গল্প ও অণুগল্প

পাগলটা (ভাষান্তরঃ গৌতম চক্রবর্তী)



চিনুয়া আচেবে


হাটবাজার আর সোজা রাস্তা ওকে আকর্ষণ করত। কিন্তু ছোটখাট কোনো পাড়ার বাজার যেখানে সন্ধ্যায় কিছু বাচাল মহিলা জড় হয়ে গল্পগুজব করে আর সন্ধ্যায় ঝোল রাঁধার জন্য ওগিলি কেনে, তা নয়। বরং এমন এক বিশাল, ভরা বাজার, যা দূর-দূরান্ত থেকে চেনা-অচেনা মানুষকে ডাক দেয়। আর কোনো ধুলো-ঢাকা পুরোনো পায়ে-চলার পথ যা এই গ্রামে শুরু হয়ে ওই খাল বা নদীতে গিয়ে শেষ হয়েছে, তাও পছন্দের নয়। বরং এমন এক চওড়া, কালো, রহস্যময় মহাসড়ক, যার আদি-অন্ত নেই। অনেকদিন ঘোরাঘুরির পর ও এমন দু'টি বাজার খুঁজে পেল। সেগুলো একে অপরের সঙ্গে একটি সড়ক দিয়ে যুক্ত। খুঁজে পাওয়ার পর ওর পথিক জীবনের শেষ হল। দু'টি বাজারের একটির নাম আফো, আরেকটির একে। আফো আর একে-র মধ্যে দুই দিনের পথ তার খুব মনমতো হয়েছিল: একে-তে রওনা হওয়ার আগে সে আফো বাজারের সব কাজ গুছিয়ে নিতে পারত। রাতটা সে আফো-তেই কাটাত, কারণ সারাদিন তার কুঁড়েঘর দখল করে রাখত বাজারের দুই গুরু-নিতম্বিনী নারী। ওরা বলত এটা ওদের দোকান দেওয়ার জায়গা। প্রথমে ও প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মহিলারা তাদের পুরুষ সঙ্গীদের ডেকে নিয়ে এলো। জঙ্গল থেকে চারজন বিশালদেহী পুরুষ এসে তাকে কুঁড়েঘর থেকে মারধর করে বের করে দিল। এরপর থেকে ও তাদের এড়িয়ে চলত - বাজার ছেড়ে সকালে বেরিয়ে পড়ত, আর সন্ধ্যায় ফিরে এসে রাত কাটাত। পরদিন সকালে ও তাড়াতাড়ি সব কাজ গুছিয়ে ফেলত। তারপর সেই দীর্ঘ, সুন্দর, অজগরের মতো সড়ক ধরে একে বাজারের দিকে রওনা দিত - দূরের শহর ওগবুতে। চলার সময় বাঁহাতে সামলে রাখত মাখায় রাখা মালপত্রের ঝাঁকা, আর ডান হাতে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে থাকত একটা মোটা লাঠি। খুদে দুষ্টুদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। খুদেরা ওকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ত, নিজেদের মা-বোনেদের নগ্নতা নিয়ে হাসাহাসি করত। তবে ওর মা'কে নিয়ে কখনও খারাপ কথা বলেনি।

ও সাধারণত রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেত, কথা বলত রাস্তার সঙ্গে। কিন্তু একদিন এক ম্যামি-ওয়াগনের চালক আর তার সাথী এসে চেঁচিয়ে, ধাক্কা দিয়ে, ওর গালে এক চড় কষিয়ে দিল। বলল, ট্রাক প্রায় ওদের মায়ের গায়ে উঠে গিয়েছিল - ওর গায়ে নয়। এরপর থেকে ও ওইসব শব্দমুখর ট্রাক আর ভেতরের ভবঘুরে মানুষদের এড়িয়ে চলতে লাগল।

