গল্প ও অণুগল্প

নিখোঁজ কবির ডায়েরি (চতুর্থ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অভিজিৎ রায়


[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]

(চার)

- গুডমর্নিং বিনয়বাবু।

- সত্যিই কী গুড? নতুন জায়গায় কাউকে কিছু না বলে এভাবে বেরিয়ে পড়ছেন। ফোনের সিম নাম্বারটা তো নতুন। আমি ছাড়া তো কেউ জানে না। ওটা অন্তত অন রাখুন।

- রাখা উচিত। কিন্তু ভয়ে পারছি না। সবসময় মনে হচ্ছে আমাকে কেউ খুঁজছে। আর ওই ব্লু-টুকু পেলেই আমার খোঁজ পেয়ে যাবে।

আচ্ছা। বেশ। তাহলে আমাকে অন্তত তিনবেলা ফোন করবেন। নইলে আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। আজ না হয় কাল আপনি ফিরবেন আর সবাই সব জানবে অন্তত আপনার পরিবারের লোকেরা। আমার কী হাল হবে ভাবতে পারছেন?

- কেউ কি কোনো যোগাযোগ করেছিল আপনার সাথে?

- না। করেনি। তবে সুবোধ গতকাল এসেছিল। অঞ্জনা বৌদি ওর বাড়ি গিয়েছিল। ওরা সবাই মিলে থানায় একটা এফ.আই.আর.-ও করে এসেছে।

- আপনাকে সুবোধ কিছু জিজ্ঞেস করেনি?

- আমার প্রফেশন আলাদা। ওরা বোধহয় ভাবতে পারেনি আমি আপনাকে সহযোগিতা করছি। যাইহোক, আজকের দিনটা ঘুরে নিয়ে লেখায় মন দিন। খুব বেশি সময় আপনি হয়ত পাবেন না। তাড়াতাড়ি লিখে ফেলুন।

- হ্যাঁ। মনে আছে। জানাব আপনাকে সব। এখন রাখি?

- হ্যাঁ রাখুন। আমারও একটা মিটিং আছে। এক্ষুনি বের হব।

কথা শেষ হতে না হতেই শ্যামলাল রুটি আর তরকারি নিয়ে হাজির। শ্যামলালের পিছু পিছু পিকুও। থালা থেকে রুটিগুলো তুলে গুনে গুনে রাখল সৃজিত। চারটে রুটি। এতগুলো রুটি সৃজিত খায় না। একটা রুটি প্রথমেই খুব ছোট ছোট টুকরো করে পিকুর সামনে ছড়িয়ে দিল। পিকু একবার সৃজিতের মুখের দিকে তাকাল। যেন মনে হল, প্রশ্ন করছে। খাব? সৃজিত হালকা হেসে হাতের ইশারা করে পিকুকে বলল, "কী রে? খা।" সাথে সাথে পিকু গবগব করে খাওয়া শুরু করল। ওর খাওয়া দেখে সৃজিত আর একটা রুটি ছিঁড়তে শুরু করল। আবার পিকুর মুখের সামনে ছড়িয়ে দিল। এবার পিকু ওর খাবার গতি কমাল। প্রথমে যতটা খিদে ছিল এখন আর ততটা নেই। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। এবার সৃজিত নিজে খাওয়া শুরু করল। শ্যামলাল চা দিয়ে যাবার সময় পিকুকে ডাক দিল। পিকু একবার ওর মুখের দিকে তাকাল আর একবার সৃজিতের দিকে। নড়ল চড়ল না। মুখ গুঁজে সৃজিতের চেয়ারের পাশে বসে থাকল। শ্যামলাল হালকা হেসে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।

