[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]
(দশ)
ইদানিং মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে সৃজিত একদিন ভুটানি বস্তির চায়ের দোকানে যায় আর অন্যদিন পোড়ো জয়ন্তী স্টেশনের চায়ের দোকানে। দু'জনের কাছ থেকে শুধু গল্প শোনে। জয়ন্তীর গল্প। কোনও মানুষের গল্প পরিষ্কারভাবে শুনতে পায়নি তেমনভাবে। একটা চরিত্র খুঁজছে সৃজিত। তার লেখাটা আটকে গেছে এইখানে এসে। এই নদীকে যে লোকটা খুব প্রাণবন্তভাবে দেখেছে এমন একজন লোকের সন্ধান চাই তার। নদী তো জীবন। ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প শুনতে হবে তাকে। শুনতেই হবে। তারপর তো সেই কাহিনি শোনাবে নগরবাসীদের। ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়া প্রত্যেক মানুষের জীবন একই পথে যে অগ্রসর হয় তারই বিবরণী হোক তার এই নতুন উপন্যাস। এই ভাঙা সাঁকোর জীবনের মতো তার জীবনকে সে এক ধারাভাষ্যকারের জীবন করে তুলতে চায়। এই যে সাঁকো যা কিনা এই জয়ন্তীর ল্যান্ডমার্ক হয়ে নিজেকে ধারণ করে চলেছে সে কতভাবে কত দিন ধরে কত রূপে এই নদীকে দেখেছে! এই সাঁকো যদি কথা বলতে পারতো। সাঁকো পারে না কিন্তু সৃজিত তো পারে। বলতে না পারুক, লিখতে তো পারে। তাকে লিখে যেতেই হবে।
এই স্বেচ্ছানির্বাসনের দিন যেদিন শেষ হবে তার পর অঞ্জনার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সাহস সৃজিতের থাকবে না সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। অঞ্জনাও এরপর সৃজিতের সঙ্গে আর থাকবে না তা ভাল করেই জানে সে। সংসারের মধ্যে থেকে সৃজিতের বোহেমিয়ান লাইফ কাটানোর নেশা অঞ্জনা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। আর এই জয়ন্তী নদীর মতোই ভিতরে ভিতরে ক্রমশ অঞ্জনা শুকিয়ে গিয়েছে। সৃজিত যে ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি তা নয়। আসলে, এমন অনেক অনুভব আছে যা বুঝে নেবার পরও মানুষ কিছু করে উঠতে পারে না। এটাকে অঞ্জনা অপ্রেম নাম দিয়েছে। সৃজিত এই অপবাদ কখনোই মেনে নেয়নি। সে তার যুক্তি সাজিয়েছে নদীখাতে জমে থাকা নুড়িপাথরগুলোর মতোই। সৃজিত বরাবরই বলে এসেছে, ভালবাসার লোকের উপরই এরকম প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু অঞ্জনার কাছে এই উদাসীনতা অপ্রেমেরই সামিল। দিনের পর দিন অভিযোগ, অভিমান জড়ো হতে হতে দু'জনের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছিল। অদৃশ্য কথাটাও ঠিক নয়। ওরা দু'জন ভালই দেখতে পাচ্ছিল। বুঝতে পারছিল। অন্যদের কাছে অদৃশ্য করে রাখার ক্ষেত্রে অঞ্জনার অভিনয় দক্ষতা আর সৃজিতের স্যোসাল ক্রাইসিস একটা বড় ভূমিকা পালন করেছে।
পাঞ্জাবীর পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল সৃজিতের।
- হ্যালো বিনয়বাবু। বলুন কী খবর? কেমন আছেন?
- আমি তো ভালই আছি। আপনার লেখাপত্র কেমন চলছে?
- চলছে। মাঝপথে এসে একটু আটকে আছি। আশা করছি দিন পনেরোর মধ্যে শেষ করে ফেলব।
- আপনাকে একটু অসুবিধায় ফেলছি কিনা জানি না তবে আপনার একজন মুগ্ধ পাঠিকা আমার ওই হোম-স্টে'তে থাকতে যাচ্ছে। কাল সকালে পৌঁছবে।
- সে কি! আমার খবর চারদিকে ছড়িয়ে যাবে তো!
