কবিতা

আমার প্রিয় নীলিমা



তহমিনা খাতুন (বাংলাদেশ)


নীলিমা...
আমার হৃদয়ের গভীরতম কোণে রাখা এক নাম।
এক শিশু,
যার চোখে ছিল না কৌতূহল,
ছিল কেবল বিস্ময়ের আঁচড়,
যেন এই পৃথিবীটা ওর জন্য নয় -
বরং ও যেন এই পৃথিবীর ভুলে যাওয়া এক প্রান্তিক গল্প।

ছোটবেলা থেকেই শান্ত, স্থির,
স্নিগ্ধ অথচ অদ্ভুত রকমের নিঃসঙ্গ।
মায়ের কোলে না খেলে,
ও বেড়ে উঠেছিল অনাত্মীয় এক গৃহকোণে -
যেখানে বাবার ভালোবাসাও
প্রতিদিন মুছে যেত এক সৎসম্পর্কের নির্লজ্জ কোলাহলে।

সব কিছু ছিল -
খাবার, জামা, বই, ঘর -
তবু কিছুই ছিল না ওর একান্ত নিজের।
সব যেন কুড়িয়ে পাওয়া এক ফোঁটা দয়া
নিজেরই জন্মভিটায়
নীলিমা ছিল এক উপেক্ষিত অতিথি।

আমার স্কুলেই পড়ত ও।
প্রতিদিন এক কোণে বসে থাকত,
ক্লাসে কেউ উচ্চস্বরে ডাকলে
চমকে উঠত -
ভয়ে না সম্মানে,
তা বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল।

মুখে কোনো রঙ ছিল না,
চোখে কেবল একটি প্রশ্ন -
আমি কি এখানে থাকবার যোগ্য?
সেই চোখ আজও আমাকে তাড়া করে,
আজও ঘুম ভাঙায় মধ্যরাতে।

যেদিন ওর প্রথম ঋতুস্রাব হয়েছিল,
ও প্রথম আমার কাছেই এসেছিল -
এক হাতে জামার প্রান্ত ধরে,
অন্য হাতে ভয়।
কিন্তু চোখে ছিল নির্ভরতার রেখা।
সেদিন বুঝেছিলাম -
ওর দুনিয়ায় আমি আছি,
আমি আছি একজন নিজের মানুষ হয়ে।

আমি ওকে আগলে রাখতে চেয়েছিলাম,
জীবনের যাবতীয় নিষ্ঠুরতা থেকে।
কিন্তু আমি তো ছিলাম কেবল একজন শিক্ষক -
মমতার গভীরতা থাকলেও
আইনগত অধিকারের জোর তো ছিল না আমার।

তারপর একদিন,
হঠাৎ করে,
প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এসে শুনি -
নীলিমার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, জোর করে।
বয়স তখন তেরোর কোঠাতেও পৌঁছয়নি,
তবু কন্যাদানের ভার সেরে ফেলেছে ওর বাবা।

সেই বিয়েতে ছিল না আশীর্বাদ,
ছিল না গয়নার ঝলক,
ছিল কেবল
একটা নিষ্পাপ প্রাণকে সমাজের দায়মুক্তিতে ঠেলে দেওয়া।
একটা মেয়েকে বোঝা থেকে বউ বানানোর নিষ্ঠুর সমাপ্তি।

কিন্তু সেই সংসারও ওকে নিজের করে নেয়নি।
বরং ওর স্বপ্নগুলোকে
প্রতিদিন পিষে মেরেছে এক নেশাগ্রস্ত পিশাচ।
গর্ভবতী অবস্থায় -
যখন প্রতিটি নারী আশায় বুক বাঁধে,
নীলিমা বেঁধেছিল শোক,
একরাশ শোক!
নীলিমা হারিয়েছিল শেষ আশাটুকুনও।

এক নিষ্ঠুর সকালে শুনলাম,
আমার সেই প্রিয় ছাত্রী,
আমার সেই ছোট্ট নীলিমা -
আর নেই।

শেষ নিঃশ্বাসে কি ও আমায় খুঁজেছিল?
চোখে কি ছিল সেই চিরচেনা ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি?
কি যেন বলতে চেয়েছিল,
কি যেন চিরকাল না বলা থেকে গেল -

আমার নীরব নীলিমার মুখ
আজও ভাসে আমার কল্পনায়,
যেন কষ্টের বিষে নীলাভ হয়ে উঠেছে -
এক গভীর বিষণ্নতা,
যা ছুঁয়ে যায় আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

আজও ওর গল্প বেঁচে আছে -
আমার প্রতিটি ক্লাসরুমে,
প্রতিটি শিশুর মুখে,
প্রতিটি নিষ্পাপ চোখে,
যারা কথা বলতে জানে না,
তবু প্রতিদিন বলে ফেলে
একটা চুপ থাকা ভাষায়।

নীলিমা নেই,
তবুও আছে।
ওর গল্প আছে।
ওর স্মৃতি আছে।
আর আমি থাকব,
ওর সেই না-বলা কথাগুলোর পাঠক হয়ে -
আজীবন।