গল্প ও অণুগল্প

নিখোঁজ কবির ডায়েরি (ষষ্ঠ ও সপ্তম পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অভিজিৎ রায়


[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]

(ছয়)

- আপনিই বলুন সুবোধদা, এটা কোনও ম্যাচিওরড মানুষের কাজ হল? মেয়েটা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে বিছানা নিয়ে নিয়েছে। অফিসে অডিট চলছে। আমি একা কোন দিকে যাব?

অঞ্জনা চায়ের কাপটা টি-টেবিলে রাখতে রাখতে কথাগুলো বলল সুবোধ সেনকে।

- হ্যাঁ অঞ্জনা। আমিও তো অবাক হয়ে যাচ্ছি। প্রশাসনিক লেভেল দিয়ে আমি সবকিছু চেষ্টা চালাচ্ছি। দেখি কী হয়!

- হুম। আমি আরও কীসে অবাক হচ্ছি জানেন? বেশ কিছুদিন ধরেই ও খুব ডিপ্রেশনে ভুগছিল। আত্মবিশ্বাস ক্রমশ কমে আসছিল। রোজগারপাতি কমে আসা যেমন একটা কারণ ঠিক তেমনই আর একটা বড় কারণ ছিল আপনাদের সাহিত্যের বাজার ক্রমশ কমে আসা। সরকার বা নির্দিষ্ট কর্পোরেট যতক্ষণ না কাউকে কবি বা লেখক হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে ততক্ষণ পাঠক নড়েচড়ে বসে না। তার বই বাজারে বিক্রি হয় না। বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিকল্প আয়ের পথ খোলা না রেখে কারোরই লেখালিখির জন্য জীবন উৎসর্গ করা উচিত নয়।

- অথচ সৃজিত সেইটাই করে এসেছে। এটা ভুল আমি বলব না। না লিখে থাকতে না পারার কষ্টটা তোমরা হয়ত বুঝবে না অঞ্জনা। এটা শিল্পীসত্তার নিজস্ব কষ্ট, ব্যক্তিগত যন্ত্রণা। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওকে আমি আকাদেমির সদস্যপদের জন্য প্রোপোজাল দিয়েছিলাম। ও শুনল না। গোয়ার্তুমি। নীতিকথা পাঠ্য বইয়েই ভাল মানায়। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষকে অভিযোজিত হতে হয়। শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে যেমন, তেমনই মানসিক গঠনের দিক থেকে।

- সবাই সবকিছু পারে না সুবোধদা। আমি জানি, ও এটা কিছুতেই পারত না। আর ওর প্রতিক্রিয়ায় আপনাকেও হয়ত বিপদে পড়তে হতো। এতে আপনারও ভাল হয়েছে।

- এটা তুমি ভালই বলেছ। কিন্তু আমাকে একটা কথা বল তো। তোমাদের মধ্যে কি খুব ঝামেলা হয়েছিল? এরকমভাবে নিখোঁজ হবার মূল কারণটা কী?

- ওই যে বললাম আত্মবিশ্বাসহীনতা! আপনি ওই 'সিনেমাওয়ালা' ছায়াছবিটা দেখেছেন সুবোধদা? পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ের কথা আমার মনে পড়ছে। সৃজিত কিছুতেই বুঝতে চাইছে না যে করোনা পরবর্তী সময়ে প্রিন্ট মিডিয়ার যুগ শেষ। আর বড় জোর বছর পাঁচেক। প্রিন্ট অন ডিমান্ড আর সাহিত্যের সিন্ডিকেটের যুগে পাঠকহীন বাংলা সাহিত্যের আয়ু বড় জোর পাঁচ বছর। তারপর, সবটাই মঞ্চ, আলো আর পুরস্কারের সাহিত্য।

- আরিব্বাস! কবিসঙ্গ করার দারুণ সুফল সাক্ষাৎ করলাম আজ। এত ভাল কথা বল তুমি! তুমি তো দেখছি কলম ধরলে আমাদের অনেকেরই হাল খারাপ করে দিতে অঞ্জনা!

- এরকম কথা বলে লজ্জা দেবেন না দাদা। তবে সৃজিতের সঙ্গে থাকা মানে তো ওর ভাবনাগুলোর সঙ্গেও থাকা। ওর কাছে যা শুনি তা নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে বললাম আর কী!

- সোহিনীর সাথে কথা বলা যাবে? চল দেখি। মেয়েটার জন্য সত্যিই আমার কষ্ট হচ্ছে।

অঞ্জনার সঙ্গে সুবোধ ঢোকে সোহিনীর ঘরে। খাটের পাশে একটা চেয়ার এগিয়ে দেয় অঞ্জনা। সুবোধ বসে। খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল সোহিনী। সুবোধ মাথায় হাত বোলাতে থাকে।

- উঠে বস টুকুন। জেঠু কী বলছেন শোন।

- এই পাগলি। বাবা বেড়াতে গেছে। ঠিক ফিরে আসবে। তুই তোর পড়াশোনা ছেড়ে এভাবে শুয়ে আছিস শুনলে কী বাবা খুশি হবে? নাকি মা মায়ের কাজগুলো করতে পারবে? বড় হয়েছিস না?