বারান্দার সামনে উঠোনের উপর একটা কৃষ্ণচূড়া গাছে খুব সুন্দর একটা কালো হলুদ পাখি। সৃজিত দেখল। একবার গাছ থেকে রেলিংয়ের উপর উড়ে এসে বসল। তাই দেখে পিকু ভৌ ভৌ করে তেড়ে গেল পাখিটার দিকে। পাখিটাও সুডুৎ করে উড়ে গিয়ে বসল গাছটার ডালে। তারপর সুন্দর আওয়াজে ডাকতে শুরু করল। পিকুও পাখিটার ডাক শুনে রেলিংয়ের ধারে গিয়ে ভৌ ভৌ করে ডাক ছাড়তে লাগল। সৃজিত পিকুকে থামানোর চেষ্টা করল। "এই থাম। পিকু। থাম।" হাত তুলে মারতে উঠল পিকু না থামায়। পিকু একবার দৌড়ে পালাল একটু দূরে। তারপরই আবার রেলিংয়ের ধারে এসে চেঁচাতে শুরু করল। সৃজিতের বিরক্তি শুরু হল। পাখিটার ডাকটা তার খুব ভাল লাগছিল। কিন্তু পিকুর ভৌ ভৌ চিৎকারের চোটে পাখিটা উড়ে পালাল কিছুক্ষণ বাদেই।

সৃজিত ব্রেকফাস্ট কমপ্লিট করে স্নানে ঢুকে গেল। স্নান থেকে বেরিয়ে লিখবে বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে সে। বাথরুম থেকে বের হবার পর দেখল পিকু তার ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘরের টেবিলের উপর একটা জলের বোতল ছিল। পিকু হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠে সেই বোতলটা নিচে ফেলে দিতেই সৃজিতের মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেল। হয়ত পাখিটাকে উড়িয়ে দেবার রাগটা দেখাল এখন। পিকুকে তাড়া করে ঘর থেকে বের করে দরজা বন্ধ করে দিল সে। দরজার বাইরে পিকুর ছোট ছোট হাতে আঁচড় কাটার আওয়াজ পাচ্ছিল সৃজিত। এখন পিকুর জন্য একটু খারাপ লাগছে তার। কিন্তু মনখারাপকে পাত্তা না দিয়ে ব্যাগ থেকে ট্যাবটা বের করে নিজেকে লেখার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করল বারান্দায় পিকুর দৌরাত্ম্য বাড়ছে তা কাঠের মেঝেতে দাপাদাপির শব্দে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এরকম সময়গুলোতে সৃজিত খুব তাড়াতাড়ি সংযম হারিয়ে ফেলে।

- বাবা, ও বাবা দরজাটা খোলো না। আমার ভয় করছে। মা রাগ করে কথা বলছে না আমার সঙ্গে।

- আমি এখন লিখতে বসেছি। তুমি মাকে সরি বলে ভাব করে নাও টুকুন।

- না। নেব না। তুমি দরজা খোলো। আমাকে নিয়ে বেড়াতে চল তুমি।

দরজায় দুম দুম করে কিল মারতে মারতে চিৎকার করছিল সোহিনী। সৃজিত মেজাজ হারিয়ে ফেলল অল্পতেই। দরজা খুলেই সোহিনীর চুলের মুঠি ধরে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় কষাল। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে চলে গেল।

মিনিটখানেক যেতে না যেতেই অঞ্জনা ছুটে এল। বলল,

- তোমার কী একটুও বুদ্ধিসুদ্ধি নেই? তুমি মেয়েটাকে মেরে দিলে? একেই আমি রাগ করেছি বলে ওর মানসিক অবস্থা ভালো নেই। তারপর তুমি এরকম করলে? তুমি কি মানুষ? মানুষ না হলে ওসব লেখক, কবি হওয়া যায় না। বুঝলে?

চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতে অঞ্জনা বেডরুমে চলে গেল মেয়েকে শান্ত করতে। সৃজিত ভাবতে বসল। লেখক, কবিরা কি সত্যিই মানুষ? মানে সাধারণ মানুষের মতো আবেগ নিয়েই কি তারা প্রাত্যহিক জীবনে বাঁচে? বাঁচলে চলে? মানুষের মনের অন্ধকার জগত নিয়েই তো লেখক কবিদের কাজ। সেই অন্ধকার ঘেঁটে ঘেঁটে আলোর খোঁজ লিখে রাখাটাই তো লেখক-কবির কাজ! তাই নয় কি? আবারও সেই প্রশ্ন। নিজের কাছে নিজের প্রশ্ন। অবশ্য এই প্রশ্নে পথ হারায় না সৃজিত। সে জানে মানুষের অবচেতনের অন্ধকারেই লুকিয়ে আছে সাহিত্যের মায়াবী আলো। যা পাঠককে আকর্ষণ করে। পাঠক যখন নিজেকে খুঁজে পেতে চায় এবং গল্প, উপন্যাসের চরিত্রে তখন লেখক সাফল্য পায় তার অন্বেষণের। এই অন্ধকারে ঘাঁটাঘাটি করতে করতে যে একজন মানুষ অন্ধকারের ছায়ায় হারিয়ে যায় না এমন নয়। কিন্তু তার চরিত্রেরা হারিয়ে যায় না। পাঠকের স্মৃতিতে তারা উজ্জ্বল আলো নিয়ে ফিরে আসে। এত কঠিন একটা কাজে মানুষকে কখনও কখনও কঠোর হতে হয় নিশ্চয়। মেয়েকে যে সৃজিত ভালোবাসে না এমন নয় কিন্তু তার কাজের ক্ষেত্রে কোনো আপোষ করতে সে রাজি নয়। অন্ধকারের প্রতিটি স্তরে যেভাবে চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে সেভাবে তাদের খুঁজে লিপিবদ্ধ করার মতো কঠিন কাজে হাত দেবার সময় এইসমস্ত ছোটখাটো ব্যাপারে কি মাথা লাগালে চলে? লেখার টেবিলে বসে এই কথাগুলো ভাবছিল যখন, তখন অঞ্জনা আবার ফিরে এলো।

- এই যে তুমি আমাদের গুরুত্ব দিচ্ছ না। সংসারকে গুরুত্ব দিচ্ছ না। মেয়েকে গুরুত্ব দিচ্ছ না - এর ফল তুমি একদিন বুঝবে। আমি জানি তুমি সেসব লিখবে তোমার লেখায় কিন্তু তাতে বাংলা সাহিত্যের যতই উন্নতি হোক, তোমার উন্নতি একদম হবে না। হতে পারে না। ওইটুকু মেয়ে ভয় পেয়ে কাঁদছিল বাবার আশ্রয় পাবার জন্য আর তুমি কি না ওকে মারলে?

- আয়, ভেতরে আয়।

দরজা খুলে পিকুকে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে নিল সৃজিত। বারান্দার রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়ে শ্যামলালকে হাঁক দিয়ে আরও এককাপ চা অর্ডার দিল। দরজা ভেজিয়ে এসে খাটের উপর ট্যাব খুলে লেখার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। মেঝেতে পাপোষের উপর নখ ঘষছিল পিকু। সৃজিত খাট থেকে নামল। পিকুর মাথায় ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

- ওরম করে না পিকু। আমার লিখতে অসুবিধা হবে। এরকম করলে কিন্তু তোমাকে বাইরে বের করে দেব।

কী অদ্ভুত? পিকু চুপ করে গেল। শ্যামলাল চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল। চায়ের কাপের ট্রে-তে আজকের খবরের কাগজ।

ট্যাবটা পাশে সরিয়ে রেখে খবরের কাগজে চোখ বোলাল সৃজিত। পাঁচের পাতায় ছোট করে খবরটা চোখে পড়ল। না, তার কোনো ছবি নেই। বাঁচা গেল। পাঁচটা বাক্যেই তার নিরুদ্দেশের খবরটা শেষ করে দিয়েছে। নিজের নামটা বদলাতে হবে এখানে কারোর সাথে আলাপ হলে। আপাতত, এটুকুই সিদ্ধান্ত নিল সৃজিত। মাথা থেকে বাকি সব ভাবনা দূরে সরিয়ে নিজের লেখাতে মনোনিবেশ করার চেষ্টা করতে থাকল। পিকু ঘরের মেঝেতে একটা ফাঁকা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ নিয়ে খেলা করছিল। সৃজিতের মনে হল তার ভাবনাগুলোও যেন ওরকম ফাঁকা হয়ে পড়ে থাকা ক্যারিব্যাগ। কিন্তু সৃজিত বুঝতে পারছে না যে ভাবনাগুলো নিয়ে সে খেলছে, ছিঁড়ছে নাকি জীবনকে ধরার জাল বুনছে।

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।