গল্প ও অণুগল্প

সেরা দান (অণুগল্প)



মমতা বিশ্বাস


বয় চা দিতে এসে দেখে ম্যানেজার সলিলবাবু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছেন। তার চেঁচামেচিতে ব্যাঙ্ককর্মীরা ছুটে আসেন। জামা ভিজে সপসপে হয়ে গেছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম সারা মুখমণ্ডলে। সহকর্মীরা ধরাধরি করে সোফাতে বসিয়ে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে থাকে। মিনিট দশেক পর জ্ঞান ফিরে আসে, কিন্তু বুকে অসম্ভব ব্যথা। ব্যথার চোটে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। হাই স্পিডে ফ্যান ঘুরছে; তবুও ঘাম কমছে না। জুনিয়র অফিসার সোনু জানে ম্যানেজারের ব্যাগে সরবিট্রেট আছে। ব্যাগ থেকে ওষুধের কৌটো বের করে একটা ট্যাবলেট নিয়ে ম্যানেজারের জিবের তলায় দিয়ে দেয়। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে আস্তে আস্তে ব্যথা কমে আসছে। সোনু ম্যানেজারের স্ত্রীকে ফোন করে জানায় সলিলবাবু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন; তবে আগের তুলনায় ভালো আছেন। কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার মণ্ডলের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সলিলবাবুকে নিয়ে ডাক্তারখানায় পৌঁছানোর আগেই তার স্ত্রী-কন্যা সেখানে পৌঁছে যায়। এমার্জেন্সি পেশেন্ট বলে ডাক্তারবাবু চেম্বার ছেড়ে অ্যাম্বুলেন্সে পেশেন্ট দেখে বলে দিলেন "এক্ষুণি NRS-এ অথবা যে কোনো মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যান। অ্যাম্বুলেন্সে স্যালাইন, অক্সিজেন দিয়ে নিয়ে যেতে হবে। একদম সময় নষ্ট করবেন না।"

পৌরসভার অ্যাম্বুলেন্সে সিরিয়াস পেশেন্টদের নিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা আছে। রেটটা অনেক কম; তবে হুট করে বুকিং পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ঐদিন আগে থেকে বুকিং না থাকায় কণিকা দেবী অ্যাম্বুলেন্স পেয়ে গেলেন। তিনি সোনুকে জানিয়ে দিলেন গাড়ি আধঘণ্টার মধ্যে এসে যাবে। সোনু বলল, "ঠিক আছে ম্যাডাম। বেশি চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে; আমি যাচ্ছি আপনাদের সঙ্গে।"

আর. এন. টেগোরে নিয়ে যাওয়ার কথা ড্রাইভারকে বলা হলেও রাস্তা এত খারাপ; প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে বসে থাকা সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এসি চলছে, স্যালাইন চলছে; তবুও ঘাম বন্ধ হচ্ছে না। সলিলবাবু, স্ত্রীর ঘাড়ে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আছেন। সোনু খেয়াল রাখছে স্যার অক্সিজেন, স্যালাইন ঠিকঠাক নিতে পারছেন কিনা। দিঠি বাবার হাতের তালু, পায়ের তালু ম্যাসাজ করছে। মাঝে ফোন করে ওর দাদাকে বাবার অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিল। সে দু'দিনের আগে কিছুতেই পৌঁছতে পারবে না। দিঠি, বাবাকে বুকের ব্যথায় ককিয়ে উঠতে দেখে বলে, "মা, দুই কিমি গেলেই অ্যাপোলো হসপিটাল, ওখানে নিয়ে গেলে হয় না? আর. এন. টেগোরে নিয়ে যেতে গেলে, এখনও দু'ঘণ্টা লেগে যাবে। বাবা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে।"

কণিকাদেবী সোনুর সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত পাল্টে অ্যাপোলো হসপিটালে নিয়ে যাওয়া স্থির করেন। অন্তত ১২ কিমি রাস্তা কম হবে। এমার্জেন্সিতে পেশেন্টের গাড়ির লম্বা লাইন। সরকারি হসপিটালে অভয়াকাণ্ডে ডাক্তারবাবুদের ধর্মঘট চলছে। এত ভিড়ের কারণ এটাই। নিঃশ্বাস নিতে এখনও কষ্ট হচ্ছে সলিলবাবুর। দিঠি বাবাকে হাল্কা কথাবার্তায় দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভিড় দেখে যতটা দেরি হবে বলে মনে হয়েছিল; ততটা নয়। কণিকাদেবী বাইরে বসে থাকলেন। সোনু আর দিঠি সলিলবাবুকে নিয়ে এমার্জেন্সিতে ঢুকল। তিনঘণ্টা ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলল। MRCP হল। দিঠি বণ্ডে সই করে সিকিউরিটি মানি ডিপোজিট করে এল। রুম অ্যালোট হয়ে গেছে। বাড়ির একজন থাকতে পারবে। ইনশিয়োরেন্সের কাজ এখনও বাকি আছে। দিঠি, সোনুকে বলল, "আপনি একটু ওয়েটিং রুমে বসুন; বাকি কাজটুকু করে আসছি। আমাদের জন্য আপনার কী ধকলটাই না গেল।"

