বিবিধ

কৃষ্ণনগরে কাজী (ত্রিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



ইনাস উদ্দীন


[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ৩০

বেনিয়াটোলার মুখে হ্যারিসন রোডে হারাধনের চায়ের দোকান সারাদিন জমজমাট। তবে সন্ধ্যার দিকে নামীদামি লেখক-কবিদেরও দেখা যায় কাঁধের ঝোলা পাশে রেখে আড্ডা দিতে। এইসব ঝোলা কাঁধে কবি-সাহিত্যিকরা কে কিরকম চা খায়, কত ঘন ঘন চা খায় সেসব হারাধনের মুখস্ত। আধঘন্টার মধ্যে না চাইতেই নজরুলের সামনে দ্বিতীয় কাপ চা।

নজরুলের চোখেমুখে একটা দুশ্চিন্তার ছাপ। লাঙলের অফিস যেতে হবে। মুজফফর আহমদ, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিশ্চয় আছেন সেখানে। দু'দিন পরেই এলবার্ট হলে সাহায্য রজনী - পার্টি ফাণ্ডে টাকার দরকার। কথাবার্তা সেরে সকালের ট্রেনেই কৃষ্ণনগর ফিরতে হবে। হেমন্তদাকে কথা দেওয়া আছে, দিনাজপুরে যেতেই হবে। কিন্তু মুরলীধর বসুর নতুন ভাবনার কথা শুনে নজরুল কিছুটা গুম মেরে আছেন। ব্যাপারটা মোটেও হাল্কা ভাবে নিতে পারছেন না। সাহিত্য-সামাজিক ক্ষেত্রে যে কোনো নবীন উদ্যোগকে স্বাগত জানানো নজরুলের অভ্যাস। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করা বা ভবিষ্যৎ কিরকম হতে পারে তা নিয়ে ভাবিত হওয়া তাঁর ধাতে নেই। কল্লোলের পাশাপাশি আরেকটা মাসিকপত্র যদি প্রকাশ হয় তো খারাপ কী? ভালোই তো! কিন্তু নজরুলের ভিতরে কোথায় কেউ যেন একটা কু গাইছে। বারবার মনে হচ্ছে - শৈলজাদের এই সিদ্ধান্ত ঠিক হচ্ছে না। কেন এরকম মনে হচ্ছে? সেটা কি গোকুল নাগের স্মৃতি ঠেলে ওঠা আবেগের জন্য?

'মুরলীদা' নজরুল ধীর এবং যথেষ্ট ভাবিত কণ্ঠেই বললেন, 'শৈলজাসহ তোমরা যখন ঠিক করে ফেলেছ, তখন নিশ্চয় সবদিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছ। আমার কিন্তু খুব একটা ভালো লাগছে না। দীনেশরঞ্জন ব্যবসার দিকটা ততো ভালো বোঝে না, বুঝতেও চায়না সেটা ঠিক। কিন্তু কল্লোল ইতিমধ্যে বাংলা সাহিত্যে সেই অর্থে বিদ্রোহীদের একটা আস্তানা সৃষ্টি করে ফেলেছে। গুরুদেব নিজেই একটা প্রতিষ্ঠান। তাঁকে ঘিরে থাকা স্তাবকেরা কল্লোলের ঔদ্ধত্যের প্রকাশকে ভালো চোখে তো দেখেই নি, বরং গুরুদেবের অসম্মান অবমাননা ইত্যাদি বলে তাঁর কান ভাঙানোর প্রভূত চেষ্টা করেছে। অথচ গুরুদেব নিজে কল্লোলকে স্বাগত জানিয়েছেন, এবং তা যে অন্তর থেকেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁর অন্তর প্রকৃতই ঋষিতুল্য। এইরকম অবস্থায় তুমি যাই বলো --- কালিকলম কিন্তু কল্লোলের এই শক্তিকে দুর্বল করে দেবে।'

- কাজী, তুমি একটু বেশি করে ভাবছ। কল্লোল তো আমাদের প্রাণের সম্পদ। আমরা তো কোথাও যাচ্ছি না। তাছাড়া দীনেশের সাথে কোনো বিবাদ নেই। বিতর্ক হয়েছে বটে, কিন্তু দীনেশ কল্লোলে বড়ো প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞাপন নেওয়া, গল্প-উপন্যাস প্রকাশ করা - অন্তত যা থেকে কিছু অর্থ-সংস্থান হবে - সেসব কথায় একেবারেই কর্ণপাত করতে চায়নি। বরদা এজেন্সির শিশির নিয়োগীর সাথে একটা কথাবার্তাও হয়েছে। উনি আমাদের উপন্যাস ছাপানোর দায়িত্ব নেবেন। এটা যে একটা সুযোগ সেটা দীনেশ মানতে চায়না।

