গল্প ও অণুগল্প

নিখোঁজ কবির ডায়েরি (তৃতীয় পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অভিজিৎ রায়


[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]

(তিন)

ঘরের জানালায় কোনও পর্দা না থাকায় ঘুমটা একটু ভোরেই ভেঙে গেল সৃজিতের। রাতে খুব ভাল ঘুম হয়নি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে জামাকাপড় চেঞ্জ করে সৃজিত বেরিয়ে পড়ল মর্ণিংওয়াকে। হোম-স্টে থেকে বেরিয়ে আবারও জয়ন্তী নদীর দিকটায় হাঁটা দিল সৃজিত। রাস্তায় বেশ কুয়াশা। গোটা এলাকাটাই এখনও বেশ নিঃস্তব্ধ। আশেপাশের হোম-স্টেগুলো থেকে কোনো পর্যটককে এখনও মুখ বাড়াতে দেখল না সৃজিত। এক কাপ চায়ের খুব প্রয়োজন বোধ করছে সে। কিন্তু উপায় নেই। আস্তে আস্তে সৃজিত ভুটানি বস্তির দিকে হাঁটা শুরু করল। এদিককার রাস্তাটা বেশ চড়াই। যত বস্তির দিকে এগোচ্ছিল ততই হাঁপিয়ে যাচ্ছিল সে। পিকুর মতোই বেশ কয়েকটা পাহাড়ি কুকুর তাকে দেখে রাস্তা আটকে দাঁড়াল। ভৌ ভৌ করে নিজেদের মালিকদের ডাকাডাকি শুরু করে দিল। একটা ছোট ঘরের সামনে উনুনে ধোঁয়া উঠছে দেখে সৃজিতের চায়ের তেষ্টা বেড়ে গেল। ঘড়ি দেখল। ছ'টা দশ। সমতলে তো এতক্ষণে অনেক চায়ের দোকান খুলে যায়। এদিকে খুলবে না। আর একটু এগোতে থাকে সে। এবার একটা ছোট্ট দোকান চোখে পড়ল। একজন বয়স্ক নেপালি অথবা ভুটানি ভদ্রমহিলা হাসিমুখে তাকে আপ্যায়ন জানাল।

- ক্যা চাহিয়ে বাবুজী আপকো?

- চায়ে মিলেগা ক্যায়া?

- কিঁউ নেহি। ইধার বৈঠিয়ে।

একটা ছোট কাঠের টুল বের করে দিয়ে দোকানি ভদ্রমহিলা স্টোভে আগুন ধরায়। সামনের বয়ামে দু'ধরণের বিস্কুট। একটা বয়ামে টোকা মেরে সৃজিত বলল, "ইয়ে এক দিজিয়ে তো"। ভদ্রমহিলা বিস্কুট এগিয়ে দিয়ে হাসে। বিস্কুটে প্রথম কামড় মারতেই আশেপাশে গোটা চারেক কুকুর এসে উপস্থিত। এগুলো অবশ্য কোনোটাই পিকুর মতো ছোট নয়। বেশ বড়। দোকানির কাছে আবার চারটে বিস্কুট চেয়ে নিয়ে কুকুরগুলোকে খাওয়াল সৃজিত। চা রেডি। কাঁচের গ্লাসটা বেশ বড়। কুকুর খাওয়ানোর ফাঁকে চায়ের উপর বেশ পুরু সর পড়ে গেছে। সৃজিত এক টুকরো বিস্কুট দিয়ে সরটাকে সরিয়ে ফেলল রাস্তার উপর। তারপর চায়ে চুমুক দিয়েই জিভ কাটল। চিনি না দিতে বলতে ভুলে গিয়েছে। আর, এসব কুলি কামিনের বস্তি এলাকার মানুষের চায়ে বেশি চিনি খাওয়ার অভ্যাস। অনেকদিন বাদে বেশি মিষ্টি চা খেয়ে যে খুব খারাপ লাগছে তা নয় কিন্তু অঞ্জনা থেকে দূরে সরে এসে নিজের জীবন নিয়ে নিজে একটু ভয় পাচ্ছে সৃজিত। এ কথা ভাবনায় আসতে নিজেকে নিয়ে আরও একবার অবাক হল সে। এমনিতে সে খুবই বেপরোয়া। নিজের শরীর নিয়ে তো বটেই। কতদিন বলার পর যে এই মর্নিংওয়াকের অভ্যাসটা অঞ্জনা করাতে পেরেছিল তা ভাবতেই হাসি পেল সৃজিতের। সোহিনীকে রীতিমতো নজরদারির কাজে লাগিয়েছিল। অঞ্জনা নিজে সকালে ঘুম থেকে উঠেই যোগব্যায়ামের ক্লাসে চলে যেত। কাজেই মর্নিংওয়াকে বের করার দায়িত্ব ছিল সোহিনীর। ক্লাস এইট থেকে মেয়ে সেই কাজ নিষ্ঠাভরে করে আসছে। বাবার সঙ্গে যতই তার মনান্তর হোক বাবা একটু অসুস্থ হয়ে পড়লেই মেয়ে এক্কেবারে অন্যরকম। বিছানা ছেড়ে নড়ত না। সারাক্ষণ বাবার মাথা টিপে দেওয়া, হাত-পা টিপে দেওয়া, সময়মতো জল খাওয়ানো, ওষুধ খাওয়ানো - সব কাজটাই মন দিয়ে করত সোহিনী। অঞ্জনা নিশ্চিন্তে অফিস থেকে দু'বার, বড়জোর তিনবার ফোন করত। মেয়ে এমনই বাবা ন্যাওটা যে বাবার অসুখ হলে সে কিছুতেই স্কুল যেতে চাইত না।

- কিতনা হুয়া?

