প্রবন্ধ

যুবকদের চরিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ



সৌমিত্র মজুমদার


বর্তমানে সমগ্র ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যেসব ঘটনাবলী ঘটে চলেছে তার পর্যালোচনা করলে একটাই বিষয় উঠে আসছে - সেটা হল মানুষের চারিত্রিক পতন। সেই কবেই তো রবীন্দ্রনাথ 'দ্য রবারি অফ দ্য সয়েল' প্রবন্ধে এই অবস্থাকে 'আত্মহননের প্রক্রিয়া' বলেছেন।

এতকাল পরেও কি আমরা 'আত্মহননের প্রক্রিয়ার' যুগে ফিরে এসেছি। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর লোভকে যে সমাজ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে দেয়, দেশবাসী যখন তাকে উৎসাহিত বা হর্ষধ্বনিতে সম্বর্ধিত করে, পাশ্চাত্য ভাবনায় যাকে গণতন্ত্র বলা হয়, তা সেখানে বাস্তবায়িত হতে পারে না। এরকম পরিবেশে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করার জন্য জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দখল করতে ব্যক্তিদের মধ্যে নিরন্তর লড়াই চলে। এইভাবে গণতন্ত্র একটা হাতির আকার নেয়, যার জীবনের উদ্দেশ্য ধনী ও চতুর প্রমোদ ভ্রমণে ব্যবহৃত হওয়া। তথ্য ও মতপ্রকাশের যে মাধ্যমগুলি জনমত তৈরি করে সেগুলি এবং প্রশাসন যন্ত্র প্রকাশ্যে বা গোপনে মুষ্ঠিমেয় বিত্তশালীদের দ্বারা সুকৌশলে নিয়ন্ত্রিত হয়।" (বাংলা ভাষান্তরঃ সজল রায়চৌধুরী)

রবীন্দ্রনাথ আরও বলেছিলেন, "সভ্যতা আজ এক বিরাট ভোগ-লোভী সমাজের চাহিদা পূরণে নিয়োজিত... এই সর্বব্যাপী লোভ, যার সংক্রমণ আমাদের সকলকে স্পর্শ করেছে - এর থেকেই জন্ম নিয়েছে যত হীনতা, নির্দয়তা, রাজনীতি আর মিথ্যাচার। সমস্ত মানবিক বাতাবরণকে তা আজ বিষাক্ত করে দিচ্ছে।"

১৯২২ সালে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলো আজ ২০২২ সালেও কতটা প্রাসঙ্গিক তা পাঠক মাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। বর্তমানে ভারতবাসী বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষরা তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।

কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগে কেন এমন দুরবস্থা? এর জন্য অনেকেই সরকার বা কোনো রাজনৈতিক পার্টি বা নেতাদের কাটগড়ায় দাঁড় করাবেন, কিন্তু সত্যিই কি তাই? সমাজের অধিকাংশ লোকের সামগ্রিক চারিত্রিক পতনই এর জন্য দায়ী। এই সমাজ থেকে উঠে আসা লোকরাই তো নেতা, মন্ত্রী হয়। কলুষিত সমাজের জনপ্রতিনিধিদের থেকে এমনটাই আশা করা যেতে পারে।

আমরা সবাই জানি ধনসম্পত্তি গেলে আবার ফিরে আসতে পারে, কিন্তু চরিত্র গেলে তা আর ফিরে আসে না। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পত্তি। চরিত্র নষ্ট করলে সে তার মনুষত্বই নষ্ট করল।

কিন্তু সমাজের অধিকাংশ লোক এই উপদেশে কর্ণপাত না করে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক পার্টির সমর্থনে ভাগ হয়ে দেখা দিল বুদ্ধির মন্দা।

বিপরীত অর্থবোধ, একে অন্যের ওপর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, দুরাগ্রহ, 'আমিই ঠিক বুঝি, আমি সকলের চাইতে বেশি বুদ্ধিমান' ইত্যাদি। কিন্তু কেউই আসল সমস্যার সমাধানে মাথা ঘামায় না - ফলস্বরূপ ছল-চাতুরী, বঞ্চনা, প্রতারণা, জাল-জুয়াচুরি, অন্যায়-অবিচার, নির্যাতন, শোষণ, চুরি-ডাকাতি, লুট, আত্মরতি, রিরিংসা প্রভৃতি - যা আজ এই যুগের যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভাবলে অবাক হতে হয় এর মধ্যে অনেক শিক্ষিত মানুষ নেতা-মন্ত্রী আমলাও যুক্ত। তবে কি চরিত্রের পতনই এর জন্য দায়ী।

চরিত্র গঠন প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, "মনুষ্যজন্ম শ্রেষ্ঠ জন্ম। চরিত্র গঠনের জন্য ধীর ও অবিচলিত যত্ন এবং সত্যপলদ্ধির তীব্র প্রচেষ্টাই কেবল মানবজাতির ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।... চাই পূর্ণ সরলতা, পবিত্রতা, বৃহৎবুদ্ধি এবং সর্বজয়ী ইচ্ছাশক্তি। এই সকল গুণসম্পন্ন মুষ্টিমেয় লোক যদি কাজে লাগে তবে দুনিয়া ওলট-পালট হয়ে যায়।... আমাদের অভীঃ নির্ভীক হতে হবে। তবেই আমরা কার্যে সিদ্ধিলাভ করবো।"

কিন্তু হায়। বর্তমানে মানুষ যতই মনীষীদের উপদেশ অনুধাবন করুন বা না করুন, শেষ পর্যন্ত সে নিজের মনের অন্তরতম প্রদেশ থেকে যে আদেশ ধ্বনিত হয়, তাই যেন তার কাছে সকলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

সেটা ভালো হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে সর্বশক্তিমান ভেবে নিজের চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করতে অপারগ তারাই নানা কেলেঙ্কারির নায়ক হয়ে ওঠেন।

অ্যারিস্টটল বলেছিলেন - "আমাদের চরিত্র হচ্ছে আমাদের আচার আচরণের ফল।"

যে যাই বলুক। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের চরিত্রের অধঃপতনের অন্যতম কারণ হিসাবে অনেকেই রাজনীতিতে অপবিত্রতা ইত্যাদিকেই দায়ী করেন।

।। ২ ।।

'রাজনীতি' শব্দটা গ্রীক ভাষা থেকে পাওয়া। 'পলিটিক্স' শব্দটা এরই ইংরাজি অনুবাদ। মনুষ্য সমাজের একটা প্রয়োজনীয় জ্ঞান হিসাবেই 'রাজনীতি'কে দেখি। তখন আমরা অ্যারিস্টটলের সঙ্গে একমত হই। কিন্তু আজ রাজনীতির এই চরম দুঃসময়ে মানুষের চরিত্রের পতন হয়েছে। এইসব মানুষের ব্যক্তিত্ব আজ অশ্রদ্ধেয়। বলতে বাধা নেই আজকাল এইসব লোকেরাই সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

এই সংকটের মূলে আছে চারিত্রিক পতন, প্রকৃত শিক্ষার অভাব এবং অবশ্যই রাজনীতি।

তবে কি আমরা ইংরেজদের থেকে পাওয়া (মেকলের) শিক্ষার সাথে কিছু গোঁজামিল মিশিয়ে প্রাপ্ত শিক্ষায় নিজেদের চরিত্র নির্মাণ করতে পারি নি? 'বিদ্যা দদাতি বিনয়ং'-এর শিক্ষা নিতে পারিনি?

