গল্প ও অণুগল্প

আমার মা (ত্রয়োবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


খেয়াঘাট পার হয়ে যখন বেজপাড়া গ্রামের বাগান হয়ে পাড়ায় প্রবেশ করলাম তখন মাঠ থেকে অনেকেই ফিরছেন। কারও কাঁধে হাল, সামনে বলদ, কেউ কোমরে গামছা বেঁধে টোকা মাথায় দিয়ে বাড়ির পথ ধরেছেন। এখন গ্রামের চেহারা এমনই বদলে গেছে যে, বছর পনেরো আগে দেখা সেই গ্রামের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রাস্তাঘাটের অবস্থা আগের মতো নেই। এখানে প্রচুর আম ও লিচুর বাগান। আম ও লিচুর টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের নানা প্রজাতির আম ও লিচু পাওয়া যায়। এমনকি এখানকার আম ও লিচুর চাহিদা বিদেশের বাজারেও আছে। তাই মরসুম আসার আগেই আম ও লিচু ব্যবসায়ীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। ওঁরা এসে লিজ নেওয়া বাগান পরিষ্কার, গাছে ওষুধ দেওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করে ফিরে যান। হয়তো সেই কারণেই রাস্তাঘাটের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছে। আম, লিচু বাগানের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বাড়িটি অনেক চেষ্টার পর খুঁজে পাওয়া গেল। বাড়িতে কেউ আছেন কী না জানতে চাইলে নয় দশ বছরের একটা ফুটফুটে মেয়ে বেরিয়ে এলো। ওর দিকে চোখ পড়তেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি ঠিক দেখছি তো? এ তো আমার হারিয়ে যাওয়া শিউলি! শৈশবের সেই শিউলি! বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই একগাল হাসি উপহার দিয়ে বললো - তুমি কে গো, কোত্থেকে আসছ, আর কাকে দরকার?

- আগে বলো তুমি কে?

- বলবো না। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।

- বেশ। তাই হোক। আমার নাম জয়। আমি সুমিতের কলেজ জীবনের বন্ধু আর আমি আসছি -

- তোমার নাম জয়? তা ভারি সুন্দর নাম তো তোমার, আমার নাম কাজল। আমি ভালো দিদার কাছে প্রতিদিন আসি, সারাদিন এখানে থেকে দিদার কাছে গল্প শুনি। দিদা একা থাকে তো তাই -

- কেন দিদার ছেলে সুমিত, সুমিত এখানে থাকে না?

- তা আমি জানি না। আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি, চিনিও না, কেবল নামটাই শুনেছি। আসলে দিদা এখন চোখে ভালো দেখতে পায় না, কোনো কাজ ঠিকঠাক করতে পারে না। আর জোরে জোরে কথা না বললে শুনতেও পায় না।

আমি ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম - তোমার দিদা কী এখন ঘরে আছেন?

- হ্যাঁ, আছে। আসলে দিদাকে দেখার কেউ নেই তো তাই আমার মা সকাল আর দুপুরে কিছু খাবার বানিয়ে আমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। তিনি দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন। বিকেলে বেলতলার মন্দিরে গীতা পাঠ হয় সেটা শুনে সন্ধেবেলা ওখান থেকেই প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফেরে। আমি নাহলে আমার মা দিদাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। জানো কাকু, দিদা তার পুরনো দিনের গল্প বলতে বলতে চোখের জল মোছে। আমিও দিদার কথা শুনতে শুনতে কেঁদে ফেলি।

আমাদের কথার মাঝখানে দেখলাম সুলতা মাসিমা তাঁর ভাঙাচোরা শরীরে শতচ্ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন - কে রে কাজু কে এসেছে?

সুলতা মাসিমার জীর্ণ কঙ্কালসার চেহারা এবং নুইয়ে পড়া শরীরের দিকে তাকিয়ে আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বাড়িটার চেহারা আর মাসিমার চেহারা একই রকম। আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম - মাসিমা আমি জয়। চিনতে পারছো না?

তিনি বিস্মিত হয়ে বলে উঠলেন - জয়? জয় এসেছিস বাবা? এতদিন পর এলি? আমার যে সব শেষ হয়ে গেছে বাবা।

আমি এগিয়ে তাঁর হাত দু’খানা ধরে দাওয়ায় বসালাম তারপর জিজ্ঞাসা করলাম - কী বলছো তুমি? কী শেষ হয়ে গেছে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। সুমিত কোথায়?