নজরুল বেশি আর কিছু বলতে চাইলেন না। গোকুলের অভাবে এমনিতেই কল্লোলের প্রাণশক্তি অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। নতুন একটা মাসিক মানেই প্রেমেন, শৈলজা, মুরলীদা - সবার মন সেখানেই পড়ে থাকবে। হয়ত অচিন্ত্যও তাই করবে।

- তোমরা যখন মনস্থির করেই ফেলেছ, আমার আর কিছু বলার নেই। শুধু বলব, কল্লোল থেকে দূরে থেকো না। একটা কথা আজ বলি মুরলীদা - আমার বিদ্রোহী কবিতা, বিদ্রোহী ভাবনা, ধূমকেতু, নবযুগ, লাঙল যার কথাই বলিনা কেন

- সেখানে কামান থেকে আগুনের গোলা ছুটেছে। সে দ্রুতগতির সাথে পাল্লা দিয়ে সাধারণ সাহিত্যের মানুষ বেশি কাছে আসতে পারেনি। বলা ভালো, বেশি মানুষকে কাছে টানতে পারেনি। কল্লোল কামান দাগে নি, কিন্তু নবীন প্রজন্মের বুকে আগুন জ্বালিয়েছে। আপাত ধিকিধিকি, কিন্তু সে আগুনের বিস্তার ঘটেছে বেশি। কলকাতার বুকে কল্লোল জ্বলন্ত অগ্নিকূপ।

- তুমি বৃথাই অত ভাবছ কাজী! কল্লোল আমাদের প্রাণশক্তির উৎস, আমাদের প্রেম। তুমি কিন্তু কালিকলমে লিখবে। ইদানীং তুমি লিখছই না দেখছি।

নজরুল অনেকক্ষণ পরে হাসিতে ফেটে পড়লেন। হারাধন বুঝে গেল এক্ষুণি আরেক ভাঁড় চা লাগবে।

- আচ্ছা, ইদানীং কম লিখছি কথা ঠিক। গত দুই সংখ্যা লাঙলেও কিছু লিখতে পারিনি। ইচ্ছে হলে লিখব, নইলে না। তবে কল্লোল হোক আর কালিকলম - মানুষ তো সেই তোমরাই! তোমরা ছাড়া কলকাতা শহরে কে আর আমার নিকটজন আছে? আমি তোমাদের সঙ্গেই আছি। শুভেচ্ছা রইল। প্রেমেনকেও জানিও, কালিকলম নামটা কিন্তু বেশ হয়েছে। আজ আর নয়, লাঙলের অফিসে যেতে হবে।

- হ্যাঁ, তোমরা তো আবার কৃষক-শ্রমিক দলের জন্য বিশেষ রজনী করছ। ইউরোপীয় মহিলার নৃত্য পরিবেশন হবে। আজকেই লাঙলে দেখলাম। তোমার তো অনেক দায়িত্ব!

- তোমার দেখা হয়ে গিয়েছে?

- দেখব না! লাঙল তো আগে নিজের পাড়ায় চাষ সেরে অন্য মাঠে যাবে! কিন্তু কাজী - সিরিয়াসলি বলছি, সব্যসাচীর পরে তোমার আর তেমন লেখা দেখিনি। তোমার কলম ঈশ্বর প্রদত্ত, সর্বহারা সাধারণ মানুষকে ভালোবেসেই সে কলম তীরের বেগে ছোটে। কৃষ্ণনগরে গিয়ে তুমি অতিরিক্ত রাজনীতির পাঁকে ডুবে যাচ্ছ। ও পথ তোমার জন্য নয়।

- মুরলীদা, আমি তো রাজনীতিরই লোক! কবে আবার আমি রাজনীতির বাইরে ছিলাম? আমার ধূমকেতু, নবযুগ, লাঙল সবই তো রাজনীতি নিয়ে? বিদেশী শাসনের অবসানে দেশের মুক্তি - এটাই তো আমার জীবন, আমার সাহিত্য, কবিতা সবকিছুরই ধ্যানজ্ঞান!