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন - "বিদ্যা মনুষত্ব লাভের উপায়। বিদ্যালাভ মানব মাত্রেরই সহজাত অধিকার।"

কিন্তু কোন বিদ্যা? কথিত আছে - 'চুরি বিদ্যাও বড় বিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা।' এধরণের অনেক বিদ্যাই আছে। প্রবাদে এও বলা হয়েছে - 'বিদ্যাতে বুদ্ধি বাড়ে, চরিত্র বাড়ে না' সুবুদ্ধিও হতে পারে আবার কুবুদ্ধিও হতে পারে। তাইতো দেখেছি মানুষ বড় বড় ডিগ্রী অর্জন করতে পারে, বড় বড় ভাষণ দিতে পারে কিন্তু চরিত্র সংকট হলে এই বিদ্যা কোনো কাজে আসে না। সমাজে এর বিপরীত প্রভাব দেখা দেয়।

কিন্তু ভারতের প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতি অর্থাৎ বেদ উপনিষদের শিক্ষায় এমনটা ছিল না। উপনিষদ বলছে - "সা বিদ্যা যা বিমুক্ত যে।" যা মুক্তি দেয়, তাই বিদ্যা। সাধারণতঃ 'মুক্তি' বলতে আমরা বুঝি আধ্যাত্মিক মোক্ষ। কিন্তু এই মুক্তি মননের, বোধের মুক্তি। যে মুক্ত মন নিয়ে ব্যক্তিত্ব থেকে সামাজিকতা সকল কিছু গড়ে তোলা যায়, জীবনে চলার পথে 'সত্যম-শিবম সুন্দরম'-এর পথ দেখায়, চরিত্র গঠন করে, নির্ভীক করে তোলে - তাই মুক্তি।

এই মুক্তির প্রয়োজনে চাই প্রকৃত শিক্ষার অধ্যয়ন। এই শিক্ষার পদ্ধতি প্রসঙ্গে তৈত্তিরীয় উপনিষদে পাঁচটি বিষয়ে বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা দেওয়া আছে।

১৮৯৫ সালের ২রা আগস্ট তারিখের এক পত্রে বিবেকানন্দ লিখেছিলেন - "মানুষেরা যখন বেদান্তের মহিমা বুঝিতে পারে তখনি তাহাদের হিজিবিজি ধারণাগুলি দূর হইয়া যায়।" তখনই মানুষ উপলব্ধি করতে পারে 'ঈশা ব্যাসমিদং সর্বম'। জার্মান দার্শনিক সোপেন হাওয়ার বলেছিলেন - "সমগ্র জগতে যত বিদ্যা আছে, তাহার মধ্যে উপনিষদের ন্যায় উপকারী ও মনের উন্নতি বিধায়ক কোন বিদ্যা নাই, ইহা আমাদের জীবনে সান্ত্বনা দিয়াছে, মৃত্যুতেও সান্ত্বনা দিবে।"

তাই স্বামী বিবেকানন্দ শিক্ষা প্রসঙ্গে বলেছিলেন - "আমরা সেই শিক্ষাই চাই, যাহার দ্বারা চরিত্র গঠিত হয়, মনের জোর বাড়ে, বুদ্ধি বিকশিত হয় এবং মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। মানুষ গঠন করাই সকল শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। যাতে মানুষের চরিত্র পরার্থপরতা সিংহ সাহসিকতা এনে দেয় না - সে কী আবার শিক্ষা।"

তাই তিনি যুবকদের আহ্বান করে বলেছিলেন - "এসো মানুষ হও। তোমরা কি মানুষকে ভালোবাস? দেশকে ভালোবাস? তাহলে এসো, আমরা উন্নত হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করি।... পেছনে যেও না, সামনে এগিয়ে যাও।"

তখনকার শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথও বলেছিলেন - "এর মধ্যে গলদ কিছু নেই তা বলিনে, গুরুতর গলদ আছে। সেজন্য একদিন এদের বিপদ ঘটবে। সংক্ষেপে যে গলদ হচ্ছে, শিক্ষাবিধি দিয়ে এরা ছাঁচ বানিয়েছে - কিন্তু ছাঁচে ঢালা মনুষত্ব টেকে না - সজীব মনের তত্ত্বের সঙ্গে বিদ্যার তত্ত্ব যদি না মেলে তাহলে হয় একদিন ছাঁচ হবে ফেটে চুরমার, নয় মানুষের মন যাবে আড়ষ্ট হয়ে, কিংবা কলের পুতুল হয়ে দাঁড়াবে।" (রাশিয়ার চিঠি, পত্র সংখ্যা ১)

তাইতো তিনি শিক্ষাকে উপনিষদের শিক্ষা আদর্শকে বাস্তবে পরিণত করতে 'বিশ্বভারতী'র প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁর মতে, "শিক্ষা তো শুধু সংবাদ বিতরণ নয়; মানুষ সংবাদ বহন করতে জন্মায়নি, জীবনের মূলে যে লক্ষ্য আছে তাকেই গ্রহণ করা চাই। মানবজীবনের সমগ্র আদর্শকে জ্ঞানে ও কর্মে পূর্ণ করে উপলব্ধি করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য।" (বিশ্বভারতী-১৫)

সুতরাং বিদ্যাই হোক বা শিক্ষা, চরিত্রকে এমনভাবে উন্নত করতে হবে যাতে আনন্দ ও আশ্রয়, সেবা ও ভক্তি পরস্পরের মধ্যে রাসায়নিক মিলনের মতো একীভূত হবে। মনুষত্বের সাধনার পরই শিক্ষার জন্য তত্ত্ব ও প্রযুক্তির পন্থা নির্ধারণ করতে হবে।

