রহস্যধর্মিতা আর ইঙ্গিতময়তা কবিতার, বিশেষ করে আধুনিক কবিতার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং আমরা দেখেছি যাঁরা নিবিড়ভাবে কবি, তাঁরা প্রায়ই পাঠককে সংকেত পাঠান। অর্থাৎ ঠারেঠোরে বলেন। সোজাসুজি স্পষ্ট ভাষায় যা বলা হয় তা অনেক সময় স্লোগান বা ইস্তাহার হয়ে ওঠে, কবিতা হয় না। আর সারা বিশ্বের কবিতার সব থেকে বড় রহস্য বোধহয় কবির মানস প্রতিমাকে নিয়ে। এখানে পুরুষ কবিদের কথাই আমি বলছি। তাঁদের কবিতার সিংহভাগ দেখা যায় প্রেমের কবিতা। আর প্রেমের কবিতা লিখেই কবিরা জনপ্রিয় হন - এ তো সত্য কথা।
তো আমরা এখনও জানতে পারিনি যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা কে? কেউ একজন বলেছিলেন যে নীরা মানে 'নারীরা এরকম' থেকে নীরা এসেছে। আবার রবীন্দ্রনাথে দেখা যায় যে, বইয়ের উৎসর্গপত্রে লেখা 'শ্রীমতি হে-কে'। তো 'হে'-টি একজন গ্রিক দেবীর নাম। তার থেকে হে। দেখা যাচ্ছে যে তিনি কাদম্বরীদেবী অর্থাৎ তাঁর কাদম্বরী বৌঠানকে এটা উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু সেটা সাংকেতিকভাবে লিখেছেন 'হে'।
তো এতসব কথা বলছি কারণ আমার হাতে এসেছে ৯০ দশকের বিশিষ্ট কবি তৌফিক জহুরের কবিতার বই 'নবুবা'। তিনি ভৌগোলিকভাবে থাকেন ওপার বাংলায় অর্থাৎ বাংলাদেশে। আমরা যারা ফেসবুকে ওঁর বন্ধু, তারা দেখছিলাম যে বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি 'নবুবা' কবিতার সিরিজ লিখছেন এবং সেটা নিয়ে বেশ একটা রহস্য ঘনীভূত হয়েছে কে এই নবুবা। তিনি কি কবির কোনো প্রেয়সী? কোনো মানসপ্রতিমা নাকি কবির কোনো দার্শনিক চিন্তার একটা সংহত রূপ? আমি একটু শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালবাসি আর ছোটবেলা থেকেই রহস্য কাহিনির ভক্ত। আমি এই 'নবুবা' শব্দটি নানাভাবে ভাঙার চেষ্টা করলাম, তো আমি সফল হলাম না আমি শব্দটাকে উল্টে দেখলাম 'বাবুন' হয়। বাবুন অনেক সময় ছেলের নাম হতে পারে, আবার মেয়ের নামও হতে পারে। আর 'নবুবা' শব্দ বাংলাতে তো নেই। তার জন্য আমি গুগল-এ সার্চ করেছিলাম কিন্তু আমি খুঁজে পাইনি।

রহস্য ভেদ করার চেষ্টা না করে আমি বরঞ্চ কবিতার কাছেই যাই। যেটা আমার কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে কবিতাটা আমাকে ছুঁল কিনা। কবিতার অতো চুলচেরা বিশ্লেষণে আমি যাচ্ছি না। 