বিবিধ

কৃষ্ণনগরে কাজী (ঊনত্রিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



ইনাস উদ্দীন


[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ২৯

- কাজী কোথায়? ঘরে আছো নাকি?

হেমন্তদার গলা। দোলন টেবিলে চায়ের কাপটি রেখে সশব্যস্ত হয়ে বারান্দার ধাপির দিকে এগিয়ে গেল।

- আসুন দাদা!

ঝলমলে মিষ্টি সকাল। শীতের সেই দাপট আর নেই। সকালের রোদ্দুরের গায়ে কেউ যেন মাখনের মতো মোলায়েম হিম মাখিয়ে রেখেছে। কাঁধের উপর একটা হালকা চাদর ফেলে রাখলেই যথেষ্ট। একেই হয়তো বসন্তের আভাস বলে। জ্ঞান সরকারের এই বাড়িতে ভিতরের প্রশস্ত উঠোনে সকালের রোদ ঢুকতে পারে না, অনেকটা বেলা পর্যন্ত সেখানে বাতাসে হিমের পরশ লেগে থাকে। কিন্তু বারান্দার পাশে গোলাপট্টির মদন সরকার লেনে ফালি রোদ্দুর যেন রাস্তার উপর সোনার জরি বসানো জাজিম বিছিয়ে দেয়। খড়খড়ির জানালাটা খুলে দিলে সোনালী আভায় বারান্দাটা যেন কলাবউয়ের মতো ঘোমটা খুলে কচি কলাপাতা দোলাতে থাকে। নজরুলের ঘুমের ঘোর না কাটলেও দোলন ইচ্ছে করে তাঁকে ডেকে তুলে আনে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসে এই ঝলমলে সোনালী সকালটা দুইজনে একসঙ্গে বসে উপভোগ করে নিতে চায়। চঞ্চলা কিশোরীর মত মিঠে রোদটুকু খানিক পরেই তো কড়া মেজাজী হয়ে উঠবে। হাসিখুশি কিশোরীটি কখন নিজের অজান্তে কেজো আর সংসারী হয়ে উঠবে। নজরুলকে কেউ না কেউ ডেকে নিয়ে যাবে, সারাদিন দেখা মিলবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই। রাতেও যে ঘরে ফিরবে তারও ভরসা নেই।

উনুনে কাঠ জ্বালিয়ে সকালের চা'টা দোলন নিজের হাতেই বানায়। গাঢ় দুধের চা। গিরিবালা দেবী নিজের মতো উঠোনে খুটখাট করেন। এককোণে একটা তুলসীতলা আগে থেকেই ছিল। সেটা পেয়ে তিনি খুব খুশি। কাদামাটি দিয়ে সেটাকে ঝকঝকে সুন্দর করে নিয়েছেন। নতুন চারা বসিয়েছেন সেখানে। জলের ছড়া দিয়ে গোপালের সামনে এসে চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ বিড়বিড় করে ইস্টনাম জপ করেন। হয়তো অনিশ্চিত জীবনের যন্ত্রণা লাঘবের জন্য নিত্যদিন একই প্রার্থনা করেন - মেয়েটা যেন ভালো থাকে। দেয়ালে কুলঙ্গির মতো একটা বাতি রাখার তাক আছে। সেখানে কান্দিরপাড় থেকে সঙ্গে রাখা গোপালের বাঁধানো ছবিটা সযত্নে সাজিয়ে রেখেছেন। পরে ধীরেসুস্থে উনুনে কয়লা সাজাবেন। বেলা হলে হাবির মা আসে।

- বাঃ, বেশ ভালো সময়েই এসে পড়েছি।

খানিকটা যেন সলজ্জ ভঙ্গিতে দোলন বলে উঠল, 'দাদা, কথা বলুন, আমি এখনি চা নিয়ে আসছি।'

- আরে না না! বোসো বোসো। চা খেয়েই বেরিয়েছি, অত তাড়া নেই। তা কাজীর শরীর কেমন আছে? নগেন ডাক্তারের ওষুধে ফল হচ্ছে তো?