এক্ষেত্রে শিক্ষককেও চরিত্রবান হতে হবে। শিক্ষকরা যদি নিজেরাই চরিত্রবান না হন, তারা যতই নৈতিক শিক্ষা, নীতি উপদেশ দিন, কাজের কাজ কিছুই হবে না। দুশ্চরিত্র শিক্ষক যদি একটিও হয়। তার কুপ্রভাবে নষ্ট হবে শত শত শিক্ষার্থীর জীবন।

বিবেকানন্দের মতে, "শিক্ষা হল অনুশীলন - যার দ্বারা মানুষের অন্তর্মুখী ও বহিমুখী উভয় প্রকৃতিরই সমন্বয় সাধন সম্ভব। সুতরাং শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজ - উভয়েরই উন্নয়ন মার্গ। ধর্ম ও বিজ্ঞান এই শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হবে এবং মাতৃভাষাই হবে শিক্ষার বাহন।"

তিনি ছাত্রদের বলেছেন, "মাথায় কতকগুলি তথ্য ঢুকানো হইল, সারা জীবন হজম হইল না, অসম্বদ্ধভাবে মাথায় ঘুরিতে লাগিল - ইহাকে শিক্ষা বলে না। বিভিন্ন ভাবকে এমনভাবে নিজের করিয়া লইতে হইবে, যাহাতে আমাদের জীবন গঠিত হয়, যাহাতে মানুষ তৈরি হয়, চরিত্র গঠিত হয়। যদি তোমরা পাঁচটি ভাব হজম করিয়া জীবন ও চরিত্র ওইভাবে গঠন করিতে পারো, তবে যে ব্যক্তি একটি গ্রন্থাগারের সবকিছু পুস্তক মুখস্থ করিয়াছে তাহার অপেক্ষা তোমার অধিক শিক্ষা হইয়াছে বলিতে হইবে।"

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, "নীতি উপদেশ জিনিসটা একটা বিরোধ। ইহা কোনোমতেই মনোরম হইতে পারে না। যাহাকে উপদেশ দেওয়া হয় তাহাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। উপদেশ হয় তাহার মাথা ডিঙাইয়া চলিয়া যায়, নয় তাহাকে আঘাত করে। ইহাতে যে কেবল চেষ্টা ব্যর্থ হয় তাহা নয়। অনেক সময় অনিষ্ট করে। সৎ কথাকে বিরস ও বিফল করিয়া তোলা মনুষ্য সমাজের যেমন ক্ষতিকর এমন আর কিছুই নয় - অথচ অনেক ভালো লোক এই কাজে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন, ইহা দেখিয়া মনে আশঙ্কা হয়। নৈতিক জ্যাঠামি যাহা সকল জ্যাঠামির অধম, তাহা সুবুদ্ধির স্বাভাবিকতা ও সৌকুমার্য নষ্ট করিয়া দেয়।" (জীবন স্মৃতি)

জীবন-বিচ্ছিন্ন ও সৌন্দর্য বর্জিত সেকালের বিদ্যালয়কে তিনি মনে করতেন 'জেলখানা ও হাসপাতাল জাতীয় নির্মম বিভীষিকা'।

।। ৩ ।।

রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ দুজনেই ছিলেন বেদ-উপনিষদের জ্ঞানের দ্বারা প্রভাবিত, লালিত-পালিত এবং আলোকিত। দুজনেই বিশ্বাস করতেন কর্ম হতে আসে জ্ঞাননিষ্ঠা, জ্ঞাননিষ্ঠা হতে জ্ঞান, জ্ঞান হতে ব্রহ্মজ্ঞান। ব্রহ্মজ্ঞান হতে মুক্তি বা মোক্ষ। বেদান্তে কর্ম ও জ্ঞানের সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। গীতা জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তিমার্গের পথনির্দেশিকা। কিন্তু এই সব দার্শনিক তত্ত্বের নিবিড় অরণ্য অতিক্রম করে রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের 'আনন্দবাদ', 'সৌন্দর্য তত্ত্ব'র প্রতি বেশি আকৃষ্ট হলেন। জ্ঞান ও ভক্তি নিসৃত যে শান্ত রস - সেই রসের রসিক হয়েও রবীন্দ্রনাথ 'নৈবেদ্য' কবিতায় লিখেছেন - "যে ভক্তি তোমারে লয়ে ধৈর্যে নাহি মানে, মুহূর্তে বিহ্বল হয় নৃত্যগীত গানে ভাবোন্মদনামত্ততায়, সেই জ্ঞান হারা উদ্ভ্রান্ত উচ্ছলফেন ভক্তিমদধারা নাহি চাহি নাথ।"

রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের বাণী 'রসো বৈ, সঃ রসংহোবায় লব্ধানন্দী ভবতি। কোহবনাৎ কঃ প্রাণাৎ যদেব আকাশ আনন্দো ন সাৎ।' (তৈত্তিরিয় উপনিষদ ২/৭)-কে পরমাত্মা রসস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ রূপে দেখেছেন।

রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের জ্ঞান ও কর্মকে প্রেমানুভূতির সহায়করূপে কাজে লাগিয়েছেন। এইভাবে তিনি সৌন্দর্যবোধ, আনন্দ, রস ও প্রেম মার্গের একটা সমন্বয় গড়ে তুলেছেন।

তাঁর একটি গানে এই ভাব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে - 'প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোকে ভুলোকে তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া।/ দিকে দিকে আজি টুটিয়া সকল বন্ধ মুরতি ধরিয়া জাগিয়া উঠে আনন্দ, জীবন উঠিল নিবিড় সুধায় ভরিয়া।' (ব্রহ্মসঙ্গীত-৬, গীতাঞ্জলি, স্বরবিতান-২৬, তান-২৬)

রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব মত ছিল - "যে কিছু আনন্দ আছে দৃশ্যে, গন্ধে, গানে, তোমার আনন্দ রবে তার মাঝখানে।"

কালক্রমে রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ংগম করলেন - "শাস্ত্র যদি নেহাৎ পড়তে হবে 'গীতগোবিন্দ' খোলা হোক না তবে।"

তাইতো 'গীতগোবিন্দ'-র 'মঞ্জুল-বস্তুল-কুঞ্জগতং' (গীতগোবিন্দ ১/৪৪)-এর অনুকরণে রবীন্দ্রনাথের 'সেই মুকুল আকুল বকুল-কুঞ্জভবনে' (ভৈরবী গান (মানসী)-র সাথে মিল খুঁজে পাই। এরকম রবীন্দ্রনাথের অনেক গানে-কবিতায় 'গীতগোবিন্দ'-র প্রভাব স্পষ্ট। যেমন মানসী কবিতায় - "যৌবনললিতলতা বাহুর বন্ধনে" অংশের পদটি 'গীতগোবিন্দ'র 'ললিতলবঙ্গলতা' পদটির সাথে সাদৃশ্য বজায় রেখেছেন।