এক দিন এক রাত হাঁটার পর ও এখন একে বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। প্রতিটি ছোট ছোট গলিপথ থেকে বাজারমুখী মানুষের ঢল এসে মিশছে প্রধান সড়কে। তখনই ও দেখতে পেল কয়েকজন তরুণী তাদের মাথায় জলভর্তি কলসি নিয়ে উল্টোদিক থেকে ওর দিকে আসছে। অন্যদের মতো বাজার থেকে ফিরছে না। সে বেশ অবাক হল। তারপর ও দেখল আরও দুটি কলসির মাথা উঁকি মারছে প্রধান সড়কের পাশে একটি ঢালু পায়ে চলার পথ থেকে। তখন ওর জলতেষ্টা পেল। একটু ভেবে ও রাস্তার পাশে ঝাঁকাটা নামিয়ে রেখে ঢালু পথটির দিকে রওনা হল। যাওয়ার আগে ও তার প্রিয় সড়ককে অনুরোধ করল, রাগ করে যেন ওকে ছেড়ে না চলে যায়। "তোর জন্যও জল নিয়ে আসব," সে আদুরে দৃষ্টিতে পিছনে তাকিয়ে বলল। "আমি জানি, তোরও তেষ্টা পেয়েছে।"

লুইবে ছিল ওগবু গ্রামের একজন সম্মানিত মানুষ। ওর মর্যাদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ও ছিল একজন ধনী ও সৎ ব্যক্তি। ও শহরের সমস্ত অভিজাত ওজো পুরুষদের সম্প্রতি জানিয়েছিল যে, আসন্ন দীক্ষার মরসুমে তাঁদের গৌরবময় গোষ্ঠীতে ওর যোগদানের ইচ্ছে আছে।

"চমৎকার তোমার প্রস্তাব" খেতাবধারী লোকেরা বলল। সাক্ষাতে দেখলে তবে বিশ্বাস করব। সসম্মানে তারা বুঝিয়ে দিল যে লুইবে বিষয়টি যেন আবার ভালো করে ভেবে দেখে। নিশ্চিত হয় যে, ও যথাযথভাবে তা সম্পন্ন করার সামর্থ্য রাখে। কারণ ওজো কোনো শিশুর নামকরণ অনুষ্ঠান নয়। কোথায় মুখ লুকোবে সেই পুরুষ, যে ওজো নৃত্য শুরু করে তারপর মঞ্চেই আটকে যায়? কিন্তু এই ক্ষেত্রে বড়দের সতর্কবাণী ছিল কেবল এক আনুষ্ঠানিকতা। কারণ লুইবে এতটাই বিচক্ষণ এক ব্যক্তি ছিল যে কেউ কল্পনাও করতে পারত না যে কিছু শুরু করে শেষ করার সামর্থ্য ওর নেই।

একে-র সেই দিনে লুইবে খুব ভোরে উঠে পড়েছিল। উদ্দেশ্য নদীর ওপারের জমিতে গিয়ে কিছু হালকা কাজ সারবে। তারপর দুপুরবেলা বাজারে গিয়ে সমবয়সীদের সঙ্গে দু-এক শিঙা ভালো মদ খাবে। আর সম্ভব হলে স্ত্রী'র কুটির মেরামতের জন্য ছাউনি কিনবে। নিজের কুটিরের ছাউনির সমস্যা সে কয়েক বছর আগেই স্থায়ীভাবে সমাধান করেছে। খড়ের ছাউনি সরিয়ে টিনের ছাউনি লাগিয়ে নিয়েছে। বউদের ক্ষেত্রেও একই কাজ শীঘ্রই করার ইচ্ছে ওর ছিল। চাইলে তখনই মগবোয়ে-র কুটির ঠিক করে দিতে পারত। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল একসঙ্গে দু'টি কুটিরই মেরামত করবে, নাহলে উদেনকো পুরো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে। উদেনকো ছোট বউ, তিন বছরের ছোট, কিন্তু ও কখনোই তা নিয়ে সচেতন ছিল না। সৌভাগ্যবশত, মগবোয়ে ছিল খুব শান্তিপ্রিয়। সে সচরাচর উদেনকোর কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মান তেমন দাবি করত না। মাঝে মাঝে সারাদিন ধরে সে একনাগাড়ে উদেনকো-র উসকানিমূলক কথাবার্তা সহ্য করত। তবে তেমন কোনো জবাব দিত না। জবাব দিলেও অল্প কথায়, নিচু গলায়।

সেই সকালেই উদেনকো এক ছোট কুকুরকে কেন্দ্র করে মগবোয়ে-কে হিংসা ও নানা ধরনের নষ্টামির অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।

"একটা ছোট কুকুর তোর কী ক্ষতি করেছে?" উদেনকো এত জোরে চিৎকার করছিল যে অর্ধেক গ্রাম শুনতে পেয়েছিল।

"আমি জিজ্ঞেস করছি, মগবোয়ে, একটা বাচ্চা কুকুর কী এমন দোষ করেছে দিনের শুরুতে?"

