প্রতিমা যে এমন হুট করে চলে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি প্রিয়নাথ। সুস্থ সবল মানুষটা সেদিন সকালে উঠেও পাঁচপদ রান্না করেছিল। পরিপাটি করে খেতেও দিয়েছিল তার খাদ্যরসিক কত্তাকে। অফিসের দিনে রোজ স্নান পুজো সেরে সাত তাড়াতাড়ি ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ে প্রিয়নাথ। তার প্রতিমার মতো অমন সুস্বাদু রান্না আর কেউ যে বানাতে পারে না। সেদিনও খাচ্ছিল প্রিয়নাথ। হঠাৎ ভেতরঘরে দড়াম করে কিছু পড়ার শব্দ শুনে ছুট্টে যায়। দৌড়ে গিয়ে দেখে প্রতিমা ঠাকুরের সিংহাসনের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারা ঘর। এর আধঘন্টার মধ্যেই সব শেষ। প্রিয়নাথ কতবার "প্রতিমা... প্রতিমা..." করে ডাকল। কিন্তু সে বলল না, "সারাক্ষণ প্রতিমা প্রতিমা কোরো না তো, ভাল্লাগে না।" আর কোনদিনই বলবে না।
সত্যিই প্রতিমাকে ছাড়া প্রিয়নাথের একদণ্ডও চলত না। সকাল থেকে শুরু হয়ে যেত - "প্রতিমা আমার চশমাটা কোথায়? গামছা খুঁজে পাচ্ছি না। রুমাল? ঘড়ি, মোবাইল? আমার সুগারের ওষুধ?" প্রতিমা সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে খুঁজে এনে দিয়ে হেসে বলত, "তোমাকে অফিস পাঠানো নয়তো যেন কেজি ক্লাসের বাচ্চাকে সব গুছিয়ে গাছিয়ে স্কুলে পাঠাচ্ছি।" এসব ঘরোয়া কথা প্রিয়নাথ অফিস কলিগদেরও অবলীলায় বলত। তাদের বক্রোক্তি সে গায়ে মাখত না। কেনই বা মাখবে। প্রতিমা শুধু সহধর্মিণী নয়, তার কাছে আদর্শ নারী। সেই নারীই এক লহমায় কেমন অতীত হয়ে গেল। শোকস্তব্ধ প্রিয়নাথ প্রতিমা চলে যাওয়ার পর দু'মাস অফিস যায়নি। ভেবেছিল আর চাকরিই করবে না।
বুবাই আর বুল্টি শেষ পর্যন্ত বুঝিয়ে ভুলিয়ে কেঁদে চেঁচিয়ে তাদের বাবাকে অফিসে পাঠাতে পেরেছে। একমাস পুরো ঘোরের মধ্যে অফিস যাতায়াত করেছে প্রিয়নাথ। তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতি, কত কথা ভেসে উঠেছে মনে, থেকে থেকেই। পাগলের মতো অস্থিরতা বোধ করেছে সর্বক্ষণ। গত সপ্তাহ থেকে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে তাদের বাবা। অফিস থেকে ফেরার পথে সবজি, ফল কিনে এনেছে। তবে পটল আর নাসপাতি সে হাতে ধরে আর কোনোদিন কিনতে পারবে না। ও দুটো খেতে বড় ভালোবাসত প্রতিমা।
বাবার এমন শোকবিধ্বস্ত অবসন্নতার জেরে বুবাই, বুল্টি মা'কে হারানোয় শোক করার ফুরসৎ পায়নি। তাদের সর্বক্ষণ ভয় করত, বাবা কিছু না করে বসে। তাই বাবা যতদিন অফিস যায়নি, দুই ভাইবোন পালা করে কলেজ, অফিস ছুটি নিয়ে সঙ্গে থেকে পাহারা দিয়েছে বাবাকে। তিন মাস হয়ে গেছে মা চলে গেছে, এখনও বাবা মাঝে মধ্যেই বলে, "তোদের মা আমাকেও কেন নিয়ে গেল না ওর সঙ্গে। স্বার্থপরের মতো একা চলে গেল ড্যাং ড্যাং করে।"
"তুমিও তো একথা স্বার্থপরের মতোই বললে বাবা। তুমি চলে গেলে আমাদের কী হবে সেটা ভাবলে না তো?"
