গল্প ও অণুগল্প

আনন্দঝর্ণা



শর্মিষ্ঠা


অঝোর ঝরঝর ধারা। ওয়াইপারের মেশিনের দ্রুততাও হার মেনে যাচ্ছে। কাঁচের ওপর ক্রমাগত ঘষটাতে ঘষটাতে সেও ক্লান্ত। পিচ্ছিল জলের শব্দ বাড়ছে। এই যে প্রকৃতির কাছে এক্কেরে হেরে ভূত হয়ে যাচ্ছে, সেটাই একমনে দেখছিল নীলম। চারপাশ ধোঁয়া ধোঁয়া সাদা। সামান্য আলো। বোঝা যায় তখনও সন্ধে হয়নি। বেরিয়েছে সেই দুপুরে। ড্রাইভার ধীরে ধীরে বড় রাস্তার পাশে গাড়ি নামিয়ে দাঁড় করাল।

"এত বৃষ্টিতে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। চালানো মুশকিল। একটু দাঁড়াতেই হবে দিদি।"

মনে মনে হেসে ফেলল নীলম।

"কী হে বাহনচালক তুমি! সামান্য জল তোমায় কাবু করে ফেললো!"

সিটবেল্ট খুলে সিটে নিজেকে সমর্পিত করল ও। তার মানে এখন জানলা খোলা যাবে ভেবে সে চেষ্টা করতেই ডাকাতদলের মতো হা-রে-রে-রে করে উঠল পাশে বসা স্টিয়ারিং মাস্টার,

"আরে রে রে, ওটা খুলছেন কেন!" সে যত না আতঁকে উঠেছে, নীলম তার আঁতকে ওঠা দেখে ততোধিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।

"কী এমন করলাম রে বাবা! সামান্য আঙুলগুলো ভেজাতেই তো চেয়েছি।"

অগত্যা কাঁচ তুলে বসে থাকা ছাড়া কোনও গত্যন্তর নেই। ঝোড়ো হাওয়ায় বৃষ্টিরা সব বাঁ দিক থেকে ডান দিকে সরে যাচ্ছে। জলের আঁচল। একবার ঢেউ-এর ফাঁকে আবছা একটা সাইনবোর্ড দেখা গেল রাস্তার ধারে। চৌকো। সবুজ রঙের। সাদা রঙে নাম লেখা। 'বাতাসকুড়ি'। এই জায়গার নাম। কী অপূর্ব! নীলমের মনে হল তাই বুঝি বাতাস বারবার কুঁড়ি থেকে প্রস্ফুটিত হচ্ছে! বলে উঠল, "কী সুন্দর নামটা। তাই না!" পাশে তাকিয়ে দেখে তিনি গুটখার লালার টোপলা বানিয়ে অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়তো ভাবছেন এ কোন উন্মাদের পাল্লায় পড়েছেন! নীলমও ভাবছে, "সত্য সেলুকাস! মনুষ্য কী বিচিত্র জীব!"

কিছুটা সময় যেতেই এক তুমুল বেপরোয়া আরেকটি নীলম কোত্থেকে ঠেলেঠুলে বেরিয়ে এলো ওর সামনে।

"নাঃ, এভাবে গাড়িতে বসে থাকা যায় না। সঙ্গে বাড়তি জামা, গামছা সবই আছে। তাহলে কেন..." হঠাৎ ওর মনে পড়ল সেটা।

"ইউরেকা! আমার সাথে তো ছাতা আছে।"

সেই যে গেল হপ্তায় বাসে পাশে বসা ছেলেটি তার ছাতাটা ভুল করে সিটে ফেলে হুড়মুড়িয়ে নেমে যায়, সেই ছাতাটা। নীলম জানলা দিয়ে কত চেঁচিয়েছিল। সে আরেকটি বাসে উঠতে উঠতে হাত নেড়ে ওকে জানিয়েছিল ওটা ওর কাছেই রেখে দিতে! সেই থেকে ছাতাটা ওর সাথেই থেকে গিয়েছে। রোজই ওটা সাথে নিয়ে বেরোয়। যদি কখনও দেখা হয়ে যায়! তাকে তো নীলমের বলা হয়নি যে সে ভিজতে ভালোবাসে। রোদ্দুরে পুড়তে ভালোবাসে। ছাতা ওর চাই না! তার আগেই একরাশ ধুলো ছড়িয়ে সে বাস ধাঁ হয়ে গিয়েছিল।

পেছনের সিট থেকে ব্যাগ টেনে ছাতাটা বের করল ও। সম্পূর্ণ কালো। উল্টো জে-এর মতো বাঁট। তারপর সটান দরজা খুলে ছাতা হাতে নিচে নেমে দাঁড়াল। ওদিকে তখন পেল্লাই ডাকাতিয়া ভেঁপু বাজছে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে।

"এসব করবেন না দিদি...! কাকিমা আমাকে বলে দিয়েছেন দেখে নিয়ে যেতে... জলে ভিজবেন না দিদি..."