চায়ের কাপটা রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল সৃজিত।

- বিশ রুপিয়া সাহাব।

টাকাটা পকেট থেকে বের করে দিতে দিতে নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছিল সৃজিতের। এমন সুন্দর একটা জায়গায় সে একা চলে এল। সোহিনী এখানে এলে কত খুশি হতো। বিশেষ করে পিকুকে পেলে তো আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। বাড়ি ফেরার সময় কি পিকুর মতো একটা কুকুরের বাচ্চা এদিক থেকে নিয়ে যাওয়া যায়? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করল সৃজিত। তারপরেই আপন মনে হেসে উঠল। দোকানি ভদ্রমহিলা কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "ক্যা হুয়া সাব? কুছ হুয়া ক্যায়া?"

- ইধার ক্যায়া ও পাহাড়ি কুত্তা কা পাপ্পি মিলেগা? ঘর লেজানে কে লিয়ে?

- নেহি মালুম সাবজী। আপ কিতনে দিন রহেঙ্গে? দো-চারদিন বাদ আইয়ে ম্যায় খবর দে দুঙ্গী।

ফেরার পথে নিজেকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল সৃজিত। এমন হলে সত্যিই চলে না। অঞ্জনা একদম ঠিক কথা বলে। সবসময় সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাটাই তার রোগ। বাড়ি থেকে বের হবার সময় সে ভেবেছিল সে আর বাড়িই ফিরবে না। আর আজ দু'দিন যেতে না যেতেই মেয়ের জন্য কুকুরের খোঁজ নিচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়। লিখে জীবিকা হবে না। নতুন জীবিকার পথ সন্ধানে সে কিছুটা একা থাকতে চাইছিল। নতুন লেখার আঙ্গিক খুঁজতে সে কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে একা কাটাতে চাইছিল। বেশ কিছু ভালো বইপত্র সঙ্গে করে এনেছে পড়ার জন্য। চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে গেল। কিছুই পড়া হয়নি তার। লেখা তো হয়ইনি। আর, অঞ্জনার সাংসারিক খরচের বিকল্প রুজির পথও ভাবতে পারেনি। আত্মবিশ্বাস একদম তলানিতে। ইদানিং সৃজিতের মাঝেমাঝেই মনে হয় সে বোধহয় আর লেখালিখিটাও করতে পারবে না। একদিন লিখতে বসতে না পারলেই তার মধ্যে এই ভাবনা শিকড় গেড়ে বসে। তারপর আবার একটা ভালো লেখা হলে মনে হয় পারবে। কিন্তু, সেইমুহূর্তেই অঞ্জনার কথা মাথায় আসে। "লিখে হবেটা কী? মেয়ের পড়াশোনার টাকাটা তো বাপ হয়ে জোগাতে পারো না। এভাবে তোমাদের কোন লেখকের সংসার কীভাবে চলে এটুকু জানিয়ে উদ্ধার করো আমায়।"

নিজেকে উদ্ধার করার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি পলায়নপর্ব? নিজেকে জিজ্ঞেস করে সৃজিত। বিনয়বাবুকে লেখার কথাটা বলে অন্তত মাসখানেকের থাকার ব্যবস্থা করা গেছে। ভদ্রলোক সৃজিতের লেখার এত বড় ফ্যান যে হোম-স্টে'র পয়সা অন্তত লাগবে না। যা ক্যাশ নিয়ে এসেছে তাতে চলে যাবে। এটিএম কার্ড ব্যবহার করবে না বলেই ভেবেছে সে। যদি অঞ্জনা পুলিশে খবর দেয়। যদি তাকে ট্রেস করার চেষ্টা করা হয়! জীবনের সবটুকু ঘিরে এখনও অনেক অনেক যদি, কিন্তু, তবু...