বাবার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে হেসেই কথাগুলো বলেছিল বুল্টি। বাবার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল জল। মায়ের কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই কেঁদে ফেলে বাবা। বুল্টির কষ্ট হয় বাবার জন্যে। কোনো জিয়নকাঠির স্পর্শে যদি মা'কে আবার ফেরত আনা যেত, বাবার এই শুকনো দুঃখী মুখ আবার আনন্দে চকচক করত।
ছ'মাস হয়ে গেছে প্রতিমা নেই। এর মধ্যে যতটা স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিল ততটা হতে পারেনি প্রিয়নাথ। ভোরের চা বানানো থেকে শুরু করে রাতের প্রেশারের ওষুধ মনে করে খাওয়া সবই করছে সে, তবে কোনওরকমে। প্রতিমার মতো গুছিয়ে সময় ধরে নয়। এখন প্রিয়নাথের অভিমানের পাশাপাশি রাগও হয় স্ত্রীর ওপর। সবকিছু সারাক্ষণ হাতের কাছে জোগান দিয়ে তাকে পঙ্গু বানিয়ে দিয়ে গেছে প্রতিমা। গোটা পরিবারের খিদমত খাটতে খাটতে নিজের শরীরে নজর দেওয়ার সময় পায়নি সে, প্রিয়নাথকেও নিতে দেয়নি।
এরমধ্যে একদিন অফিসে হাতাহাতি করে জামা টামা ছিঁড়ে বাড়ি ফিরেছে প্রিয়নাথ। তার প্রাণাধিক প্রিয় প্রতিমাকে নিয়ে কেউ কটুক্তি করলে সে মেনে নেবে না। নেয়ওনি। অফিসের এক অতি উৎসাহী ছোকরা সহকর্মী মনমরা প্রিয়নাথকে চাগিয়ে দেওয়ার জন্যে বেমক্কা বলে ফেলেছিল, "প্রিয়দা, বৌদিকে ভুলে থাকার জন্যে আর একজন বৌদি খুঁজব নাকি?"
ব্যস, ওইটুকুই যথেষ্ট। শান্ত সৌম্য মানুষটার ওরকম ক্রোধোন্মত্ত রুদ্ররূপ আগে অফিসে কেউ দেখেনি। অফিসের সিনিয়র অনিলদা সেদিন অনেক কসরত করে শান্ত করেছিলেন প্রিয়নাথকে। তারপর একান্তে নিজের পাশে বসিয়ে তার প্রিয় সহকর্মীকে বুঝিয়েছিলেন, "দেখ প্রিয়, তোমার জীবনে যা ঘটেছে তাতে সান্ত্বনার প্রলেপ দিয়ে ভোলানো সম্ভব নয়। কিন্তু এটাও তো ঠিক, নিজের সন্তানের মৃত্যুর পরেও একজন মা ধীরে ধীরে জীবনের ছন্দে ফিরে আসেন। রান্না করেন, বাড়ির বাকীদের ভালোমন্দ খেয়াল রাখেন, এমনকি লিপস্টিক পরে বিয়েবাড়িতেও যান। তোমাকেও তাই তোমার ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হবে। ছ'মাস কিন্তু অনেকটা সময়। এবার ফিরে এসো জীবনের ছন্দে।"
প্রিয়নাথ এর উত্তরে কিছু বলেনি। শুধু একগ্লাস জল চেয়ে খেয়ে উঠে পড়েছিল চেয়ার ছেড়ে।
