
জন্ম ১লা জুলাই ১৮৮২, মৃত্যু ১লা জুলাই ১৯৬২ একই দিনে জন্ম ও মৃত্যু, এই সমাপতন যাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিনি হলেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়। তিনি ছিলেন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী, তাঁকে বলা হতো 'ধন্বন্তরী'। পয়লা জুলাই দিনটিকে 'জাতীয় চিকি়ৎসক দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
গোটা জীবনে নানা মিথ তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা গল্প বলব আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।
একবার বিখ্যাত সাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-এর বাবার এক সহকর্মী দীর্ঘদিন মাথার যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। বহু চিকিৎসা ও ওষুধপত্রে ফল না পেয়ে দ্বারস্থ হলেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়ের। সবশুনে ডাঃ রায় একটা সাদা কাগজে লিখে দিলেন - Reverse your head. এমন prescription দেখে সবাই হতবাক ও বিরক্ত। এতবড়ো ডাক্তার একি লিখেছেন? শেষে সঞ্জীববাবুর বাবার ডাক পড়ল, তিনিও কিছু বুঝতে না পেরে অগত্যা বিধানবাবুর কাছে গেলেন। ডাক্তারবাবু বললেন, উনি বোধহয় উত্তর দিকে মাথা করে শোন, ফলে পৃথিবীর চুম্বক ক্ষেত্র বরাবর উনি চুম্বক শলাকার কাজ করছেন, তাই ওঁনাকে উল্টো দিকে মাথা করে শুতে বলেছি। তাজ্জব ব্যাপার কিছুদিন পরে মাথার যন্ত্রণা উধাও।
একবার বিধানবাবু ভিয়েনায় গেছেন চোখ অপারেশন করাতে। টেবিল রেডি। শুরু হবে অপারেশন এমন সময় একজন ডাক্তার কাশলেন শুনে বিধান রায় বললেন কে কাশলেন? একজন ডাক্তার বললেন আমি স্যার। সঙ্গে সঙ্গে উনি বললেন, এখনই আপনার চেস্ট এক্সরে করে নিয়ে আসুন। শুনে একজন বললেন উনি তো ঠিকই আছেন, তাছাড়া উনি তো একজন ডাক্তার কিছু হলে উনি তো বুঝতে পারতেন।
বিধানবাবু বললেন যা বলছি তাই করুন। এক্সরে করে দেখা গেল ওনার টিবি হয়েছে। এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা বটে!
বিধান রায় ডাক্তার হয়ে যাবার পর উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে এসেছেন। কিন্তু ভর্তির তারিখ পেরিয়ে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়লেন, কিন্তু রোজই কলেজ চত্বরে ঘোরাঘুরি করতে লাগলেন। সেটা কলেজের সুপারের চোখ এড়াল না। ঐসময় একদিন এক রোগী এলেন, সুপার বিধান রায়কে ডেকে বললেন, "ইয়ংম্যান বলতে পারবে এর কি হয়েছে?" বিধান রায় রোগীকে না ছুঁয়েই বলে দিলেন, "চিকেন পক্স হয়েছে।" সুপার সাহেব বললেন, "কিন্তু এর গায়ে তো কিছুই বেরোয়নি তাহলে বুঝলে কি করে?" অক্লেশে উত্তর এলো, "এর গায়ের গন্ধ থেকে।" পরের দিন দেখা গেল রোগীর সারা দেহ ভরে গেছে চিকেন পক্সে।
এই হল বিধান রায়ের চিকিৎসা পদ্ধতি তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে রয়ে গেছেন। এমন কিংবদন্তী ডাক্তার বিধান রায় প্রতিদিন সকালে তাঁর নিজের বাসভবনে বিনা পারিশ্রমিকে ১৬ জন করে রোগী দেখতেন। একটা ঘরের শেষপ্রান্তে ছিল তাঁর টেবিল চেয়ার। রোগীকে আসতে হতো বেশ কয়েকপা হেঁটে, ঐটুকু সময় দেখে তিনি রোগ নির্ণয় করে ফেলতেন। কি অসাধারণ ক্ষমতা!
একবার এক মহিলা এলেন দেখাতে, বহু চিকিৎসা করে খুব হতাশ হয়ে শেষ চেষ্টা করার জন্য। যখন ধীর পায়ে হেঁটে আসছিলেন, তখন ডাক্তারবাবু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছিলেন। বসামাত্র প্রশ্ন - "মাথায় সবসময়য় খুব যন্ত্রণা করে, আলোর দিকে তাকাতে পারেন না? তাইতো?" এইকথা শুনে মহিলা যেন একটু শান্তি পেলেন। ডাক্তারবাবু বললেন, "কোনো ওষুধ লাগবে না।আপনার সিঁদুরটা বদল করুন, বাজার থেকে কোনো ভালো সিঁদুর কিনে ব্যবহার করুন আর কিছুদিন পরে রিপোর্ট দেবেন।" আশ্চর্যের ব্যাপার ঐ সিঁদুরের বিষক্রিয়া থেকে তিনি মুক্ত হলেন ও সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন।
একবার এক গ্ৰামের লোক কানের যন্ত্রণায় কাতর। সকলে বললেন পুকুরে স্নান করার দরুন কানে জল ঢুকেছে। সেই মতো চিকিৎসা শুরু হল তবে শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না। এবার কলকাতায় দেখাতে হবে, একজনই আছেন ধন্বন্তরী, নিয়ে যাওয়া হল বিধান রায়ের কাছে। সেসময় সেদিনের মতো তাঁর রোগী দেখা শেষ। কিন্তু অনুরোধ ও রোগীর কষ্ট দেখে তাকে ডেকে নিলেন। দেখেই একটা ঘুমের ইনজেকশন দিলেন তারপর বললেন, কিছুটা কাঁঠাল লাগবে। কারো কিছু বোধগম্য হল না। তাঁর নির্দেশ অমান্য করার উপায় নেই। এল কাঁঠাল, রুগীর কানের পাশে রাখা হল কয়েকটা, কিছুক্ষণের মধ্যেই কানের ভিতর থেকে বেশ কিছু পিঁপড়ে বেরিয়ে এলো। ডাক্তারবাবু বললেন, "পানা পুকুরে স্নান করার জন্য এই অবস্থা।" এই হল বিধান রায়ের চিকিৎসা পদ্ধতি। তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে রয়ে গেছেন। এমন কিংবদন্তী ভগবানরূপী ডাক্তারকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও প্রণাম।
(লেখাটি সংগৃহীত ও পরিমার্জিত।)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
