বিবিধ

কৃষ্ণনগরে কাজী (সপ্তবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



ইনাস উদ্দীন


[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]


ঢাকায় নজরুলের বাসভবনে কবিকে একান্তে গান শোনাচ্ছেন রেণু ভৌমিক। ১৯৭০ সালের শুরুর দিকে তোলা আলোকচিত্র।

পর্ব - ২৭

কাজী সাহেব আছেন?

শীতের তেজ অনেকটাই কমে গিয়েছে। তবু সকালটায় একটা মিঠে হিমেল আমেজ আছে। এই আমেজটুকু গায়ে মেখে নজরুলের সঙ্গে বসে চা খাওয়ার সময়টুকু দোলনের বড়ো প্রিয়, বড়ো সুখের। এমনিতে মানুষটিকে বাড়িতে বেশি পাওয়া যায়না। তার উপর নজরুলের সকালে ঘুম থেকে ওঠার কোনও নিয়ম বা স্থিরতা নেই। রাতে ঘুমোয় দেরি করে। জ্বর বা শরীর খারাপ থাকলে তো কথাই নেই, সারারাত ছটফটানি। ভোরবেলাটুকুই তার আরামের ঘুম। দোলন অপেক্ষায় থাকে। আভাস পেলেই চা বসিয়ে দেয়। ঘন দুধের চা, কাঁসার থালায় নকশা কাটা দুটি পেয়ালায় সাজিয়ে নিয়ে একেবারে বাইরের বারান্দায়। থালায় দুটো বড়ো সাইজের বিস্কুট - অদ্ভুত সুন্দর তার নাম - বাখরখানি। কৃষ্ণনগরে এসে প্রথমদিনে বিজয়লালের বাড়িতে এরকম একটা বিস্কুট দেখেছিল। ঘিয়ে ভাজা, মুচমুচে, পাতলা পরতের উপর পরতে সাজানো। এক কামড় দিতেই অর্ধেক বিস্কুট ঝুরঝুর করে ভেঙে শাড়ির আঁচলে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিব্রতকর অবস্থা। হেলেন খিলখিল করে হেসে সামাল দিয়েছিল, ও বৌদি, বাখরখানি বড্ড লাজুক! ওকে সাবধানে কামড় দিতে হয়। এই যে, উপরের দিকে মুখ করে অল্প একটু কামড়। ঝুরঝুর করে তো পড়বেই, তবে যা পড়বে মুখের ভিতরেই! ভারি মজা পেয়েছিল দোলন। খেতেও বেশ স্বাদ, বলেছিল হেলেনকে। সেই কথা মনে রেখে এইদিন কিরণময়ী দেবী বিদায় নেবার সময় একটা কাপড়ের পুঁটলি ধরিয়ে বলেছিলেন, ক'টা বাখরখানি আছে মা, হেলেন বলছিল তোমার নাকি পছন্দ হয়েছে। ভালোলাগায় অভিভূত হয়েছিল দোলন। একেই বুঝি বলে মায়ের মন।

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে তার দিকে একবার তাকিয়ে নজরুল বলেন, পেয়ালাটা দেখলেই আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। নিজের মায়ের মায়া-মমতার স্পর্শ তেমন করে পাওয়ার সুযোগ হয়নি, তাই স্নেহের ছোঁয়া পেলেই মনটা কেমন দুর্বল হয়ে ওঠে।