এদিকে বাবাকে জীবনের ছন্দে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বুবাই, বুল্টি অনেক আগেই শুরু করে দিয়েছে।
প্রিয়নাথের আজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে। ছ'টা আঠাশের ব্যারাকপুর লোকাল মিস হয়ে গেছে, ফোন করে জানিয়েছে বুবাইকে। ঘরে ঢুকে বাবার প্রাথমিক রিঅ্যাকশন কী হয় তাই নিয়ে ছেলে আর মেয়ে বেশ টেনশনে আছে।
বাড়ি ফিরে অভ্যেসমতো বৈঠকখানার ঘর, স্টোর রুম পেরিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকে সিলিং পাখাটা ছেড়ে দিল প্রিয়নাথ। বিছানায় কিছুক্ষণ বসে হাওয়ায় গা জুড়িয়ে বাথরুমে ঢুকল। বুল্টি দোতলার ঘরে বসে চরম মুহূর্তের জন্যে অপেক্ষা করছে। দিদিকে বাবার প্রতিটি পদক্ষেপ নীচুগলায় ফোনে রিলে করছে বুবাই। ঢোলা পাজামা পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে খালি গায়ে ভিজে গামছা হাতে বৈঠকখানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয়নাথ। এই মুহূর্তে দোতলার সিঁড়ির আড়ালে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে দিদি আর ভাই। পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকেই প্রবল এক আর্তনাদ করে ছিটকে বেরিয়ে এল প্রিয়নাথ। বুবাই বুল্টি নেমে এল ছুট্টে।
"কি হয়েছে বাবা? গোঙাচ্ছ কেন?"
"কে বসে আছে ঘরে?"
প্রিয়নাথের চোখ তখনও বিস্ফারিত।
"তুমি এসো আমার সঙ্গে।"
মিষ্টি হেসে বাবার হাত ধরে ঘরে ঢুকল বুল্টি। ঘরের সবকটা লাইট জ্বেলে দিল বুবাই। মুহূর্তে প্রিয়নাথের মুখময় ছড়িয়ে পড়ল উচ্ছ্বাস,
"একি প্রতিমা তুমি?"
"হ্যাঁ আমাদের মাকে আমরা ফিরিয়ে নিয়ে এলাম।"
"কী সুন্দর সেজেছে রে তোদের মা।"
বুল্টি জিজ্ঞেস করল,
"শাড়িটা তুমি চিনতে পারছ?"
"খুব পারছি। পঁচিশ বছরের বিবাহবার্ষিকীতে এই জামদানীটা ওকে জোর করে কিনে দিয়েছিলাম। তোদের মা কোনদিনও মুখ ফুটে কিছু চায়নি। এটা পরে তোমায় দারুন ঝলমলে দেখাচ্ছে প্রতিমা।"
ভাই বোন বেশ নিশ্চিন্ত হলো, যাক তাদের প্ল্যান তবে সার্থক। ঠিক তখুনি মা কালির মত জিভ বের করল প্রিয়নাথ, "এই দেখেছ। সোফার ওপর আবার ভুল করে ভিজে গামছাটা রেখেছি। এক্ষুণি যাই, বারান্দায় মেলে দিয়ে আসি।"
গামছা নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল প্রিয়নাথ। বিস্মিত চোখে জিজ্ঞেস করে প্রতিমাকে, "ভিজে গামছা বিছানায় রাখার জন্যে তুমি বকলে না তো আজ আমাকে?"