- নিজের ছেলের কথা আর কী বলবো বাবা। ওকে মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারলাম না। যতদিন আমার শরীরে শক্তি-সামর্থ্য ছিল ততদিন সুমিত আমাকে কিচ্ছুটি বলেনি। যেদিন ও চাকরি নিয়ে কলকাতায় চলে গেল তার দুদিন পরে বেউলো নদীতে কচুশাক কাটতে গিয়ে আমার বাঁহাতের কবজিতে হেঁসোর কোপ লাগে। আমার পাড়ার বাসিন্দা বেলতলার মন্দিরে সব সময় থাকে যে ছেলেগুলো তারা দৌঁড়ে এসে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারপর আমার হাতটা বাদ যায়। ছেলের সঙ্গে নানাভাবে ওরা যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু ওদেরকে কীসব উল্টোপাল্টা কথাবার্তা বলে। তাতেই ওরা রেগে গিয়ে ছেলের সাথে আর যোগাযোগ করেনি। আমাকে বলে - মাসি তোমার ছেলে এখন বেঁচে নেই। ধরে নাও ও মারা গেছে। এখন থেকে আমরাই তোমার দেখাশোনা সেবাযত্ন করবো। অকৃতজ্ঞ বেইমান ছেলে।

কথা বলতে বলতে মাসিমার চোখের কোণে জলের ধারা নেমে এলো। আমি চোখ দুটি মুছে দিয়ে বললাম - কেঁদো না মাসি। তোমার ছেলে তোমার খোঁজখবর নেয় না আর আমার মাকে তাঁর অন্য ছেলেরা রাখতে চায় না অথচ যে ছেলে তাঁকে রাখতে চায় তার কাছে তিনি আসতে চান না। চিন্তা কোরো না মাসি চলো আমার কাছে থাকবে।

- না বাবা, তুই বলেছিস এটাই অনেক। আমাকে এখানে সবাই খুব ভালোবাসে। পাড়ার নলিনী, সুধাকান্ত, রমেশ, শরৎ ওরা প্রতিদিন পালা করে আমার খোঁজখবর নেয়। আমার দরকারী জিনিস পত্র দিয়ে যায়। আর কাজলের মা, নলিনীর বউ ওরা সব রান্না করে দু’বেলা খাবার দিয়ে যায়। মেয়েটা সারাদিন আমার কাছে এসে পড়া করে, গল্প করে - আমার বেশ সময় কেটে যায়। এদের মধ্যে এভাবেই থাকি আর ক’টা দিনই বা বাঁচব?

- সুমিত কোথায় থাকে? তুমি জানো?

- আমি ঠিক জানি না বাবা। তবে সুধা তো পাটালি গুড় আর ভুসিমালের ব্যবসা করে। তাই প্রায় প্রতি সপ্তাহে ওকে কলকাতা যেতে হয়। ওর সাথে শিয়ালদা স্টেশনে মাঝে মাঝেই দেখা হয় সুমিতের তবে কথা হয় না। সুধা কার কাছে জেনেছে সুমিত নাকি কোন একটা বড়ো অফিসে কাজ করে। ওই অফিসের বড়বাবুর একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করে তাঁদের বাড়িতে ঘরজামাই হয়ে থাকে। তাঁর নাকি অগাধ সম্পত্তি। আমি তো আমার ছেলেকে চিনি - ছোটবেলা থেকেই ও একটু লোভী প্রকৃতির। টাকার গন্ধ নাকে গেলে ও ঠিক থাকতে পারে না। ওখানে কুবেরের ধন আছে তার গন্ধে নিজেকে ডুবিয়ে নিয়ে এই অন্ধ বৃদ্ধা মাকে ছেড়ে দিতে দু’বার ভাবেনি৷ এই দেখো কেবলই আমার কথা বলছি তুই এতদূর থেকে এলি তোকে কিছু একটা না খেতে দিয়ে আমার দুঃখের মহাভারত খুলে বসেছি।

বলেই শশব্যস্ত হয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন - কাজল কাজল কোথায় গেলি মা? তোর কাকুর জন্য দু’টো নাড়ু আর একবাটি মুড়ি নিয়ে আয় তো মা। সেই কোন সকালে হয়তো বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ছেলেটা আমার।

