
জামাই।। (মুখে লুচি আলুর দম নিয়ে...) না না আর দেবেন না, খেতে পারব না।
মাদার-ইন-ল।। খাও খাও, আরও দুটো লুচি খেলে কিচ্ছু হবে না। আর একটু আলুর দম দিই?
জামাই।। না না দেবেন না মা, পেট ভরে গেছে।
মাদার-ইন-ল।। সেকি! এখনই তো খাবার সময় তোমাদের। আমাদের বয়েসে এলে ইচ্ছে হলেও আর খেতে পারবে না।
জামাই।। খাবার দাবারে যা ভেজাল, আপনাদের থেকে অনেক আগেই আমরা বুড়িয়ে যাবো।
মাদার-ইন-ল।। তা কেন, মনের বয়েসকে ধরে রাখাটা তো তোমার হাতে। (হাঁক দিয়ে) ও টুসি তুই বেরোবি কখন বাথরুম থেকে? লুচি তো ঠান্ডা হয়ে গেল।
জামাই।। বেকার চিৎকার করছেন মা। ও আজ মাথায় শ্যাম্পু করবে। সহজে বেরোচ্ছে না।
মাদার-ইন-ল।। সত্যি গো, কি সুন্দর চুলের গোছ ছিল মেয়েটার আমার। যে দেখত সেই প্রশংসা করত। রোজ রোজ শ্যাম্পু করে, হিট দিয়ে দিয়ে একদম নষ্ট করে ফেলল। ঘোড়ার লেজের মতো ওই স্ট্রেট চুল - কি স্টাইল বাপু বুঝিনা।
জামাই।। আপনি চেয়ারে বসুন না মা। দাঁড়িয়ে কেন?
মাদার-ইন-ল।। দাঁড়াও, আগে তোমার পায়েসটা বাটিতে দিয়ে দিই।
জামাই।। এর পর আবার পায়েসও?
মাদার-ইন-ল।। নিশ্চয়ই। শেষপাতে পরমান্ন ছাড়া জমে? তাছাড়া তুমি না খেলে উনি খুব দুঃখ পাবেন। সেই শোভাবাজার থেকে নাগড়ি করে মাজদিয়ার নতুন গুড় এনেছেন, জামাইকে পায়েস খাওয়াবেন বলে।
(বাটি ভর্তি পায়েস জামাই-এর সামনে রেখে চেয়ারে বসেন।)
জামাই।। আচ্ছা মা, আপনি মনের বয়েস ধরে রাখতে পেরেছেন?
মাদার-ইন-ল।। সংসারের নানা কাজে ফুরসৎ পাই না, কিন্তু ইচ্ছে তো করেই। একটু নাটক সিনেমা দেখতে যাই, রান্নায় ছুটি করে হপ্তা শেষে রেস্টুরেন্টে ভালো মন্দ খাই, বই পড়ি, গান শুনি, (হেসে ফেলে) তোমাদের মত মোবাইল নিয়ে খুটখাট করি।
জামাই।। করেন না কেন? এনাক্ষী তো এখন আমার জিম্মায়, আপনারা দুজনেই ঝাড়া হাত পা।
মাদার-ইন-ল।। উনি পছন্দ করেন না। বলেন - ছুটির দিনে বাড়িতেই ভালো মন্দ রান্না করো, দুজনে রসিয়ে খাওয়া দাওয়া করব, বসে গল্প করব।
জামাই।। বাঃ দারুন রোম্যান্টিক ব্যাপার তো।
মাদার-ইন-ল।। একদমই না। বরং উলটোটা, খুব আনরোমান্টিক মানুষ উনি। খানিক একথা ওকথার পরেই শুরু করে দেন সংসারের গল্প। ওঁনার অফিসের গল্প। তোমাদের কথা। রিটায়ার করে কি কি করবেন তার প্ল্যান। দুঃখ করেন, বুড়ো বয়েসে কে দেখবে?
জামাই।। আচ্ছা মা, আপনি নিজে খুব রোম্যান্টিক, তাই না?