দোলন জানে সেকথা। জেঠিমা বিরজাসুন্দরীর কাছে নজরুল একেবারে শিশুর মতো হয়ে যেতো। চুরুলিয়ায় নিজের শাশুড়ী জাহেদা খাতুন সম্পর্কে নজরুল নিজে থেকে বিশেষ কিছু বলতে চায়না, দোলনও এ নিয়ে জোর করে জানতে চায়না। তবে বুঝতে পারে কোথাও একটা গভীর অভিমান আছে। কথা উঠলেই নজরুলের মুখটা কেমন কালো দেখায়, চুপচাপ হয়ে যায়। তবে বিয়ের পরে শাশুড়ীর অভাব পুরোমাত্রায় মিটিয়ে দিয়েছিলেন হুগলির মাসুদা মা। বিয়ের পরেই বা বলছি কেন, বিয়ের যোগাড়যন্ত্রণা থেকে শুরু করে হুগলির মোগলপুরায় সংসার পেতে দেওয়ার যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তিনি নিজে পালন করে গিয়েছেন। দাপটও ছিল যথেষ্ট, বড়ো ঘরের মেয়ে, ভয়ডর করতেন না কাউকে। সংসার পাতার সময় প্রথম এই পিরিচ-পেয়ালার সেট উপহার দিয়েছিলেন। চীনেমাটির, কিন্তু দুধসাদা নয়, ঘিয়ে রঙের উপর হালকা লাল সুতোর মতো নকশা। ভারি সুন্দর। ছেলে চায়ের ভক্ত, সুতরাং সর্বাগ্রে পেয়ালার কথাই মনে হয়েছে।

গিরিবালা দেবী সাধারণত সকালের এই চায়ের পর্বে যোগ দেন না। দুধের চা এড়িয়েই চলেন। রান্নাঘরের কাজও শুরু হয়ে যায়। তাছাড়া দু:খী মেয়েটা উড়নচণ্ডী জামাইকে কতটুকুই বা কাছে পায়। বেলা হলেই কেউ না কেউ এসে হাজির হয়ে পড়ে। আজ অতটা বেলা হয়নি, তবে চায়ের পর্বটা শেষ হয়ে এসেছিল। এমন সময় বাইরে ডাক - কাজী সাহেব আছেন?

বাহির মানে ঠিক বাহির নয়, বারান্দার নিচেই। কন্ঠটা একটু অন্যরকম, দোলন নিজেই মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিল। আকবর উদ্দীন দাঁড়িয়ে আছেন, সঙ্গে আরেকজন ভদ্রলোক। রোজকার রাজনীতির লোকজন আসা-যাওয়া দেখে অভ্যস্ত, কিছুটা বিরক্তিও থাকে। কিন্তু আজকের নতুন আগন্তুকদের দেখে খুশিই হলো।

আসুন, আসুন!

বারান্দার ধাপি দিয়ে উঠে আসতেই নজরুল দাঁড়িয়ে আপ্যায়নের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিলেন - এইতো, দেরি করে ফেললেন! চা-টা মিস হয়ে গেল!
সে আবার কী কথা! চা আবার হবে। আমার ঘরে চায়ের জল সবসময় ফুটতেই থাকে। আপনারা বসুন। দোলন কাপগুলি তুলে নিয়ে ভিতরে চলে গেল।

আকবর উদ্দীন পরিচয়ে কিছু বলার আগেই আগন্তুক ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আসসালামো আলাইকুম!

'ওয়া আলাইকুম সালাম', নজরুল প্রত্যুত্তর দিয়ে বললেন, ইসমাইল সিরাজী, মসজিদের ইমাম সাহেব!

দুজনের চোখেই বিস্ময়। কাজী সাহেব নাম পর্যন্ত মনে রেখেছেন!

আগেই বলেছি, ইমাম সাহেব আপনার ব্যাপারে খুব আগ্রহী, অনুরাগীও বটে। তাঁর অত্যন্ত আগ্রহ আপনার সঙ্গে দেখা করবার, কথা বলবার। পাশের বেঞ্চিতে বসে আকবর উদ্দীন শুরু করলেন।

আমিও সাগ্রহে অপেক্ষায় আছি, নজরুল একটু মজার ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন। আকবর সাহেব তো ভালোই জানেন, আলেম-মৌলানা সমাজ আমাকে কাফের, কুলাঙ্গার, নরাধম, পাপিষ্ঠ ইত্যাদি নানান অলংকারে ভূষিত করেছেন। সুযোগ পেলে মুণ্ডুটাও খসিয়ে দিতে প্রস্তুত। এইরকম অবস্থায় একজন শিক্ষিত আলেম ইমাম সাহেব আমার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন - কৌতূহল তো আমারও যথেষ্ট।