'নবুবা'র কবিতাগুলি আমাদের যেন একটা অচেনা অনাবিষ্কৃত মহাদেশে নিয়ে যায় সেই মহাদেশ একান্তভাবেই কবির। সেটা একটা ইউটোপিয়ান জায়গা যেখানে কবি তাঁর জীবনের অনেক শুশ্রূষা পান এবং অনেক সাহচর্য পান। সেটাকে আমরা প্রেম বললে, প্রেম বলতে পারি। বন্ধুতা বললে বন্ধুতা বলতে পারি। এমনকি আমরা যদি একটা অধ্যাত্ম চেতনা বলি 'নবুবা'-কে তাও বলতে পারি। আমার 'নবুবা' শব্দটা শুনে আরেকটা শব্দ মনে পড়ছে। রবাব। একটা বাদ্যযন্ত্র। শিখদের প্রথম গুরু নানক এই রবাব বাজাতেন। আর এই নবুবার মধ্যে আমি সেই একটা ধ্বনিময়তা লক্ষ্য করি, মানে কোথায় যেন একটা করুণ মধুর সুর বেজে উঠছে যা স্পর্শ করছে সমস্ত ধর্মের ও বর্ণের মানুষকে।
আমি একটি উদাহরণ বই থেকে পড়ছি -
"আশ্চর্য এক প্রদীপের আলো
আমাদের আত্মজীবন নিউরনের ঝড় হয়
হঠাৎ মনে পড়ে পাতা জীবন আত্মা
গাছে ঝুলে থাকা কোটি বছরের পড়শী
আমার একই গাছে বেড়ে ওঠা
অপেক্ষার প্রহর শেষে অসীমের ইশারায়
নতুন জ্যোতির দুয়ার পেরিয়ে অরণ্য পর্বত সাঁতরে
আবার দেখা আগুনের ডানায় তোমাকে খুঁজে পেতেই
একটা জীবন চলে গেল
কত কথা বলার ছিল আমার
অথচ কাঠের সিঁড়ির ওপর হেলে পড়েছে সূর্য
সন্ধ্যার অন্ধকারে নেমে আসে আলোর আত্মচিৎকার
একটি গ্রন্থ আমি রেখে যাব এ পৃথিবীতে
তোমার নামে নবুবা।"
এই কবিতাটি পাঠ করলে একজন কবির, বলা ভালো একজন মানুষের এক চিরকালীন খোঁজ বোঝা যায়। সে সারা পৃথিবীতে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার সোলমেটকে বা আত্মসখাকে। তো সেখানে কাঠের সিঁড়ির ওপর হেলে পড়ছে সূর্য এবং আলোর আত্মচিৎকার। সারা পৃথিবীতে বড় হিংসা বড় হানাহানি তার মধ্যে সে একটি সংকল্প করেছে যে একটি গ্রন্থ আমি রেখে যাব এ পৃথিবীতে তোমার নামে নবুবা। চিরকালীন সত্যের কবিতা।
আরও একটি কবিতা আমার দেখাতে ইচ্ছে করছে। সেখানে বলছে যে, "তুমি আছো বলেই আমি জেগে থাকি চিরটা কাল।" 'প্লাটফর্মে খুঁজে ফিরে একটা মাদুলি,' 'আম্মা কি জানতেন আমার সঙ্গে দেখা হবে তোমার' এইটা পাঠ করলে মনে হয় সেই কবিতা - জীবনানন্দ দাশের 'হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে' 'নবুবা' পড়ে আমার মনে হয়েছে এটি একটি অন্তহীন সন্ধানের কবিতা। অন্তহীন হাঁটার কবিতা যে হাঁটার শেষে হয়তো কোনো এক নির্জন দ্বীপে একটি ছোট ঘরে একটি দীপ জ্বলে আছে এবং এই দীপ জ্বলে আছে বলেই কবি লিখতে পারছেন।
কবিকে ধন্যবাদ এরকম অসাধারণ কবিতা উপহার দেয়ার জন্য। তবে একটি জিনিস আমার ভালো লাগেনি সেটা হচ্ছে বাংলা কবিতা আর ইংরেজি কবিতার পাঠক কিন্তু আলাদা। তো বাংলা আর ইংরেজি কবিতা পরপর দিয়ে আমার মনে হয়েছে কোথাও যেন একটা মনোযোগের ছন্দপতন ঘটেছে বা আরেকটু পাঠ নিবিড় হতে পারত শুধু যদি বাংলা কবিতা থাকত। ইংরেজি কবিতা আলাদাভাবে আর একটা বই হতো।
আরও লিখুন কবি। ভালো থাকুন।
