বিবিধ

শত শতাব্দীর জাদুবিদ্যা (ত্রয়োবিংশ পর্ব)



জাদুকর শ্যামল কুমার


আজকের জাদুবিদ্যা

জাদুর সূর্যগ্রহণ

পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে ষাটের দশকের শুরুর দিকে জাদুবিদ্যার শিল্প যেন এক আংশিক সূর্যগ্রহণের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক মন্দা, বিশ্বযুদ্ধ এবং বাস্তববাদের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ - এই সব মিলিয়ে জাদুবিদ্যা যেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।

একসময় যে শিল্প ছিল বিস্ময়ের, আনন্দের ও স্বপ্নের - সেই জাদু তখন ধুলো জমা অতীতের খেলনায় পরিণত হয়।

রেডিও এবং টেলিভিশনের মতো নতুন বিনোদনের আগমনে জনসাধারণের মনোযোগ সরে যায়। এক সময় যিনি তাঁর সাহস, অভিনবত্ব ও শৈল্পিক উপস্থাপনায় দর্শকদের মুগ্ধ করতেন, সেই সুশ্রী জাদুকরেরা আর বিনোদনের অংশ নন। যদিও পেশাদার ও অপেশাদার জাদুকরদের একটি নিবেদিত দল, যারা বিভিন্ন জাদু-সমিতির সদস্য ছিলেন, তাঁরা শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন - তবুও সাধারণ মানুষের আগ্রহ অনেকটাই নিভে গিয়েছিল।

এরপর এলো নবজাগরণের আলো

তাই সময়ের প্রবাহে জাদুবিদ্যার আকাশে আবারও নতুন আলোর উদ্ভাস ঘটেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা দিয়েছে এক নবজাগরণ, যার অন্যতম অজানা ও অলৌকিকতার প্রতি নবীনদের কৌতূহল।

প্রকৃত জাদুকর নিজেকে কখনও মরমি বা অলৌকিক শক্তির অধিকারী বলে দাবি করেন না, কিন্তু তিনি স্পর্শ করেন মানবমনের সেই গভীরতম আকাঙ্ক্ষাকে। অজানার প্রতি টান, রহস্য, অব্যাখ্যাতকে উপলব্ধির বিস্ময়, আর মুগ্ধতার আনন্দ।

তাই আবার এই বিস্ময়ের শিল্প আবারও তার প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পেলো। আজকের দিনে জাদুবিদ্যা হয়ে উঠেছে নতুন সৌন্দর্য ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক।

জাদুর রূপ ও রস

আজকের জাদু শুধুই কৌশলের প্রদর্শনী নয় - এ এক সম্পূর্ণ শিল্পরূপ। এর মধ্যে আছে - সৃজনশীলতার কোমলতা, নাটকীয়তার ছন্দ, রসিকতার আনন্দ, নৃত্যের গতি, রহস্যের উত্তেজনা, সূক্ষ্ম ইঙ্গিত ও রঙিন উপকরণের সৌন্দর্য।

এই সমস্ত উপাদান একত্রে জাদুবিদ্যাকে আবারও এনে দিয়েছে তার হারানো সম্মান ও মর্যাদা।

আধুনিক যুগের নক্ষত্র

আজকের জাদু-আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন হলেন কানাডিয়ান জাদুকর ও অভিনেতা Doug Henning (১৯৪৭-২০০০)

তাঁর অসাধারণ সংগীতনাট্য 'দি ম্যাজিক শো' ব্রডওয়েতে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চস্থ হয়েছে। তাঁর এই কৃতিত্ব শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জয় নয় - এটি আধুনিক জাদুবিদ্যার পুনর্জাগরণের এক জ্বলন্ত প্রতীক।

ডগ হেনিং-এর এই অর্জন আজকের যুগে জাদুবিদ্যার প্রতি মানুষের নবীন আগ্রহ ও প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাসেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

জাদুবিদ্যা আজ আর অতীতের ধুলোমাখা স্মৃতি নয়। এটি ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ, নতুন রূপ, নতুন দর্শন।

যে শিল্প একদিন বিস্মৃতির পথে হারিয়ে যাচ্ছিল, আজ সেটিই আবার হয়ে উঠেছে আনন্দ, রহস্য ও কল্পনার এক দীপ্ত প্রতীক।