কাজল ততক্ষণে পাড়ার মাঝখান দিয়ে দৌড়ে বাড়ি চলে গেছে। ওর ধারণা দিদার খুব কাছের কেউ একজন এসেছে। সেই খবরটা দিতেই ছুটে গেছে ওর মায়ের কাছে। আমাদের কথার মাঝে খেয়াল করিনি কখন সে বেরিয়ে পড়েছে।

আমার বুঝতে সময় লাগলো না যে, মায়ের অন্তরটা কত স্নেহ-মমতা, আবেগ-ভালোবাসায় পূর্ণ - সামর্থ্য নেই, অন্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা একজন সহায়সম্বলহীন মায়ের প্রাণে তাঁর সন্তানের জন্য কত উৎকণ্ঠা! আমার সাথে তাঁর রক্তের সম্পর্ক নেই অথচ তিনি আমাকে আজও তাঁর সন্তানের জায়গায় বসিয়ে রেখেছেন - এটাই আমার বাংলার নিজস্বতা। আমি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললাম - থাক মাসিমা, থাক। অত ব্যস্ত হতে হবে না। আমি আসার পথে তাপসের দোকান থেকে পেটভরে ঘুগনি রুটি খেয়ে এসেছি।

- তাপস মানে তোদের কলেজে ফুচকা বিক্রি করতো সেই ছেলেটা?

- হ্যাঁ মাসিমা। তুমি তাকেও চেনো?

- তাপসকে চিনবো না? ও আমার জন্য অনেক করেছে। আমার হাত কেটে যাবার খবর পেয়ে ও আমার কাছে এসেছিল। সুমিত আমাকে দেখে না, খোঁজ খবর নেয় না এটা শুনে খুব রেগে গিয়েছিল। ও আমার জন্য ওষুধ, ব্যান্ডেজ এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠাতো। কিন্তু বাবা আমি তো বুঝি ওর সামান্য রোজগারে ওদের সংসার চলে। আমি একজন বাড়তি বোঝা। আমিই ওকে বলেছিলাম - "বাবা তাপস তোর তো সংসার আছে, নতুন বিয়ে করেছিস এখন অনেক খরচ। তুই আর এসব পাঠাস না।" তাতেই ও অসন্তুষ্ট হয়ে আমার কাছে আর আসে না। বল বাবা আমি কী ভুল কিছু বলেছি?

আমি বললাম - হ্যাঁ মাসি তুমি ভুলই করেছ। তুমি তাপসদের মতো ছেলেদের চিনতে ভুল করেছ। এরা টাকাপয়সার চেয়ে মানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিকতাকেই বেশি মর্যাদা দেয়। তোমার কথায় ও খুব দুঃখ পেয়েছে, ওর বড়ো অভিমান হয়েছে। তুমি কী জানো তাপস ওর মাকে কত শ্রদ্ধা করে, দেবতার মতো পুজো করে? তোমাকেও তাপস ওর মায়ের আসনে বসিয়েছে।

- তাপস কী তোকে এসব বলেছে?

- সব কথা বলে বোঝাতে হয় না মাসিমা। ওর কাছে তোমার খবর জানতে চেয়ে আমি ওর অভিমানী মনটা আবিষ্কার করলাম। তোমার এখানে এসে তোমার কথা শুনে বিষয়টা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। তাপস সত্যি খুব ভালো ছেলে মাসিমা। সেই কলেজে পড়ার সময় থেকে ওকে জানি, কেউ না খেয়ে আছে শুনলে ওর মনটা কেঁদে ওঠে।

সবাইকে সুমিতের সাথে গুলিয়ে ফেলো না। এখনো আমাদের গ্রাম-শহরে খোঁজ করলে তাপসের মতো এমন অনেক ছেলে-মেয়েকে পাবে যারা সত্যি সত্যিই মানুষকে ভালোবাসে। আমাকে দেখো না, আমি একবুক শূন্যতা আর হাহাকারকে সঙ্গী করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তোমাকে বললাম আমার কাছে থাকতে, তুমি রাজি হলে না।

মাসিমা আমার কাছে এসে আমার কপালে, মুখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমার চোখে জলের ধারা নেমে এলো।

(ক্রমশ)