যযাত্রীরা যেন ট্রেন কিনে নিয়েছে? যথারীতি টিকিট কেটে যাচ্ছি। কী মুখরে বাবা! নিজের সুবিধামতো তো বেরোব।”

“বাক্স রাখতে গিয়ে হাঁটুতে যা লাগল না! ওরে, বাপরে, বাপ। তার উপর এত কথা বলছ কেন?”

“সরিতা চুপ করে যা। জীবনে ট্রেনে ওঠে না, সব। বারাকপুর আসলে লোক দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না। দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।”

"ওরা কী বুঝবে ট্রেন জার্নির!”

“ছোটোলোক কোথাকার। ট্রেন মনে হচ্ছে নিত্যযাত্রীদের বাপের সম্পত্তি?"

সরিতার ধৈর্য্যচূতি ঘটল, “ভারি আমার বড়ো লোক এলেন রে! দামি পোষাক আর কথায় কথায় ইংরেজি শব্দ আওড়ালে শিক্ষিত হওয়া যায় না। দমদমে যে বাড়িতে বয়ষ্ক বুড়িটাকে দেখি রত্নাদি, মুখে যা কাঁচা খিস্তি না! দামড়া দামড়া ছেলে দাদা, বাবার সামনে মা-মেয়ে হাতকাটা যা প'রে থাকে না; বাল-ঝোল সব দেখা যায়। তারা আবার ভদ্দরলোকগিরি মারায়।”

“সরিতা, দাঁড়া। এরপর বেশি কথা বললে ট্রলিগুলো বাইরে ফেলে দিতে হবে। মানুষ দাঁড়ানোর জায়গা পাচ্ছে না। প্রত্যেকদিন কী লড়াই করে যাওয়া-আসা করতে হয় এরা তার কী বুঝবে?

এই প্রতিবাদী কণ্ঠকে সাথ দিতে একসঙ্গে অনেক কণ্ঠ ধ্বনিত হয়ে উঠল, "ট্রলি বের করে দাও আমরা ফেলে দিচ্ছি। মহিলাদেরও ঘাড় ধরে নামিয়ে দেওয়া হোক।”

“মা চেপে যাও।” - বেগতিক দেখে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে সুন্দরী মহিলার মেয়ে বলল।

কুন্তী ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ভ হয়ে গেল। কোনো পক্ষকেই সমর্থন করতে পারছে না। মানুষের বেঁচে থাকার কী কঠিন লড়াই! পরের স্টেশন দমদম। অসম্ভব ভিড়। ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে নামতে পারবে তো ওরা? ভাবনা হলেও; নিজে কীভাবে নামবে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

____________________


।। পর্ব-১২ ।।



দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ শীতকালীন ফসলে অপরূপা হয়ে ওঠে। বঙ্গজননী তার মধুমাখা রঙিন শীতল আঁচলখানি বিছিয়ে রাখে যেন। কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও হাল্কা সবুজ, কোথাও সোনালী বরণ, কোথাও বিবর্ণ। মায়াময় সে চিত্র জাদু জানে। সে জাদু সবাইকে সম্মোহিত করতে পারে না। প্রকৃতি দেখার চোখ যার আছে; সেই ধন্য হয়। ফাল্গুনে ফসল পেকে ওঠে। দুপুরে বঙ্গজননীর সোনালী আঁচলে সোনা রোদ ঝিকিমিকি করে। সমস্যা তৈরি হয় ফসল বাড়িতে আনতে। কোনো কোনো জমি তিন/চার ফসলি। বৃষ্টি না হলে সেচ দিয়ে ফসল কাটার পর পর অন্য ফসল রোপন/বপন হয়ে যায়। অতীতে একটা ফসল উঠে যাওয়ার পর জমি ফাঁকা পড়ে থাকত। গরুর গাড়ি, মোষের গাড়িতে ফসল বাড়িতে এনে ঝাড়াই-মাড়াই করতে অসুবিধা হতো না। ট্রাক্টর, ঝাড়াই মেসিন চাষির পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছে ঠিকই; তবে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে। ফসল ঝাড়াই-মাড়াই করে, শুকিয়ে মাথায় করে বয়ে আনতে হয়। মুনিষের খুব অভাব। বোঝা টানার কাজ কেউ করতে চায় না। দুই/একজনের গরুর গাড়ি আছে। তারা ফসল টানার কাজ করে। পরির মতো ক্ষুদ্র চাষীরা মাথায় ক'রে অথবা সাইকেলে ক'রে ফসল বাড়িতে আনে। কয়েক হাজার বিঘের বিলের মাঠে একটা রাস্তা থাকা খুব দরকার। অন্তত ফরেস্ট পর্যন্ত। থগবগের খাল থেকে চূর্ণীনদী পর্যন্ত খাল কাটা যেমন জরুরি; তেমনি একটা রাস্তাও দরকার। এসব আলোচনা চাষিরা মাঠে, তেমাথায়, চৌমাথায় করে; কিন্তু কীভাবে হবে - সে রাস্তা কেউ বাতলাতে পারে না। অবশ্য সম্পদ মাস্টার বলে, "তোমরা যদি একটু স্বার্থত্যাগ করার উদারতা দেখাতে পার তবে খালটা হয়ে যাবে; রাস্তাটাও। উঠে দাঁড়িয়ে বলো তো কে কে রাজি?

