আমেরিকায় জাদুবিদ্যা (১৭৩৪-১৮৭৫)
"সম্পূর্ণ সান্ধ্যকালীন প্রদর্শনীর স্বর্ণযুগ"

এই সময় হ্যারি হুডিনি (Harry Houdini) ছিলেন উত্তেজনার আবহ তৈরি করার এবং প্রতিটি জাদুকে এক একটি রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বানানোর এক অসাধারণ দক্ষ জাদুকর।
হুডিনি ১৯২৬ সালে নিউ ইয়র্কে তাঁর একটি পূর্ণাঙ্গ সন্ধ্যার শো-তে 'ইস্ট ইন্ডিয়ান নিডল ট্রিক' পরিবেশন করেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর খুব বেশি দিন আগে নয়। অধিকাংশ জাদুকরের হাতে এই তুলনামূলক সহজ খেলা কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু হুডিনি এই খেলাটি এমনভাবে পরিবেশন করতেন যে, তিনি দর্শকদের মধ্য থেকে কিছু দর্শককে ডেকে এনে তার মুখ, সূচ এবং সুতার পরীক্ষা করাতেন এবং বিভিন্ন নাটকীয় উপায়ে খেলার উপস্থাপন করতেন। ফলে এই খেলা দশ মিনিট পর্যন্ত চলত এবং দর্শকদের দারুণ উত্তেজনা ও কৌতূহলে ভরিয়ে রাখত।
তাঁর জীবনের শেষ দিকে হুডিনি প্রতারণামূলক মিডিয়ামদের (আত্মা ডাকানোর ভুয়ো জাদুকর) বিরুদ্ধে নিরলস প্রচার চালান। এই প্রচার ছিল ভীষণ নাটকীয় এবং বিভিন্ন গোপন কৌশল ও প্রতারণা ফাঁস করার মাধ্যমে ভরা।

হুডিনি অকালে মারা যান ১৯২৬ সালের ৩১ অক্টোবর, এক কলেজ ছাত্রের হঠাৎ আঘাতে সৃষ্ট সংক্রমণের কারণে, যে তাঁর ড্রেসিং রুমে তাঁকে দেখতে এসেছিল। এর কিছুদিন আগে, এই মহান পালিয়ে যাওয়ার (Escape Art) জাদুকর তাঁর স্ত্রী এবং বন্ধুদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন - যদি সম্ভব হয়, তিনি মৃত্যুর পর কোনওভাবে 'ওপার থেকে' সঙ্কেত পাঠাবেন।
আজও প্রতি বছর হ্যালোইনের দিনে, তাঁর মৃত্যুর বার্ষিকীতে, 'সোসাইটি অফ আমেরিকান ম্যাজিশিয়ান' (Society of American Magician) এবং ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অফ ম্যাজিশিয়ানস (International Brotherhood of Magicians) সদস্যরা নিউ ইয়র্কে লং আইল্যান্ডে হুডিনির সমাধিতে তীর্থযাত্রা করেন।
তাঁর স্ত্রী বেস হুডিনি (Bess Houdini) এবং তাঁর বন্ধুরা বহু বছর ধরে সেই নির্দিষ্ট রাতে আশায় বুক বেঁধে আত্মার ডাক (Séance) পরিচালনা করতেন। কিন্তু সেই প্রতীক্ষিত সঙ্কেত আর কখনও আসেনি।

আরও কিছু নাম, যাঁরা পূর্ণাঙ্গ সন্ধ্যার জাদু প্রদর্শনের স্বর্ণযুগে উজ্জ্বল ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কার্টার দি গ্রেট (Carter the Great) তিনি তাঁর জাদু ক্যারিয়ার শুরু করেন শিকাগোতে এবং আটটি ভিন্ন ভিন্ন দলের সঙ্গে বিশ্ব ভ্রমণে বের হন। তিনি ১৯৩৬ সালে মুম্বাইতে মারা যান। তাঁর জাদুর সরঞ্জাম ও স্মৃতিচিহ্ন এখনও সান ফ্রান্সিসকোর 'Earthquake McGoon's Saloon'-এ দেখা যায়।