মাদার-ইন-ল।। হুঁ, বয়েসকালে তো কিছুটা ছিলামই।
জামাই।। তাই? তাহলে আপনার জীবনে নিশ্চই প্রেম এসেছিল?
মাদার-ইন-ল।। চুপ চুপ, আস্তে। পাশের ঘরে বসে খবর কাগজ পড়লে কি হবে, কান খাড়া করে সব শুনছেন উনি। (নীচু স্বরে) প্রেম আমার জীবনেও এসেছিল বৈকি। তবে খুব গোপনে, মনে মনে। তোমাদের মতন তো এত খোলামেলা ব্যাপার ছিল না তখন।
জামাই।। ভেরি ইন্টারেস্টিং। বলুন না একটু শুনি।
মাদার-ইন-ল।। বলার মতো কিছুই না। তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়ে, শুনলে হাসবে।
জামাই।। ও মা হাসব কেন, বলুন।
মাদার-ইন-ল।। (খুব নীচু গলায়) আমার দাদার বন্ধু ছিল। লম্বা সৌম্যকান্তি চেহারা, ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন। আলবোট করে আঁচড়ানো চুল। পান খেতেন। গুনে গুনে তিনবার কথা হয়েছিল। দুজনে দুজনকে আপনি করে বলতাম।
জামাই।। আপনি করে প্রেম?
মাদার-ইন-ল।। তখন ওটাই রেওয়াজ ছিল। তোমাদের এখনকার মতো তুই তোকারি করার প্রশ্ন তো ছিলই না, আপনি থেকে তুমি হতে বছর গড়িয়ে যেত। গল্প, নভেল, নাটকেও তখন আপনি থেকে তুমিতে নামতে বই-এর আদ্ধেক পাতা ফুরিয়ে যেত।
জামাই।। একান্তে সাক্ষাৎ হয়নি কখনো?
মাদার-ইন-ল।। ছি ছি, ওসব কল্পনাই করতে পারতাম না আমরা।
জামাই।। তাহলে কি হল শেষ পর্যন্ত?
মাদার-ইন-ল।। কি আর হবে। অমলেন্দুদা - (জিভ কেটে) এই যাঃ নামটা বলেই ফেললাম। বাড়ির বড় ছেলে, পরে দু' বোন ছিল। অসচ্ছ্বল সংসারের হাল ধরতে হঠাৎ চাকরি নিয়ে অন্য দেশে চলে গেলেন। ভালোবাসি বলার সুযোগটাও পেলাম না।
জামাই।। সেকি, উনি বুঝতে পারেন নি আপনি ওঁনাকে ভালোবাসেন?
মাদার-ইন-ল।। কখনো মনে হতো বোঝে। রাশভারী মানুষ ছিলেন তো খুব, (আবেগমথিত কন্ঠে) তাই কখনো আবার মনে হতো হয়তো কোনোদিন টেরই পান নি।
জামাই।। যোগাযোগ করতে ইচ্ছে করে না আবার নতুন করে?
মাদার-ইন-ল।। নাঃ এই বেশ আছি। স্বামী, মেয়ে, তুমি - এই নিয়ে এখন তো আমার ভর্তি সুখের সংসার। তোমার পাতে আলুর দম এখনো থেকে গেল তো, আর একটা লুচি দিই?
জামাই।। না না একদম না। পেট এখনই আঁইঢাঁই করছে। দেখে বেশ লোভও হচ্ছে, আবার ভাবছি কোন পেটে এই একবাটি পায়েস খাবো।
(জামাই গ্লাসের জল খেতে গেলে...)
