বুকের ব্যামো নিয়ে হাবিবুর রহমান ভুগছে বেশ কয়েক বছর ধরে। কি যে ব্যামো হল হাবিবুর নিজে কিছু বোঝে না। কত ঝাড়ফুঁক কবচ তাবিজ মাদুলি নিল গ্রামগঞ্জের যত চিকিৎসা ছিল প্রায় সব শেষ কিন্তু হাবিবুরের বুকের ব্যামো মনে হয় আর ভালো হবে না। অল্পতেই দমে যায় বুক ধড়ফড় করে মাঝে মাঝে দম আটকে আসে মনে হয় এই বোধ হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে। আরো কত কি করে হাবিবুর আর আগের মতো কাজকর্ম করতে পারে না, খেতেও পারে না। তবে হাবিবুর বোঝে এই বুকের ব্যামো নাকি সে বংশ পরম্পরায় পেয়েছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীকে বলে, "আমার বুকের বেমো আর ভালো হইব না সালমা। আমার আব্বা, দাদাজানের এই বেমো আছিল এই বেমোতে মরল দুইজন। কি শক্তি আছিল দুইজনের কত কাম করত কিন্তু যখন থাইকা বুকের বেমো অইল কামকাজ বন্ধ আর আস্তে আস্তে বিছানায় পইড়া গেল একদিন মইরাও গেল। কোনো ঝাড়ফোক কবচ তাবিজ কাম দিল না। আমিও এই বেমোতে মরুম দেখবা তোমরা!"
"হেইডা তো আমি দেখছি মরিয়মের বাপ! কি করুম কও চেষ্টা তো কম করতাছি না।"
"আর টেকা নষ্ট করবি না কোনো লাভ নাই যতদিন বাছুম এমনি বাছুম। পুলাগোর সংসার আছে টেকা দরকার আছে।"
সালমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, "সত্য টেকার কত দরকার!"
হাবিবুরের ছোট ছেলে হাসান কলকাতা থেকে এসেই বলল, "ও বাজান তোমার লাইগ্যা একখান জব্বর খবর আছে!"
"কি খবর বাপ!"
"তোমার বুকের বেমো এখন ভালা হইব আর চিন্তা নাই।"
"হেই অসুখ আর ভালা হইব নারে বাপ! বুড়া অইছি এখন তো একদিন মরতে অইব। এখন তোরা বড় হইয়া গেছস রোজগার করছ এখন আর মরতে ভয় নাই রে বাজান।"
"এমন কথা কইও না। বেমো অইলে চিকিৎসা আছে। তুমি কেন এত তাড়াতাড়ি মরবা। আমি তোমারে কলকেতা নিয়া গিয়া বড় ডাক্তার দেখামু তুমি ভালা হৈয়া যাইবা বাজান। আমি সব ব্যবস্থা কইরা আইছি।"
"কলকেতা তো মেলা দূর বাজান। এই বয়সে এত দূরে যাইতে পারুম না।"
"আরে কিসের দূর! এখন কি আর আগের দিন আছে রাস্তাঘাট ভালা রেলগাড়ি আছে। রেলগাড়িতে জার্নি কম অইব তোমার কষ্ট কম অইব।"
"এইসবের কি দরকার আছে বাপ।"
"আছে দরকার আছে। এত কষ্ট কইরা আমাগোরে বড় করছ। এখন তুমারে দেখন আমার কর্তব্য। আইছা তুমি কোনোদিন কলকেতা গেছিলা।"
"কলকেতা! কি জানি মনে নাই!"