আর একজন শিল্পমনা জাদুশিল্পী ছিলেন Cleveland-এর কার্ল জার্মেইন (Karl Germain - 1878-1959)।
তিনি Lyceum এবং Chautauqua পারফর্মার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। পরে তিনি লন্ডনের Maskelyne ও ডেভান্টের সেন্ট জর্জেস হলে জাদু প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন।
জার্মেইন যখন অন্ধত্বের কারণে মঞ্চ থেকে অবসর নেন, তখন তাঁর বহু মৌলিক খেলা তাঁর প্রাক্তন সহকারী Paul Fleming (P. F. Gemill - 1889-1976) মঞ্চস্থ করেন। ফ্লেমিং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করতেন। তিনি তাঁর মজার জাদু প্রদর্শনী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শন করতেন।
তাঁর ভাই ওয়াকার ফ্লেমিং মিলে একটি জাদু বই-)এর প্রকাশনা সংস্থা শুরু করেন এবং 'ফ্লেমিং ক্লাসিকস অফ ম্যাজিক' নামে একটি ধারাবাহিক সিরিজে বিশ্বের বিখ্যাত জাদুকরদের লেখা ও সম্পাদিত বই প্রকাশ করেন।

Theo Bamberg (1875-1963)
জাদু জগতে সবচেয়ে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে হল্যান্ডের বিখ্যাত বামবার্গ (Bambergs) পরিবারের। এই পরিবার ছয় প্রজন্ম ধরে জাদুকরের খ্যাতি ধরে রেখেছে। তাঁদের জাদুর সূচনা হয়েছিল ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে Leyden-এর Eliaser Bamberg থেকে, যিনি প্রথম প্রজন্ম। এরপরের তিন প্রজন্ম - David Leendart Bamberg, তাঁর ছেলে Tobias Bamberg এবং তাঁর ছেলে David Tobias Bamberg - সকলেই ডাচ রাজদরবারে অত্যন্ত সম্মানিত জাদুকর ছিলেন।


পরবর্তী দুই প্রজন্মের বামবার্গরা খ্যাত ছিলেন চাইনিজ পোশাকে জাদু পরিবেশন করার জন্য। এর মধ্যে অন্যতম ছিলেন Theo Bamberg (1875-1963), যিনি 'Okito' নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি চতুর হাতে খেলা, বিভ্রম ও জাদুর উপকরণ উদ্ভাবনের মাধ্যমে এক অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ইউরোপ ও নিউ ইয়র্কে বহু জায়গায় পারফর্ম করতেন এবং কিছু সময় আমেরিকাতেও বসবাস করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত সুন্দর অলংকরণযুক্ত চীনা স্টাইলের যন্ত্রপাতি এখন সংগ্রহযোগ্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।

ওকিটো'র পুত্র, ডেভিড বামবার্গ, যিনি ১৯০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তিনিও একজন অসাধারণ জাদুকর ছিলেন। তিনি ইউরোপ ও আমেরিকায় বড় হন এবং চীনা পোশাকে ‘Fu Manchu’ নাম নিয়ে মঞ্চে পারফর্ম করতেন। তিনি লাতিন আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জুড়ে তাঁর জাদুতে দর্শকদের মাতিয়ে দিয়েছিলেন।

জাদুকর Dante, যিনি আগে থার্সটন (Thurston)-এর সাথে কাজ করতেন, পরে স্বতন্ত্রভাবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি 'Sim Sala Bim' নামে একটি জনপ্রিয় রোড শো তৈরি করেন, যেখানে দ্রুত গতির বিভ্রম জাদুর এক বিশাল সম্ভার ছিল। এই শো ইউ.কে. ও ইউরোপে ব্যাপক সাফল্য পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে দান্তে আমেরিকায় ফিরে আসেন এবং ১৯৪০ সালে নিউ ইয়র্কে 'সিম সালা বিম' আবার মঞ্চস্থ হয়। এই সুদর্শন, হাসিখুশি জাদুকর পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত মঞ্চ এবং চলচ্চিত্রে সক্রিয় ছিলেন। পরে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় জাদু থেকে অবসর নেন এবং ১৯৫৫ সালে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