সব দিদি নামক আর্ত ডাকগুলো নদীর মতো ভেসে চলে যাচ্ছে। নীলম দিব্য হাঁটছে। জলে ভিজছে চুটকির সাদা পাথর আর কালো নেইলপলিশ, ফর্সা পা। জুতোর ফিতের ফাঁক গলিয়ে দিব্যি সপসপ শব্দ তুলছে। বেশ খানিকটা এগোতেই দেখতে পেল আরেকটা চারমাথার মোড়। সামান্য কয়েকটি দোকান। ঝাঁপ নামানো। একটা টোটো দাঁড়িয়ে জবজবে ভেজা। শুধু ধূসর জলের ভেতর জ্বলজ্বল করছে মোড়ের চারমাথার গুলমোহরের লাল ফুলগুলো। মোড়ের ওপর লাল সামিয়ানা। চারপাশে তাকিয়ে কী যেন খুঁজল ও। এই জায়গাটার কেউ কোনও নামকরণ করেনি! হয়তো তেমন দাগ রেখে যাওয়া কোনও ব্যাপার নয়। শুনশান চারপাশ। ধীরে ধীরে মোড়ের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল নীলম। হাওয়া আর নেই। বৃষ্টিও কিছুটা ধরেছে। থমথমে। ছাতা নামিয়ে রাখল রাস্তায়। এই 'কৃষ্ণচূড়ার মোড়'-এ তোমায় রেখে যাচ্ছি। আবার কাউকে ছায়া দিও ভালোবেসে। আমি এর জন্য উপযুক্ত নই।

কখন যেন বাহন এসে দাঁড়িয়েছে পেছনে। প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে হাত জোড় করে নেমে এসেছে জলাতঙ্ক সেই রুগী।

"গাড়িতে চলুন দিদি..."

দেখে বড্ড হাসিই পেল নীলমের। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় ওর মা ড্রাইভারকে ডেকে পইপই করে বলে দিয়েছিল, "সাবধানে নিয়ে যাবে। এ মেয়ের মাথায় ছিট আছে। যখন তখন যা খুশি করে বসে। প্রত্যেকবার ছুটিতে এলেই সেই অনাথশালায় ওর যাওয়া চাই। একদিনের জন্য হলেও। নাহলে এমন দুর্যোগের দিনে কেউ যায়! একবার না গেলে কী হয়! জিনিসগুলো ওর বাবা কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিত! গায়ে জ্বর। শুনবে কেন আমাদের কথা। সে তো লায়েক..."

নীলম ভাবল নির্ঘাৎ ড্রাইভার ভেবেছে যে নীলম সত্যিই পাগল। গাড়িতে উঠে বসতেই কোনওমতে দরজা দ্রাম করে বন্ধ করে অটো লক। স্টার্ট হয়ে গেল গাড়ি। ভ্রূম ভ্রূম। দে ছুট্। ছাতা যে রাস্তায় ফেলে এসেছে, সে ভ্রূক্ষেপও ড্রাইভারের নেই। আর কেউ ওসব কথা তোলে! পাগল নাকি! আবারও হাসি পেল নীলমের। ভীষণ জোরে। আর চাপতে পারছে না ও। গাড়ির স্পিড বাড়ছে। কোনওমতে এ পাগলকে গন্তব্যে নামিয়ে সে এ যাত্রায় রক্ষে পায়। নীলম ধীরে ধীরে সিটে নিজেকে এলিয়ে দিল। এতক্ষণে হয়তো ঠিক কেউ ছাতাটা নিয়ে গিয়েছে। সেও হয়তো আমায় খুঁজবে আমারই মতো! তারপর সেও আমারই মতো... তারপর সেও হয়তো ওকে খুঁজবে ওর মতো... খুঁজতে খুঁজতে একদিন আমাদের সকলের সাথে সকলের দেখা হয়ে যাবে। আমরা সবাই সেদিন একসাথে ছাতাটা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেব। দেখব কিভাবে সেটা আকাশের মতো বড় হতে হতে ছড়িয়ে পড়ছে। আকাশ জোড়া কালো ছাতার কাপড়, কালো মেঘের মতো। তার নিচে ঢুকে যাচ্ছে অপ্রয়োজনীয় যা কিছু... আমারই মতন! আমার বাচ্চাগুলোর মতন...

নীলম বুঝতে পারল জ্বরটা বাড়ছে। বড্ড শীত করছে ওর। রঘু, পুচু, বাবান, পিকলু, বুটাই, কুহু, কেকা সবাইকে একসাথে আঁকড়ে না ধরা পর্যন্ত এ শীত যাবে না। ভেজা হাওয়া কেটে পক্ষীরাজের মতো এগিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। বাতাসকুড়ি, কৃষ্ণচূড়ার মোড়, গোয়ালফ্লানী সেতু, পুনর্ভবা নদী পেরিয়ে সে অসীম আনন্দডাকের দিকে। নীলমের এবার শুশ্রূষার পালা।