নতুন করে কী আর বলব, ইমাম সাহেব শুরু করলেন। আপনি আমাদের মুসলিম সমাজের গর্ব, আমাদের সম্পদ, অন্ধকারের আলো। সওগাত ও মোসলেম ভারতে আপনার লেখা সেই সময় থেকেই পড়েছি। সে অবশ্য আকবর ভাইয়ের দৌলতে। তাঁর কাছে নানারকম পত্র-পত্রিকা আসে। প্রথম যেদিন আপনার খেয়াপারের তরণী পড়লাম, সেদিন থেকেই আপনার গুণমুগ্ধ হয়ে গেলাম। মাঝিমাল্লা'র সাথে 'লা শরিক আল্লা' যেভাবে মিলিয়ে দিলেন - তা দেখে আমার অন্তর মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তারপরে হিন্দু দেবদেবীর নাম আর গুণগান গেয়ে আপনি অনেক কবিতা লিখেছেন। বিদ্রোহী লিখেছেন, আনন্দময়ীর আগমনে লিখেছেন, ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেওয়ার কথা, খোদার আসন আরশকে ভেদ করার কথা সবই পড়েছি। 'ইসলাম দর্শন' পত্রিকায় এ নিয়ে আপনার উপর কদর্য ভাষায় প্রচুর গালাগালি নিন্দা বর্ষণ হতেও দেখেছি। তারপরেও - বিশ্বাস করুন, আপনার প্রতি অনুরাগ আমার কিছুমাত্র কমেনি।

এ ভারি আশ্চর্য কথা শোনালেন সিরাজী সাহেব, নজরুলের বিস্ময়। আপনি একজন মসজিদের ইমাম, অর্থাৎ শরা-শরিয়তে একজন নিষ্ঠাবান আলেম, ইসলাম দর্শন নিয়মিত পড়েন, তাঁদের ভাবাদর্শে নিশ্চয় অনুপ্রাণিতও বটে। সেইরকম একজন মানুষ আমার মতো ঘোষিত কাফের নরাধমের প্রতি কিভাবে অনুরাগী থাকতে পারেন - সেটা সত্যিই আমার কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার।

আপনার পক্ষে সেটা মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আপনার কলম থেকে যেভাবে হিন্দু দেব-দেবীর গুণগানের মতো কুফরি কালাম বের হয়, মৌলবী-মৌলানাদের প্রতি অবজ্ঞাসূচক অসম্মান প্রদর্শন করা হয়, সবার উপরে একজন রাজনৈতিক নেতাকে, সে তিনি যতই বরেণ্য ব্যক্তি হোন, আম্বিয়া-পয়গম্বরের মর্যাদা প্রদান করা হয় - তাতে একজন ধর্মপ্রাণ, এমনকি সাধারণ মুসলমানেরও বিক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু তারপরেও আমি আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, অনুরাগী এবং একজন মুগ্ধ পাঠক। কাজী সাহেব, এর কারণ ব্যাখ্যা করতে বললে বুঝিয়ে বলতে পারব না। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমার ধারণায় আপনার ভিতরে অসম্ভব প্রতিভা আছে, অসম্ভব রকমের অসাম্প্রদায়িক মন আছে, হিন্দু মুসলিম সব ধর্মের বিষয়ে অসম্ভব রকমের গভীর জ্ঞান আছে এবং কোনো ধর্মের প্রতি আপনার অভক্তি নেই। যে মানুষ কোরবানির মতো, ফাতেহা-দোয়াজদাহমের মতো, মোহাররমের মতো কবিতা লিখতে পারে, সে যতই শিব-পার্বতীর বন্দনা করুক - ইসলাম এবং মুসলিম সমাজের প্রতি দরদ এবং ভালোবাসার ঘাটতি কোনোমতেই থাকতে পারে না।

আচ্ছা ইসমাইল সাহেব, সিরাজী কি আপনার পদবী?