"দিনের শুরুতে," উত্তর দিল মগবোয়ে, "তোর কুকুর ওর নোংরা মুখটা ঢুকিয়ে দিয়েছে আমার ঝোলের হাঁড়িতে।"

"তারপর?"

"তারপর আমি ওকে চাপড় মেরেছি।"

"চাপড় মেরেছিস। তোর ঝোলের পাত্র ঢেকে রাখিস না কেন তুই? কুকুরকে মারার চেয়ে পাত্রের মুখ ঢেকে রাখা কি সহজ কাজ নয়? একটা বাচ্চা কুকুর কি তোর মতো একজন মহিলার চেয়ে বেশি বুদ্ধি রাখে যে হাঁড়িতে মুখ লাগিয়ে আবার ঢেকে রেখে যাবে...?"

"উদেনকো, চুপ কর এবার।"

"এখনও শেষ হয়নি, মগবোয়ে, শেষ হয়নি কথা। যদি ওই কুকুর তোর কাছে কোনোভাবে ঋণী হয়, আমি তা জানতে চাই। আমার যা কিছু আছে, এমনকি এই ছোট কুকুরটা যা আমার শিশুর মল পরিষ্কার করার জন্য কিনেছি, তাও ভোর রাতের ঘুম নষ্ট করে দেয়। তুই খারাপ মেয়েছেলে, মগবোয়ে, খুবই খারাপ!"

লুইবে তাঁর কুঁড়েয় বসে সব কিছু নীরবে শুনছিল। উদেনকো-র গলার জোর দেখে ও বুঝতে পারছিল যে বাজার শুরু না হওয়া পর্যন্ত সে এভাবেই কথা বলে যাবে। তাই ও তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হস্তক্ষেপ করে বড় বউকে হেঁকে বলল:

"মগবোয়ে! সকাল সকাল আমায় একটু শান্তি দে!"

"শুনছ না, উদেনকো কেমন অপমান করছে..."

"উদেনকো কী বলছে আমি কিছুই শুনছি না। আমি আমার বাড়িতে একটু হলেও শান্তি চাই। উদেনকো যদি পাগল হয়ে গিয়ে থাকে, তবে বাকিরাও কি পাগল হয়ে যাবে? আমার উঠোনে এত সকালে একজন পাগলই কি যথেষ্ট নয়?"

"মহান বিচারক শেষে কথা বলেছেন," উদেনকো গানের সুরে ঠাট্টা করে উঠল।

"ধন্যবাদ, মহান বিচারক। উদেনকো পাগল। উদেনকো সবসময় পাগল, কিন্তু তোমাদের মধ্যে যারা সুস্থ, তারা যেন..."

"চুপ কর, নির্লজ্জ মেয়ে, নাহলে আজ সকালে কোনো বুনো জানোয়ার এসে তোর চোখ চেটে দেবে। কবে শিখবি, সারা ওগবু-কে না শুনিয়ে, নিজের খারাপ ব্যবহার বাড়ির ভেতরেই রাখতে? চুপ কর বলছি!"

তারপর চারদিকে নীরবতা নেমে এল। শব্দ বলতে শুধু উদেনকো-র শিশুর কান্না। বড়দের চিৎকারে এতক্ষণ তা হারিয়ে গিয়েছিল।

"কেঁদো না, সোনা বাবা," উদেনকো তাকে বলল। "ওরা তোর কুকুরটাকে মারতে চায়। কিন্তু কথায় আছে, যে মুরগির পেছনে ছোটে, তার পতন..."