উঠল না একজনও। দুই/একজন মুখে আশ্বাস দেয় শুধু।

সম্পদ মাস্টার বলে, "তোমাদের রাস্তাও হবে না; খালও না।"

ফসলের গাড়ি যাওয়া-আসা নিয়ে ঝগড়া-গণ্ডগোল বারোমেসে সমস্যা। শিবরাত্রির দিন বিপদভঞ্জন, বারিনের তিলের জমির মধ্যে দিয়ে সর্ষের গাড়ি নিয়ে গেল। সেচ দেওয়া জমিতে তিলের চারা সবে মাটির উপর সবুজ ছাউনি দিয়েছে। চাকার চাপে তিলগাছ থেঁতলে গেছে। গাড়ি নিয়ে যাবে - সে কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করেনি। পরের গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় খিস্তিখামারি হয়ে গেছে।

"এর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হইব।" - চৌমাথায় এসে বারিন বলে।

শান্ত মানুষ রেগে গেলে যা হয়, বারিনের অবস্থা তাই। তাঁতিয়ে দেওয়ার লোকের অভাব নেই। হরেন বলে ওঠে, "বারিন ওই বিপদভঞ্জন মাস্টাররে ছাইড়া দিও না। অর বাপ আর তালুক ডাক্তারের জন্ন্যিই সেই সুমায় মাঠের হওয়া রাস্তা বন্দ হইল।"

"হ' বাপের কাচে শুনচি। ছাড়ুম না। মাস্টারি মারাচ্ছে। শিক্ষিত! বড়োলোক! মুখ দিয়ে কী বাইর হয়। কানে আঙুল দিউন লাগে। ওর জমির আল দিয়া একটা মানুষ হাঁটতে পারব না! মোড়ল হইচে? মানে কিডা?"

"মাথা গরম কইরো না বারিন।"

"মাথা গরমের কিচ্ছু দেখ নাই। অন্যায় করচে, নত না হয়ে -বাপ-মা তুইল্যা খিস্তি দিবো। বয়সে বড়ো তাই কী? মানুম না। সামনে পাইলেই মারুম। বাপ-মা তুইল্যা কথা কয়!"

"পরি, বারিনরে এট্টু বুঝায়া কও - ওর গায় য্যান হাত না দেয়। চণ্ডাল! মাথা গরম হইলে কিচ্চু ঠিক থাকে না। রক্তারক্তি হইব?"

"তুমি আবার এর মধ্যে আসলে ক্যান কাকি। বাড়ি যাও। আমরা আছি।"

শ'খানেক লোক জড়ো হয়ে গেছে ক্লাবের সামনে। পরি বিপদভঞ্জনের মা-কে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে পাড়ায় একটা মিটিং ডাকার প্রস্তাব রাখে। মিটিং-এর প্রধান আলোচনার বিষয়, অঞ্চলে খাল সংস্কারের জন্য টাকা এসেছে। খাল তাদের। কাজ বুঝে নিতে হবে।

খাল-বিল সংরক্ষণের সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য যে ক'টা সংগঠন তৈরি হয়েছে সম্পদ মাস্টার সবগুলোকে একছাতার নীচে আনার চেষ্টা করছে। কয়েক বছর হয়ে গেল অঞ্জনা, পলদা সংস্কারে টাকা বরাদ্দ হয়েছ। রাজনৈতিক তর্জায় কিচ্ছু কাজ হয়নি। টাকাটা সরকারের ঘরে ফেরত যায়নি। টাকাটা কোথায় আছে, সেটাও জানা যাচ্ছে না। তাই পরিরা এই সকল খাল-বিল বেষ্টিত গ্রামের মানুষদের নিয়ে মিটিং করবে। নিজেদের ন্যায্য পাওনা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নেওয়ার লড়াই। উন্নয়নের জন্য যে টাকা বরাদ্দ হয়; তা তো জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকা, জিএসটি-র টাকা। এক প্যাকেট মুড়ি কেনে তাতেও সরকার ট্যাক্স কাটে। সে টাকা তারা নেতাদের পকেট বোঝাই হতে দেবে না। পাড়ার রাস্তাটা যে পিচের; বোঝার উপায় নেই। মাটির মধ্যে খোয়া পোঁতা রাস্তা। নামমাত্র পিচ দিয়ে রাস্তা বানানোর ফল। প্রমোটারের রাজপ্রাসাদে অ্যাকোয়ার জলে রাজকন্যের স্নান হয়! এসব কথা এলাকার সবাই জানে।

