প্রাচীনকাল থেকে তন্ত্র এবং বেদের উপাসনা পদ্ধতি এদেশে প্রচলিত ছিল। সেই সময় থেকে মানুষ শক্তি পূজা করে থাকতো। যদিও আর্য যুগে 'পুরুষ দেবতা'ই প্রধান আরাধ্য ছিল। পরবর্তীতে মানুষ শক্তির উৎস হিসেবে দেবীকে মেনে নিত, এই হিসাবে মাতৃশক্তির আরাধনা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ নিজস্ব চিন্তা ও চেতনা, রুচি ও সংস্কারের মাধ্যমে দেবদেবীর পূজা করে থাকেন।

কথামৃতে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব কালী সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, "যাঁর নিত্য তাঁরই লীলা। যিনি ব্রহ্ম তিনি কালী" (মা আদ্যা শক্তি)। তিনি বলেনঃ "নিত্য আর লীলা আলাদা নয়, ব্রহ্ম আর কালী এক। কালই হচ্ছেন ব্রহ্মের শক্তি। শক্তি আর শক্তিমান অভেদ।" বলছেনঃ "জল আর জলের হিমশক্তি, অগ্নি আর দাহিকা শক্তি। দুধ আর দুধের ধবলত্ব...। একটাকে ভাবলেই আর একটাকে ভাবতে হয়। যখন নিষ্ক্রিয় তাঁকে ব্রহ্ম বলি। যখন সৃষ্টি, স্থিতি প্রলয় এইসব কাজ করেন তাঁকে শক্তি বলি।"
বস্তুত, আদ্যাশক্তি ব্রহ্মময়ী নানান রূপের মধ্যে, কালী রূপ বাঙালির একান্ত প্রিয়। প্রায় সারা বছরেই পূজা চলতে থাকে। তবে কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় যে কালী পূজা হয় - সেটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ কালীপূজা। তন্ত্রোক্ত উগ্রকালী, চামুণ্ডা কালী, দক্ষিণা কালী, বামা কালী, সিদ্ধ কালী, রক্ষাকালী এই বিভিন্ন ভাবে, শ্রেণীতে বিভক্ত আছে কালী পূজা। শ্যামা কালী অনেকটা কোমল ভাব - বরাভয়দায়িনী গৃহস্থ বাড়িতে তাঁরই পূজা হয়।

মা সারদার জীবনীতে পাই, ১৮৫৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর জয়রামবাটী নামক একটি গ্রামে কৃষ্ণসপ্তমী তিথিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবী।
বিভিন্ন পুস্তক পড়ে শ্রীমায়ের অনেক অলৌকিক চরিত্র সম্বন্ধে জানা যায় যা থেকে মা'কে অতিমানব পর্যায়ের বলে মনে হয়। সারদাদেবীর মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবীর জীবনের একটি অলৌকিক ঘটনা। স্বামী কাজের জন্য শ্রীহড়ে গেছেন। শ্যামাসুন্দরী দেবী বাপের বাড়িতে একা। জয়রামবাটীর কাছে শ্রীহড়ে তাঁর বাপের বাড়ি। একদিন অন্যান্য গ্রাম্য বধূদের সঙ্গে পুকুর পাড়ে শৌচে গেছেন। একটু অসুস্থ ছিলেন। প্রায় সংজ্ঞাহীন, এমন অবস্থায় কুমোরদের পোয়ানের শব্দে হঠাৎ সচকিত হয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন - এক রক্তবস্ত্র পরিহিতা অপরূপ বালিকা তাঁকে বলছেন, "আমি তোমার ঘরে এলাম মা"। তারপর তিনি শ্যামাসুন্দরী দেবীকে জড়িয়ে ধরলেই তিনি পুনরায় সংজ্ঞাহীন হন। জ্ঞান ফিরলে তিনি অনুভব করেন ওই কাঁচা মেয়েটি তাঁর গর্ভে প্রবেশ করে। এইভাবে মা সারদার আগমন।
বাঙালি জীবনে ফলহারিণী কালী পূজার তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে। রামকৃষ্ণ এই দিনেই স্ত্রীসারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগৎ কল্যাণের জন্য। ১২৮০ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তি সগুণরূপের পুজো করেছিলেন। তিনি ফলহারিণী কালী পুজোর দিন শ্রীমা সারদাকে ষোড়শীরূপে পুজো করেছিলেন বলে আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রমে এই পুজো 'ষোড়শী পুজো' নামে পরিচিত। মায়ের জীবনী পড়ে জানা যায় মা সারদা দেবী ছিলেন মাতৃরূপে সাক্ষাৎ দেবী।
স্বামী বিবেকানন্দ, মা সারদা দেবীকে 'জ্যান্ত দুর্গা' বলে মনে করতেন এবং তাঁকে এই রূপেই পুজো করতেন। এটি ছিল মৃন্ময়ী মূর্তির বাইরে এক জীবন্ত দেবীর প্রতীক, যা মা সারদার মধ্যে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন। ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার সূচনা করার সময়, স্বামীজি এই পূজা করেছিলেন, যেখানে কুমারী পূজার পর মায়ের চরণে ১০৮টি পদ্ম নিবেদন করে তাঁকে 'জ্যান্ত দুর্গা' রূপে পুজো করা হয়।

মা সারদা নিরক্ষর ও গ্রাম্য বালিকা হলেও, তিনি ছিলেন অসীম জ্ঞানের অধিকারিণী। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৪ সালে যখন অ্যামেরিকাতে ছিলেন তখন একজন সন্ন্যাসী গুরুভ্রাতাকে লিখেছিলেন, মা ঠাকুরণ কী বস্তু বুঝতে পারোনি। এখনও কেউ পারোনি - ক্রমে পারবে। শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না। মা ঠাকুরণ ভারতে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছেন। তাঁকে অবলম্বন করে আবার সব গার্গী, মৈত্রেয়ী জন্মাবে। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব মা সারদাকে প্রশ্ন করেছিলেন, "তুমি আমাকে সংসারে টেনে নিতে এসেছ?" মা সারদা জীবনের প্রথম প্রভাতে একান্ত তরুণ বয়সে উত্তর দিলেন, "না সাধনায় সহায় হতে এসেছি।"
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
