গল্প ও অণুগল্প

আমার মা (পঞ্চবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই রাজ্যের ঘুম আমার চোখে এসে আমাকে মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমের রাজ্যে নিয়ে গেল। গতকাল শুতে শুতে রাত দুটো বেজে গিয়েছিল। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম শিউলির মেয়ে কাজল দাঁড়িয়ে। আমার ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় ছিল। সুলতা মাসিমার বাড়ি বাইরে থেকে দেখলে ভগ্নস্তূপ মনে হলেও ভিতরটা বেশ পরিপাটি। সুমিত যে ঘরেয় থাকতো সেখানেই আমার শোবার ব্যবস্থা হয়েছিল। ওখানে এখনো সাদা-কালো টি-শার্ট পরা সুমিতের ছবি টাঙানো আছে। মায়ের মন বোধ হয় এটাকেই বলে। ছেলে তাঁকে ছেড়ে কোন দূরদেশে বাস করছে অথচ মা এখনো তার পুরনো বই, তার ব্যবহৃত দ্রব্যাদি অতি সযতনে আগলে রেখেছেন। সবটাকে বাঁচিয়ে রাখার মতো মনের জোর বা শারীরিক অবস্থা হয়তো তাঁর নেই কিন্তু সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি সেই সাত রাজার ধন মানিকের মতো পাহারা দিচ্ছেন। এখনো সামান্য হলেও সুপ্ত বাসনা অন্তরে বাঁচিয়ে রেখেছেন - কোনো একদিন ঠিক সুমিত তার মা'কে দেখতে আসবে। এই বাসনা টুকু হৃদয়ে লালন করে আমাদের মায়েদের বেঁচে থাকা। আমিও বিশ্বাস করি - আমার মা-ও ঠিক একদিন তাঁর সমস্ত ভুল ভাবনা মন থেকে দূর করে আমার কাছে এসে বলবেন - বাবা সোনা আমার, তোকে চিনতে বড্ড দেরী হয়ে গেল।

ছোটো তক্তাপোশের পাশে পুরনো একটা টেবিলের উপর থরে থরে বই সাজানো। বেশির ভাগ বই-ই স্কুল কলেজের। কাজল বললো - দেখ কত বই! আমার খুব পড়তে ইচ্ছে করে কিন্তু আমি পারি না। তুমি আমাকে শিখিয়ে দেবে?

আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। শিউলি ওকে বললো - রাত হয়েছে মাম, এবার ঘুমোতে হবে। আমরা কিছুক্ষণ গল্পগুজব করবো তারপর বাড়ি যাবো। এখন মামাকে বিরক্ত কোরো না। 
আমি বললাম - হ্যাঁ, কাল সকালে তোমাকে গল্প শোনাবো। এখন মা যা বলছে সেটা মন দিয়ে শোনো কেমন?

কাজল গল্প শোনার জন্যই সকাল সকাল এসে হাজির। ওকে কাছে টেনে নিয়ে তক্তাপোশে বসালাম। পরপর দুটো মজার গল্প বললাম। তারপর বললাম - এবার স্কুলের পড়া করতে হবে। অনেক অনেক পড়াশোনা করে অনেক বড়ো হতে হবে। জানো তো তোমার মা পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল।

শিউলি তার জীবন সংগ্রামের কাহিনি বলতে শুরু করলো। ওর কথা শুনতে শুনতে বিস্মিত হয়ে গেলাম - বাবার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, মা এবং ছোটো ভাইটির অকাল মৃত্যুতে শোকাভিভূত হয়ে শিউলি পরের ভাইটিকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে চুপিসাড়ে পাড়ি দিয়েছিল এক অনিশ্চিত জীবনের পথে। স্টেশনে বাকি রাতটা কাটিয়ে ভোরের আলো ফোটবার আগেই ট্রেন ধরে সোজা চলে এসেছিল রানাঘাট। টিকিট না থাকায় টিকিট চেকার ওদেরকে নিয়ে যান চেকারদের কেবিনে। প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও পরে সবকিছু সামলে নিয়েছিল শিউলি - মা এবং ছোটো ভাইয়ের মৃত্যু, বাবার নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, গ্রামের খগেনবাবুর অত্যাচার, না খেতে পাওয়ার যন্ত্রণা একমাত্র ভাইটিকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলার তাগিদ এবং গ্রাম থেকে কপর্দকহীন অবস্থায় শহরে চলে আসার সমস্ত ঘটনা চেকার সাহেবের কাছে বলে শিউলি। সে কোনো কথাই গোপন করে না।