রবীন্দ্রনাথের মানসলোকে 'গীতগোবিন্দ'-র যথেষ্ট প্রভাব ছিল। কিন্তু 'গীতগোবিন্দ'র আপেক্ষিক অপকর্ষ বা উচ্চভাবের দৈন্য সম্পর্কে সচেতন থাকা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ 'গীতগোবিন্দ'র বহিঃসৌষ্ঠব, সৌন্দর্যের সাথে নিজের প্রতিভার যাদুস্পর্শে ইন্দ্রিয় সুখের উপকরণের সাথে 'মানসিক আনন্দের' উপকরণ খুঁজে পেয়েছেন। ফলে রবীন্দ্রকাব্য চিরন্তন রসলোকের সামগ্রী হয়ে উঠেছে।

কম বয়সে পিতার সংস্পর্শে ও শিক্ষায় রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের যে আনন্দবাদের তত্ত্ব অনুধাবন করেছিলেন - যা তিনি তাঁর অনেক লেখায় ব্যক্ত করেছেন - সেই রবীন্দ্রনাথই পরিণত বয়সে আনন্দের সাথে রূপ অথবা অরূপ যোগ করলেন। তিনি বলেছেন - "ওই যে বলা হল রূপের কথা তাকেও ভালো করে বুঝতে হবে। সাহিত্য-সৃষ্টির সকল রূপের সার্থকতা অরূপ আনন্দে। উপলব্ধির রূপ থাকে না। অথচ উপলব্ধিটা রূপের মধ্য দিয়েই আসে।" আমরা এক্ষেত্রেও বলতে পারি - 'রূপসাগরে ডুব দিয়েছি অরূপ রতন আশা করি।' (গীতাঞ্জলী)। এই অরূপ রতন আনন্দময় উপলব্ধি। সব রূপ-ডোবানো রূপের উপাসনাই সাহিত্য সাধনা। এখানে রূপ মানে উপকরণকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

স্বামী বিবেকানন্দের কাছেও আনন্দের শিক্ষা ছিল উপনিষদের বাণী -"আনন্দে ব্রহ্মোতি বাজানাৎ আনন্দাদ্ধ্যেব খন্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবস্তি।আনন্দং প্রয়ন্ত্যাভিসং বিশস্তীতি।"

অর্থাৎ আনন্দই ব্রহ্মা। কারণ আনন্দ হইতেই এই ভূতবর্গ জাত হইয়া আনন্দের দ্বারা বর্ধিত হয় এবং অবশেষে আনন্দভিমুখে প্রতিগমন করে ও আনন্দে বিলীন হয়। এছাড়া বিবেকানন্দের পথ ও শিক্ষা ছিল জ্ঞানমার্গ, ভক্তিমার্গ, ত্যাগ, কর্ম, ব্রহ্মচর্য, সংযম ও একাগ্রতার পথ।

উপনিষদের বাণী 'উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত।' "ওঠো জাগো যতদিন না নির্দিষ্ট লক্ষ্যে না পৌঁছাও।" এটাই ছিল স্বামীজির শিক্ষা, আদর্শ।

পরবর্তীকালে স্বামীজি প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠের নিয়মাবলীতে লিখেছেন - "জ্ঞান, ভক্তি, যোগ ও কর্মের সমন্বয়ে চরিত্র গঠন করা এই মঠের উদ্দেশ্য।"

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নীরস জ্ঞানমার্গের এবং ত্যাগমার্গের পথিক ছিলেন না - তিনি কবি, বিচিত্রের দূত, রসিকরঞ্জন সভার সভাকবি, পৌত্তলিকতার বিরোধী, রূপ থেকে রূপান্তরে তাঁর ভ্রমণ, রস ও সৌন্দর্যবোধের ধারক ও বাহক। আনন্দ তাঁর কাছে উপনিষদের 'আনন্দরা পমমতং যদ্ধিভাতি' (মুন্ডকোপনিষদ ২/২/৭) তাঁর সঙ্গীত ঘুরে বেড়ায় আকাশে, দ্যুলোকে, ভূলোকে, মানুষের প্রাণে মনে সর্বত্র।

বিবেকানন্দ নিজেও রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে শুনিয়েছেন - 'তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা' সহ একাধিক গান। শ্রদ্ধেয় ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন যে, "প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছিলেন কাশীতে বিবেকানন্দের কণ্ঠে - 'সখি আমারি দুয়ারে কেন আসিল নিশিভোরে যোগী ভিখারী'।"

স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনে দুজনের বৈদিক শিক্ষার প্রভাবে দুজনেই ছিলেন দুজনের অনুরাগী কিন্তু পরবর্তীকালে বিবেকানন্দের পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস ও বিশেষ করে পৌত্তলিক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ ব্রাহ্মধর্মের অনুরাগী রবীন্দ্রনাথ ভালভাবে মেনে নিতে পারেননি।

এই প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় লিখেছেনঃ "উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে স্বামী বিবেকানন্দ বাংলার হতাশাচ্ছন্ন, যুব সমাজের মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়ে তাদের শক্তিসাধনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলেন।"

রবীন্দ্রনাথের লেখা সৌন্দর্য ও প্রেমরসের কবিতাগুলো যুবা মানসে ক্ষতিকর বিবেচনা করে স্বামী বিবেকানন্দ সমালোচনা করেছিলেন - এভাবে দু-জনার মধ্যে দূরত্ব বাড়ে।

সেই সময়ে দুজনকে ঘিরেই পৃথক অনুরাগী ভক্তবৃন্দ গড়ে উঠেছিল। স্বামী বিবেকানন্দ 'পরিব্রাজক' গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের এই তথাকথিত ভক্তদের কথা উল্লেখ না করেই লিখেছিলেন, "ঐ যে একদল দেশে উঠছে। মেয়ে মানুষের মতো বেশভূষা, নরম নরম বুলি কাটেন, এঁকে বেঁকে চলেন। কারুর চোখের উপর চোখ রেখে কথা কইতে পারেন না। আর ভূমিষ্ঠ হয়ে অবধি পিরিতের কবিতা লেখেন, আর বিরহের জ্বালায় 'হাঁসেন-হোসেন' করেন।"

