গল্প ও অণুগল্প

শেষ ট্রেনের যাত্রী



ইন্দ্রজিৎ বিশ্বাস


বিকেল গড়াতেই স্টেশনটা একটু একটু করে নিস্তব্ধ হয়ে উঠছিল। শহরের শেষ লোকাল ট্রেনটা রাত ৯টা নাগাদ ছাড়ে। প্ল্যাটফর্মে হাতে গোনা কয়েকজন যাত্রী, আর কিছু হকার। হকারদের ভেতর একজন ছিলেন বয়স্ক ভদ্রলোক - সাদা ধুতি, মলিন শার্ট, হাতে একটা ছোট বাক্স। সেই বাক্সে বিস্কুট, চানাচুর আর পাউরুটি। বয়স কম করে হলেও ৬৫।

নাম তার হরিপদ। একসময় একটা প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। পেনশন আর ছেলের পাঠানো টাকায় চলত সংসার। কিন্তু কয়েক বছর আগে ছেলে বিদেশে চলে যায়, এখন যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। পেনশনের টাকা কখনও আসত, কখনও আসত না। বাধ্য হয়ে রেলস্টেশনের পাশে ছোট একটা ভাড়া ঘরে থাকতে শুরু করেন আর সন্ধ্যার পর স্টেশনে বিস্কুট, চানাচুর, পাউরুটি এসব বিক্রি করে পেট চালান।

একদিন সন্ধ্যায় স্টেশনে হরিপদ বসে আছেন। হঠাৎ একটা ছেলেকে দেখতে পেলেন - দেখতে ভদ্র, মুখে চিন্তার ছাপ, গায়ে কলেজ ড্রেস। ছেলেটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে যেন কাউকে খুঁজছে। হরিপদ এগিয়ে গিয়ে বললেন,
"বাবা, কিছু খাবে? পাউরুটি নাও, সন্ধ্যা হয়ে গেছে।"

ছেলেটি হাসিমুখে মাথা নাড়িয়ে বলল, "না দাদু, ধন্যবাদ। আমি আসলে আমার ব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছি। তাতে আমার টাকা, মোবাইল সব ছিল। কী করব বুঝতে পারছি না। বাড়ি ফিরতে হবে, কিন্তু ট্রেনের টিকিট কাটার টাকাটাও নেই।"

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বাক্সটা বন্ধ করে ছেলেটিকে বললেন, "চলো, আমি তোমার জন্য টিকিট কেটে দিই।"

ছেলেটা হতভম্ব হয়ে বলল, "না না, দাদু, আপনি কষ্ট করে টাকা উপার্জন করেন, আমি নিতে পারি না।"

হরিপদ হেসে বললেন, "এটা ঠিক যে এই বয়সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিক্রি করি শুধু এই পেট চালাতে। তবুও যদি কাউকে সাহায্য করতে না পারি, তবে আমার জীবনের মূল্যটাই বা কী?"

অবশেষে হরিপদের জোরাজুরিতে ছেলেটি রাজি হয়। তিনি টিকিট কেটে দেন, আর পাউরুটি হাতে দিয়ে বলেন, "রাতে খেয়ে নিও।"

এরপর পরস্পরের মধ্যে নানা কথা হয়।

যাবার আগে ছেলেটি চোখে জল নিয়ে শুধু বলেছিল, "আমি ফিরে এসে একদিন এই ঋণ শোধ করব, দাদু।"

তারপর কেটে যায় প্রায় তিন বছর। হরিপদ এখন আরও বয়স্ক, চলাফেরাও একটু কষ্টকর হয়ে গেছে। পেনশন বন্ধ প্রায়, স্টেশনে গিয়ে এখন আর আগের মতো বিক্রি হয় না। অনেক সময় আধা খাওয়ার মতো খাবার নিয়েই ফিরে আসেন।

একদিন বিকেলে হরিপদ স্টেশনে বসে আছেন। এমন সময় একটা দামি গাড়ি এসে থামে। গেট খুলে নামেন একজন তরুণ, হাতে একটা ব্যাগ, চোখে চশমা, পরনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক। সোজা এগিয়ে এসে হরিপদকে জিজ্ঞাসা করেন, "দাদু, আপনি কি হরিপদবাবু?"

হরিপদ কিছুটা অবাক হয়ে মাথা নাড়েন। "হ্যাঁ, আপনি কে বাবা?"

তরুণটি হেসে বলল, "আমার নাম রাহুল। আপনি একদিন আমার জীবনের দিশা দেখিয়েছিলেন। মনে আছে, আমি ব্যাগ হারিয়েছিলাম, আর আপনি আমাকে টিকিট কেটে দিয়েছিলেন?"

হরিপদের চোখে বিস্ময় আর আনন্দের মিশেল। "তুমি রাহুল? কত বড় হয়ে গেছ বাবা!"

রাহুল মাথা নিচু করে বলল, "আমি এখন একটা কোম্পানিতে চাকরি করি, নিজের সামান্য জায়গায় দাঁড়িয়েছি। কিন্তু আপনার সেই সাহায্য না পেলে আমি হয়তো সেদিন বাড়ি ফিরতেই পারতাম না। আজ আমি এসেছি আপনাকে নিয়ে যেতে।"

হরিপদ কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। "নিয়ে যেতে মানে?"

রাহুল বলল, "আপনার এখন আর স্টেশনে বসে বিক্রি করার দরকার নেই, দাদু। আমি আপনার থাকার ব্যবস্থা করেছি আমার কাছে। আপনার জন্য আলাদা ঘর, চিকিৎসা, আর আরামদায়ক জীবন। আপনি আমার পরিবারের একজন হয়ে থাকবেন।"

হরিপদের চোখে জল চলে আসে। তিনি স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে বলেন, "আমি তো ভেবেছিলাম, আমার জীবনের শেষ দিনগুলো স্টেশনেই কাটবে। কখনো ভাবিনি কেউ এসে এভাবে নিয়ে যাবে।"

রাহুল বলল, "আপনার মতো একজন মানুষ, যিনি নিঃস্ব হয়েও নিঃস্বের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তিনি সমাজের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আপনি আমাদের আশীর্বাদ।"

হরিপদ তার ছোট বাক্সটা হাতে নেন, তাতে শেষবারের মতো চোখ বোলান। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। রাহুল তাঁর হাত ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

প্ল্যাটফর্মের একপাশে কয়েকজন হকার এই দৃশ্য দেখছিল। তারা বলল, "দেখলে কেমন মানুষ? সবাই বলে ভালো কাজ করলে কিছু হয় না। কিন্তু দ্যাখো - একটা ছোট ভালো কাজ একটা জীবনকে কত সুন্দরভাবে ফিরিয়ে দিতে পারে।"

হ্যাঁ, সমাজ এখনও বেঁচে আছে, কারণ এখনও কিছু মানুষ আছে যারা ভালোবাসা ও দায়িত্বের মানে বোঝে।

চিত্রঃ লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ব্যবহার করে কাল্পনিকভাবে তৈরি।