মাদার-ইন-ল।। খেতে বসে অত জল খেলে পেট আঁইঢাঁই তো করবেই।
জামাই।। (হেসে) এই বদ অভ্যেসটা কিছুতেই ছাড়তে পারলাম না। তা আপনার সেই ব্যর্থ প্রেমের বিরহ বেদনা কতদিন চলেছিল।
মাদার-ইন-ল।। বিরহ দেখানোর সময় পেলাম কোথায়? সেই... (হঠাৎ থেমে গিয়ে) আচ্ছা, তুমি তো দেখি আমাকে সাংবাদিকের মতো প্রশ্ন করে যাচ্ছো একের পর এক।
জামাই।। (একগাল হেসে) বেশ ভালো লাগছে কিন্তু শুনতে। এভাবে আপনার সঙ্গে তো কখনো কথা বলিনি। একদম অন্যরকম লাগছে আপনাকে আজ।
মাদার-ইন-ল।। কালটিভেট করতে ইচ্ছে করছে?
জামাই।। মাই গড। আপনি একথাও জানেন?
মাদার-ইন-ল।। ওমা! না জানার কি আছে, আমি কি ফেলুদা পড়িনি না দেখিনি?
জামাই।। না মানে সেকথা বলিনি। একদম সঠিক জায়গায় কথাটা ব্যবহার করলেন তো তাই...
মাদার-ইন-ল।। শোনো একটা সার কথা বলি, তোমরা আজকালকার ছেলেমেয়েরা আমাদের যতোটা বোকাসোকা সেকেলে ভাবো ততোটা কিন্তু আমরা মোটেই নই। এই বয়েসে এসে তোমরা যা বলো বা করো সেরকম কিছু কিছু জিনিস বলা বা করা আমাদের আর মানায় না। তাই তোমাদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছি নাহলে...
জামাই।। লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান করে দিতেন, তাই তো?
মাদার-ইন-ল।। একদম। (হাঁক দিয়ে) ও টুসি বের হ, আর কতক্ষণ বসে থাকবি বাথরুমে? মেয়েটাকে নিয়ে না আর পারি না। (জামাইকে) পায়েসটা তুমি খেয়ে নাও এবার।
জামাই।। একটু জিরিয়ে নিয়ে খাচ্ছি। তারপর কি হল বলুন না মা?
মাদার-ইন-ল।। কি আর হবে। সেই বছরেরই অগ্রহায়ণ মাসে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।
জামাই।। বাবা প্রথম জীবনে নিশ্চয়ই রোম্যান্টিক ছিলেন?
মাদার-ইন-ল।। রোমান্টিক? শোন তাহলে। (খুব নীচু স্বরে) ফুলশয্যার পরের দিন সকালে উনি আমাকে সেই খাটেরই তলায় ঢুকিয়েছিলেন বড় টিন থেকে কৌটো ভরে চাল বের করার জন্যে।
জামাই।। বলেন কি? (হো হো করে হেসে ওঠে)
মাদার-ইন-ল।। তোমার এই ফাদার-ইন-ল-কে নিয়েই তো তিরিশটা বছর কাটিয়ে দিলাম।
জামাই।। বাবাঃ এতক্ষণ 'উনি' 'ওঁনার' করে এখন একেবারে ফাদার-ইন-ল। নাঃ সত্যিই আপনাকে আমায় কালটিভেট করতেই হচ্ছে।
মাদার-ইন-ল।। সে কোরো'খন। এখন পায়েসটা খেয়ে বলো, কেমন হয়েছে?
জামাই।। (দু' চামচ পর পর মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে পরমান্নের আস্বাদ নিতে নিতে) উম্ম্ অপূর্ব। জানো, আমার মা ঠিক এরকম নতুন গুড়ের পায়েস বানাতো... না মানে আপনার পায়েসটা খেতে একদম আমার মায়ের মতো হয়েছে।
মাদার-ইন-ল।। শুধরে নিয়ে তুমি থেকে আবার আপনিতেই চলে এলে?
জামাই।। না মানে... আসলে আপনাকে তো কখনো...
মা।। ইন-ল টা বাদ দিয়েই দেখো না, আমরা তোমার মা-বাবা হতে পারি কিনা।
(জামাই মায়ের হাত চেপে ধরে। উনি পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করেন।)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
