
১৮৬৭ সালে ২৮শে অক্টোবর উত্তর আয়ারল্যান্ডে টাইরন প্রদেশে ভ্যানগ্যানার নামে ছোট্ট একটি শহরে মার্গারেটের জন্ম হয়। মার্গারেটের মাতৃগর্ভে থাকাকালীন তাঁর মা দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেছিলেন তাঁর সন্তান যদি নিরাপদে ভূমিষ্ঠ হয় তবে দেবতার কাজেই তাঁকে উৎসর্গ করবেন। ধর্মযাজক পিতা স্যামুয়েল রিচমন্ড শৈশব থেকে কন্যার দেবদুর্লভ ধর্মগত ও নৈতিক গুণপনা দেখে স্ত্রীকে মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, মার্গারেটের জীবনে এক বৃহত্তর আহ্বান আসবে, তিনি যেন তাকে সাহায্য করেন। ঠিকই তাই ঘটেছিল। পরবর্তীকালে তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করেন এবং মানব সেবায় নিযুক্ত হলেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষায়িত্রী কেসউইক গমন করলেন। ১৮৯০ পর্যন্ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষায়িত্রী হিসাবে নিযুক্ত রেখে ১৮৯২ উইম্বলডনে নিজেই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন।

যাই হোক্ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে নভেম্বর মাসে ইংল্যান্ডের ওয়েস্ট অ্যান্ড নামক স্থানে ড্রইংরুমে হিন্দুযোগী স্বামী বিবেকানন্দকে দেখার ও তাঁর কথা শোনার জন্য পনেরো ষোল জন অভ্যাগত উপস্থিত, যাদের মধ্যে একজন হলেন মার্গারেট। হিন্দুধর্ম ও দর্শন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে আদর্শ বিনিময় প্রসঙ্গে স্বামীজীর মুখ দিয়ে শুনতে পারলেন-"সকল ধর্মই একদিক দিয়ে দেখতে গেলে সমভাবে সত্য। মার্গারেট মনে হলেও এমন একটি ব্যক্তির দর্শন তিনি এর আগে লাভ করেননি, যিনি যা শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্ট তা এত সুন্দর ভাবে প্রকাশ করেছেন।

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে স্বামীজি আবার লন্ডনে এলেন। আবার বক্তৃতা প্রশ্নোত্তরের আসর বসলো। মার্গারেট এতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন এবং নানা রকম যুক্তি-তর্কের সাহায্যে স্বামীজীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতেন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে গেল। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৬ই ডিসেম্বর স্বামীজীর ভারত যাত্রার আগে মার্গারেট স্বামীজীর কাজে যোগদান করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সেটি স্বামীজিকে জানালেন। ১৮৯৭ সালে ১৯ শে জুলাই আলমোড়া থেকে স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলকে একটি পত্র দেন। তিনি লিখেছিলেন-"আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভারতের জন্য, বিশেষভাবে ভারতের নারী সমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন। ভারতবর্ষে এখনো মহিষী মহিলাদের জন্ম দান করতে পারছে না, তাই অন্য জাতি থেকে তাঁকে ধার করতে হবে। তোমার শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, অসীম ভালোবাসা, দৃঢ়তা, সর্বোপরি তোমার ধমনীতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন"।
পরবর্তীতে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করতে গিয়ে বলেছিলেন, মানুষের সত্যরূপ, চিৎরূপ যে কি তাহা যে তাঁহাকে জানিয়েছে সে দেখিয়াছে। মানুষের আন্তরিক সত্তা সর্বপ্রকার স্থূল আবরণ কে একেবারে মিথ্যা করিয়া দিয়া কিরূপ অপ্রতিহত তেজে প্রকাশ পাইতে পারে তা দেখিতে পাওয়া পরম সৌভাগ্যের কথা। ভগ্নী নিবেদিতা তাঁর মধ্যে মানুষের সেই অপরাহত মাহাত্ম্যকে সম্মুখে প্রত্যক্ষ করিয়া ধন্য হইয়াছি।
যাইহোক্ মার্গারেট ভাবলেন তাঁর থাকা হবে না ইংল্যান্ডে। তিনি ভারতে আসার জন্য প্রস্তুত হলেন: আত্মীয়-স্বজন, স্বদেশ সমাজ সব পরিত্যাগ করে জাহাজে করে যাত্রা করলেন। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে ২৮শে জানুয়ারি জাহাজ ভিড়ল কলকাতা বন্দরে। স্বামীজি নিজে জাহাজঘাটে উপস্থিত ছিলেন নিজের মানসকন্যাকে স্বাগত জানাতে। ২৫ শে মার্চ ১৮৯৮ মার্গারেটকে স্বামীজি ব্রহ্মচর্য ব্রতে দীক্ষিত করলেন। তাঁকে শিব পূজা করিয়ে ভগবান বুদ্ধের চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিতে বললেন। তাঁর নামকরণ করলেন নিবেদিতা।