____________________


।। পর্ব-১৩ ।।



জ্যৈষ্ঠের শেষ। তাপমাত্রা ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। চোখ রাঙিয়ে সূর্যি ঠাকুরের আবির্ভাব ঘটে। সকাল ন'টা থেকেই রাস্তাঘাট শুনসান। চাষিরা কড়া রোদের তাতে মাঠে তিষ্ঠতে পারে না। ফুটিফাটা মাঠঘাট। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরে পড়ছে। খেতেই - ফসল ও সবজি পুড়ে যাচ্ছে। করোনার পর থেকে অধিকাংশ কৃষকরা হীনবল হয়ে পড়েছে। কঠোর পরিশ্রম করতে পারে না। তারপর এই তীব্র তাপপ্রবাহ। ঘরে ঘরে অজানা জ্বর, পাতলা পায়খানা হচ্ছে আকছার। বয়স্ক ও ছোটোরা বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বড়ো মণ্ডলের ছয় বছরের ফুটফুটে নাতিটা দুইদিনের জ্বর-পায়খানায় মারা গেল। শোকে বউটা উন্মাদ। অসহ্য গরমে মানুষের চোখে ঘুম নেই। দিনের পর দিন এভাবে চলে না। সামর্থ্য যার আছে; সে এসি কিনছে। সম্পদ মাস্টার চিন্তিত হয়ে পড়ে। এতে পরিবেশের আরও ক্ষতি হবে। চৌমাথায় বসে পরিবেশ নিয়ে আলোচনা করে। তাপপ্রবাহের কারণ বিশ্লেষণ করে। বলে, "আমাদের এইভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ পরিবেশে রেখে যাওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। মানুষ অরণ্য ধ্বংস করেছে নির্বিচারে; প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগিয়ে প্রকৃতির সেই ক্ষত সারিয়ে তুলতে হবে। গরমের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য এসি শেষ কথা নয়। বিদ্যুতের অপর্যাপ্ত সরবরাহে ফ্যান ঘোরে টিকিস টিকিস করে। এইভাবে চলতে থাকলে তাও ঘুরবে না। তখন মানুষ কী করবে?"

এসব কথা বাইরের অনেকে সমর্থন করে; মেনে চলে কিন্তু নিজের বাড়ির অন্যদের এসব কথা বলা মানে অশান্তি ডেকে আনা। সম্পদ মাস্টারের ছোটো ভা'য়ের বউটা বড্ড আতুসি। গরম সে মোটেও সহ্য করতে পারে না। ওয়াশরুমে পর্যন্ত ফ্যান। এসি চালানো থাকলেও মাথার উপর সিলিং ফ্যান ঘোরে। পায়ের দিকে স্ট্যান্ড ফ্যান ঘোরে। সম্পদ মাস্টারের মা'কে কাঠ ঠেলে দু'বেলা রান্না করতে হয়। এত কষ্ট করেন ছোটো বউমাকে ধরে রাখার জন্য। বড়োছেলেটার জীবনটা ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। অফিস, সংগঠন নিয়ে মেতে থাকে। শখ - ছবি তোলা, ছিপ দিয়ে মাছ ধরা! ইট, কাঠ, পাথরের জঙ্গলে হাঁফিয়ে উঠলেই বেরিয়ে পড়ে পাহাড়ে-জঙ্গলে। হিমালয়ের বেশ কয়েকটি শৃঙ্গে আরোহণ করেছে।

ইদানিং সে সংগঠন নিয়ে মেতে উঠেছে। 'নদী বাঁচাও' বিভিন্ন সংগঠনের মিটিং-এর জন্য সপ্তাহখানেক ছুটি নিয়েছে। উদ্দেশ্য প্রশাসনকে জোর ধাক্কা দেওয়া। মাইক নিয়ে চূর্ণী, কলিঙ্গ, ঝোর-পলদার তীরবর্তী চল্লিশটি গ্রামে মাইকে প্রচার করেছে। একমাত্র জনরোষ পারে দূর্নীতির এই জগদ্দল পাথরকে সরাতে। মিটিং-এর দিনে ৪৫ ডিগ্রী তাপমাত্রাকে উপেক্ষা করে কাঠফাটা রোদে দলে দলে নারী-পুরুষের দল শ্লোগান দিতে দিতে এসে উপস্থিত হয়েছিল বটতলায়। লোকে লোকারণ্য।

