গল্প ও অণুগল্প

আপন হতে বাহির হয়ে (অণুগল্প)



সুনন্দা দাশ


শহরতলীর খ্যাতিবিহীন ছোট্ট একটা পাড়া। পুকুর পাড়ে, পেঁপে গাছের ছায়ায় একটা ছোট্ট বাংলো বাড়ী। সামনের জমিতে ঘাসগুলি অযত্নে এবড়ো খেবরো।

এখানেই থাকেন সুতপা ও তাঁর বিধবা ভাসুরঝি মায়া। মায়া কাছের একটা স্কুলে চাকরি করে। তাঁর মেয়ে জামাই থাকে বিদেশে।

এবারে শীত পড়েছে বেশ। বড়দিনের ছুটিতে মেয়েরা এসেছিল। আনন্দ করে ফিরে চলে গেছে। মাঘ মাসের সন্ধ্যায়, হিম হিম অন্ধকার। বাইরের ঘরে জানলার সামনে বসে, হাতের বইটা বন্ধ রেখে মেয়ের দেওয়া গায়ের দামী শালটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে দূরের বাগান বাড়িটার মস্ত বড় বাতাবি লেবুর গাছটার দিকে তাকালেন তিনি। বাইরে কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় শীতার্ত সবুজেরা ভয়ে চুপসে ঝরে পড়ছে হলদে হয়ে।

গেটের বাইরে লাল কাঁকরের রাস্তার ধারে লাঠি হাতে কে যেন বসে না? গায়ে জামা নেই ছেঁড়া শাড়ি, শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছে। অন্ধকারে বাইরে বসে কেন? গায়ে শালটা ভালো করে জড়িয়ে উঠে বাইরে গেলেন তিনি।

"কি গো! কে তুমি? অন্ধকারে, ঠান্ডায় বসে কেন?"

"তিনটে গরু নিয়ে বেরিয়েছিলাম, দুটো ফিরেছে, একটা ফেরেনি মাগো।" কান্না ভেজা ভয়ভীত গলা।

"আজ ছেলে বউ বাড়িতে ঢুকতে দেবে না।"

অসহায় বৃদ্ধাকে হাত ধরে তুলে ঘরে নিয়ে গেলেন তিনি।

ছোট মোড়াতে বসিয়ে গরম চা খেতে দিলেন তাকে। নিজের একখানা পুরোনো শাড়ি ও ব্লাউজ দিলেন তাকে। বুড়ী তবু কাঁদে।

হঠাৎ বাইরে থেকে জোর হাম্বা হাম্বা ডাক। বুড়ীর মুখের তোবড়ানো গালে হাসি ফুটল।

"ঐ যে ধবলী ফিরে এয়েছে!"

বৃদ্ধাকে গেট অবধি নিয়ে গিয়ে, তার গায়ে নিজের গরম শালটা জড়িয়ে দিয়ে, তার অবাক হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে কি এক আশ্চর্য তৃপ্তির আস্বাদ পেলেন সুতপা। সে যেন এক পরম পাওয়া!