সকালের মাঝামাঝি সময়ে, লুইবে তার খামারের সব কাজ শেষ করে আবার বাজার যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। ছোট এক জলধারার কাছে এসে, সচরাচর যেমন করে, ও শরীরের ঘাম ধুয়ে ফেলতে চাইল। জামাকাপড় পুরুষদের স্নান করার জায়গায় এক বিশাল পাথরের উপর রেখে জলে নেমে পড়ল। দিনের এই সময়ে হাটের দিনে আশেপাশে আর কেউ ছিল না। কিন্তু স্বাভাবিক লজ্জাবোধে সে জঙ্গলের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল।

পাগলটা তাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখছিল। যত বার সে হাতের তালুতে জল তুলে মাখা ও শরীরে ঢালছিল, পাগলটা তখন তার খোলা পাছার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। তারপর ওর মনে পড়ল - এই তো সেই মোটা লোকটা, যে আরও তিনজনকে নিয়ে এসে আফো বাজারে কুঁড়েঘরে ওকে আচ্ছা করে চাবকেছিল। ও নিজের মনে মাথা নাড়ল। আবার মনে পড়ল - এই তো সেই ভবঘুরে, যে হাইওয়ের মাঝখানে ট্রাক থেকে নেমে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সে আবার মাথা নাড়ল। তারপর আবার মনে পড়ল - এই তো সেই লোক, যে নিজের ছেলেমেয়েদের দিয়ে আমার দিকে ঢিল ছুঁড়িয়েছিল, ওদের মায়েদের পৃথুল পাছা নিয়ে মন্তব্য করিয়েছিল। তবে আমার মা'কে নিয়ে কখনই ওরা কিছু বলেনি। পাগলটা হো-হো করে হেসে উঠল।

লুইবে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল আর নগ্ন লোকটাকে হাসতে দেখল। ঝর্ণার গভীর গিরিখাতে ওর হাসির প্রতিধ্বনি। তারপর লোকটা যেমন হঠাৎ হাসতে শুরু করেছিল, তেমনই হঠাৎ থেমে গেল। তার মুখ থেকে হাসি কোথায় উবে গেল।

"আমি তোকে নগ্ন অবস্থায় ধরে ফেলেছি," ও বলল।

লুইবে দ্রুত তার মুখে হাত বুলিয়ে চোখ থেকে জল সরাল।

"আমি বলছি, আমি তোকে নগ্ন অবস্থায় ধরেছি, তোর ওটা লেপটে আছে কেমন!"

"দেখছি তুই চাবুক খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিস," লুইবে ধীরে কিন্তু হুমকির সুরে বলল।

"কখনও কোথাও শুনেছিল পাগলরা চাবুকের নামে ভয় পায়।"

"দাঁড়া, আমি ওপরে উঠলেই... কী করছিস? ওগুলো রেখে দে, রাখ বলছি এক্ষুণি... আমি বলছি, রেখে দে!"

পাগলটা লুইবে-র কাপড় তুলে নিয়ে নিজের কোমরের চারপাশে জড়িয়ে নিল। আর নিজের দিকে তাকিয়ে আবার হাসতে শুরু করল।

"আমি তোকে মেরে ফেলব," চিৎকার করে উঠল লুইবে। রাগে পাগল হয়ে পাড়ে উঠতে গেল।

"আজ তোকে এমন মার দেব, এই পাগলামি ছুটে যাবে একেবারে!"

ওরা দু'জনে ছুটে চলেছিল খাড়া ও পাথুরে শাখাপথ বেয়ে ওপরে, সবুজ জঙ্গলে ঘেরা ছায়াপথ ধরে। কুয়াশায় লুইবের চোখ ঢেকে গেল। সে দৌড়চ্ছিল, হোঁচট খাচ্ছিল, পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছিল, আবারও হোঁচট খেতে খেতে দৌড়চ্ছিল, চিৎকার করছিল আর গালাগালি দিচ্ছিল। অন্য লোকটি, যদিও সে এমন বোঝা বহনে অভ্যন্ত ছিল না, তবু ধীরে ধীরে ব্যবধান বাড়িয়ে চলেছিল। সে ছিল কৃশ, দড়ির মতো - দৌড়নোর জন্য অভ্যস্ত।

"আমাদের ওপর এত দোষ দিও না," বলল লুইবের এক আত্মীয়।

"যেদিন সকালে ও ঘর ছাড়ল, তখন ওর বুদ্ধি একদম ঠিকঠাক ছিল, যেমন এখন আমাদের আছে। আমাদের ওপর এত দোষ দিও না।"

"হ্যাঁ, আমি জানি। মাঝে মাঝে এমনটা হয়। আর ওরাই সেই মানুষ, যাদের কাছে ওষুধ পৌঁছয় না। আমি জানি।"

"তাহলে তুমি কিছুই করতে পারবে না? এমনকি জড়ানো জিভও খুলতে পারবে না?"

