গল্প ও অণুগল্প

আমার মা (বিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


মজিদ ভাইয়ের মুখে ওর জীবন সংগ্রামের কাহিনি শুনতে শুনতে সেদিন কখন যে রাত শেষ হয়ে গেছিল তা আমরা বুঝতেই পারিনি। সারারাত ধরে শুনেছিলাম ওর মা-বাবার মৃত্যুর পর থেকে কীভাবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছে। খোরশেদকে মানুষ করার জন্য নিজের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে। সেদিনই প্রথম জানতে পারলাম যে, খোরশেদ ওর মায়ের পেটের ভাই নয়। ওর মাসির ছেলে খোরশেদ। ওর জন্মের দুমাস পরেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাসি মারা যায়। মেশো লরি চালাতেন। শিলিগুড়ি থেকে ফেরার পথে লোহার রড ভর্তি একটা লরিকে ধাক্কা দেয়। সারা শরীরে রড ঢুকে গিয়ে তৎক্ষনাৎ তাঁর মৃত্যু হয়। মেশো তাঁর একমাত্র ছেলের মুখটাও দেখে যেতে পারেননি। খোরশেদ এ ব্যাপারে কিছুই জানে না। বাবা মারা যাবার সময় মজিদ ভাইকে সব বলে গেছেন। মজিদ ভাইয়ের মতো এমন দরদী মানুষকে সত্যি সত্যি শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারা যায় না। এ গ্রামের কেউই একথা জানেন না। ওদের আসল বাড়ি নন্দনপুর থেকে আরও অনেকটা ভেতরে। সেখানে ওর কে কে আছেন তাও মজিদ ভাই জানেনা। এসব কথা ঘুনাক্ষরেও কাউকে জানতে দেয়নি মজিদ ভাই। আমাকেও শপথ করিয়ে নেয় - আমি যেন কোনোদিন খোরশেদকে এসব কথা না বলি। পরদিন আমার স্কুল ছুটি ছিলো। মজিদ ভাইয়ের অনুরোধে সেদিন ওদের বাড়ি থেকে গেলাম। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব মিটলে আমি আমার দ্বিচক্রযানটিকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

বাসবদাকে খোঁজার চেষ্টা সফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। ইতিমধ্যেই বাসবদার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তিনি নাকি গ্রাম-গঞ্জের মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা প্রচার করে মানুষকে খেপিয়ে তুলছেন। তাঁর বাড়িতেও খানাতল্লাশি চালানো হয়েছে। তথাকথিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দল যাঁরা একসময় নানারকম সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন তাঁদের প্ররোচনায় পুলিশ সদলবলে বাসবদার বাড়িতে ঢুকে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে নতুন কেনা এল.ই.ডি. এবং কম্পিউটারটাকে মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে রেখে গেছে। বাসবদার বাবা হিরন্ময় বাবু মানবাধিকার সংগঠনকে বিষয়টি জানিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। তাঁরা যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছেন তাতে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বেন। এই পরিস্থিতিতে বাসবদার খোঁজ করা ঠিক হবে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যেই বাসবদার সঙ্গে যাঁরা সবসময় ওঠাবসা করতেন তাঁদের কাউকে কাউকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সম্প্রতি এই ধরনের একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে - ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেই তাঁকে হয় অ্যারেস্ট করা হবে অথবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের জীবন নরক করে তোলা হবে। কখনো কখনো বিনা বিচারে থানা লক-আপ কিম্বা জেল-হাজতে বন্দী করে রাখা হবে। কিন্তু সরকারের প্রশংসা করলে উচ্চ পদ বা সম্মান যোগ্যতা না থাকলেও অযাচিতভাবে এসে যাবে। এই কারনেই কেউ কেউ অহেতুক ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে চান না। তবে যে যা-ই বলুন না কেন এক ধরনের নাছোড়বান্দা মানুষ আছেন যাঁরা কোনো অবস্থায়ই নতি স্বীকার করতে জানেন না। আমৃত্যু ন্যায্য কথা বলেন, ন্যায়বিচার দাবি করেন। গুটিকয়েক মানুষকে জড়ো করে সরকারের জনবিরোধী নীতি ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে ভয় পান না। আজকের যুবসমাজের মনে তা কতটা প্রভাব ফেলে তা বলা দুষ্কর।

স্কুল থেকে বেরিয়ে ভাবলাম আজ এখনই বাড়ি ফিরবো না তাই রোড স্টেশন থেকে বাঁদিকের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম চামটা ক্যাম্পের দিকে। চামটার একটু আগে হরিশপুর গ্রামে আমার বাল্যবন্ধু ও একসময়ের অরূপদের বাড়ি। ওদের সহপাঠী বাড়ি যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝেই পীড়াপীড়ি করে। আজ ঠিক ওদের বাড়ি গিয়ে ওদের সবাইকে অবাক করে দেবো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে আমি যখন ওদের বাড়ি পৌছালাম তখন ওরা সবেমাত্র দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। দরজায় কড়া নাড়তেই অরূপের স্ত্রী রঞ্জা এসে দরজা খুলে আমাকে দেখে চিৎকার করে বললো - আরে, দেখো কে এসেছে। দাদা আপনি?

- চলে এলাম। অনেকদিন অরূপের সাথে দেখা হয়নি তাই...

