গল্প ও অণুগল্প

আমার মা (ঊনবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


বড়ো রাস্তা ধরে বেশ কিছুটা এগিয়ে একটা বাঁক ওখানে গিয়ে রাস্তাটা দুটো ভাগে বিভক্ত হয়েছে - একটা চলে গেছে হাঁসপুকুরিয়া হয়ে তেহট্টের দিকে আর একটা গেছে ম্যাজপোঁতা নামে একটি গ্রামের দিকে। আমি ম্যাজপোঁতার রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম। এই গ্রামের সঙ্গে আমার একটা পুরনো সম্পর্ক আছে। এই গ্রামের মজিদ ভাইয়ের বাড়িতে একবার এসেছিলাম। মজিদ ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। ওর ছোটো ভাই খোরশেদ আমার সাথে কৃষ্ণনগর কলেজে পড়তো। ভর্তির প্রথম দিকে খোরশেদ কারোর সাথে কথা বলতো না। চুপচাপ বসে বসে বইয়ের পৃষ্ঠা ওলট-পালট করতো আর অসহায়ের মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। একদিন আমি যেচে পড়ে আলাপ করতে গেলাম - হ্যাঁ রে, তুই এভাবে একা একা থাকিস কেন?

আমি কারণ জানতাম তবুও ওর মুখ থেকে শুনতে চাইছিলাম - আমাদের কাউকে কী তোর পছন্দ হয় না, না কী?

- না গো দাদা, তা নয়। আসলে তোমরা সবাই একসাথে মিলেমিশে আনন্দ করো আমার বেশ ভালো লাগে কিন্তু আমি তোমাদের সাথে মিশতে পারি না।

- কেন, কেন পারিস না আমি তো সেটাই জানতে চাইছি।

- আসলে আমি তো মাইনরিটি সম্প্রদায়ের তাই...

- মারবো টেনে এক থাপ্পড়। ব্যাটা কলেজে অনার্স নিয়ে ভর্তি হয়ে মেজরিটি মাইনরিটি দেখাচ্ছে। এতদিন কী খেয়ে লেখাপড়া করেছিস, অ্যাঁ? এখানে এসব চলবে না। আয় এদিকে আয়, আজ তোর একদিন কী আমার একদিন। 
ওকে টানতে টানতে নিয়ে এলাম। কলেজের কদম গাছের নীচে আমরা সবাই গোল হয়ে বসে এ ওর টিফিন ভাগাভাগি করে খেতাম। খুব মজা হতো। খোরশেদ-এর ব্যাগ সার্চ করে পাওয়া গেল রুটি আর হালুয়া। সবাই কাড়াকাড়ি করে ওর রুটি হালুয়া সাবাড় করলাম। সেদিন ইচ্ছে করেই ওকে না খাইয়ে রাখলাম। বললাম - এটা তোর শাস্তি।

খবরটা মজিদ ভাইয়ের কানে যায়। পরের সপ্তাহে মজিদ ভাই আমাদের কলেজে এসে আমাদেরকে বাহবা জানায় এবং সবাইকে তার প্রাণভরা ভালোবাসার কথা বলে। সবার সাথে আলাপ করে খুব খুশি হয়। একবুক আশা বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। তারপর অনেকবার কলেজে এসেছে মজিদ ভাই। ওর কথার মধ্যে ফুটে উঠতো একজন চেতনা সম্পন্ন সত্যিকারের মানুষ। আমাদের সাথে মজিদ ভাইয়ের একটা আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। খোরশেদকে আমরা সম্পূর্ণ মানুষ করে দিয়েছিলাম। আমাদের ফাইনাল ইয়ারে মজিদ ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়। মজিদ ভাই নিজে এসে আমাদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে যায়। আমার হাত ধরে বলেছিল - জয় ভাই তোমার কাছে বিশেষ অনুরোধ রইলো তুমি সবাইকে সাথে নিয়ে আমাদের গ্রামে এসো। রাতে থাকতে হবে কিন্তু। সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে যেও। বেথুয়া স্টেশনে পৌঁছে হাইরোডে চলে আসবে ওখানে একটা মারুতি ভ্যান থাকবে। ড্রাইভারের নাম আলম। ওটা আমার নিজের গাড়ি। আলমই তোমাদের নিয়ে আসবে। মজিদ ভাই তার গাড়ির নম্বর, রঙ এবং ড্রাইভারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে যায়।