হেমন্ত সরকারের গলা শুনেই গিরিবালা দেবী বেরিয়ে এসেছেন। হয়ত পাশের ঘরেই ছিলেন।

- যাই বলো বাবা, নগেন ডাক্তারের ওষুধ কিন্তু খুব কাজের। কিন্তু নিয়ম করে না খেলে সে ওষুধে কাজ কী করে হবে বলো দেখি বাছা! খাওয়া শোওয়া বিশ্রাম কোনো কিছুরই তো ঠিক নেই।

মাসিমার কথায় ঈষৎ বিব্রত নজরুল বললেন, না দাদা। এখন তো ভালোই আছি। সম্মেলনের কদিন কিছুটা অনিয়ম হয়েছিল ঠিকই, এখন ঠিক আছে।

গিরিবালা দেবী নজরুলকে শুনিয়ে শুনিয়েই বললেন, ঐ কথাটাই ভালো করে বুঝিয়ে দাও বাপু!

- হ্যাঁ, একটু যত্ন নিয়ে ওষুধপত্র খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নাও। হেমন্ত সরকার বললেন। হাতে এখনো ক'দিন সময় আছে। ৬ তারিখে দিনাজপুরে প্রজা সম্মেলন, তারপর ১০ মার্চ মাদারীপুর যেতে হবে, ধীবরদের রাজ্য সম্মেলন। তোমাকে তো থাকতেই হবে। সদ্য সদ্য অনেক ঝুঁকি নিয়ে নতুন দল ঘোষণা করা হয়ে গিয়েছে, মানুষের কাছে যতটা পারা যায় পৌঁছাতে হবে তো।

- সে তো অবশ্যই। আমিও তো যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি।

কথার এক ফাঁকে দোলন চা বসাতে চলে গিয়েছে। গিরিবালা দেবী নজরুলের খুব বেশি ছুটোছুটি করার মতো সুস্থতা এখনো আসেনি সেটা জানিয়ে আরেকবার উল্লেখ করে দিয়ে গেলেন। তার আগে সংসারে বিশেষ অসুবিধে হচ্ছে কিনা সেই প্রশ্নের উত্তরে হেমন্ত কুমারের ব্যবস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করে গেলেন। শিবেন তো প্রতিদিন দু'বেলা খবর নিয়ে যায়। যতই ধারবাকি থাক, শিবেন গিয়ে খবর দিলেই তারকদাসের ভাণ্ডার থেকে কেউ না কেউ চাল আর কয়লা পৌঁছে দিয়ে যায়। হেমন্ত সরকারেরও একটা স্বস্তি হলো। অনেক ভরসা দিয়ে, দায়দায়িত্ব নিয়ে নজরুলকে তিনি কৃষ্ণনগরে এনেছেন। নগেন ডাক্তারের উপর তাঁর নিজের যথেষ্ট আস্থা ছিল। সেটাও কাজে লেগেছে। নিজের খামখেয়ালিপনা না থাকলে কাজী এতোদিনে অনেক সুস্থ হয়ে যেতো। এদিকে নতুন দল তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই সংকটময় টালমাটাল পরিস্থিতিতে। গিরিবালা দেবী চলে যাবার পরে হেমন্ত সরকার নজরুলের সঙ্গে সম্মেলনের আলোচনায় বসলেন।

গত কয়েক বছর প্রজা সম্মেলনের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। কৃষক প্রজাদের সামনে নিজেদের তুলে ধরার জন্য জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ সবাই নানাভাবে ফাঁকফোকর খুঁজে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফজলুল হক সাহেব ইতিমধ্যেই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সাধারণ প্রজা সমাজে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন, সারা বাংলা চষে বেড়াচ্ছেন। রায় বাহাদুর, নবাব, জমিদার শ্রেণিকেও তিনি নাড়িয়ে দিয়েছেন। কৃষক প্রজা সমাজে এই জাগরণের হাওয়াকে কাজে লাগাতে হবে। কংগ্রেস বা লীগ যাই করুক, তাদের নেতারা নিজ নিজ ক্ষমতা ভাগাভাগিতে লিপ্ত। সাধারণ কৃষক-শ্রমিকদের ভিতর ক্ষমতায়ণের বোধ সৃষ্টি হোক - সেটি তারা কেউই চায়না৷ এই দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। দিনাজপুরের সম্মেলনে উত্তরবঙ্গের বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধিরা থাকবেন। এর ভিতরে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মাদারীপুরের ধীবর সম্মেলন। আসাম এবং পুরো বঙ্গপ্রদেশের জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে জড়ো হবেন - এটা একটা বড়ো ঘটনা।

- এর মধ্যে একদিন কলকাতা যেতে হবে দাদা। কতদিন পত্র-পত্রিকা গুলোর সাথে যোগাযোগ নাই। লাঙলের অফিসেও একবার যাওয়া দরকার। এলবার্ট হলে সাহায্য রজনীর কিরকম অবস্থা?