একটা পথ খুঁজতেই হবে। এই বয়সে এসে ঠিক কী করবে সেটা ভেবে ওঠা খুব মুস্কিল তার পক্ষে। করোনার আবহে লকডাউনটা না হলে খবরের কাগজের সহকারী সম্পাদকের কাজটা যেত না তার। খবরের কাগজ বিক্রি প্রায় সত্তর শতাংশ পড়ে গেল। মালিকরা কোনো দিশা না দেখতে পেয়ে এক্কেবারে পঁচাত্তর শতাংশ কর্মচারী ছাঁটাইয়ের পথে চলে গেল। প্রতি বছর সৃজিতদের কাজের কন্ট্রাক্ট রিনিউ হতো। সেবার হল না। অঞ্জনার চাকরিটা ছিল বলে তাও ফ্ল্যাটের লোন পরিশোধ করে কোনওক্রমে ডাল-ভাতের জোগান করা গিয়েছিল। সোহিনী কলেজে ভর্তি হতেই এক লাফে খরচ বেড়ে গেল অনেকটা। এতগুলো প্রাইভেট টিউশনির পয়সা জোগাড় করা খুবই কঠিন কাজ। সৃজিত ভেবে দেখেছিল। সে সত্যিই অপদার্থ। এই বাজারে সে যে কাজটা জানে সেই কাজ করে কোনো রোজগার করাই সম্ভব নয়। পুরোনো শিক্ষক বন্ধুদের বলেছিল দু'একটা বাংলার টিউশনি জোগাড় করে দিতে। শুনে অমিত খুব হেসেছিল। বলেছিল, "এখন আর ওরকম পড়াশোনা নেই রে ভাই। শুধু নোটস্। নোটস্ দাও নোটস্ নাও। তাছাড়া বাজারে ভাল রেজাল্টের ছাত্র দু'একখানা না বের হলে কেউ পড়তে আসবে না তোর কাছে। আর তাছাড়া তুই তো কোনো স্কুলের টিচার নোস!"

সৃজিতের মনে পড়ে যায় কলেজ লাইফের কথা। বাবার সাধ্য ছিল না পড়ার খরচ চালানোর। বইপত্র বা টিউশনির খরচ চালানোর জন্য নিজেও কিছু টিউশনি শুরু করেছিল সে। দু'বছর পর সৃজিতের চাহিদা অভিভাবকদের কাছে এত বেড়েছিল যে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। তারপর সে এক অদ্ভুত নিয়ম চালু করেছিল। এক বছর নাওয়া খাওয়া ভুলে ভোর ছ'টা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত পড়াতো আবার পরের বছর টিউশন কমিয়ে দিত নানা অজুহাতে। এই করতে করতে একদিন দেখল তার কাছে আর কেউই পড়ানোর অনুরোধ নিয়ে আসছে না। এক ঝটকায় বছর দশেকের মধ্যে টিউশনির বাজার শূন্য হয়ে গিয়েছিল। তখন লেখা পাগল সৃজিত। নামীদামী সমস্ত কাগজে শুধু লিখে চলেছে। মফস্বল থেকে লিখতে শুরু করে এবং কলকাতায় পা না দিয়ে এতরকম লেখালিখির সুযোগ খুব কম ছেলেই পেয়েছে। তারপর একদিন একটা যোগাযোগ হল কাগজের অফিসের চাকরির। খাটনি খুব বেশি হলেও মাইনেটা খারাপ না দেওয়ায় পুষিয়ে যাচ্ছিল। সংসারের জন্য সময় কম ছিল, অঞ্জনার অভিযোগ ছিল কিন্তু সৃজিতের ভিতরে লুকিয়ে থাকা পুরুষ মানুষটিকে বেকারত্বের খোঁটা শুনতে হচ্ছিল না। লকডাউন পর্বের শুরু থেকেই অভিযোগগুলো দূরত্ব বাড়াতে শুরু করে। কারোরই ধৈর্য ছিল না সম্পর্কটাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার। সৃজিত লিখছিল। কিছু ছাপাও হচ্ছিল। কিন্তু পয়সা আসছিল না। কবিরা গরীব থাকলেই সমাজ খুশি হয়। সৃজিতের আশেপাশের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সমবেদনা বেশ কিছুদিন ধরেই ঠিক নিতে পারছিল না সৃজিত। ক্রমশ নিজেকে একা করে ফেলার ছক কষছিল সে। বাড়িতে ঢুকেও বেশিরভাগ দিন মেয়ে বা বৌ কারোর সাথে বিশেষ কোনো কথা বলছিল না সৃজিত। বলতে ভাল লাগছিল না। দুপুরবেলা কেউ যখন বাড়িতে থাকত না তখন ঘর অন্ধকার করে, মোবাইল সুইচড্ অফ করে সে একা শুয়ে থাকত। কোনোদিন ঘুম আসত। কোনোদিন ঘুম আসত না। রাতের ঘুমটা ইদানিং বড্ড পাতলা হয়ে গিয়েছে তার। যত ঘুম ভোরবেলা চোখ ভারি করত। কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করত না। মেয়ে আর বৌয়ের সাথে মর্নিংওয়াক নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়ে যেত। শেষে একসময় রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত সৃজিত।

রোদটা গায়ে লাগছে এবার। চাদরটা গা থেকে নামিয়ে রাখল ভাঙা সাঁকোটার উপর। ঘড়ি দেখল। আটটা পনেরো। এবার হোম-স্টে'র দিকে ফিরতে হবে। শ্যামলাল চিন্তা করবে। বিনয়বাবুকে ইতিমধ্যেই ফোন লাগিয়েছে কি না কে জানে। হাঁটা শুরু করল সৃজিত।

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ 'সমন্বয়' আর্কাইভ।