একটা গুরুগম্ভীর কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ এরকম প্রশ্নের মুখে পড়ে ইসমাইল সাহেব হকচকিয়ে গেলেন।

- হ্যাঁ, কিন্তু... হঠাৎ, মানে ঠিক...

- মানে ঠিক বুঝতে পারছেন না, এই তো? আমার একটা কৌতুহল হচ্ছে। অনুমানও হচ্ছে একটা। এবং আমার ধারণা, আপনার মতো গভীর ভাবজগতের মানুষের পক্ষে সেটা বুঝে নিতে দেরি হবে না। আগে জিগ্যেস করি এই সিরাজী পদবির উৎস কী?

ইসমাইল সাহেব একটু যেন থামলেন। বললেন, এর শুরু আমার দাদাজীর কাছ থেকে। সে আমার জন্মের আগে। আমাদের আদিনিবাস ছিল চাপড়ার বাঙালঝি এলাকায়। দাদাজী কোনো এক সিরাজী পীরের মুরিদ ছিলেন। তিনি ঠিক কিরকম পীর ছিলেন জানিনা, শরা-শরিয়ত নামাজ-রোজা ছিল, অনেকে হাতে হাত রেখে তাঁর মুরিদ হতেন। অন্যদিকে সাধু-ফকিরের মতো তাঁর নাকি আখড়া ছিল, শিষ্য মুরিদেরা সব গানবাজনা করত। আমার দাদাও গানবাজনা নিয়ে থাকতেন। হাকিম সিরাজীর পদ বলে কিছু গানও নাকি তাঁর আছে। দূরদূরান্তের ভক্ত-শিষ্যরা সবাই নামের শেষে সিরাজী পরিচয় দিতেন। আমার বাবার নামেও সিরাজী এলো বটে, কিন্তু তিনি এসবের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ছোটো বয়সেই তিনি শান্তিপুরের কাছে পাঁচপোতায় একটা মক্তবে পড়তে চলে আসেন। হাফেজ হয়েছিলেন। তারপর সারাজীবন এখানেই থেকে গেলেন, আমিও শান্তিপুরে সেই ঘরাণায় বড়ো হয়েছি। আলেম-মৌলানা আর হাদিস-কোরানের মধ্যেই দিনরাত ওঠাবসা।

আমার অনুমান কিছুটা হলেও ঠিক মনে হচ্ছে, নজরুল বললেন। দিবারাত্র যাদের সঙ্গে আপনার ওঠাবসা ছিল, আলাপ-আলোচনা পড়াশোনা ছিল - আপনি তো ঠিক তাঁদের মতো হননি। আপনার ভিতরে যে উদারতার সহজ মানবিক বোধের পরিচয় দেখছি, তা একজন শরা-শরিয়ত মেনে চলা ইসলামের বার্তাবাহক ইমামের কাছে অপ্রত্যাশিত। একমাত্র কোনো সূফী তরিকার মানুষের ভিতর সেটা আসতে পারে। আপনার রক্তে হয়ত সেই ধারার একটা উত্তরাধিকার বাহিত হচ্ছে।

আকবর উদ্দীন গভীর মনোযোগ দিয়ে তাঁদের আলোচনা শুনছিলেন। না বলে থাকতে পারলেন না - ইমাম সাহেব, আপনার ভিতরে এতোরকম ভাব, এতোরকম কথা, এতোদিন তো কিছুই বুঝিনি। সওগাত, মোসলেম ভারত, ইসলাম দর্শন ইত্যাদি পত্র-পত্রিকার লেখা নিয়ে কত আলোচনা গল্প-কথা হয়েছে - কিন্তু কাজী সাহেবের কাছে এসে আপনাকে মনে হচ্ছে নতুন করে চিনলাম।