স্বামী বিবেকানন্দ সতর্ক করে বলেছিলেন ভারতচন্দ্রের লেখা বই যেন ছাত্রদের কাছে না পৌঁছায় - যাতে ছাত্রদের চরিত্র গঠনে বিপরীত প্রভাব পড়ে। অনুরূপ ভাবে তিনি চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের লেখা সৌন্দর্য ও আদিরসের কবিতাগুলো যুব-ছাত্রদের কাছে যেন না পৌঁছায়।

বিবেকানন্দ চাইতেন যুব ছাত্ররা যেন মানুষ তৈরি হয়, চরিত্র গঠিত হয়। তাঁর মতে রবীন্দ্রনাথের শৃঙ্গাররসের উপভোগে কামনা-বাসনাদি নীচ প্রবৃত্তির উদ্রেগ হয়।

বিবেকানন্দ বলেছিলেন - "মানুষ চাই। চাই বলিষ্ঠ, ওজস্বী যুবকের দল - তাহলেই পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটবে।" তিনি বলেছেন - "কাজে লাগো, সাহসী যুবকবৃন্দ কাজে লাগো। প্রার্থনা করি, আমার ভেতরে যে আগুন জ্বলছে, তা তোমাদের মধ্যে জ্বলে উঠুক।"

বিবেকানন্দ চাইতেন না সিস্টার নিবেদিতা ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা করুক। তিনি নিবেদিতাকে বলেছিলেন - "তুমি যতদিন ওই পরিবারের সাথে মেলামেশা চালিয়ে যাবে, ততদিন আমাকে বারে বারে সাবধান করে যেতেই হবে, ওই পরিবার বাংলাদেশকে শৃঙ্গার রসে কলুষিত করেছে।" রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতাকে শিলাইদহে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন উত্তরে নিবেদিতা লিখেছিলেন - "আপনার সাথে নৌ-বিহারের লোভনীয় আমন্ত্রণ আমার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।" রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছোট মেয়েকে ইংরাজি শেখানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু নিবেদিতা দৃঢ় কণ্ঠে অস্বীকার করেছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের সৌন্দর্যের তত্ত্ব হল ঐশ্বরিক শক্তি। সৃষ্ট জীবের ও বস্তুর সৌন্দর্য পরমশ্রষ্ঠার সৌন্দর্য। তিনি আরও বলেছেন সৌন্দর্য ও আনন্দ অভিন্ন। তিনি বৃহদারণ্যক উপনিষদের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন - "যেখানেই একটু আনন্দ দেখিতে পাওয়া যায় সেখানেই সেই অনন্ত আনন্দস্বরূপ স্বয়ং ভগবানের অংশ রহিয়াছে, বুঝিতে হইবে।" (স্বামীজির লেখা বাণী ও রচনা, চতুর্থ খণ্ড)

"কিন্তু যোগীর কাছে সৌন্দর্য যদি জ্ঞানের কোনো চিহ্ন না থাকে তবে সেই সৌন্দর্য যোগীর কাছে পশুর মুখ বলে প্রতীয়মান হবে।"

বিবেকানন্দ ছিলেন যোগী, আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সংসারী - 'বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি'তে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন না। তিনি সৌন্দর্য বোধের মধ্যে দেখেছিলেন হংস বলাকার অভিগমন। রচিত হল 'বলাকা' কবিতা।

"ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। রক্ত আলোর মদেমাতাল ভোরে, সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ করে পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা। আয় দুরন্ত, আয়রে আমার কাঁচা।"

কচি-কাঁচাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের আহ্বান ব্যর্থ হয়নি। পরবর্তীকালে এরাই রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী, ধারক ও বাহক হয়ে সমাজে রবীন্দ্রপ্রভাব বিস্তার করেছেন - যার প্রভাব বেড়েছে বৈ কমেনি।

অন্যদিকে বিবেকানন্দের উপলব্ধি পরম প্রিয়তমের আনন্দোদ্ভাসিত মুখশ্রী দ্যুলোকে, ভুলোকে সব সৌন্দর্য পবিত্রতার মধুময় প্রকাশে দীপ্ত হয়ে দেখা দিল। তাঁর অন্তর থেকে লেখা কবিতা - "From that day forth where ere I roam, I feel Him standing by O'er hill and dale, high amount and vale, Far for away and high, Thou speakest in the mothers lay That shuts the babies eye; When innocent children laugh and play I see thee standing by,"

এভাবে স্বামীজি চেতনা, শান্তি, আনন্দ ও সৌন্দর্যবোধের পরিপূর্ণতায় খুঁজে পেলেন সত্য, জ্ঞান ও আনন্দের চির প্রস্রবণকে। পেলেন 'সৎ-চিৎ-আনন্দকে'। আবিষ্কার করলেন প্রকৃত ধর্ম ও শিক্ষাকে। তিনি বলেছেন - "ধর্ম হচ্ছে মানুষের ভিতর যে ব্রহ্মত্ব প্রথম থেকেই বিদ্যমান। তারই প্রকাশ" (বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড) আর "শিক্ষা হচ্ছে, মানুষের ভিতর যে পূর্ণতা প্রথম থেকেই বিদ্যমান, তারই প্রকাশ।" (বানী ও রচনা, পঞ্চম খণ্ড) এভাবে প্রাপ্ত শিক্ষা দ্বারা ব্যক্তির মধ্যে সুপ্ত ইচ্ছাশক্তি (Will Power) উদ্বোধন করে তার প্রবাহ সঙ্ঘটিত করতে হবে। শিক্ষার লক্ষ্য হল মানুষ গড়া; ধর্মের উদ্দেশ্যও তাই।"

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তখন যৌবনমত্ত, প্রেম ও সৌন্দর্যের পূজারী। খুঁজে চলেছেন - "... কোথা সেই হাসি প্রান্ত চুম্বন তৃষিত/ রাঙা পুষ্পটুকু যেন প্রস্ফুট অধর/ কোথা কুসুমিত পূর্ণ বিকশিত/ কম্পিত পুলকভরে যৌবনকাতর।"

কিশোর-কিশোরীদের জাগৃত করলেন - "... সেই নিরালায় সেই কোমল আসনে/ দুইখানে স্নেহস্ফুট স্তনের ছায়ায়/ কিশোর প্রেমের মৃদু প্রদোষ কিরণে/ আনত আঁখির তলে রাখিবে আমায়...।"