হোক না সিলিকন ফাইবারের প্রমাণ সাইজের পুতুল, তবু প্রাণাধিক প্রিয় প্রতিমাকে ফিরে পেয়ে বেজায় খুশি প্রিয়নাথ। তার জীবনে ফিরে এসেছে আগের ছন্দ। সাতসকালে নিজে দু'কাপ চা বানিয়ে এনেছে। একটা কাপ দিয়েছে প্রতিমাকে। পাশে বসে নিজে খাচ্ছে আগের মতো। ছুটির দিনে রান্নার মাসিকে অফ করে দিয়ে প্রিয়নাথ গিন্নীর কাছে জেনে নিচ্ছে মুসুর ডাল, মাছের কালিয়ায় কি ফোড়ণ দেবে। দু'চারদিন পরপরই বুল্টিকে বলছে মায়ের শাড়ি বদলে দিতে। স্ত্রীর গয়না পালটে সুন্দর করে পরিয়ে দিচ্ছে নিজের হাতে। এমনকি এই বৈঠকখানার ছোট ডিভানটাতেই রাত্রে শুচ্ছে। বাবাকে দেখে প্রিয়নাথের ছেলে আর মেয়ে বেজায় খুশি। মাস দুয়েক হল, ওদের তিনজনের জীবনে ছন্দ ফিরে এসেছে।
স্যালারি পেয়ে আজ বাবা একটা হাল-ফ্যাশনের স্মার্ট ওয়াচ কিনে এনেছে - এ খবর ভাই-এর থেকে পেয়েই প্রমাদ গুনেছে বুল্টি। ব্যাপারটা যাতে বেশিদূর না গড়ায় সেইজন্যে সে আগেভাগেই বাবার কাছ ঘেঁষে এসে আহ্লাদী সুরে বলে,
"বাবা, বেইজ কালার ব্যান্ডের এরকম একটা স্মার্টওয়াচের শখ আমার বহুদিনের।"
"যা এখান থেকে। জানিস না, তোদের মা ঘড়ি কত পছন্দ করত। এটা প্রতিমার জন্যে এনেছি।"
এই বলে কেস থেকে বের করে প্রতিমার বাঁহাতের স্বর্ণবালা খানিক ওপরে সরিয়ে ঘড়ি পরাচ্ছে প্রিয়নাথ খুব মনোযোগ দিয়ে। খুশিতে বাবার চোখদুটো চিকচিক করছে, দরজার আড়াল থেকে উঁকি মেরে দেখছে তার ছেলে আর মেয়ে। পরানো শেষ করে ঘড়ির পাওয়ার অন করার অল্পক্ষণের মধ্যেই ভুরু কোঁচকালো প্রিয়নাথ। এ কি ব্লাড প্রেশার শূণ্য কেন? অক্সিজেন লেভেলও নিল। হার্টবিটের ধুকপুকানিও উঠছে না স্ক্রিনে। কেন এমন হচ্ছে? প্রতিমার হাত থেকে খুলে ঘষাঘষি করে আবার ঘড়িটা পরাল প্রিয়নাথ। তবু সব রেজাল্টই শূণ্য।
"হ্যাঁ রে বুল্টি এটা কী হলো, কেন এমন হচ্ছে! তোর মায়ের প্রেশার, হার্টবিট, অক্সিজেন লেভেল সব জিরো দেখাচ্ছে কেন? দোকানে আমি নিজে পরে চেক করেছি, সব কাজ করছিল। এখন কোনো রিডিং দেখাচ্ছে না। খারাপ ঘড়ি গছিয়ে দিয়েছে আমাকে। সব শালা জোচ্চোর। বারবার বললাম, আমার বউ এর শখের জন্যে কিনছি, ভালো জিনিস দেবেন। তবু হারামজাদাটা..."