ইসমাইল সাহেব আক্ষরিক অর্থেই খুব লজ্জিত হয়ে পড়লেন। কিছুটা হয়ত বিভ্রান্তও। কারণ যা বলব বলে ভেবে এসেছিলেন, কথাবার্তার মোড় যেদিকে ঘুরে যাচ্ছে তাতে সেগুলি কিভাবে বলবেন তা নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন। এ কথা সত্য যে তার বাবার মতো ইসলামের বিশুদ্ধতা নিয়ে তার নিজের তেমন বাড়াবাড়ি নাই। কিন্তু এই বঙ্গদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সাহিত্য জগতে, বইপুস্তকে তাদের সম্পর্কে আলোচনা নাই। কলকাতার শিক্ষিত-সাহিত্য মহল রামায়ণ মহাভারত আর পুরাণের দেবদেবীর বর্ণনা নিয়ে ব্যাপৃত। হাবিলদার কবি নজরুল ইসলাম অল্পবয়সে আবির্ভূত হয়েই আরব্য-পার্সী জগতের কাহিনী নিয়ে কবিতা লিখে হিন্দুসমাজের মন জয় করে নিয়েছেন। মুসলিম সমাজে সত্যিকার অর্থে এক কবি প্রতিভার জন্ম হয়েছে।

নজরুল বললেন, আমি অনুমান করতে পারছি আপনি ঠিক কী বলতে চান। আমি হিন্দু দেবদেবী নিয়ে না লিখে শুধু মুসলিম গৌরবগাঁথা রচনা করি।

অল্প বিব্রত সিরাজী সাহেব মাথা নাড়লেন, আপনার অনুমান সঠিক, তবে যেভাবে ভাবছেন, হয়ত সেভাবে নয়। আপনি ভালোই জানেন এদেশের মুসলমান ধনে মানে শিক্ষা সংস্কৃতি সাহিত্য, এমনকি সঠিক ধর্মীয় চেতনা - সবদিক দিয়েই পশ্চাদপদ, শুধু সংখ্যায় বেশি। কলকাতার শিক্ষিত বাবু সম্প্রদায় সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গন আলো করে আছেন, কিন্তু তাঁরা প্রতিবেশী মুসলিম সমাজের জীবনযাপন, নামাজ, রোজা, তাদের ইতিহাস, পয়গম্বরদের জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভাবে অজ্ঞ। আপনি আপনার শিল্প-সাহিত্য কাব্যচর্চা আপনার মতো করে রচনা করুন - সেটা আপনার অন্তরের ইচ্ছা। শুধু সেই সঙ্গে এই অবোধ অশিক্ষিত মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ইতিহাস, গৌরবগাঁথা আরো বেশি করে তুলে ধরুন - যাতে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পরিচিতি বাড়ে, অজ্ঞানতার প্রাচীরটা কমে। এই পোড়া দেশে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ এবং হিংসার টানাটানি খুব দ্রুত বাড়ছে। রাজনীতির ক্ষমতা নিয়ে ভাগাভাগির লড়াই যে এর অন্যতম কারণ সেকথা আপনার সামনে আর কী বলব। আমার শুধু মনে হয়, মুসলিম সংস্কৃতির ইতিহাস, তাদের ভাষা, আচার-আচরণ, জীবন-যাপনের ধরণ প্রকৃত সাহিত্যের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারলে মুসলিম সম্পর্কে হিন্দুর অজ্ঞতা অনেকটা কমে। আর তাতে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ তাতে কিছুটা হলেও কমতে পারে - প্রকৃতপক্ষে আপনিও সেটা চান, তার জন্যই আপনার এতো লড়াই। আপনার মতো বিরাট মাপের মানুষের সামনে এতোসব কথা বলা ধৃষ্টতা, তবু অনেকদিনের বাসনা ছিল কথাগুলি বলার।