এর বিপরীতে স্বামী বিবেকানন্দ এই রূপ জাগতিক রূপ ও সৌন্দর্যের জগৎ থেকে নিজেকে সংবরণ করে লিখেছেন - "নাহি সূর্য, নাহি জ্যোতিঃ, নাহি শশাঙ্ক সুন্দর; ভাসে ব্যোমে ছায়াসম ছবি বিশ্ব চরাচর।/ অস্ফুট মনআকাশে, জগৎ সংসার ভাসে, ওঠে ভাসে ডোবে পুনঃ অহং স্রোতে নিরন্তর।/ ধীরে ধীরে ছায়াদল, মহালয়ে প্রবেশিল, রহে মাত্র 'আমি আমি' - এই ধারা অনুক্ষণ।/ সে ধারাও বন্ধ হল, শূণ্যে শূণ্য মিলাইল, অবাঙমনোসোগোচরম, বোঝে প্রাণ - বোঝে যার।" (বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড)

স্বামী বিবেকানন্দের কাছে প্রেমের অভিব্যক্তি তাঁর লেখা অন্য একটি কবিতায় ধরা পড়ে - "হৃদিবান নিঃস্বার্থ প্রেমিক। এ জগতে নাহি তব স্থান, সয়? লৌহপিণ্ড সহে যে আঘাত, মর্মর মুরতি তা কি স্থান। হত জড়প্রায়, অতি নীচ, মুখে মধু, অন্তরে গরল-সত্যহীন, স্বার্থপরায়ণ, তবে পাবে এ সংসারে।" (বাণী ও রচনা, ষষ্ঠ খণ্ড)

তাই প্রেমের অন্তহীন আকাঙ্খায় প্রেমিক বিবেকানন্দ তাঁর লেখা প্রিয় কবিতায় লিখেছেন - "অনন্তের তুমি অধিকারী, প্রেমসিন্ধু হৃদে বিদ্যমান, 'দাও দাও' - যেথা ফিরে চায় তার সিন্ধু, বিন্দু হয়ে যান।..."

রবীন্দ্রনাথের যৌবনে লেখা অনেক কবিতার উৎস ছিল শৃঙ্গার রস। আর বিবেকানন্দের কবিতায় ছিল বীর রস। বিবেকানন্দের লেখা কবিতা মার্জিত রুচির তৃষ্ণা মেটাতেও সক্ষম ছিল। বিবেকানন্দের রচনার মূল লক্ষ্য ছিল যুবক-যুবতীদের চরিত্রবল, পরার্থ তৎপরতা, সিংহ সাহসিকতা।

বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতা যুবসমাজের চরিত্র গঠনের পরিপন্থী।

কিন্তু বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ দুজনে দুই মেরুতে অবস্থান সত্ত্বেও দুজনের আদর্শ ও শিক্ষার উৎস ছিল উপনিষদ। দুজনেই ছিলেন 'সত্যম-শিবম্-সুন্দরম'-এর পথিক। দুজনেই আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন উপনিষদের শিক্ষাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেছেন 'বিশ্বভারতী' আর বিবেকানন্দ 'রামকৃষ্ণ মিশন'-এর মাধ্যমে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চরিত্র গঠন করাই ছিল দুজনের মূল উদ্দেশ্য।

রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের ভাবধারার অনুকরণে বলেছেন - "বালকদিগের অধ্যয়নের কাল একটি ব্রত যাপনের কাল। মনুষত্বলাভ স্বার্থ নহে, পরমার্থ - ইহা আমাদের পিতামহেরা জানিতেন। এই মনুষত্বলাভের ভিত্তি যে শিক্ষা তাহাকে তাঁহারা ব্রহ্মচর্যব্রত বলিতেন। এ কেবল পড়া মুখস্ত করা এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নহে - সংযমের দ্বারা, ভক্তি শ্রদ্ধার দ্বারা, শুচিতার দ্বারা, একাগ্র নিষ্ঠা দ্বারা, সংসার শ্রমের অতীত ব্রহ্মের সহিত অনন্ত যোগ সাধনের জন্য প্রস্তুত হইবার সাধনাই ব্রহ্মচর্য ব্রত... ইহা ধর্মব্রত। পৃথিবীতে অনেক জিনিষই কেনাবেচার সামগ্রী বটে, কিন্তু ধর্ম পণ্যদ্রব্য নহে।"

১৮৯৯-১৯০০ এই সময়কালে দেশে শিক্ষা কেমন হবে প্রসঙ্গে প্রিয়নাথ সিংহের সাথে স্বামী বিবেকানন্দের কথোপকথনের কিছু অংশ হুবহু তুলে ধরছি -

স্বামীজি - দেশের মহাদুর্গতি হয়েছে, কিছু কর রে। ছোট ছেলেমেয়েদের পড়বার উপযুক্ত একখানাও কেতাব নেই।

প্রশ্ন - বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তো অনেকগুলো বই আছে।

স্বামীজি - 'ঈশ্বর নিরাকার চৈতন্য স্বরূপ,' 'গোপাল অতি সুবোধ বালক', ওতে কোনো কাজ হবে না। ওতে মন্দ বই ভাল হবে না। রামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ থেকে ছোট ছোট গল্প নিয়ে অতি সোজা ভাষায় কতকগুলি বাংলাতে আর কতকগুলি ইংরাজি কেতাব চাই। (বাণী ও রচনা, ১ম খণ্ড)

এই সমসাময়িক কালেই অর্থাৎ ১৯০০ সালে রবীন্দ্রনাথের 'কথা ও কাহিনী' প্রকাশিত হয়েছিল। এই কাব্যগ্রন্থের কাহিনীগুলির বিষয়বস্তু ছিল - বৌদ্ধ কথা, রাজপুতদের বীরত্ব, শিখ বীরত্ব, মারাঠী বীরত্ব, ভক্তমাল থেকে বৈষ্ণব গল্প, মহাভারতের গল্প ইত্যাদি।

এর থেকেই জানা যায় শিক্ষায় পাঠ্যপুস্তক কেমন হবে, সে সম্বন্ধে বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট মিল ছিল।

বিবেকানন্দের লেখা 'প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য' গ্রন্থটির প্রশংসা করে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন - "যেমন ভাব, তেমনি ভাষা। তেমনি সুক্ষ্ম উদার দৃষ্টি আর পূর্ব পশ্চিমের সমন্বয়ের আদর্শ দেখে অবাক হতে হয়।"

পরবর্তীকালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথ 'প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য' গ্রন্থখানি পাঠ্যরূপে প্রবর্তিত করেন।

তেমনি স্বামী বিবেকানন্দের নিজের রচনাবলীর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের 'অপমানিত' কবিতাটির উল্লেখ খুঁজে পাই।