এসব বলে প্রবল চেঁচামেচি হট্টগোল জুড়ে দিল প্রিয়নাথ। বুল্টি ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল। অস্থির বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে শান্তগলায় বলল,
"ফাইবারের পুতুলের প্রেশার হার্টবিট কোত্থেকে থাকবে বাবা? একটু বোঝার চেষ্টা করো।"
মেয়ের কথা শুনে মুহূর্তে থম মেরে গেল প্রিয়নাথ। রাত্রে কিছু খেল না, প্রতিমার সঙ্গে একঘরে শুলোও না।
অফিসে অনিলদাকে দু'দিন পরে এই ঘটনার বিবরণ দিয়ে হাসতে হাসতে প্রিয়নাথ বলে,
"সেদিন যদি স্মার্টওয়াচটা কোন মিরাকেল ঘটিয়ে রিডিং দিত তাহলে কী ভালোটাই না হতো, বলুন দাদা।"
প্রিয়নাথের কথায় সায় দিয়ে অন্য সহকর্মীদের মতো এড়িয়ে যেতেই পারতেন অনিলদা। কিন্তু তা না করে তিনি হেসে বললেন,
"মিরাকেল না হয়ে ভালোই হয়েছে। তাহলে তুমি মিথ্যেটাকেই সত্যি ভেবে হয়তো গিন্নীকে আদা দিয়ে সুন্দর এক কাপ লিকার চা বানিয়ে আনতে বলতে।"
"এক কাপ নয়, দু'কাপ। আমরা বাড়িতে সবসময় দুজনে একসঙ্গে বসে চা খেতাম। এখনও খাই।"
অনিলবাবু চকিতে তাকালেন প্রিয়নাথের চোখের দিকে। তবে নিজের বিস্ময় প্রিয়নাথকে টের পেতে দিলেন না। বললেন, "দেখো ভায়া, নিজের ছোট ভাই ভেবে তোমাকে একটা কথা বলি, গিন্নীকে সিলিকন প্রতিমা বানিয়ে বৈঠকখানায় সাজিয়ে রেখো না। বরং রক্তমাংসের প্রতিমা করে রেখে দাও নিজের অন্তরে। আবারও বলছি, ফিরে এসো বাস্তব জীবনের ছন্দে। তাতেই ওঁনার মুক্তি, তোমারও শান্তি।"
কোনো উত্তর বা প্রতিক্রিয়া না দিয়ে আজও উঠে গেল প্রিয়নাথ। যাওয়ার আগে শুধু অনিলদার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকল কয়েকমুহূর্ত।
সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে প্রিয়নাথ অন্যদিনের মতো একতলার ঠাকুরঘরে ঢুকল না, নিচের বাথরুমেও গেল না। সিঁড়ি বেয়ে সোজা উঠে এল দোতলায়। বুবাইকে বলল এককাপ চা বানাতে। চা খেয়ে ধীর পায়ে নামল একতলার বৈঠকখানায়। বুবাই-এর কাছে এ যেন একেবারে অন্য বাবা। অফিস ফেরত ক্যাবে আছে এখন দিদি। দিদিকে সব জানাল বুবাই। কিন্তু দিদির নির্দেশ সত্ত্বেও নিচে গিয়ে বাবা কী করছে, দেখার সাহস পেল না বুবাই।
বৈঠকখানায় ঢুকে প্রিয়নাথ একটা চেয়ার টেনে প্রতিমার খুব কাছাকাছি এসে বসল। গিন্নীর মুখের এত কাছাকাছি নিজের মুখ যখনই এনেছে, সে নিদেনপক্ষে তার গালে একটা চুমু খেয়েছেই। কিন্তু আজ শুধুই দেখছে। চুলের ডগা থেকে নেইলপালিশ পরানো পায়ের নখ পর্যন্ত নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করতে গিয়ে বারবার প্রতিমাকে নেহাতই ফাইবারের পুতুল মনে হচ্ছে প্রিয়নাথের। কেন, বুঝতে পারছে না সে। প্রতিমার হাতঘড়িটার ডিসপ্লে এখনও অন্ধকার।
মাঝরাতে চোখে হঠাৎ আলো পড়ায় ঘুম ভেঙে গেল বুল্টির। তাকিয়ে দেখে তার বালিশের পাশে মায়ের স্মার্টওয়াচটা জ্বলছে। তড়াক করে বিছানা থেকে উঠেই সে দৌড়লো বৈঠকখানায়। দেখল সোফার ওপর মা নেই। বুবাইও ঘুম চোখে নেমে এসেছে দিদির পেছন পেছন। দুই ভাইবোন দোতলায় উঠে বাবাকে একবার ঝাঁকুনি দিতেই প্রিয়নাথ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কী হয়েছে?"
"মা কোথায়?"
মেয়ের কথার উত্তর না দিয়ে প্রিয়নাথ শুধুমাত্র চোখের ইশারা করল। ভাই-বোন ছুটল চিলেকোঠায়। গিয়ে দেখে অন্যান্য আবর্জনার মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে সিলিকন ফাইবারের পুতুলটা।
এতো রাত পরে আজ প্রথম প্রতিমাকে অন্তরে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমোবে প্রিয়নাথ।