- সে তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু যেগুলো তুমি বললে সেগুলো সবই লেখা এবং ছাপার মাধ্যমে, মাঠে ময়দানে। তোমার অন্তরের কথন, তোমার স্বপ্ন, তোমার আরাধ্য সুন্দর তোমার কলম দিয়েই আসবে। সেভাবেই এসেছে। তার জন্য রাজনৈতিক দলের দরকার হয়নি। চারিদিকে রাজনীতির নোংরামি দেখছ না? দেশবন্ধু চলে যাবার পর দেশহিতৈষী বরেণ্য নেতাদের কদর্য চেহারা কেমন বেরিয়ে আসছে দেখছ না? কংগ্রেসের কর্মীসঙ্ঘ নানারকম সেবামূলক কাজটাজ করছে, ভালোই করছে। কিন্তু অমরবাবু কর্মীসঙ্ঘকে দিয়ে কী করাচ্ছে দেখছ? স্বদেশীয়ানার নামে একটা হিন্দুয়ানী ভাবনা ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কংগ্রেস নাকি মুসলমানদের মাথায় তুলছে। বেঙ্গল প্যাক্ট আমারও পছন্দ হয়নি। কলকাতা করপোরেশনে সুভাষ বাবু ঢেলে মুসলমানদের চাকরি দিয়ে জেলে চলে গেলেন। মুসলমানদের কিছু চাকরি হলো ঠিকই, কিন্তু ফল কী হলো? অমরবাবুরা মুসলিম বিরোধী প্রচারে নেমে পড়লেন। দেশবন্ধু থাকাকালীন কেউ কিন্তু চেঁচামেচি করেনি। হক সাহেবের মতো কৃষক দরদী অসাম্প্রদায়িক মানুষও লীগের বিপক্ষে প্রচারের নামে মুসলমানদের নিয়ে মাতামাতি করছেন, তাদের দরদী সাজছেন।

- মুরলীদা, সেগুলো দেখেছি বলেই তো অনেক খেটেখুটে অল্প ক'জন হলেও কৃষক-শ্রমিক দলকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। হিন্দু-মুসলমানের পরিচয়ে নয়, কৃষক-শ্রমিক পরিচয়ে দেখতে হবে সর্বহারা মানুষকে।

- ঠিকই করেছ। হেমন্তবাবু, মুজফফর সাহেব, শামসুদ্দিন এঁরা সবাই ভালো মন নিয়ে নিপীড়িত সাধারণ মানুষের জন্য দল তৈরি করছেন। কিন্তু তাঁরা প্রকৃত অর্থেই রাজনীতির লোক, তুমি তা নও। যত ভালো ইস্তেহারই লেখ, তোমার সাম্যবাদীর মানুষ আর এই রাজনীতি করা লোকদের মানুষ এক নয়। রাজনীতি আর পার্টির সংগঠনে ভাষণ দিয়ে ছুটে বেড়ানোর রাজনীতি তোমার জন্য নয়, ও পথ পাঁকের পথ। তোমার অস্ত্র কলম।

- মুরলীদা, তোমার প্রতিটি কথাই বুঝতে পারছি। ভিতর ভিতর অনুভবও যে করছি না তা নয় - ও পথ ঠিক আমার জন্য নয়। গত দু'বছর অভিজ্ঞতা তো কম হলোনা। অধিকাংশ নেতাদের দেখছি মুখে এক, কাজে আরেক রকম। তোমার কথা মিথ্যে নয়। তবে কী জানো - শুধু মনে হয় কবিতা লিখে নাম-যশ-খ্যাতি হয়ত হবে, কিন্তু সর্বহারা মানুষের জন্য সত্যিকারের কিছু করতে গেলে সংগঠন দরকার, পথে নেমে মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার। চারিপাশে প্রকৃত দরদী জনকল্যাণকামী মানুষ কম নেই, আন্তরিকতাতেও ঘাটতি নেই, শুধু খারাপ লাগে - ক্ষমতা আর ব্যক্তি ইগোর লড়াইয়ে তাঁদের চেহারা বদলে যেতে দেরি হয়না। যাইহোক, আজ নিজের সৃষ্ট স্রোতে নিজেই ভেসে চলেছি। জানিনা কোন কূলে গিয়ে ভিড়ব। আমি অতশত ভাবতে পারিনা মুরলীদা, আজকে উঠি।

হারাধনের ভাঁড় শেষ করে দ্রুত পায়ে হ্যারিসন রোড ধরে এগিয়ে গেলেন নজরুল। সন্ধ্যা নেমে এলো, অথচ নিজের দায়িত্বের জায়গা লাঙলের অফিসেই প্রবেশ ঘটেনি। গত কয়েকদিন সত্যিই লাঙলের কাজকর্ম বিশেষ দেখা হয়নি। মণিভূষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর মাথার উপরে মুজফফর আহমদ তো আছেনই। পুরোটা সময় দিচ্ছেন, তাতেই নিশ্চিন্ত। কিন্তু এখন তো পার্টির কাজ বেড়েছে। পত্রিকার জন্য তাঁরও সময়ের অভাব।