সেটা প্রায় বছর দশেক আগের কথা। সেবারে মজিদ ভাইয়ের আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। পরদিন ঘুরে ঘুরে গ্রামখানিকে দেখেছিলাম। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত। অল্প কয়েক ঘর মাত্র হিন্দু, ওরা অবশ্য মাহিষ্য সম্প্রদায়ভুক্ত। বেশির ভাগই ভাগচাষী। সব মিলিয়ে শ'দুয়েক পরিবারের বাস। অল্প কয়েকটি পরিবার তুলনামূলক ভাবে অবস্থাপন্ন, তাদের মধ্যে মজিদ ভাইয়ের অবস্থা একটু ভালো। মজিদ ভাইয়ের বয়স যখন পনের বছর তখন বাবা মারা যান আর ঠিক পরের বছরই মা-ও চলে গেলেন। খোরশেদ তখন সবেমাত্র স্কুলে ভর্তি হয়েছে। বিঘে দশেক জমি, দু'দুটো পুকুর, আর খোরশেদকে ওর হাতে সঁপে দিয়ে মা-বাবার চলে যাওয়াটা ওর কাছে একটা বড়ো শূন্যতা। ভাই এবং পুকুরের দায়িত্ব একা হাতে সামলাতে হয় মজিদ ভাইকে। মাধ্যমিক পাশ করার পর আর স্কুলে যাওয়া হয়নি ওর। ওর পুকুরের ধারে প্রায় বিঘে দশেক জমির ওপর ছিল সাহা বাবুদের আম ও লিচুর বাগান। ওটা দেখাশোনার কেউ ছিলো না। মজিদ একদিন বেথুয়ায় গিয়ে বেথুয়ার সাহা বাবুদের কাছ থেকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে আম ও লিচু বাগান বার্ষিক চুক্তিতে লিজ নেয়। সাহা বাবুদের প্রচুর সম্পত্তি অথচ পরিবারের একমাত্র বাউণ্ডুলে ছেলে সেই সম্পত্তি রাখতে পারেনি। পরে সামান্য টাকা দিয়ে মজিদ ভাই আমবাগান ও লিচু বাগান কিনে নেয়। দুটি বাগান থেকে বছরে প্রায় লাখ দশেক টাকা ঘরে আসে। এইভাবে অক্লান্ত পরিশ্রমে মজিদ ভাই ধীরে ধীরে প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়। সততা আর পরিশ্রমকে মূলধন করে মজিদ ভাই আজ কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি করতে পেরেছে। গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান এবং কয়েকজন মেম্বারকে ডেকে নিয়ে একটা মিটিং ডেকে ও নিজে যেটা করেছে সেটা ছাড়া পৈতৃক সম্পত্তির পুরোটাই সবার সম্মতি নিয়ে খোরশেদকে দিয়ে দিয়েছে। মজিদের এই ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ হয়ে গেছেন সবাই একবাক্যে বলেছেন - মজিদের দিল আছে বটে! একটা কাজের মতো কাজ করেছে।

মজিদ ভাইয়ের দুটো ছেলে। খোরশেদ-এর এক ছেলে এক মেয়ে। ওদেরকে না জানিয়ে হঠাৎ করে ওদের বাড়ি পৌঁছে যাওয়ায় ওরা শুধু অবাকই হয়নি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেছে। মজিদ ভাই তো আমাকে দেখে হাতের কাজ ফেলে রেখে ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে - আ রে জয় ভাই, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? এতদিন পরে আমাদের কথা মনে পড়লো। এবারে তোমাকে সহজে ছাড়ছি না। চলো, ভেতরে চলো। তোমার ভাবি তো কেবলই তোমার কথা বলে। খোরশেদ-এর বউকে তো দেখোনি ওর বালবাচ্চাদেরও দেখবে চলো।

বাড়ির সব সময়ের একজন কর্মী মহেশকে ডেকে আমার সাইকেলটা নিয়ে গ্যারেজে রাখতে বলে আমাকে একেবারে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। আমার দশ বছর আগে দেখা বাড়ির সাথে আজকের বাড়ির খুব একটা মিল নেই। ভেতর বাড়িটা ভেঙে দুটো অংশ করা হয়েছে - একটা অংশে খোরশেদ ওর বউ ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকে। অন্য অংশে থাকে মজিদ ও তার পরিবার। দুটো অংশই মার্বেল পাথর দিয়ে মজবুত করে বানানো। দোতলা বাড়িটি বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে না ভেতরে এত নিখুঁত এবং সুন্দর। ভেতরে কোনো এয়ার কন্ডিশন নেই তবুও অদ্ভুত সুন্দর ঠাণ্ডা। জানালা দরজা সবগুলোই সেগুন কাঠের তৈরী, সুন্দর করে বার্নিশ করা। মজিদ ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই সে বললো - আমাদের বিয়ের বছর দুয়েক পরে এই বাড়ি বানিয়েছি। তুমি তো শিল্পী মানুষ তোমার চোখ দিয়ে দেখ কেমন লাগছে।

আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। বলে কী! এ বাড়ির বয়স আট ন'বছর! দেখে মনে হচ্ছে মাস ছয়েক আগে বানানো হয়েছে। এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন!! আমি বললাম - মজিদ ভাই ঠিক বলছো তো?

- কেন তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?

- সেই জন্যই তো জিজ্ঞেস করছি। বলো না ঠিক বলছো তো?