আপনি একজন প্রকৃত সূফী ঘরাণার মানুষের মতোই কথা বলছেন, কিছুটা আশ্চর্যও হচ্ছি, নজরুল বললেন। আকবর উদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে সমর্থনের সুরে বললেন, আমিও। তার সঙ্গে বলি, আমিও ইমাম সাহেবের কথা ও যুক্তিতে সহমত। শনিবারের চিঠি যা করে তা যে ঘৃণ্য ন্যাক্কারজনক কাজ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ইসলাম দর্শন, মোসলেম দর্পণ, ছোলতানের মতো কাগজগুলিও কাজী সাহেবকে যেভাবে আক্রমণ করে, খারাপ ভাষায় গালাগালি দেয় তা দেখে খারাপ লাগে। তারা যদি আপনার মতো করে একজন প্রতিভাবানের যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে বক্তব্যগুলি তুলে ধরতেন তাহলে সমাজের উপকারই হতো।

নজরুল হঠাৎ করে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন। কী যে বলেন আকবর সাহেব! রেয়াজুদ্দিন নামের এক শিক্ষিত প্রকৃত ইসলামী ভদ্রলোকের লেখা পড়েছেন? আরেকজন, সম্ভবত সায়েফুল ইসলাম নাম - তাঁর চিঠির ভাষা দেখেছেন। তাঁরা প্রকৃত মুসলমানের যে নিম্নতম সৌজন্যবোধ থাকা উচিত, সেটুকুরও ধার ধারে না। তাদের কাছ থেকে আপনি এই চিন্তা, এই বোধের আশা করেন? তবে কিছুদিন আগে ইব্রাহিম খান সাহেবের কাছ থেকে একটি ব্যক্তিগত পত্র পেয়েছি। যথেষ্ট মার্জিত, সুচিন্তিত। আপনাদের এনে দেখাচ্ছি। তার আগে সিরাজী সাহেব, আপনাকে আর একটি বিস্ময় এবং দুঃখের কথা বলি। এই নদীয়া তো লালন সাঁইয়ের মাটি। এই যে আপনাদের গুরু সিরাজ ফকির, আরো কতো গুরু, পীর এবং বাউল-ফকির রয়েছেন। তরিকা প্রত্যেকের আলাদা হতে পারে, কিন্তু আসলে তো সবাই সূফী ভাবনার মানুষ! মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি, সবার উপরে মানুষ সত্য - এটাই তো তাঁদের অন্তরের মূলকথা? অন্য কাগজের কথা আলাদা, কিন্তু ইসলাম দর্শন প্রকাশিত হয় ফুরফুরা শরীফ থেকে। একজন নামজাদা পীরসাহেবের প্রতিষ্ঠিত ঘরাণা, সেখান থেকে সূফী ধারার তরিকার প্রচার হবে - সেটাই তো প্রত্যাশিত। তার বদলে সেখান থেকে এরকম কূপমণ্ডুকতা, গোঁড়ামির অন্ধতা আর অশিক্ষিত কদর্যতার প্রকাশ পায় কী করে?
দুজনেই নিরুত্তর।

কয়েক মুহুর্তের অখণ্ড নীরবতা ভঙ্গ করে চায়ের পেয়ালা আর বাখরখানি সাজিয়ে নিয়ে দোলনের প্রবেশ।

কী ব্যাপার? এতো চুপচাপ? খুব গম্ভীর ব্যাপার মনে হচ্ছে! চায়ের আসরে এরকম নীরবতা - ভারি আশ্চর্য ঘটনা!

নজরুল হো হো করে হেসে উঠলেন।

আরে, না না। তোমার চা আসছে না দেখে সবাই মন খারাপ করে বসে আছে!

এবার সম্মিলিত হাসি। এই নীরবতা, এই উচ্ছ্বসিত হাসি এবং তাৎক্ষণিক রসিকতার ধরণ - উপস্থিত দুজনের কাছে এটাও একটা বিস্ময়।

'আসলে কি বুঝলে দোলন, আমাদের ইমাম সাহেব খুব কঠিন কঠিন প্রশ্ন করেছেন, আমি উত্তর দিতে পারিনি, তাই চুপচাপ চিন্তা করছিলাম। তুমি খানিক চা খাইয়ে সামাল দাও, আমি একটু আসছি' - বলে নজরুল উঠে ভিতরে চলে গেলেন।

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।