জাদুর নতুন দিগন্তঃ অনুপ্রেরণার নাম ডগ হেনিং

ই. এল. ডক্টরোর বিখ্যাত উপন্যাস 'র‍্যাগটাইম'-এ আবার জীবন্ত হয়ে ওঠা মহান জাদুকর হুডিনি (Houdini) আজও জনমানসে এক বিস্ময়। তাঁরই ধারাবাহিকতায়, আজকের যুগে জাদুর জগৎ আবার ফিরে পাচ্ছে তার হারানো গৌরব ও মর্যাদা।

আজ বৈধ জাদু (Legitimate Magic) নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে - টেলিভিশনের অবাস্তব কল্পকাহিনি ও বিজ্ঞাপনের বাইরে এসে বাস্তবতার মঞ্চে জাদু ছড়াচ্ছে নতুন আলো। বিভিন্ন জাদু সংগঠনে সদস্যপদ বেড়েছে, সম্মেলনে দর্শকের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে, আর জাদু সামগ্রী বিক্রেতারাও আজ ব্যস্ততম সময় কাটাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের তরুণ জাদুকররা নিজেদের মৌলিক শৈলী ও অভিনব পরিবেশনা নিয়ে আলোচনায় আসছেন। বলা চলে - জাদুর মান ও পরিধি আজ তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে।

প্রত্যেক জাদুকরেরই প্রয়োজন হয় এক স্বতন্ত্র পরিবেশ ও ব্যক্তিত্ব, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।

এরই উজ্জ্বল উদাহরণ ছিলেন ডগ হেনিং। তাঁর জাদুতে শুধু হাতের নিপুণতা নয় - আছে শিশুসুলভ বিস্ময়, সরলতা ও আনন্দের ছোঁয়া। যখনই কোনো জটিল কৌশল সফল হয়, তিনি নিজেই সেই সাফল্যে অভিভূত হন, হাসেন, চমকে ওঠেন - যেন দর্শকদেরই একজন। এই আন্তরিকতা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি কখনও নিজের দক্ষতা প্রদর্শনের অহংকার দেখান না; বরং তাঁর চোখে-মুখে খেলে যায় আশ্চর্যের আলো, সরল বিস্ময় এবং আনন্দের ছায়া।

তাঁর এই বিনয়ী ও মানবিক উপস্থিতির আড়ালে লুকিয়ে আছে অনন্য কারিগরি দক্ষতা। তিনি শুধু একজন জাদুকর নন - বরং আধুনিক যুগের অন্যতম উজ্জ্বল মঞ্চশিল্পী, যিনি জাদুকে এক নতুন মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন।

আজ জাদু শুধু মঞ্চেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দাতব্য অনুষ্ঠান, কলেজ অডিটোরিয়াম, ক্লাব, টেলিভিশন ও কর্পোরেট ইভেন্টে জাদু পরিবেশিত হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে - ক্লোজ-আপ ম্যাজিক, প্যান্টোমাইম, মেন্টালিজম, এমনকি পায়রা ও সিল্কের রুমাল, ওড়না ইত্যাদি নিয়ে পরিবেশিত রোমাঞ্চকর মঞ্চজাদুও। আধুনিক জাদুকরেরা জটিল যান্ত্রিক উপকরণের বদলে হাতের নিপুণতা, মনোযোগ ও কৌশলেই বিশ্বাস রাখছেন - যা সত্যিকার অর্থেই জাদুর শিল্পকে পরিপূর্ণতা দেয়।

এই ধারার অন্যতম আরেকজন মহান শিল্পী Albert Goshman (১৯২০-১৯৯১) তিনি প্রায়ই টেলিভিশনে ম্যাজিক দেখাতেন, যেখানে দুইজন দর্শক তাঁর পাশে বসে থাকতেন। তাঁর জাদুতে ছিল না বড়সড় মঞ্চসজ্জা বা গোপন যন্ত্র, বরং রসিকতা, কথার মাধুরী ও চিত্তাকর্ষক ব্যক্তিত্ব - যা দর্শকদের সম্পূর্ণভাবে মুগ্ধ করে দিতো।

আজকের দিনে ডগ হেনিং ও আলবার্ট গশম্যানের মতো জাদুকররা প্রমাণ করেছেন - "জাদু মানে শুধু হাতের কারসাজি নয়, এটা মনের শিল্প। বিস্ময়, কল্পনা ও আনন্দের এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা।"

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।