কৃষ্ণনগরে ওয়ার্কার্স এন্ড পীজ্যান্ট পার্টির সিদ্ধান্ত নেবার সময়েই স্থির হয়েছিল, পার্টির তহবিলের জন্য এলবার্ট হলে টিকিট কেটে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। আয়োজনের ব্যবস্থাও মোটামুটি সম্পন্ন। কিন্তু সেটাও ধার্য হয়েছে মার্চের ৬ তারিখে। হেমন্ত সরকার দোটানায় পড়া চিন্তিত স্বরেই বললেন - পার্টির জন্য সাহায্য রজনীর অনুষ্ঠান হবে, সেখানে তোমার আমার দুজনেরই উপস্থিত থাকা কর্তব্য। বিশেষ করে তুমি না থাকলে পাবলিকের অর্ধেক আকর্ষণই কমে যায়। কিন্তু দিনাজপুরের সম্মেলনটা যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ। এতো বড়ো সমাবেশের সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে। যাইহোক, সৌমেন ঠাকুর দায়িত্ব নিয়ে অনেকটাই ব্যবস্থা করে ফেলেছে। মণিকা ঠাকুরের উপস্থিতিও পাকা করে ফেলেছে।

- মণিকা ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়েছে? সৌমেন ঠাকুরের কাছে যা শুনেছি, তিনি বেশ উচ্চ মানের গুণী মানুষ। ঠাকুর পরিবারের আরেক রত্ন। কিন্তু কলকাতার লোক তাঁকে ঠিকঠাক চেনেনা এখনো।

- আমার সঙ্গেও তো এই প্রথম দেখা হলো। বেশিরভাগ সময় বিদেশে কাটান। এখন কলকাতায় আছেন। তবে ভালো লাগল যে আমাদের ভাবধারার প্রতি তাঁর একটা শ্রদ্ধা আছে। একজন জার্মান মহিলার নৃত্য পরিবেশনের ব্যবস্থা করছেন উনি।

- তাহলে তো বেশ ভালোই অনুষ্ঠান হবে মনে হচ্ছে। নজরুলের কণ্ঠে একটা উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। হেমন্ত সরকার মনে করিয়ে দিলেন - কলকাতা গেলে যাও। মনে রেখো ৫ তারিখ বিকেলে বগুলা থেকে দিনাজপুরে যাওয়ার ট্রেনে উঠব।

নজরুল সেকথা ভালোই মনে রেখেছিলেন, আশপাশের বন্ধুদের জানিয়েও দিলেন। ঢাকায় আনওয়ার হোসেনকে চিঠি লেখার সময়ও লিখলেন যে ৬ তারিখে দিনাজপুরে যাচ্ছি। কিন্তু কলকাতা যাবার পরে সেকথা মন থেকে হারিয়ে গেল - ৬ তারিখ নজরুলকে দেখা গেল কলেজ স্ট্রিটের এলবার্ট হলে।

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বেরিয়ে নজরুল হ্যারিসন রোড দিয়ে লাঙলের অফিসে যাবার পথে কী মনে হলো পটুয়াটোলা লেনে ঢুকে পড়লেন - কল্লোল অফিসের দিকে। কীসব দিনই না গিয়েছে! 'বিদ্রোহী' প্রকাশের পর তরুণ সাহিত্য সমাজে তাঁকে নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ার মতো হৈচৈ। তার মধ্যে মনের মতো জায়গা পেয়ে গেলেন এই পটুয়াটোলা লেনে দীনেশরঞ্জনের বাড়ি - আর সে বাড়িতে গোকুল নাগের মতো মহৎপ্রাণ এক অকৃত্রিম বন্ধু। 'কল্লোল' ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছে, রাবীন্দ্রিক পরিমণ্ডলে হঠাৎই যেন এক অন্যরকম সুর - অথচ কোথাও কাউকে অশ্রদ্ধা নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর মনন এবং মানসিকতার প্রতি বিদ্রোহ করাকে স্বাগত জানিয়েছেন, লিখছেন সেখানে। আর সবাইকে ছাপিয়ে গেল হুল্লোড়! গোকুল নাগ আর দীনেশের জুটি তো আছেই, সঙ্গে আছে বন্ধু শৈলজানন্দ, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, প্রেমেন মিত্রের মতো সব হুল্লোড়বাজ। তাছাড়া অন্যতম বড়ো ব্যাপার - কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় যেখানে পত্রিকা বা প্রকাশনার অফিস করতে একটা খুপরি পাওয়া দুষ্কর, সেখানে বিনে পয়সায় বাড়ির পরিবেশে দুইখানা ঘর - তদুপরি সেখানে চীৎকার চেঁচামেচি গানবাজনা করতে বাড়ির লোকদের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই - হুল্লোড় না জমে পারে!