"কিছুই করা যাবে না। তারা এরমধ্যেই ওকে আসন করে নিয়েছে। এটা ঠিক সেই লোকটার মতো, যে তার লোকজনের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে যায় অলুসির বলে, আর বলে: 'আমায় গ্রহণ কর, হে আত্মা, আমি তোমার ওসু।' এরপর আর কেউ ওকে ছুঁতে পারে না। ও মানুষের হাত থেকে মুক্ত, কিন্তু দেবতার কাছে বাঁধা। ওর আর মুক্তি নেই।"

দ্বিতীয় চিকিৎসক প্রথমজনের মতো বিখ্যাত ছিল না ঠিকই, তবে ততটা কঠোরও না। সে বলেছিল, রোগটা খারাপ, খুবই খারাপ। তবে সন্তানের অবস্থা আশাহীন বলে কেউ কি শুধু হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? না, চেষ্টা চালিয়ে যাবে? আঁধারে হাতড়ে হলেও কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। শ্রোতারা সাগ্রহে মাথা নাড়ল। যেন সহমত। আর তখন সে আপনমনেই বিড়বিড় করল: "যদি প্রত্যেক ডাক্তার আরোগ্য নিশ্চিত নয় জেনে সব রোগীকে ফিরিয়ে দিত তবে সপ্তাহ জুড়ে একবেলাও কি তাদের খাবার জুটত?"

লুইবে সুস্থ হয়ে উঠেছিল। যে সাধারণ চিকিৎসক এই অলৌকিক চিকিৎসা করেছিল, সে রাতারাতি তার প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাগলের ডাক্তার হয়ে উঠল। সবাই ওকে ডাকতে লাগল 'আত্মার দেশের যাত্রী' বলে। তবে সত্যি কথা এই যে, পাগলামি কখনও কখনও সেরে যায় ঠিকই, কিন্তু কিছু পদচিহ্ন রেখে যায়। তোমরা একে বলতে পারো পাগলামির ছায়া যা থেকে যায় চোখের সামনে, চুপচাপ হানাহানি করে শুধু। একজন মানুষ কখনও কি আর আগের মতো হতে পারে? লুইবোর সম্পর্কে একসময় ওলু এবং ইগবোর সমস্ত অঞ্চলের মানুষ সাক্ষ্য দিয়েছিল: "আজ আমরা দেখেছি একজন সুদর্শন, শক্তিশালী পুরুষ, ভরা যৌবনে, সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে জনতার মাঝখান দিয়ে দৌড়ে চলেছে, হাটের ডাকে সাড়া দিতে!” এমন একজন মানুষ চিরকালের জন্য চিহ্নিত হয়ে যায়।

লুইবে ক্রমশ হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ, গুটিয়ে থাকা মানুষ। সবসময় উল্লাসমুখর জীবন এড়িয়ে চলার চেষ্টা। দু'বছর পর, আরেক দীক্ষা মরসুমের আগে, ও আবার খোঁজ নিয়েছিল, যদি দীক্ষা নিয়ে সে তার শহরের অভিজাত, খেতাবধারী পুরুষদের সমাজে যোগ দিতে পারে। ওরা যদি লুইবেকে গ্রহণ করত, হয়ত সে কিছুটা হলেও নিজেকে ফিরে পেত। কিন্তু সেই অভিজাত ওজো-পুরুষরা, যথারীতি মার্জিত ও ভদ্র, নিপুণভাবে আলোচনার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিল।


চিনুয়া আচেবে (ঔপন্যাসিক ও কবি, নাইজেরিয়া।)


(ভাষান্তরঃ গৌতম চক্রবর্তী)