বিবিধ

অন্য যুদ্ধ, অন্য মুক্তি



অভিজিৎ রায়


পালিয়ে বাঁচতে চাইছি। নিজের সঙ্গে লড়াই থেকে পালাতে চাইছি। খুব চেনা অথচ প্রতিমুহূর্তের অপরিচিত এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছি। শর্ত একটাই। সন্ধি করব না। জীবন আমার পাশে বসে কখনও বোঝাচ্ছে, কখনও ধমকাচ্ছে। ভাষা যা-ই হোক তার মূল বক্তব্য এই যে, যা আমি চাইছি তা নাকি হয় না; হয়নি কখনও।

এইরকম অবস্থায় পড়লে আমার মনে হয় একটাই কথা। যা কখনও হয়নি, তার থেকে আমরা কি আদৌ এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, যা হয়নি তা হয় না বা হবে না? নিজের কানের কাছে মুখ নিয়ে যাই। ফিসফিসিয়ে বলি, যা হয়নি তা হবে না এমন হতে পারে, নাও হতে পারে। যখন এরকম কথা আমি নিজেকে বলি, তখন নিজেকে খুবই আত্মবিশ্বাসী মনে হয়। অথচ, আমি বুঝতে পারি আত্মবিশ্বাস তলানিতে এসে ঠেকেছে। এইরকম দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের তলানি নিয়ে যুদ্ধে নামাটা কি বোকামি নয়? চক্রব্যূহ ভেদ করা সমস্ত শিক্ষা গ্রহণ না করে যুদ্ধের ভিতরে ঢুকে পড়া নিতান্তই মূর্খতা। অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়।

আচ্ছা, অভিজ্ঞতা তো বদলায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে! তাহলে আজ যে অভিজ্ঞতা দাম পেল কোনও সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে, আগামীকাল তো বদলে যাওয়া অভিজ্ঞতা তাকে ভুল প্রমাণিত করতে পারে সহজেই! তাই না?

লড়াই ভুল নাকি সন্ধি? লড়াইয়ের শুরুতে তো সন্ধির কোনও কথা থাকে না! তাহলে পরে কেন আসে? হেরে যাবার ভয়ে নাকি হারিয়ে যাবার? যতক্ষণ লড়াইয়ের মধ্যে থাকা যায় ততক্ষণই তো হারিয়ে যাবার ভয় থাকে না আমাদের। তাই না?

প্রশ্নগুলো নিজের দিকে ছুঁড়ে আমি উত্তর চাইছি তাও নয়। বরং আমি চাইছি যে উত্তর যেন না আসে। আসলে উত্তর এসে যাওয়া মানেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া। তা সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে যাওয়া হোক বা লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তাছাড়া যুদ্ধের বিনোদনও তো একটা বড় ব্যাপার। তাই তো?

সন্ধির বিনোদনে বিনিয়োগ নেই তাই যত উত্তেজনা লড়াই নিয়ে। আমার নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে আমার বিনিয়োগ কিন্তু অনেকটাই। কারণ আমি বুঝতে পারি, লড়াইয়ের বিনোদন আমি বেশ উপভোগ করছি। লড়াই ছেড়ে পালানোর ভাবনার মধ্যেই আমি কিন্তু লড়াইয়ে ফিরি। হয়তো আমি একা নই, প্রত্যেকেই।

কিন্তু, এরকম লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা কতটা? লড়াই ছাড়ার ভাবনার পাশাপাশি লড়াইয়ে ফিরতে চাওয়া আমরা এই প্রশ্ন নিজেদের করি কি? যদি করি, তবে উত্তর কী আসবে? আলোচনার প্রশ্নগুলো যেমন সহজ ছিল না তেমনই উত্তরও অজানা। জীবন নাছোড়বান্দা। কঠিন প্রশ্ন আর অজানা উত্তরের ভিতর দিয়ে সে লড়াই চালিয়ে যায়। খুব চেনা অথচ অপরিচিত নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই চলতেই থাকে শিবির বদলে বদলে।

এরকম অবস্থায় পালিয়ে আসতে চাওয়া আমি এবং সন্ধিহীন যুদ্ধের পক্ষে সওয়াল করা আমার নাম তালিকা থেকে বাদ দেবার কথা টিভির পর্দায় সঞ্চালিকা উত্থাপন করলে জেন-জি'দের প্রতিক্রিয়া দেখার অপেক্ষায় অস্ত্র ত্যাগ করে ঝাঁপিয়ে পড়ি যুদ্ধক্ষেত্রে। পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া জীবন প্রতি মুহূর্তে নিজের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থেকেই মুক্তি খুঁজতে থাকে প্রতিমুহূর্তে একটু একটু করে অপরিচিত হতে থাকা যুদ্ধক্ষেত্রে।