হাবিবুর রহমান দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কুসুমপুরের একজন চাষী। ষাটোর্ধ্ব হাবিবুরের সংসারে স্ত্রী ও তিন ছেলে রয়েছে। বড় দুই ছেলে বিবাহিত তাদের সন্তান রয়েছে। গ্রামেই চাষবাস করে জীবিকা নির্বাহ করছে। শুধু ছোট ছেলে হাসান সে কলকাতায় কারখানায় কাজ করে। বাকীদের তেমন লেখাপড়া নেই ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত লেখাপড়া শিখে বাপের সঙ্গে চাষবাস শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু হাসান সে মাধ্যমিক পাশ করেছে হাবিবুরের বংশে সবচেয়ে শিক্ষিত ছেলে তাকে কি আর চাষবাস করা মানায়! তাদের দৃষ্টিতে চাষবাস অশিক্ষিত লোকেরা করে। হাসান এক আত্মীয়ের সঙ্গে কলকাতায় আসে এবং সেখানে কারখানায় কাজ পায়। বেশ কয়েক বছর ধরে সে কলকাতায় আছে বিয়ে করেনি মাঝে মাঝে বাড়ী যায় সবার খোঁজ খবর নেয়।
হাবিবুরের এত বছর বয়সে বিশেষ অসুখ বিসুখ হয়নি। তবে এখন তার বুকে সমস্যা দেখা দিয়েছে। চলতে ফিরতে কষ্ট হয় সামান্য পরিশ্রম করলেই হাঁফিয়ে উঠে। হাবিবুরের বাকী দুই ছেলে বাবাকে ঝাড়ফুঁক, তাবিজ মাদুলি, হাতুড়ে ডাক্তার অনেক কিছু দেখিয়েছে কিন্তু কমেনি তারা এখন তাদের বাপকে আল্লার কাছে সঁপে দিয়েছে উনি যা করার করবেন। কিন্তু হাসান বুঝতে পেরেছে তার বাবার হার্টের সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাকে হার্টের ডাক্তার দেখাতে হবে।
সালমা হাবিবুরকে নিয়ে যেতে সায় দিলেও বাকীদের অনিচ্ছা ও আপত্তির পরও হাবিবুরকে হাসানের সঙ্গে কলকাতায় যেতে হল। হাসান নাছোড়বান্দা বাবাকে সে ডাক্তার দেখিয়ে ছাড়বে।
মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় একজন নামকরা হার্ট সার্জন। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র প্রফেসর। বয়স ষাট-এর কাছাকাছি হবে।
রবিবার হাসানের কারখানা বন্ধ। হাসান বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে। কত লোকজন। রবিবারে ওঁনার চেম্বারে খুব ভিড় হয়। চেম্বারটা ওঁনার বাড়ীতেই।
এক সময় ডাক আসে হাবিবুরের। বাপকে নিয়ে ভিতরে যায় হাসান। ডাক্তারবাবু দেখে বেশ কিছু টেস্ট লিখে দেন। রিপোর্ট না দেখে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
হাবিবুরের বার বার মনে হতে থাকে এই ডাক্তারবাবুকে সে চেনে। অনেক বছর আগে একজনের চেহারার সঙ্গে কিছুটা মিল রয়েছে তবে সে চেহারা বদলে গেছে মাঝখানে এতগুলো বছর। তবে তিনি কি ডাক্তার ছিলেন, কি তার নাম ছিল হাবিবুর কিছু জানে না। শুধু চেহারা মনে পড়ছে তবে মানুষটার চেহারা অনেকটা বদলে গেছে হাল্কা পাতলা লম্বা মানুষটির শরীর ভারী হয়েছে, মাথায় ঘন চুল পড়ে টাক দেখা দিয়েছে তবে ডান গালে বড় জড়ুলটা ঠিক আছে ওটা হাবিবুর ভুলতে পারেনি। কিন্তু এত বড় ডাক্তার তাকে কি আর এসব কথা বলা যায় তিনি তো অন্য কেউ হতে পারেন আর ঔ লোকটা হলেও কি হাবিবুরকে চিনবেন তার চেহারার কত পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু মানুষটার সঙ্গে তার দেখা কলকাতায় হয়েছিল।