দুজনার মধ্যে কিছু বিরোধ থাকলেও সাদৃশ্যও ছিল প্রচুর। এর বিস্তৃত বিবরণ দিয়ে এই লেখার আকার বৃদ্ধি করে লাভ নেই। অথবা এই প্রবন্ধটি এখানেই শেষ করা যেত কিন্তু বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থার এই দুরবস্থার উৎস সন্ধানে, বিভিন্ন চক্রান্ত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ ইত্যাদির বিস্তৃত বিবরণ পাঠকবর্গকে জানানো অত্যাবশ্যক মনে করি।

ভারতে সর্বপ্রথম শিক্ষার ওপর আঘাত করেছিল আমাদেরই প্রাচীন শাস্ত্র 'মনু' সংস্কৃতি অর্থাৎ ব্রাহ্মণ্যবাদ। ব্রাহ্মণরা তখন আশঙ্কিত হয়েছিলেন যে শুদ্ররা যদি এভাবে বৈদিক শিক্ষার আলোকে শিক্ষিত হয় তবে ভবিষ্যতে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য খর্ব হবে। সমূহ বিপদের আশঙ্কায় 'মনু' ব্রাহ্মণদের নির্দেশ করলেন শুদ্রদের যেন শিক্ষাদান না করা হয়। ব্রহ্মবাদী ব্রাহ্মণ পুরুষরা বরং শ্মশানগামী হবেন, তথাপি ঘোর আপৎকাল উপস্থিত হলেও শুদ্রদের বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া থেকে যেন বিরত থাকেন। শুদ্রদের বেদপাঠ, গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। এর পরিণামে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ও কিছু ক্ষত্রিয়দেরই শিক্ষার অধিকার দেওয়া হল। এভাবে ভারতের অধিকাংশ জনতা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে স্থায়ীভাবে বঞ্চিত হলেন। নারীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হল।

দীর্ঘকাল এই অবস্থার পরিণামে অশিক্ষা, কুসংস্কার, দারিদ্র, শোষণ, অত্যাচারে এক বৃহত্তর সমাজ অতল অন্ধকারে ডুবে গেল।

এরপর ভারতে বহিরাগতদের আক্রমণে দেশ বিধ্বস্ত হল। মোগল-পাঠান আক্রমণে সর্বাঙ্গীন শিক্ষা সংস্কৃতির অবলুপ্তি ঘটল।

তাইতো স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন - "যদি ব্রাহ্মণের ছেলের একজন শিক্ষকের আবশ্যক, চণ্ডালের ছেলের দশজনের আবশ্যক। কারণ যাহাকে প্রকৃতি স্বাভাবিক প্রখর করেন নাই তাহাকে অধিক সাহায্য করিতে হইবে। অর্থাৎ শিক্ষাদানের সময়ই পিছিয়ে পড়া মানুষের দিকে অধিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।"

।। ৪ ।।

পরবর্তীকালে ইংরেজ শাসনে ধর্মান্তরণের সাথে সাথে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হল। পুনরায় শুরু হোল চক্রান্ত - ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে লর্ড মেকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন - "আমি সারা ভারত পরিভ্রমণ করেছি, আমি এমন একজনকেও পেলাম না যে, সে ভিক্ষুক বা চোর। এই দেশে এরূপ ধনসম্পদ উচ্চ মূল্যবোধ এবং প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ দেখেছি। কখনো আমরা এই দেশকে জয় করতে পারব না - যদি না আমরা এই জাতির মেরুদণ্ড স্বরূপ আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতিকে ভাঙতে পারি। অতএব এই সভায় প্রস্তাব রাখছি ভারতের প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং সংস্কৃতির পরিবর্তে এরূপ শিক্ষাপ্রণালী প্রচলিত করতে হবে যে তারা ভাবতে শিখবে, তাদের নিজস্ব যা কিছু সংস্কৃতি তা থেকে বিদেশী এবং ইংরেজদের সবকিছুই ভাল এবং উন্নততর মানের। এই ভাবনায় তারা আত্মমর্যাদা ও নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলবে, তখনই তারা সত্যিকারের পরাধীন জাতি হয়ে পড়বে - যা আমরা চাই।" এভাবেই মেকলের তৈরি শিক্ষানীতি অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার এইদেশে শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন করেন; ফলে ভারতবর্ষের সবকিছুই মন্দ - এই মনোভাব গড়ে উঠল তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মধ্যে। (সূত্রঃ উদ্বোধন, মাঘ ১৪২৪ সংখ্যা, স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা দর্শন ও বর্তমান সমাজ; অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়, পৃষ্ঠা-৫)

এর প্রভাবে শিক্ষার শুধু পাশ্চাত্যকরণই নয় ভারতে ইতিপূর্বে বেদ-উপনিষদের প্রাচীন শিক্ষার আদর্শ বিস্মৃত হল।

শুধু তাই নয় ইংরেজদের চক্রান্তে বেদ-উপনিষদের এবং আর্য তত্ত্বের বিকৃত এবং অপব্যাখ্যা প্রচারিত হল। এরপর ভারত স্বাধীন হওয়ার পরেও মেকলের শিক্ষা পদ্ধতি অপরিবর্তিত রইল। এবারও ভারতের প্রাচীন বৈদিক ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদি বর্জিত হল।

স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ও আদর্শকে মান্যতা না দিয়ে, পুরোপুরি বর্জন করা হল। এভাবে ধর্মের গ্লানি ও শিক্ষার অবনমনে ধীরে ধীরে সমাজে নেমে এল বিভীষিকা।

ক্রমে ভারতীয় রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধির সৌজন্যে গণতন্ত্র, কোণঠাসা হল। ইমারজেন্সীর সৌজন্যে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হল। বিরোধী রাজনীতিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হল। বিনা কারণে কারারুদ্ধ করা হল। এর প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি হয়েছিল।

পশ্চিমবাংলায় সিদ্ধার্থশঙ্করের রাজত্বে প্রথম শুরু হল রাজনৈতিক হিংসা। বিরোধীদের ওপর অত্যাচার, অবিচার এবং বিনাবিচারে হত্যার রাজনীতি। রক্তাক্ত হল রাজপথ। এক প্রজন্মকে নিঃশেষ করার ষড়যন্ত্র।

অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী শাসনের উদ্ভব হল। মানুষ এক নতুন সূর্যের স্বপ্ন দেখা শুরু করল।

সে সূর্য লাল সূর্য। কিন্তু অচিরেই মানুষের সে স্বপ্ন ভঙ্গ হল। বস্তুতপক্ষে বামপন্থী রাজত্বেই শুরু হল চরম অব্যবস্থা। শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনীতি, শিক্ষক, আচার্যদের অবমাননা। ঘেরাও মারধোর এমনকি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক গোপালচন্দ্র সেনকে হত্যা করা হল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অব্যবস্থা চরম রূপ ধারণ করল। এরপর ডাক্তাররাও বাদ গেল না। কিন্তু এইসব অপকর্মের কোনো বিচার হল না। হত্যাকারীদের সাজা হল না। সমস্ত প্রদেশে এক আতঙ্কের পরিবেশে সাধারণ মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত।