চেকার সাহেবের নাম কমল মুখোপাধ্যায়। দয়ালু এবং সজ্জন ব্যক্তি। ওনার দেশের বাড়ি মুড়াগাছার বামনপাড়ায়। বাজার থেকে প্রায় তিন-চার কিলোমিটার ভেতরে। মুড়াগাছা বাজারে ঢুকে কিছুটা দক্ষিণে দেওয়ান বাড়িকে বাঁয়ে রেখে একটা ছোটো নদী। নদীর ওপরে কালভার্টের ছোট্ট একটা ব্রিজ, ব্রিজ পেরিয়ে বাঁদিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে আঁকাবাঁকা পথ শেষ হয়েছে বামুনপাড়ায়। লিচু, আম এবং বাঁশের জন্য এই অঞ্চলের খ্যাতি সমগ্র ভারত জুড়ে আছে, এখানে শ'দুয়েক পরিবার বাস করে। মুড়াগাছা বাজার থেকে এখানে আসতে গেলে দিনের আলোতেই গা ছমছম করে। তাই এদিকে মানুষের যাওয়া-আসাটা খুব কম, ফলে রাস্তাঘাটেও উন্নতি তেমনটা চোখে পড়ে না। কমলবাবু রেলে চাকরি পাওয়ার পর প্রথম পোস্টিং পান রায়পুরে। বছর দুয়েক আগে তিনি রানাঘাটে আসেন। এখানে রেল কোয়ার্টারে তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে বাস করেন। গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা থাকেন। ওদেরকে দেখার মতো তেমন কেউ নেই। বাইরের কাজের জন্যঢ় একজনকে রাখা হয়েছে কিন্তু সে বড্ড অনিয়মিত। ওঁদের কথা ভেবে তিনি রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেন না। কমলবাবু জানেন তাঁর কাছে তাঁর পিতামাতার গুরুত্ব কতখানি। একদিকে চাকরি অপরদিকে বাবা-মা। একবার ভেবেছিলেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন। যে চাকরি তাঁকে তাঁর মা-বাবার পাশে থাকতে দেয় না সেই চাকরির তাঁর প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাবা ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে বলেছিলেন - বাবু, আমাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আমরা আর কতদিনই বা বাঁচবো? কিন্তু তোমার সামনে পড়ে রয়েছে উজ্জ্বল ভবিষ্যত। এই পাড়াগাঁয়ে থেকে তোমার কোনো বাসনাই পূর্ণ হবে না। ভবিষ্যতে তুমিও সন্তানের পিতা হবে। তাদেরকে ভালোভাবে মানুষ করতে হলে তোমাকে শহরে যেতেই হবে। আমাদের জন্য অত ভেবো না। আমি এ গ্রামকে বড্ড ভালোবাসি তাই এটাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হয়। এ গ্রাম ছেড়ে গেলে আমি হয়তো আর বাঁচবো না। বরং এখানে থাকলে আমি ভালো থাকবো। তুমি যাও, আমাদের আশীর্বাদ সবসময় তোমাকে আগলে রাখবে।

বাবার কথা শুনে কমলবাবু কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে চাকরি জীবনে ফিরে গেলেও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত মনে কাজ করতে পারেন না। যদি হঠাৎ করে ওঁদের কোনো সমস্যা হয় তখন নিজের মানুষ ব্যতীত কেউ জীবন বাজি রেখে ওঁদের সাহায্য করতে এগিয়ে এগিয়ে আসবে না। এমন একটা ব্যবস্থা করা দরকার যাতে কিছুটা নিশ্চিন্ত মনে তিনি তাঁর কাজটা করে যেতে পারেন।

শিউলির জীবনের বেদনাদায়ক কাহিনি শুনে কমলবাবুর নরম মন আর্দ্র হয়ে যায়। তিনি তখনই মনস্থির করে ফেলেন যে, এদেরকে তিনি তাঁর গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। ছেলে-মেয়ে দুটির একটি নিরাপদ আশ্রয় হবে পাশাপাশি বাবা-মাকে নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তাও কিছুটা লাঘব হবে। ওখানে ওরা যদি পড়াশোনা করতে চায় তাহলে মুড়াগাছা হাইস্কুলে ভর্তি করে দেওয়া যাবে। তিনি শিউলি এবং তার ভাইকে বসতে বলে চলে যান তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী বিপুলবাবুর কাছে। বিপুলবাবুকে সবকিছু জানিয়েয় দুদিনের ছুটি নিয়ে শিউলি ও তার ভাইকে নিয়ে চলে আসেন কোয়ার্টারে। স্ত্রী শেফালী তাঁর স্বামী কমলবাবুকে অসময়ে আসতে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে যান। সঙ্গে দুটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাকে দেখে তিনি আরও কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। কমলবাবু ঘরে ঢুকে তাঁর স্ত্রী শেফালীকে তাঁর পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি জানান - আজ দুপুরের ট্রেনে আমরা মুড়াগাছা যাচ্ছি।

শেফালী প্রথমে কিন্তু কিন্তু করলেও পরে তাঁর স্বামীর দুশ্চিন্তা ও নিজেদের কথা ভেবে আর আপত্তি করেন নি। কেননা প্রতিরাতে তিনি তাঁর স্বামীর অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা এবং মনোবেদনা লক্ষ্য করেছেন। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বড়ো রকমের কোনো বিপদ ঘটে যেতে পারে - এই আশঙ্কা করে তিনি তাঁর স্বামীর কথায় রাজি হয়ে যান।

(ক্রমশ)