নিবেদিতার সেবা কার্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্ত্রী শিক্ষা দান-যে কারণে স্বামীজি তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গুরুর কাছে তিনি জেনেছিলেন শিক্ষা হলো অন্তর্নিহিত পূর্ণত্বের প্রকাশ। পরবর্তীকালে নিবেদিতা কে বলতে শোনা গিয়েছিল শিক্ষা মানে বাইরের থেকে কোন শিক্ষাকে গিলিয়ে দেওয়া নয়। জাতিনৈপুণ্য আর ব্যক্তিগত ক্ষমতা হিসাবে মানুষের ভিতরে যা আছে তাকে জাগিয়ে তোলাই শিক্ষা, নাগ বাজারে ১৬ নং বোসপাড়া লেনে মেয়েদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে স্কুল খোলার ব্যাপারে স্বামীজি তাঁকে খুব উৎসাহিত ও সহযোগিতা করেছিলেন। ১৮৯৮ সালে ১৩ই নভেম্বর শ্রীমা এসে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পূজা করেন এবং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরদিন থেকে বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়।
এই শিক্ষা কেবল কতগুলি পাঠ্যসূচির বোঝা নয় বরং প্রকৃত শিক্ষা অর্থাৎ নিষ্ঠা, আদর্শবোধ, জাতিবোধ, ধর্মবোধ ইত্যাদির জাগরণ। এই বিদ্যালয়ে সমাজের সকল স্তরের মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। যেমন সকালে শিশুদের জন্য শিক্ষা, দুপুরে বিবাহিত ও বিধবা মেয়েদের লেখাপড়া ও সেলাই শিক্ষা, সন্ধ্যেবেলায় বাড়ির মা ঠাকুমাদের চণ্ডীপাঠ বা মায়ের নাম গান শোনান ইত্যাদি। এমনকি পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাগজ রং পেন্সিল কিনে দিয়ে তিনি আঁকাও শেখাতেন।
এই বিদ্যালয়ে স্থাপন করতে গিয়ে নিবেদিতা নানান অসুবিধা সম্মুখীন হয়েছিলেন। তখন হিন্দু সমাজের মেয়েরা লেখাপড়া শেখার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। নিবেদিতা খালি পায় হেঁটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন এবং স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করতেন। তিনি সেলাই শেখানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, এজন্য মেয়েদের বিনামূল্যে কাপড় দিতেন ও কাপড়ের উপর নানা রকম শিল্পকর্ম করার জন্য তাদের উৎসাহিত করতেন। প্রথম প্রথমে অনেকের অপছন্দ ছিল, পরে সব বাধা দূর হয়ে গেল এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় ধীরে ধীরে সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছিল।

এই স্কুলে নিবেদিতা তার পরিচয় দিতেন শিক্ষায়িত্রী হিসাবে। সত্যিই তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষায়িত্রী। অজস্র প্রবন্ধপত্র ও বক্তৃতার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে মানুষ গঠনে ব্রত নিয়েছিলেন নিবেদিতা। প্রতিকার্যে, প্রতিচিন্তায় আচরণে সেই ভারতের সেবা করে গেছেন তিনি আজীবন। নিবেদিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমরা তাঁর মহান কর্তব্য সম্বন্ধে আরও সচেতন হই। ১৯১৩ সালে ১৩ই অক্টোবর জীবনের অন্তিম মুহূর্তে তাঁর উপলব্ধি আজও স্মরণ করিয়ে দেয় যে - "The boat is sinking but I shall see the sunrise".
সহায়ক গ্রন্থঃ
● ভগ্নি নিবেদিতা - শ্রী রাজেন্দ্র কুমার গুপ্ত।
● ভগিনী নিবেদিতা - প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, সিস্টার নিবেদিতা গার্লস হাই স্কুল ২০০৫।
● পত্রাবলী - স্বামী বিবেকানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয় ১৪১০, উদ্বোধন পত্রিকা।