রামকৃষ্ণ মিশন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বামীজীরাও বাদ গেলেন না। অপমানিত ও লাঞ্ছিত হলেন। সবমিলিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে এক অরাজকতার সৃষ্টি হল। ক্রমে বিড়লার মতো এক প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিকে প্রকাশ্য দিবালোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধোর করা হল। প্রতিবাদে বা ভয়ে রাজ্যের সিংহভাগ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, কারখানা অন্য প্রদেশে স্থানান্তরিত হল।

দীর্ঘকাল মানুষ এই ব্যবস্থায় মুক্তি খুঁজতে গিয়ে অবশেষে ২০১১ সালে তৃণমূল পার্টিকে রাজ্যে শাসনভার সঁপে দিলেন। কিন্তু এবার শুধুমাত্র শিক্ষাই নয়, মানুষের চরিত্রেরও চরম সংকট দেখা দিল।

অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে গেল এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে।

ভারত কোনোদিনই রবীন্দ্রনাথ ও স্বামীজির শিক্ষার আদর্শকে গ্রহণ করেনি। অথচ শিক্ষা সম্পর্কে বিবেকানন্দের যে আদর্শের প্রতিচ্ছবি ১৯৭২ সালের ইউনেক্সোর প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। সেটির নাম - 'Learning to be'। প্রতিবেদনটিতে কি ভাবে একজন সম্পূর্ণ মানুষ তৈরি হয়, সেটাই আলোচিত হয়েছে। ইউনেস্কোর পরামর্শ ছিল - 'Education to be'!

বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য হল শারীরিক, বুদ্ধিগত, আবেগপ্রবণ, নৈতিক প্রভৃতি গুণের সমন্বয় যা কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে একটি সম্পূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে, বস্তুত একটি শিশু যখন শিক্ষামুলক প্রক্রিয়ার অঙ্গনে প্রবেশ করে, তখন বেশকিছু প্রভাব তার নিজস্ব ছায়া ফেলে যেমন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, তার পারিবারিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি... ইত্যাদি।

১৯৮৬ সালে ভারত সরকারের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সরকার স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে পশ্চিমী চিন্তাধারার ওপর অধিক পরিমাণে জোর দেওয়া হয়েছে, যেটা ভুল। শিক্ষানবীশ থাকাকালীন ভবিষ্যৎ শিক্ষকদের যথেষ্ট পরিমাণে ভারতীয় দর্শন বা শিক্ষা সম্পর্কে মনস্তাত্ত্বিক ধারণাগুলোর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় না। এই রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে মূল্যবোধের একটা ক্রমবর্দ্ধমান অবক্ষয় হচ্ছে, শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে এটি একটি বিপজ্জনক দিক। (সূত্রঃ স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষাদর্শন ও বর্তমান সমাজ - অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়, উদ্বোধন, ফাল্গুন ১৪২৪, পৃষ্ঠা-১০১)

অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিক্ষায় চরিত্র নির্মাণ প্রসঙ্গে কিছু একটা করার ভাবনা-চিন্তা করছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতে বিশেষ করে যেখানে একটা বালকের পক্ষে মোবাইলে ব্লু-ফিল্ম দেখা অতি সুলভ সেখানে চরিত্র নির্মাণ কিভাবে সম্ভব কেউ কি একবার ভেবে দেখবেন। সর্বশক্তিমান কেন্দ্র সরকারের পক্ষেও সম্ভব নয়। একবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে তা সম্ভব হয়নি। হবেও না।

সুতরাং চরিত্র নির্মাণের প্রতিশ্রুতির রঙীন স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই।

স্বামী বিবেকানন্দ বহু পূর্বেই বলে গেছেন, "ধর্ম এমন একটি ভাব, যাহা পশুকে মনুষত্বে ও মানুষকে দেবত্বে উন্নীত করে।"

তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে কোনওভাবেই চরিত্র নির্মাণ সম্ভব নয়।

শিক্ষার অবক্ষয় সম্বন্ধে অনেক আগেই রাজাগোপালাচারী মন্তব্য করেছিলেন - "আমরা কিভাবে একটা গোটা প্রজন্মকে মানুষ করছি সম্পূর্ণ নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ছাড়া।

...আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজন হল আমাদের নিজেদের সঙ্গে আমাদের প্রাচীন ঋষিদের একটি যোগসূত্র স্থাপন করা; তাহলে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ একটি শক্ত পাথরের ন্যায় কাঠোমোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যথায় বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়বে।"

রাজাগোপালাচারীর উক্তি যে বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রবন্ধ শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের উক্তি দিয়ে - শেষ করব বিবেকান্দের সংস্কৃত আবৃত্তি দিয়ে। ভর্তৃহরির এই শ্লোক স্বামীজি সর্বদা উচ্চারণ করতেন।

"নিদন্ত নীতিনিপুনা যদি বা স্তবস্তুলক্ষ্মীঃ সমাবিশতু গচ্ছত বা যথেষ্টংঅদ্যৈব বা মরণমস্ত শতান্তরে বান্যায্যাতে পথঃ প্রবিচলন্তি পদং ন ধীরাঃ।।"

অর্থাৎ 'নীতিনিপুণ'রা নিন্দাই করুন বা স্তুতিই করুন, লক্ষ্মী আসুন বা যেখানে ইচ্ছা চলে যান, মরণ আজই হোক বা শতবৎসর পরেই হোক, ধীর ব্যক্তিরা ন্যায়পথ থেকে কখনও এক-পাও বিচলিত হন না।

স্বামীজির মতে - "সমাজকে বদলাতে হলে সেই পরিবর্তনের জন্য নিজেদের বদলে নিতে হয়, অনেক পুরোনো সংস্কার ও অভ্যাস ছাড়তে হয় - নিজেকে না। বদলে সমাজ বদলাবার ভাবনা একরকম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় মাত্র।"


তথ্যসূত্রঃ

১। চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ - রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা প্রকাশিত।
২। রবীন্দ্রনাথ ও সংস্কৃত সাহিত্য - কল্যানীশঙ্কর ঘটক। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত।
৩। বাণী ও রচনা - স্বামী বিবেকানন্দ। রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা প্রকাশিত।
৪। উদ্বোধন পত্রিকা - রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা প্রকাশিত।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।