সব পরীক্ষার পর রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে যেতে যেতে পরদিন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর মানবেন্দ্রবাবু নিজের চেম্বারে বসেন। হাবিবুর শুধু দেখছে ডাক্তারবাবুকে, কিছু বলতে পারছে না।
"তোমার হার্টে তো বেশ সমস্যা দেখা দিয়েছে হাবিবুর প্রায় এইটি পার্সেন্ট ব্লক সার্জারি করাতে হবে। কি এত চিন্তা কর বয়স হয়েছে এখন কিছু চিন্তাভাবনা ছাড়ো ছেলেরা কি সংসারের দায়িত্ব নেয়নি।"
"হ ছেলেরাই তো সংসার চালায় তবু যে কেন বেমো হইল বুঝি না।
"ভালো হয়ে যাবে সার্জারি হলে চিন্তা করো না আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তারপর এখন কোথায় থাক তুমি।"
বাপের সার্জারির কথা শুনে হাসান খুব চিন্তায় পড়ে। হাবিবুর চুপচাপ ডাক্তারবাবুর কথা শোনে। হাসান বলল, "আমরা কুসুমপুর থাকি ডাক্তারবাবু।"
"ও আচ্ছা। আমি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলছি। তুমি কি আমাকে চিনতে পারোনি হাবিবুর।"
হাবিবুর অবাক। তাহলে তিনিই সেই মানুষ এত বড় ডাক্তার তাকে মনে রেখেছেন। বলল, "হ আমি আপনারে দেইখা চিনতে পারছি আপনের আমার কথা মনে আছে নাকি ডাক্তারবাবু।"
"তোমাকে কি করে ভুলতে পারি হাবিবুর সেই দিনের কথা কি ভোলা যায়।"
প্রায় ত্রিশ বছর আগে স্ত্রী সালমা আর একমাত্র কন্যাকে নিয়ে কলকাতায় মজুরি খাটত হাবিবুর। বস্তিতে ঝুপড়ি ঘরে থাকত তাদের একমাত্র কন্যা মরিয়ম ছিল তাদের নয়নের মণি। মরিয়ম স্কুলে ভর্তি হয় কিন্তু সাত বছর বয়সে মরিয়ম কঠিন রোগে আক্রান্ত হয় যার লিভারে ক্যান্সার ধরা পড়ে। হাবিবুর, সালমা পাগল হয়ে যায় মরিয়মের চিকিৎসা করাতে গিয়ে হাবিবুর নিঃস্ব হয়ে যায় এমনকি ঝুপড়িটাও চলে যায়। অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে ঠাঁই হয় ফুটপাতে অনেক কষ্টে থাকতে থাকতে একসময় মরিয়ম মারা যায় কিন্তু তাকে দাফনের জন্য এক টাকাও ছিল না হাবিবুরের কাছে। তারা দু'দিনের উপোসী ছিল। রাস্তার পাশে বসে কাঁদছিল কেউ তাকে সাহায্য করেনি। দু' চার টাকা করে সামান্য কিছু উঠেছিল কিন্তু তাতে কি হবে। তখন মানবেন্দ্রবাবু যাচ্ছিলেন সেদিকে। তিনি সবকিছু দেখেন এগিয়ে এসে হাবিবুরের হাতে বেশ কিছু টাকা দেন আর বিনিময়ে তার মেয়ের লাশ তিনি দাফন করবেন বলে নিয়ে যান। হাবিবুর কাঁদতে কাঁদতে জানতে চেয়েছিল, "আপনে হিন্দু হৈয়া মুসলমানের লাশ দাফন করবেন বাবু।"
"এখানে জাতপাতের কি আছে ভাই আমি একজন বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করছি। তোমার মেয়ের লাশের আমি সদগতি করব বিশ্বাস রেখো আমার উপর।"
"আল্লা আপনের ভালা করব বাবু!"