- যাবে না। আমি ওর বাবা, অরুণবাবুর সাথে কথা বলে নিয়েছি। আমার ছেলে অরিত্ররই বয়সী মধুপর্ণা। একটা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। ডিভোর্সী। খুব ব্রাইট ফিউচার ছিল। কিন্তু বোহেমিয়ান এক নাট্যকারের পাল্লায় পড়ে সব গেল। করোনাকালীন যাবতীয় স্ট্রেসের শিকার হয়ে এখন মধুপর্ণা ডিপ্রেশনের রুগী। দিন কুড়ির ছুটি নিয়ে আমার ওখানে একা থাকতে চেয়েছে। তবে আপনার কথা শুনে বেশ চনমনে হতে দেখলাম। বলল, "এতো আমার পরম সৌভাগ্য। মেঘ না চাইতেই জল! এরকম সঙ্গ পেলে আমি নিশ্চয় সুস্থ হয়ে উঠব।"
সৃজিত হো হো করে হেসে উঠল। নিজের হাসির আওয়াজটা নিজের কানেই বাজল খুব জোরে। সে যে সত্যিই হাসতে ভুলে গেছিল তার প্রমাণ মিলল আজ। অঞ্জনার এই অভিযোগটাও যে এত বড় সত্যি তা আজ বুঝতে পারল।
- নো প্রবলেম বিনয়বাবু। আমি দেখে নেব। আপনি যা বললেন, তাতে আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমার কাজে ব্যাঘাত না ঘটলে ভাল আর যদি আমার এই গুপ্ত নির্বাসনের কথা সবার কানে না যায় তাহলেই হ'ল।
- সে ব্যাপারে আপনাকে ভাবতে হবে না। আমি মধুপর্ণাকে আপনার এই নাম্বার দিলাম। শ্যামলালের নাম্বারও ওকে দেওয়া আছে। আপনাকেও আমি ওর নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। ওর বাবা আমার বড় দাদার মতো। কাজেই আমাকে বাধ্য হয়ে ওঁনার রিকোয়েস্ট রাখতেই হচ্ছে।
- আপনার সম্পত্তি। আমি এ ব্যাপারে কী জোর করতে পারি? আমার নিখোঁজ থাকার ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই ভয় পাচ্ছিলাম।
- কোনও ভয় নেই। আপনি আপনার লেখা চালিয়ে যান। আশা করি, মধুপর্ণার সাথে আলোচনায় আপনার লেখার সুবিধাও হতে পারে। ভালো থাকবেন।
সৃজিত ফোনটা পাঞ্জাবীর পকেটে ভরতে ভরতে আরেকবার হাসে। এবার নিঃশব্দে। চায়ের দোকানীকে একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে সিগারেট ধরায়। জয়ন্তীর শুকিয়ে যাওয়া শরীরের উপরে দু'একটা শুকনো গাছ কীসের গর্বে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুকনো শরীরে? এভাবেই কি আমরা সবাই শুকিয়ে যাচ্ছি ভিতরে ভিতরে?
- বাবু চা। আর কিছু লাগবে বাবু?
একটা বাচ্চা ছেলে বেঞ্চের উপর চায়ের গ্লাসটা রেখে সৃজিতকে প্রশ্ন করে। সৃজিত ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করে, "লেখাপড়া করিস না? স্কুলে যাস না?"
- লকডাউনের আগে যেতাম। এখন আর যাই না। স্কুলে নাম লেখানো আছে। ক্লাস ফোরে পড়ি। মিড-ডে মিল খেতে দুপুরে একবার স্কুলে যাই। বাকী সময়টা এই দোকানেই কাজ করি।
- কেন? লকডাউনে কী হল তোর?
- বাবা শহরে খবরের কাগজ দিত। লোকজন তো করোনার ভয়ে কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। বাবার রোজগার একদম কমে গেল। অন্য দোকানে কাজ খুঁজছিল। পায়নি। তাই আমাকে, মা'কে, দিদিকে সবাইকে কাজ করতে হচ্ছে। আর, বাবা ভ্যানে করে সবজি বেচে বেড়ায়। যদি কিছু বেঁচে যায় বা শুকিয়ে যায় তাই দিয়ে রাতে মা রান্না করে। গরম ভাত আর তরকারি।
- সারাদিনে কী খাস?
- এই তো এই দোকানে ঘুগনি আর পাউরুটি দেয়। দু'বার। সারাদিনে ওটাই খাই আমি।
- কী নাম তোর?
- রঞ্জু... সাব। আর কিছু লাগবে? না লাগলে তোমার একুশ টাকা হল।
সৃজিত বুঝতে পারে রঞ্জুর গুরুত্বপূর্ণ সময় সে তার চরিত্র অনুসন্ধানের প্রয়োজনে নষ্ট করছে। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে পঁচিশ টাকা বের করে দেয়। বলে, "বাকী চার টাকা তুই রেখে দিস।"
রঞ্জুর চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে খুব অস্বস্তি হতে থাকে সৃজিতের। তড়িঘড়ি সে বেরিয়ে আসে চায়ের দোকান থেকে। হোম-স্টে'র দিকে দ্রুত হাঁটা দেয়।
(ক্রমশ)
