আনমনে সমীর নিজের ছায়ার ওপর পা ফেলেছিল বারবার, পঁচিশ বছর আগে এইরকম বসন্তের উতল হাওয়াকে সঙ্গে করে শহর ছেড়েছিল সমীর। আজ ফিরছে নতুন ভাবে।
খাটের ওপর বসে আছে তনুজা, চুলগুলো ঘামে লেপ্টে নকশা এঁকেছে কপালের ওপর, বক্সার পরে পা-দুটো সেন্টার টেবিলে তুলে লম্বা ধোঁয়া ছাড়ছিল স্যাম। বেডসাইড টেবিলে জলের বোতলের নীচে পাঁচশোর বান্ডিলটা রয়েছে, প্রতিবারের মতোই! পাশেই একটা ছবি আবরণের আড়ালে, যেমন থাকে প্রতিবার!
"ম্যাডাম এবার কি আমরা এগোবো?"
"কি খাবে বলো। চাইনিজ চলবে? নাকি মোগলাই?"
কাজের সময় বেকার বসিয়ে রাখা তাও আদুল গায়ে গরমের ভেতর সারারাত, তার জন্য হাতে গরম পঞ্চাশ হাজার! আজব লাগে, অথচ টাকার অঙ্কটাই ওকে টেনে নিয়ে আসে।
সমীরের চেহারাটা ছিল গ্রীক পুরাণের দেবতাদের মতো, বাবা বা জ্ঞাতিগুষ্টির কারুর সঙ্গে ওর চেহারা মিলতো না। হীনমন্যতা আসতো যখন তুতো ভাইবোনেরা ওকে খেলায় ডাকতো না।
মায়ের দিকে ঠারেঠোরে ব্যঙ্গোক্তি উড়ে আসতো, খানিক বুঝতো খানিক বুঝতো না। তবে এটা বুঝতো বাবা-মায়ের ঘর আলাদা। দুজনের সুখ মুহূর্তের কোনো স্মৃতি নেই সমীরের কাছে। দশ বছরের ছেলেটার মনে এর বেশি আর কিছুই নেই।
এক ঝড়ের রাতে বাবার উন্মত্ত জান্তব চিৎকার আর মায়ের চাপা গোঙানি শুনে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে সমীর বেড়িয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। কোথা থেকে কোথায় গেছিল সেই সম্বন্ধে মস্তিষ্কে কোনো স্মৃতির ছবিই নেই। এমনকি মুছে গেছে মায়ের মুখটাও চিরতরে।
আবিষ্কার করেছিল নিজেকে বৃহন্নলা সমাজের ভেতরে। অথচ ও বৃহন্নলা ছিল না। গুরুমা সমীরকে পরে বলেছিল ও চেতনাহীন অবস্থায় পড়েছিল এক অখ্যাত প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে। দয়াপরবশত ওরা ওকে তুলে আনে। লেখাপড়া শেখানোর সময় ওদের ছিল না, আগের খানিক বিদ্যে আর নিজের চেষ্টায় বলিয়ে কইয়ে হয়ে উঠেছিল সমীর।
আঠারো পার হতেই মহল্লা থেকে বেরিয়ে আসে সমীর। প্রথমদিকে হপ্তায় একবার হলেও যেতো, মায়া পড়ে গিয়েছিল আসলে! গুরুমাকে প্রতিমাসে খাম পাঠাতে আজও সমীরের ভুল হয় না।
ঝিম ধরে আসছিল স্যামের, খাওয়া হয়ে গেছে অনেকক্ষণ, এখনও টাকাগুলো একভাবে রাখা, এখনও বসে আছেন তনুজা। মাথার ভেতর তীব্র হাতুড়ির বাড়ি মারে যেন কেউ! পৌরুষ ব্যঙ্গ করে স্যামের ওপর! তীব্র রাগে এগিয়ে গিয়ে খামচে ধরে তনুজার কাঁধ, আজ আর নয়, দাসত্বের দাসখত স্যাম লেখেনি কোথাও। বিহ্বল চোখে তনুজা তাকাতেই, নিজের ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে।
জানলা দিয়ে আসা হাওয়াতে উড়ে যায় টেবিলের উপর রাখা ছবিটার ঢাকনা। ছিটকে যায় স্যাম। কম্পিত ঠোঁট আশ্রয় নেয় কপালে। ছবির ভেতর হাসছে দুজন।