- যাক, বিদ্রোহী কবির দেখা মিলল তাহলে! মুজফফর আহমদ কটাক্ষ করে বললেন।

তাঁর টেবিল ঘিরে বেশ কয়েকজন বসে আছেন। দু-তিন জন অচেনা মানুষও আছেন।

- গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনা হচ্ছিল নিশ্চয়।

- ভাই কাজী, তোমার চেয়ে আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী হতে পারে? তুমি এসে গেছ, ব্যস! এলবার্ট হলের প্রোগ্রাম নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা কমে গেল! সৌমেন ঠাকুর কথা বলার আগেই অচেনা মানুষ দু'জন শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নজরুলের বসার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

নজরুল নিজেই একটা চেয়ার টেনে মুজফফর আহমদের পাশে গিয়ে বসলেন। দুশ্চিন্তা কেন? অনুষ্ঠান তো বেশ আকর্ষণীয় হবে বলেই মনে হচ্ছে। লাঙলে বিজ্ঞাপন যা ছাপা হয়েছে তাতে এমনিতেই হল ভর্তি হয়ে যাবে। কৃষক-শ্রমিকদের সাহায্যকল্পে ইউরোপীয় নৃত্যশিল্পী - সেটাই তো বিশেষ আকর্ষণ!

- সেই শিল্পীর প্রাইভেট সেক্রেটারি তোমার সামনেই বসে আছেন। তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই - ইনি রাম ভট্টাচার্য। তাঁরই জার্মান স্ত্রী নৃত্য পরিবেশন করবেন। ইউরোপীয় নৃত্যের সাথে ভারতীয় নৃত্যকলার সমন্বয় নিয়ে ভালো ক্লাসিকাল চর্চা করছেন। তুমি কবি মানুষ, শিল্পীর চোখ, দেখো, তোমার ভালোই লাগবে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নজরুলের উত্তর - আমার আর দেখার সৌভাগ্য হবে না। ঐদিনেই দিনাজপুরে রওনা দিতে হবে - হেমন্তদার নির্দেশ।

সৌমেন্দ্রনাথ হাঁ হাঁ করে উঠলেন। তাই হয় নাকি! মণিকাদি স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে ফেলেছেন। তোমার গান আর বক্তব্য না হলে এলবার্ট হলের লোক টিকিটের পয়সা ফেরত চাইবে! মুজফফর সাহেব, ব্যাপারটা দেখুন। পার্টির ফান্ডের জন্য প্রথম সাহায্য রজনী, এলবার্ট হলে কাজীর উপস্থিতির প্রত্যাশা মানুষের কিন্তু থাকবেই।

- দেখো ভাই, মণিকা ঠাকুরের সাথে এখনো দেখা হবার সৌভাগ্য হয়নি। ঠাকুর পরিবারের এই গুণী মহিলার পরিচালনায় অনুষ্ঠান সাজানো হচ্ছে, সেই অনুষ্ঠানের আকর্ষণ কম নয়। কিন্তু হেমন্তদাকে কথা দিয়ে এসেছি।

- তোমার কথা দিয়ে কথা রাখার সুনামের কথা আমরা জানি কাজী। ও সম্মেলন হেমন্তদা ঠিক সামলে নেবেন। তুমি থেকে যাও।

মুজফফর আহমদ এতোক্ষণ বিনা মন্তব্যে সব শুনছিলেন।

বললেন - কাজী সাহেব থেকেই যান। অনুষ্ঠানটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিরঞ্জন বাবুর আসার কথা, হেমন্তবাবুর লোক। সম্ভবত শান্তিপুরে বাড়ি। দুটি বিজ্ঞাপন ও এসেম্বলির খবর নিয়ে আজ আসতে পারেন বলে হেমন্তবাবু জানিয়ে গিয়েছিলেন। তার মারফৎ খবর পাঠিয়ে দিন। তিনিও কাল কৃষ্ণনগরে যাবেন, সম্ভবত দিনাজপুরেও যাবেন।

সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে গেল। আধঘন্টার মধ্যেই নিরঞ্জন বিশ্বাস এসে কাগজপত্র দিয়ে গেলেন। নজরুলকে দেখামাত্র হৈহৈ করে উঠলেন। নজরুলও চিনতে পারলেন, কৃষ্ণনগরে গিয়ে প্রথম দিনেই হেমন্তদার বৈঠকখানায় শান্তিপুরের অনেকের সাথে দেখা হয়েছিল। নিরঞ্জন বিশ্বাসও ছিলেন তার ভিতরে। রাম ভট্টাচার্য এবং তাঁর বন্ধুর সাথেও ভাব জমল বেশ। তাঁর জার্মানী যাওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ, ভারতীয় নৃত্য বিষয়ে তাঁর আগ্রহ, দেশে ফিরে শান্তিনিকেতনে ধ্রুপদী নৃত্যের প্রশিক্ষণ - নজরুলের ভালো লাগল খুব। কলকাতায় দু'দিন থাকা হচ্ছে, পুরনো পরিবেশ ফিরে পাওয়ার একটা ভালো লাগায় মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল।

অফিস ফাঁকা হলে ঘরে তালা লাগিয়ে মুজফফর আহমদ নজরুলকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমহার্স্ট স্ট্রিটের মুখে একটা হোটেলে ঢুকলেন। মেঘনা হোটেল।

- বাঃ, নদীর নামে হোটেল! খুব কমই দেখা যায়। নজরুল বললেন।

- এটা আবিষ্কার করেছি। নামেই শুধু নয়, এখানে খাবারেও চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপের একটা গন্ধ পাই। আরাম করে মাছের ঝোলভাত খেতে খেতে মুজফফর আহমদ বললেন, 'আপনি আসাতে ভালোই হলো। ক'দিন ধরেই ভাবছি, পরশু হেমন্তবাবুর সাথেও একটু আলোচনা হলো - পার্টি যখন আলাদা গঠন হয়েছে, তার একটা মুখপত্র থাকা দরকার।'

মুজফফর সাহেবের কথার ধরণে নজরুলের মুরলীদার কথা মনে পড়ল। মনের কোণে আবার কেউ যেন কু গাইতে লাগল। সুরটা প্রায় একই ধরণের। লাঙলেরও পরিবর্তন হবে নাকি?

ঠিক তাই। লাঙলের অফিসেই পাশের ঘরে দুই তক্তপোষে দুই বন্ধুর গভীর কথোপকথন। কৃষক ও শ্রমিকদের সাংগঠনিক মুখপত্র হিসেবেই লাঙল ছাপা হচ্ছে, রাজনৈতিক ইশতেহারও প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন দল হিসেবে 'দ্য পীজ্যান্টস এন্ড ওয়ার্কার্স পার্টি অফ বেঙ্গল'-এর মুখপত্র হিসেবে লাঙলে একটা ঘোষণা থাকা দরকার। কিন্তু যেটা নীতিগত ভাবে শোভন হচ্ছে না তা হলো এর নাম এবং প্রতীক - লাঙল, যা শুধু কৃষককেই ফোকাস করে। শ্রমিকশ্রেণিকে লাঙল দিয়ে কভার করা যাচ্ছে না।

যুক্তির দিক দিয়ে ঠিক থাকলেও কল্লোলের জন্য যেরকম অনুভূতি হচ্ছিল, নজরুলের একইরকম অনুভব ঠেলে উঠছিল লাঙলের জন্য। মাত্রই মাস তিনেক বয়স লাঙলের। এরই মধ্যে মফ:স্বল গ্রামে এর জনপ্রিয়তা কৃষ্ণনগরে নিজের চোখে দেখেছেন নজরুল। শান্তিপুরে সব আগে লাঙল পৌঁছে যায়, কাড়াকাড়ি পড়ে। বিজয়লাল ঝোলার মধ্যে লাঙল নিয়ে ঘোরে। কিন্তু মুজফফর আহমদের উপর দিয়ে নজরুল কখনো কোনোদিন কথা বলতে পারেন নি। তিনি তো শুধু বন্ধু নন, অভিভাবক। বোহেমিয়ান বেহিসেবী নজরুল কাউকে তোয়াক্কা না করলেও এই একজনকে সত্যিকারের অভিভাবককে শ্রদ্ধা করেন, সম্মান করেন। তাছাড়া নিজে কৃষ্ণনগরবাসী। কলকাতায় বসে প্রকাশনার কাজকর্ম সব মুজফফর সাহেবকেই করতে হচ্ছে। তিনি অনেক দূরের ভাবনা ভেবেছেন। এসব রাজনীতির কথাবার্তার মধ্যেও নজরুলকে অবাক করে দিয়ে মুজফফর আহমদ বললেন - আপনি কিন্তু সাহিত্যে নজর কম দিচ্ছেন। গরম নিবন্ধ দরকার আছে বটে, তার সঙ্গে নরম কবিতাকে বিসর্জন দিলে হবে না।

(ক্রমশ)