কতদিন! দেখতে গেলে তিন বছর! সেই জেলে বন্দী হবার কাল থেকেই সেই অনাবিল আড্ডার স্বাদ থেকে নজরুল বঞ্চিত। পুরনো স্মৃতিগুলো যেমন উদ্দীপিত করছিল, তেমনই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল - গোকুল নাগই তো নেই। বেশি ভালো লাগার মানুষগুলোই যেন তার কাছ থেকে দ্রুত দূরে চলে যায়। তার নিজের জীবনে বিধাতা যেন একটু বেশিই নিষ্ঠুর!

'আরে! কাজী যে! দে গরুর গা ধুইয়ে!' উচ্ছ্বসিত দীনেশরঞ্জন তিন হাত লাফ দিয়ে দরজায় আবির্ভূত নজরুলকে জড়িয়ে ধরলেন। পিছন পিছন উঠে এসেছেন শৈলজানন্দ - তুমি অনেকদিন বাঁঁচবে কাজী! কালকেই তোমাকে নিয়ে অনেক কথা হচ্ছিল।

- আমাকে নিয়ে? আমি তো ভাই একপ্রকার নির্বাসনে পড়ে আছি।

- সেটাই তো কথা। মুরলী বলছিল, কাজী মনে হচ্ছে কলম ছেড়ে রাজনীতির পাঁকে ডুব দিয়ে ফেলল। লাঙলে লেখাপত্র দেখছি বটে কিছু, কিন্তু আগের নজরুলকে আর দেখতে পাচ্ছি না।

- কোনোকিছুই আর আগের মতো থাকে না ভাই। তাছাড়া আমার জীবন-দেবী বড্ডই চঞ্চলা। মুরলীদা ঠিকই বলেছেন। আমার লেখা বিস্তর কমেছে, দেশ-কাল রাজনীতির চক্করে কাব্যলক্ষ্মী চঞ্চলা হয়ে উঠেছেন, সুন্দরের দেবীও যেন বিমুখ। আর দেহ-দেবতার হাল তো দেখতেই পাচ্ছ। যাইহোক, শৈলজা, তুমি কিন্তু ভাই আগের মতোই আছো! সেই রাণীগঞ্জ-সিয়ারসোলে যেমন ছিলে।

বলতে বলতে শৈলজানন্দের পিঠে চাপড় দিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন নজরুল।

দীনেশরঞ্জন বললেন, এই তো আগের কাজী ফিরে এসেছে। বরং আগে গান শুনি, অন্য কথা পরে হবে।

গোকুল নাগের কথা বেশি করে মনে পড়ছিল। কিন্তু সেকথা উঠলে পরিবেশটা বিষণ্ণ হয়ে যাবে। এই ঘরে নজরুল টেবিল বাজিয়ে কত গান গেয়েছেন। গোকুল আর মুরলীদাই গানের ব্যাপারে ছিল বেশি উৎসাহী। একের পর এক রবীন্দ্রনাথের গান।

- আচ্ছা, মুরলীদা আসবে না?