মজিদ ভাই হো হো করে হেসে উঠলো - আরে ভাই তোমাকে খামোখা মিথ্যে বলতে যাবো কেন? ঠিক আছে চলো তোমাকে ভাইয়ের ঘর দেখাই তাহলে বুঝতে পারবে।

খোরশেদ-এর ঘরে ঢুকে আমি অবাক হয়ে গেলাম। নীচে দুটো বড়ো বড়ো ঘরের এককোণে এটাচড বাথ, পৃথক ডাইনিং স্পেস এবং ওপেন কিচেন। বেশ চিত্তাকর্ষক। মজিদ ভাইয়ের এলেম আছে বলতে হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা এতবড় একটা মনের মানুষ আজকের দিনে পাওয়া সত্যি দুষ্কর। ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ব কর্তব্যবোধে অবিচল এবং পিতৃত্বের সমস্ত দায়ভার কাঁধে তুলে নিয়ে সার্বিকভাবে তা সফল করে তোলার আর এক নাম 'মহম্মদ মজিদ সেখ' বললে অত্যুক্তি হবে না।

মনে পড়ে যায় আমার পরিবারের সদস্যদের কথা। তাঁরা নিজের নিজের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় এমন কাজ কখনও করবে না। যে পিতা-মাতার জন্য এই সুন্দর পৃথিবীতে আসার সৌভাগ্য অর্জন করেছে সেই পিতা-মাতা তাদের কাছে একটা পাষাণের মতো বোঝা। যদিও পিতার জন্য তাদের কোনো মাথাব্যথা হয়নি। কারণ তিনি কাজ করতে করতে চলে গেছেন। কারোর বোঝা হয়ে শেষজীবনে কাউকে কষ্ট দিয়ে যাননি। সমস্যা হলো অসহায় মা'কে নিয়ে। তাঁর নিজের সন্তানদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে ভয় ভাবনা ঢুকে গেছে। কোটি টাকার প্রশ্ন - মা'কে কে দেখবে, কে এই পঙ্গু অথর্ব মানুষটির দায়িত্ব নেবে। নিজে না খেয়ে যে সন্তানের মুখে ক্ষুধার অন্ন তুলে দিয়েছেন সেই সন্তান আজ তাঁর দায়িত্ব নিতে চায় না। পাছে দায়িত্ব নিতে হয় এই আশঙ্কায় সে অন্যান্য ভাইদের থেকে ছিটকে অনেক দূরে গিয়ে শ্বশুর মশাই-এর বদান্যতায় বাড়ি করে স্ত্রী পুত্র নিয়ে বেশ সুখেই আছে। আর আমার হতভাগিনী জনমদুখিনী মা কেবলই দেওয়ালের এককোণে বসে শাড়ির আঁচলে চোখের জল মোছেন। মায়ের অসহায় মুখটা মনে পড়ে চোখে জল এসে যায়।

- কী ব্যাপার জয় ভাই, তোমার চোখে জল? তোমার কিছু হয়েছে কী?

মজিদ ভাইয়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম - না না, মজিদ ভাই ও কিছু না।

- না, তুমি আমার কাছে কিছু একটা লুকাতে চাইছ? তোমার যদি কখনও কোনো কিছুর দরকার হয় বড়ো ভাই মনে করে আমাকে স্বচ্ছন্দে বলবে, কোনোরকম দ্বিধা বা সংশয় রাখবে না।

- আমি জানি মজিদ ভাই। তোমার মতো এমন দারাজদিল ক'জনের আছে? তাই তো কোনো সংকোচ না করে তোমার কাছে ছুটে এলাম।

- আরে, বেলা যে গড়িয়ে এলো। সেই কোন সকালে বেরিয়েছ। চলো হালকা কিছু খাবে। তারপর রাতে ভালোমন্দ কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে।

আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল ভাবিজীর কাছে। ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে ডিমের অমলেট আর পরোটা সাজিয়ে দিল আমার সামনে। ভাবিজীর নাম শবনম। যেমন সুন্দর নাম তেমন তার মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠ - খান জয় ভাই, তৃপ্তি করে খান। ওনার মুখে কতবার আপনার কথা শুনেছি। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানের পর তো আর দেখিনি। আজ দেখলাম। সত্যি, আপনাকে দেখলে মনটা আনন্দে ভরে যায়। এমন মায়াভরা মুখ, তার সাথে এত সুন্দর কথা বলেন যে বারবার আপনার কথা শুনলে মনটা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। আপনাকে দেখার পর মনে হয়েছে যে, উনি আপনার সম্পর্কে একবিন্দু বাড়িয়ে বলেননি।

আমি বললাম - ভাবিজী আমার এত প্রশংসা কোরো না। আর হ্যাঁ, আমাকে আপনি আজ্ঞা করে বলতে হবে না। বড্ড পরপর মনে হয়।

মজিদ ভাই বলে - দেখেছ গিন্নি, জয় ভাই আমাদের কত আপনজন। শোনো জয় ভাই অনেকদিন পর তোমাকে পেয়েছি আজ সারারাত অনেক অনেক গল্প করবো। আমি একটু বেরচ্ছি। তোমরা গল্প করো।

- মজিদ ভাই একটু অপেক্ষা করো আমিও তোমার সাথে যাবো।

- ঠিক আছে, চলো।

আমি হাতমুখ ধুয়ে মজিদ ভাইয়ের পিছু নিলাম।

(ক্রমশ)