- খুব ভালো করেছেন। আসুন আসুন।

আমি ভেতরে ঢুকে দেখলাম সবাই বিশ্রাম নিচ্ছেন। কিন্তু ওর বয়স্ক পিসিমা তখনও রান্নাঘরে বসে রাতের খাবারের আয়োজন করতে ব্যস্ত। এ বাড়িতে আমার আসা-যাওয়া এবং এই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক আমার দীর্ঘদিনের, সেই তখন থেকে পিসিমাকে দেখে আসছি। অরূপের বয়স যখন সাত বছর তখন হঠাৎ ওর বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যান এবং মা এক অজানা জ্বরে মারা যান। অরূপের দাদা তখন ক্লাস সিক্স-এ পড়ে। অরূপ এবং ওর দাদার মাঝখানে দুটি দিদি আর ওর ছোটো বোন। ছ'জন ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে নিয়ে পিসিমা যেন অথৈজলে পড়লেন। পাড়ার বাসিন্দা হরপ্রসাদ বাবুর ছিল চালের আড়ত। সেই আড়তে অরূপের দাদা সুজনকে তিনি সামান্য মাস মাইনের চাকরি দেন। তিনি অবশ্য প্রতিদিন দু'সের করে গুদাম ঝাঁট দেওয়া চাল দিতেন। ঝেড়ে পুছে দেড় সের মতো হতো। আর পিসিমা দু-তিনটে বাড়িতে কাজ করে অনেক কষ্ট করে পাঁচ পাঁচটি বাচ্চাকে বড়ো করে তোলেন। হরপ্রসাদ বাবু সুজনের সততায় মুগ্ধ হয়ে বছর দশেক বাদে ওকে একটা দোকান করে দিলেন। সুজন ছিল অসম্ভব পরিশ্রমী, অরূপ কিন্তু পড়াশোনা বন্ধ করেনি। অবসর সময়ে ও দাদাকে দোকানের নানান কাজে সাহায্য করে। বছর পাঁচেকের মধ্যে ওরা ঘুরে দাঁড়ায়। রাস্তার ধারে সরকারি জমিতে ছোট্ট একটা চালাঘরে কোনোমতে মাথা গুঁজে ওরা বাস করতো। সুজন ওদের বাড়ির পিছনে খুব অল্প দাম দিয়ে দশ কাঠা জমি কিনে সেখানে নতুন বাড়ি তৈরী করে। নতুন বাড়িতে ঢোকার বছর দুয়েকের মধ্যেই দুই বোনের বিয়ে দেয়। তারপর ওকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দিন যত গড়িয়েছে সম্পত্তির পরিমাণ তত বৃদ্ধি পেয়েছে। পিসিমার দৃষ্টিশক্তি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল, দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা খাটুনিতে শরীরটাও ভেঙে পড়েছিল। অরূপ যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয় তার কিছুদিন পরে সুজন বিয়ে করে। বাড়িতে নতুন বৌদি এসেই সংসারের হাল ধরেন। পিসিমার কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। অরূপ এবং সুজনের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে ওঠে সোনার সংসার। ওদের জীবনের নানান ওঠাপড়া এবং সুকঠিন জীবনযাপনের একমাত্র সাক্ষী আমি। শৈশবের সেই দিনগুলি পেরিয়ে একে একে পিসিমার অপারেশন, মৃত্যু, ওর বাবার হঠাৎ করে অমাবশ্যার চাঁদের মতো আগমন এবং তার মৃত্যু থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার সাথে আমার জড়িয়ে থাকা যেন ওদের জীবনে বাড়তি অক্সিজেনের জোগান দিয়েছে তাই যে কোনো সমস্যায় পড়লে সবার আগে আমার কাছে পরামর্শ নেয়।

অস্পষ্ট আলোয় পিসিমা আপনমনে কাজ করে চলেছেন। আমার গলার স্বরে বুঝতে পেরেছেন আমি এসেছি। ওখান থেকেই বলে উঠলেন - বাবা জয় এলি? মনে হচ্ছে স্কুল থেকে বাড়ি না গিয়ে এখানেই এসেছিস। তা একটু বোস আমি তোর জন্য দুটো রুটি ভেজে দিই। পিসিমার দরদভরা কণ্ঠে আমার চোখে পড়ে এসে গেল। মনে পড়ে গেল ছোটোবেলার একটা ঘটনার কথা - স্কুলে যাবার সময় অরূপকে বলে দিতেন - জয় যদি না খেয়ে স্কুলে আসে তাহলে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসিস। মাটির হাড়িতে জল দেওয়া ভাত রেখে যাবো। পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মেখে দু'জনে খেয়ে নিস। ছেলেটা আমার জল দেওয়া ভাত খুব পছন্দ করে।

আমি বললাম - পিসিমা একটু বিশ্রাম নাও,আর কত কাজ করবে? বাড়িতে এখন দু'দুটো বউ, রাতের খাবার নাহয় ওরাই করবে।

আমাকে বললেন - আমি সহজে মরবো না রে বাপ, সহজে মরছি না। এবার তোর বউয়ের হাতের রান্না খাবো তারপর নিশ্চিন্তমনে চলে যাবো।

সেদিন পিসিমার হাতের তৈরী গরম গরম রুটি, বেগুন ভাজা আর আলুর তরকারি খেয়ে বাড়ি ফিরলাম। ঠিক তার দুদিন পরে তিনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন। আমি পিসিমার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারলাম না। মনের গভীরে একটা গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেল। আমার নিজের কেউ নয়, তাঁর সাথে ছিল না কোনো রক্তের সম্পর্ক অথচ প্রচন্ড অভাবের মধ্যেও তিনি আমার মতো একজন পিতৃ মাতৃহীন অসহায় বালকের মাথায় তাঁর স্নেহার্দ্র হৃদয়ের কোমল স্পর্শ বুলিয়ে দিয়েছেন। আমি আজও সেই স্নেহের পরশ অনুভব করি।

(ক্রমশ)