- তুমি গান শুরু করো, ওরা ঠিক চলে আসবে, সময় হয়ে এসেছে।

আমার সকল দুখের প্রদীপ, জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন - চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট মনে নজরুল গেয়ে চলেছেন। বন্ধ চোখের পর্দায় জীবন্ত ভেসে উঠছে - ঠিক পাশেই বসে গোকুল নাগ মাথা দুলিয়ে টেবিলে টোকা দিয়ে তাল দিয়ে চলেছে - এই গানটি গোকুলের বড্ড প্রিয় ছিল।

গান শেষ না হতেই দরজায় যুগল মূর্তির আবির্ভাব - মুরলীধর বসু এবং প্রেমেন্দ্র মিত্র। নজরুল চেয়ার ছেড়ে উঠে আনন্দে হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে গাইতে থাকলেন - আমার ব্যথার পূজা হবে সমাপন!

মুরলীধর এসে জড়িয়ে ধরলেন নজরুলকে, তোমার কথাই ক'দিন ধরে ভাবছিলাম হে কাজী!

- তা তোমরা ভাববে না তো আমার কথা কে ভাববে বলো! নজরুল নিজস্ব ঢঙে মজা করে হেসে উঠলেন। ঘরের মধ্যে চেয়ার টানাটানি, কাঁধের ঝোলা রাখা ইত্যাদির ফাঁকেই মুরলীধর একটু সিরিয়াস ভঙ্গিতে অনুচ্চস্বরে বললেন, সত্যিই ভাবছিলাম, তোমাকে পরে বলব।

অনেকদিনের পরে জমিয়ে আড্ডা হলো, গান হলো। নজরুলের লেখার ধরণে পরিবর্তন, লেখা কমে যাওয়া ইত্যাদি কথাবার্তার পাশাপাশি সাম্যবাদীর কবিতাগুচ্ছ নিয়ে উচ্ছ্বাসের প্রকাশও হলো। প্রেমেন্দ্র মিত্রের আবেগ ও উচ্ছ্বাস সবাইকে ছাপিয়ে গেল - ওহ! কী লিখলে কাজী! আমি তো দু'রাত ঘুমাতেই পারিনি! 'পরোয়া করিনা বাঁচি বা না বাঁচি, যুগের হুজুগ কেটে গেলে/ মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে' - এরকম স্পষ্ট এবং সৎ উচ্চারণ নজরুল ছাড়া আর কে করতে পারে? এতো আমার মনেরই কথা! অমর কাব্য লিখে কী হবে, যে কবিতার কথা কলকেতার বাবু-বিবিরা ছাড়া মাঠেঘাটে খেটে খাওয়া মানুষকে স্পর্শ করেনা।

সন্ধ্যা নেমে এলে নজরুল উঠলেন - লাঙলের অফিসে যেতে হবে ভাই। অনেক কাজ বাকি। মণিদা, মুজফফর সাহেব আর সৌমেন ঠাকুর সব সামলাচ্ছেন। বিদায় নিয়ে বেরোনোর সময় মুরলীধরও পথে বেরিয়ে এলেন। হ্যারিসন রোডে ওঠার মুখে হারাধনের ব্যস্ত চায়ের দোকান। চলো এক কাপ হয়ে যাক বলে বেঞ্চিতে বসে নজরুলকে অবাক করে দিয়ে মুরলীধর বললেন - কাজী, ভাবছি একটা নতুন কাগজ করব।

নজরুল কিছু একটা আঁচ করে খানিক থম মেরে থাকলেন। বললেন, একটু খুলে বলো।

- দীনেশরঞ্জনের সাথে মাঝে মাঝেই মতভেদ ঘটছে। কল্লোল ইতিমধ্যেই একটা সাড়া ফেলেছে তাতে সন্দেহ নাই। সজনীকান্তরা যতই পিছনে লাগুক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও এই তারুণ্যের অবাধ্যতার দ্রোহকে স্বীকার করে নিয়েছেন, নিজেও লিখছেন। এখনই সময়, কল্লোলকে আরেকটু কমার্শিয়াল জায়গায় নিয়ে যাওয়া সহজ, দরকারও বটে। স্পনসর নিয়ে বই প্রকাশ করা কল্লোলের পক্ষে এখন জটিল কিছু নয়, কিন্তু দীনেশ নীতিতে অনড় - প্রকাশনায় যাব না।

- তা কিরকম ভেবেছ?

- মোটামুটি স্থির করে ফেলেছি। শৈলজা এবং প্রেমেনও আছে। কল্লোল যেমন আছে থাকুক, আমাদের কোনো বিরোধ নেই, পাশাপাশি একটা নামও ঠিক হয়েছে - কালিকলম।

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।