বিবিধ

পৃথিবীর ধর্ম ও বিজ্ঞান



কাকলী দেব


একটা দোলাচলের মধ্যে জীবন কেটে যায়, পরম চৈতন্যের অস্তিত্ব অথবা অনস্তিত্বর কথা ভেবে। সংশয়বাদী হওয়া বেশ কষ্টের ব্যাপার যদিও।

ভাবতে কষ্ট হয়, এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে কোথাও কেউ বসে আছে, যে মানুষের কাজ বা কর্ম-সহায়ক হিসেবে কাজ করছে! মানুষ তার অতি ক্ষুদ্র জীবনকালে যা কিছু করে, সে জন্য একমাত্র সে-ই দায়ী! সে নিজেই তার কারণ, নিজেই ফলাফল!

মানুষ যখন বনমানুষের আবরণ অতিক্রম করছে, আগুন জ্বালানো শিখছে, ফসল ফলানোর বিদ্যা করায়ত্ত করছে, তখন ধীরে ধীরে তার বুদ্ধির বিকাশ ঘটছে, সম্পদের ব্যবহার শিখছে, সভ্যতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে তখন তার ধর্মের সাহায্য লাগছে। কে দেবে তাকে দিশা? কে শেখাবে জংলী আচরণে নম্রতা? প্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে মোকাবিলার শক্তি কে জোগাবে?

একমাত্র ধর্মের প্রলেপ তা পারল! মানুষকে সভ্যতার পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে চলল ধর্ম। যখন থেকে তা শুরু হয়েছে তারপর কেটে গেছে হাজার দশেক বছর। মহাকালের নিরিখে তা মাত্র চোখের পলক ফেলার মতো মুহূর্তমাত্র সময়। হয়ত সত্যিকার উন্নত মানুষ হওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছতে আরও কিছু সময় বাকী।

তবে ধর্ম যেমন মানুষের উপকার করেছে, তাকে শান্ত করেছে, নম্রতর করেছে, সংযত যৌনতা শিখিয়েছে, তেমনই তার অনেক ক্ষতিও করেছে।

বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিরোধের কারণে, অহিংস হতে চেয়েও সে হতে পারেনি। পাশবিক হিংস্রতার একটা রকমফেরের মাধ্যমে সে শুধুই ধর্মীয় কারণে বরং অধিকতর হিংস্র হয়ে উঠেছে।

ধর্ম মানুষকে মানবিক উত্তরণের পথে নিয়ে গেছে, শুভবুদ্ধির উদয় ঘটিয়েছে। ধর্ম আছে বলেই আজ আমরা সুসভ্য মানবজাতির আখ্যা লাভ করেছি। কিন্ত গোটা মানবজাতির তো একটাই ধর্ম নয়, স্থান কালের বিভিন্নতায় অজস্র ধর্মের সৃষ্টি ঘটেছে। সব ধর্মের মূল সুর যদিও এক কিন্তু সবাই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায় এবং চায় অন্যকে হেয় প্রতিপন্ন করতে!

প্রত্যেক দেশের শাসক গোষ্ঠী এই মানসিকতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে চলেছে। তারা এক ধর্মকে অন্যের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়েছে।

যে মানুষ শক্তিশালী সে জমি আর সম্পদ কুক্ষিগত করেছে, যে দূর্বল সে বঞ্চনার আড়ালেই থেকে গেছে। এইভাবে সমাজে বিত্তশালী আর বিত্তহীনের একটা বিরাট ব্যবধান ঘটে গেছে। সমাজ গঠনের শুরু থেকেই ঘটে চলা এই নিরন্তর ফারাকটা এখনও পর্যন্ত একই রকমভাবে বিদ্যমান।

এখানেও স্বাভাবিকভাবেই একটা লড়াই সৃষ্ট হয়েছে। মানুষ এই ক্ষেত্রেও হিংসার আশ্রয় নিয়েছে। আমাদের ভারতীয় সমাজে জাত পাতের বিভেদ ডেকে এনেছে অহেতুক হিংস্রতা। কোনও ধর্মের অহিংসার বাণীতে কেউ কান দেয়নি।

* * * *

বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উদ্ভব সেই প্রাচীন কাল থেকেই। আগুন জ্বালানো দিয়ে শুরু। তারপর চাকার আবিষ্কার! আর কোথায় যে শেষ কেউ জানেনা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি আজ আমাদের এইখানে এনে পৌঁছে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবিষ্কার আমাদের কতদূর নিয়ে যাবে তা জানা নেই। তবে অসীম সম্ভাবনার দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছি আমরা। হয় এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের উপকার করবে বিপুল পরিমাণে আর নয়তো মানব প্রজাতির ধ্বংস ডেকে আনবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিশেষত যুযুধান দুই পরাক্রমী শক্তির হাতে আছে অনেকটাই সেই নির্ণায়ক ক্ষমতা।

এখনকার দেশ কাল এবং সমাজ নির্বিশেষে হানাহানি খুব বেশী মাত্রায় বেড়ে গেছে। মানবজাতি খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক অন্ধকার নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।

সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে লিঙ্গ বৈষম্যের কথা না বললেই নয়। সভ্যতার শুরু থেকেই যে সবল সে দূর্বলের ওপর অত্যাচার করেছে একথা অনস্বীকার্য! সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে পাওয়া যাবে, নারীর ওপর পুরুষের নিপীড়ন আর নিগ্রহের অজস্র কাহিনী! এমনকি এতগুলো শতাব্দী কাটিয়েও নারীর অবস্থান পুরুষের অনেক পেছনে। খুব সম্প্রতি যে আধুনিক কালের ঘটমান বর্তমান, সেখানে আমরা নারীদের ক্রমাগত উঠে আসার, সমানতার সম্মান লাভ করার ঘটনা দেখছি।

যে নারীদের পথ প্রদর্শনের ফলে আজকের দিনে মেয়েরা সমমর্যাদা অর্জনের পথে তাদের প্রতি কুর্নিশ। কিন্তু এই পথ চলা সবে শুরু হয়েছে, হাজার হাজার বছরের পুরুষের আধিপত্য এত সহজে কেটে যাবে না।

ইদানীংকালে বিশেষ করে ভারতবর্ষের সমাজে দেখা যাচ্ছে নারীদের অবস্থানকে পিছিয়ে দেওয়ার একটা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। ধর্ষণ, তারপর খুনের ঘটনা খুব বেড়ে গেছে। নারীরা যদি নিরাপত্তার অভাব বোধ করে তাহলে সে গৃহবন্দী হতে চাইবে। নারী যখন পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠছে তখন পুরুষ প্রধান সমাজের পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া কষ্টকর হয়ে উঠছে অনেক ক্ষেত্রেই।

সামাজিক বৈষম্য, ঘৃণা, দারিদ্র্য ইত্যাদির থেকে নিস্তার পেতে গেলে একমাত্র পথ হল ঘুরে দাঁড়ানো, উল্টো পথে হাঁটা। তবে বিজ্ঞানকে সাথে নিয়ে। মানব কল্যাণকামী চিন্তার সাহায্য নিয়ে আমরা যেন সভ্যতার পথে এগিয়ে যেতে পারি। বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি যখন মানব কল্যাণকারী হবে তখনই পৃথিবী শান্ত হবে।

ব্যবসায়িক এবং তথাকথিত উন্নয়নের নামে পৃথিবীর সবুজকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে তা যদি এখনই বন্ধ না করা যায়, তাহলে এমনিতেই পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য।

এখন বিশ্বের প্রায় সমস্ত ক্ষমতাশীল দেশের হাতে রয়েছে পরমাণু বোমা, তার জোরে সবল দূর্বলের ওপরে আস্ফালন করে চলেছে।

কিন্তু পরমাণু বিস্ফোরণের আবিষ্কার তো ধ্বংসের কারণে হয়নি। বিজ্ঞানীদের, প্রচেষ্টা ছিল বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ফলতঃ ঘটবে অনেক সামাজিক উন্নতি।

একদিকে আমরা চাইছি এই গ্রহ যে এই মহাবিশ্বে সম্ভবতঃ একাকী পথ হাঁটছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। শুধু দেশ বা জাতির সীমিত ধারনায় আটকে না থেকে, গোটা পৃথিবীকে যদি মা বলে মানি তাহলে তাকে বাঁচানোর চেষ্টায় ত্রুটি রাখা চলবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ, ক্ষুদ্রতম প্রাণীকেও বেঁচে থাকার সমান অধিকার দান আমাদের আশু কর্তব্য। অন্যদিকে সামাজিক, ধার্মিক, আর্থিক সমস্ত রকম বৈষম্যকে মুছে ফেলার চেষ্টা, প্রযুক্তির অপব্যবহার সবচেয়ে প্রথমে বন্ধ করা, এইগুলোই পৃথিবীকে বাঁচাতে পারবে।

তবে বিজ্ঞান আমাদের এটাও জানিয়ে দিয়েছে যে পৃথিবী এমনকি সূর্যেরও মৃত্যু অবশ্যাম্ভাবী।

সৃষ্টি, স্থিতি এবং বিনাশের চক্রে আবর্তিত হচ্ছে এই মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বের নিয়মই তাই। জন্মায় যা তা একদিন না একদিন মারা যাবেই। সৃষ্টি আর ধ্বংস নিরন্তর চলতে থাকে। সেই সূত্র অনুসারে এই গ্রহের মৃত্যুর আগেই যদি মানবজাতির ঠিকানা বদলাতে হয় তাহলে তাকে অন্য বাসস্থান খুঁজে নিতে হবে। এক্ষেত্রে অন্য গ্রহ। সেই লক্ষ্যে কাজ শুরুও হয়ে গেছে। আরও হাজার বছর পরে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির হাত ধরে আমরা যে কোথায় পৌঁছে যাব, তা এখনই কল্পনার অতীত। সঙ্গে যদি সব ধর্মের মূল বার্তাটি থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

আগামীর সেই সুদিনের জন্য সবরকম শুভ কামনা রইল।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।