এরপর হাবিবুর স্ত্রী সালমাকে নিয়ে গ্রামে চলে আসে কলকাতায় থাকতে তাদের আর মন চাইছিল না। গ্রামে সামান্য কিছু জমি তার বন্ধক ছিল, মানবেন্দ্রবাবুর দেওয়া সেই টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে বসবাস শুরু করে। হাবিবুরের ছেলে হয় পর পর কিন্তু মেয়ে আর হয়নি মরিয়মকে কোনোদিন ভুলতে পারেনি হাবিবুর তার বুকের মাঝে রেখে দিয়েছে মেয়েকে। এখনো সালমাকে হাবিবুর 'মরিয়মের আম্মা' বলে ডাকে।
মানবেন্দ্রবাবু তাদের পরদিন মেডিকেল কলেজে যেতে বললেন। তিনি সার্জারির ব্যবস্থা করবেন বলেছেন। এমন একজন মানুষকে পাশে পেয়ে দুজনে খুব খুশি। হাসান বলল, "আর চিন্তা নাই বাজান তোমার বুকের বেমো ভালো হৈয়া যাইব।"
"হৈলেই ভালা বাপ।"
ছুটি নিয়ে হাসান হাবিবুরকে নিয়ে গেলেন মেডিকেল কলেজে। মানবেন্দ্রবাবু নিজেই এসে দেখা করলেন। হাবিবুরকে বললেন, "চল প্রাক্টিক্যাল ক্লাসে তোমাকে কিছু দেখাব।"
বাপ বেটা দুজনে ওঁনার পিছু পিছু গেল। একটা কংকাল। মানবেন্দ্রবাবু ওটা দেখিয়ে বললেন, "দেখ হাবিবুর তোমার মেয়েকে আমি কত যত্ন করে রেখে দিয়েছি। কত ছেলে-মেয়ে ডাক্তারি পাশ করেছে তোমার মেয়ের কংকালের সাহায্যে। আসলে সেদিন আমাদের মেডিকেল কলেজের জন্য একটা কংকালের দরকার ছিল আমি তোমার মেয়ের লাশটাকে সেই কাজে ব্যবহার করি। তোমার মেয়ের জীবন ধন্য এই বাচ্চা মেয়েটা কত মানুষের উপকার করেছে আর ভবিষ্যতেও করবে।"
"কি কন ডাক্তারবাবু। এইডা আমার মরিয়ম।"
"হু এই মরিয়ম! তার নাম মরিয়ম ছিল বুঝি!"
হাবিবুরের দু'চোখ বেয়ে জল পড়তে থাকে। হাসানের চোখেও জল বড় বোনের কথা কত শুনেছে হাসান চোখে দেখার ভাগ্য তার হয়নি। হাবিবুর হাত বাড়িয়ে কংকালের হাতে হাত রাখল। তার আত্মজার স্পর্শ প্রাণপ্রিয় মরিয়মের স্পর্শ প্রাণ ভরে নিতে চায় হাবিবুর। এভাবে এত বছর পর মরিয়মকে পেয়ে যাবে ভাবেনি কখনও হাবিবুর। মরিয়মের কংকালে হাত রেখে হাবিবুর বুঝতে পারে মরিয়মের কচি কচি হাত দুটো বাবার হাতটা যেন চেপে ধরেছে। হাত দুটো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে মরিয়ম যেভাবে হাবিবুরের হাত চেপে ধরত সেভাবে চেপে ধরে বলছে,
"বাজান তুমি আইছ আমি তোমার লাইগ্যা অপেক্ষা করতাছি এত বছর ধৈরা। তোমার কি একবারও আমার কথা মনে হয় নাই। আমারে কিছু খাইতে দিবা বাজান এত বছর ধৈরা না খাইয়া দেখ আমি কেমন শুকাইয়া গেছি খুব ক্ষিদা পাইছে। লোকে আমারে আদর কৈরা কয় কংকাল কিন্তু কেউ খাইতে দেয় না কিছু! তারা যেন কেমন!
"হ মা আমি তোরে কিছু খাইতে দিমু তুই আর না খাইয়া থাকবি না।" হাবিবুরের অস্ফুট স্বরে মানবেন্দ্রবাবু ও হাসানের চোখে জল চলে আসে!