"এ কী বলছেন আপনি? স্যারের জন্য এটুকু করতে পারার সৌভাগ্য হল। আমাদের বাড়ি কিষাণগঞ্জে। কৃষ্ণনগরে একা থাকি। স্যার, বড়ো ভরসার জায়গা। মা, স্কুল ছুটি থাকলে কয়েক দিন থেকে যান। স্যার, আপনার মতো আমাকেও ভালোবাসেন। কী বলেন, জানেন? - 'আমার এক মা জানুয়ারিতে দূরে চলে যাবার আগে আর এক মা'কে পেলাম।"

কথাগুলো বলতে বলতে সোনুর চোখের কোন চিক চিক করে উঠল।

"আসলে ছোটোবেলায় বাবাকে হারিয়েছি তো! সকালে ডাক্তারবাবু রাউন্ডে আসার পর কি বলেন, জেনে তারপর ফিরব। ঠিক আছে আমি এখানে ওয়েট করছি, আপনি ওদিকের কাজগুলো সেরে আসুন। চলুন তার আগে একটু চা বা কফি খেয়ে আসা যাক। ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাকে।"

কফি শপে এসে দু'জনে টেবিলে মুখোমুখি বসে কফির অর্ডার দিল।

"আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছেন! অত ভাববেন না, স্যার ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবেন।"

"আসলে সামনের জানুয়ারিতে আমার বিয়ে। এই সময় বাবার এই অবস্থা। আমার আর কিছু ভালো লাগছে না। ভালো-মন্দ যদি কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে কি হবে?"

হঠাৎ এমার্জেন্সি থেকে কল আসায় উঠতে হলো ওদের। কথা বলে জানতে পারল, বাইপাস সার্জারি করতে হবে। দুটো আর্টারি ৯০ শতাংশ ব্লক। রক্ত লাগবে ৩ ইউনিট। তিনজন ডোনার অবশ্যই চাই। পরশু বারোটা থেকে সার্জারি। সকাল দশটার মধ্যে ডোনারদের চলে আসতে হবে। ব্লাড ব্যাংক থেকে কিনে আনা রক্ত এখানে নেওয়া হয় না।

শোনার পর দিঠির চিন্তা আরও বেড়ে গেল। তিনজন ডোনার কীভাবে জোগাড় করবে? নিজে এক ইউনিট রক্ত দিতে পারবে। বাকি দু' ইউনিট?

সোনু বলল, "আমি দেবো আর একজন ডোনার জোগাড় করতে পারলেই হবে। এক কাজ করুন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট দিন ডোনার চাই বলে।"

দিঠি, ওয়েটিং রুমে বসে FB-তে একজন ডোনার চাই বলে পোস্ট করল। অপারেশনের আগের দিন রাত ১০টা বেজে গেলেও কেউ রক্ত দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করল না। দিঠি আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ল। সোনু এগারোটা নাগাদ জানতে চাইল ডোনার জোগাড় হয়েছে?

দিঠি বলল, "না"।

সোনু একটু চুপচাপ থেকে বলল, "চিন্তা করবেন না আমার মা এসেছেন উনি সব কিছু শোনার পর বললেন, যদি নিতান্তই ডোনার না পাওয়া যায় আমি রক্ত দেবো।"

"আপনার মা রক্ত দেবেন?"

হ্যাঁ দেবেন। আমার মা তো অনেক বার রক্ত দিয়েছেন। আমাকেও রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। 'রক্তদান সেরা দান' এমন মহৎ কাজ করতে পারা মানে একটা সামাজিক দায়িত্ব পালন করা। প্রত্যেকটা মানুষের উচিত রক্তদানে অংশীদার হওয়া।"

"কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আর আপনাদের ছোট করব না, আগামীকাল সকাল দশটার মধ্যে চলে আসুন।"