"শাসক তুমি সাবধান, দুর্নীতি আর নয়।" "ধর্মের ভেক নয়; কর্মসংস্থান আগে চাই।" "ভিক্ষে নিতে চাই না আর; ন্যায্য অধিকার সবার চাই।" "শাসক তোমাদের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলতে চাইলেও; আমরা তোমাদের ভুলতে দেব না" - শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নারী-পুরুষের হাতে।

চৌমাথায় থিকথিকে ভিড়। বটের ছায়ায় মঞ্চ বাঁধা। মঞ্চে বসে আছেন বিভিন্ন সংগঠনের সম্পাদক ও সভাপতিগণ। সবাই মুখিয়ে আছে সম্পদ মাস্টারের বক্তৃতা শোনার জন্য। সম্পদ মাস্টার মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সমবেত জনতাকে, "সাথী বন্ধুগণ" বলে বক্তৃতা শুরু করতেই করতালিতে ফেটে পড়েছিল সভা। সেদিনের লোক সমাবেশ প্রশাসনকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। স্থানীয় বিধায়কের গাড়ি মাঝপথে উল্টোদিকে চালনা করে দেয় থানার বড়োবাবু। ক্ষুব্ধ জনতাকে কন্ট্রোল করতে পুলিশ বেপরোয়া লাঠি চার্জ করে। নারী বাহিনী রেহাই পায়নি। মণিকুমার গুরুতরভাবে আহত হয়। মাথা ফেটে চৌঁচির। ছত্রভঙ্গ জনতা জান বাঁচানোর জন্য সভা ছেড়ে পালায়। সম্পদ মাস্টারকে পুলিশ অ্যারেস্ট করে। মণিকুমারের মতো আরও অনেকে লাঠির আঘাতে জখম হয়ে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়। সপ্তাহখানেক ধরে মণিকুমারের জ্বর ১০৪ ডিগ্রীর নীচে নামেনি; সেই সঙ্গে পাতলা পায়খানা। ফুলটুসি হাসপাতাল চত্ত্বর আকঁড়ে পড়েছিল; কিন্তু ফুলটুসি সুস্থ করে মণিকুমারকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। যেদিন সন্ধ্যের পর মণিকুমারের অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠেছিল, অনুনয়-বিনয় করেও সে স্বামীর পাশে থাকার অনুমতি পেল না। জ্বরের ঘোরে "টুসি, টুসি" করতে থাকে। কাছে ছিল কালা। কালা বাইরে এসে ফুলটুসিকে জানায় সে কথা। ফুলটুসি ছুটে গিয়েছিল গেটম্যানদের কাছে, "আমারে একটু রুগীর কাছে যেতে দেন।" নিষ্ফল মাথা কোটা। রাত দশটা নাগাদ মণিকুমার পাড়ি জমায় পরলোকে।

শেষ সময়ে মণিকুমারের পাশে থাকতে না পারার বেদনায় ফুলটুসি বোবা হয়ে গেছে। কাঁদে না, হাসে না, কথা বলে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। বিলের ধারে বসে থাকে। শূন্যদৃষ্টি! কাঁদানোর চেষ্টা করে পাড়া-প্রতিবেশী।

"ও রাঙাবউ তোর চোখের জল কী শুকিয়ে গেল; কান বউ; কান। মনের ভাব বের কর। একজন তো চলে গেল, তোর তো বাঁচতি হবে। মেয়েমানুষ হয়ে ওই লড়াই-আন্দোলন করা ভালো না। সে কতা তো কুনুদিন শুনলিনে। কতা শুনলি, এরাম করে মণিকুমাররে হারাতিসনে।" - কথাগুলো বলে কালার মা কেঁদে ভাসিয়ে দিল।

বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ভিন রাজ্য থেকে মেয়েরা ছুটে এসেছিল। কাজকর্ম বেরিয়ে যাবার পর মেয়েরা মা-কে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। ফুলটুসির এক কথা - না; সে যাবে না। এই দামোদরের বিল ছেড়ে কোথাও যাবে না।

(সমাপ্ত)

____________________


- লেখিকার প্রকাশিত বই -



- যোগাযোগ -

+91 9679366748
mamatabiswas2020@gmail.com