- বাবার কিছু হয়নি তো জেঠু? আমার খুব ভয় করছে।

- কিচ্ছু হয়নি। তোর বাবার মতো পাগল খুব কম আছে। হয়ত শুনবি কোনও লেখা শেষ করতে বাবা কোথাও গিয়ে বসে আছে। লিখছে। তখন তোর নিজেকে কীরকম বোকা মনে হবে ভাব।

- তা তুমি ঠিক বলেছ জেঠু। বাবা এরকম করতেও পারে। আমি জানি। আমাকে বলেছিল। তোদের কাউকে কিছু না বলে একদিন আমি পালিয়ে যাব। দেখি তোরা কী করিস!

- তুই কী বলেছিলি?

- তুমি যা ভিতু। একা একা বেড়াতে যাবে হতেই পারে না। বাবা খুব হেসেছিল।

সোহিনীর ঠোঁটের কোণ জুড়ে যেন সেই হাসি ফেরত এল। এই তিনদিনে মেয়েটা একদম চুপ ছিল। অঞ্জনা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

- আমি একটু রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছি সুবোধদা। আপনি কি আর এক কাপ চা খাবেন?

- আমি চা খাব মা। জেঠুও খাবে। তুমি চা কর।

সুবোধ চোখের ইশারায় অঞ্জনাকে চলে যেতে বলে।

- জেঠু, তুমি একটু বোসো। আমি দু'মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসছি।

অঞ্জনা ট্রে-তে করে বিস্কুট, নিমকি, চা সাজিয়ে আনে ঘরে। সোহিনীকে এখন একটু সুস্থ লাগল তার। এই ক'দিন যেরকম পাগলামি করছিল তাতে অঞ্জনাই অসুস্থ হয়ে পড়ছিল মাঝে মাঝে। অসম্ভব মনের জোরে নিজেকে সামলিয়ে আবার মেয়েকে সামলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। আজ ব্যাপারটা অনেক সহজ হল। হয়ত এই বয়সে মেয়েরা বাবা বা বাবার মতো কাউকে খোঁজে অসহায় মুহূর্তে।

- তা মা, তোর পড়াশোনা কেমন চলছে?

- এই ক'দিন তো কিছুই হয়নি। তবে খুব একটা খারাপ নয়। স্যাররা তো বলছেন আমার প্রোগ্রেস খুব ভাল।

- তা তুই কী নিয়ে পড়ছিস যেন?

- ফিজিক্স অনার্স।

- কম্পিউটার শিখেছিস কিছু স্কুলের বাইরে?

অঞ্জনা এবার মাঝখানে কথা বলল।

- আরে দাদা, ওই কম্পিউটার নিয়েই তো বাবা, মেয়ের দিনরাত ঝামেলা। কী সব কোর্স করবে বলে বাড়িতে কম্পিউটার কিনল আর তারপর সারা দিনরাত শুধু গেম আর গেম।

- না, জেঠু। আমি শুধু আমার রিলাক্সের টাইমে গেম খেলি। কী করব বলো? আমার তো তেমন বন্ধুবান্ধব নেই। বেশিরভাগই ডাক্তারি কিম্বা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে বাইরে চলে গেছে।

- তা তুই ডাক্তারি পড়লি না কেন?

- আমার ভাল লাগে না। ফিজিক্স নিয়ে শেষ পর্যন্ত পড়ব। রিসার্চ করব। সাইন্টিস্ট হব।

- নিজের জীবন নিজে গুছিয়ে প্ল্যান করে নিতে পারলে ভাল। কিন্তু মুখে এক কথা বলে কাজে অন্য কিছু করলে জীবনে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছু জুটবে না।

সুবোধ চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল।

- ঠিক বলেছেন দাদা। আপনি একটু বুঝিয়ে বলুন। যদি মেয়ের সুমতি হয়।

সোহিনী মিথ্যে রাগ দেখিয়ে খাট থেকে নেমে অন্য ঘরে চলে গেল। সুবোধ হাসল। অঞ্জনা বোকার মতো তাকিয়ে থাকল।

- অঞ্জনা, সবসময় এত নেগেটিভ কিছু বলবে না ওকে। আর, এখন তো নয়ই। সৃজিতকে ফিরে আসতে দাও। তারপর না হয় সোহিনীর ব্যাপারে একটা ফিউচার প্ল্যান খাড়া করা যাবে। আজ আমি তাহলে উঠি!

সুবোধকে বাইরে পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে অঞ্জনা দেখে সোহিনী গুনগুন করে গান গাইছে। এবার সে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করে। মোবাইলটা বেজে ওঠে। অঞ্জনা ছুটে যায়। নাহ, সৃজিত নয়। মায়ের ফোন।

(সাত)

পূর্ণিমার পর চাঁদের শরীরে ক্রমশ ক্ষয়রোগ ধরা পড়ছে। তার আলো ক্রমশ কমে আসছে। বারান্দার চেয়ারে বসে চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল সৃজিত। নুড়ি-পাথরগুলো আজ আর অতটা ঝঝক করছে না চাঁদের আলোয়। তবে, গোপালের বাঁশি শোনা যাচ্ছে। এখনও অনেকটা দূরে আছে গোপাল তাই পরিস্কারভাবে শোনা যাচ্ছে না কী বাজাচ্ছে। কিন্তু পিকু দৌড়ে গিয়ে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াতেই সৃজিত বুঝতে পেরে গেছে বাঁশির সুরের ম্যাজিক শুরু হয়ে গেছে এই মায়াবী নদীচরে। আস্তে আস্তে বাঁশির আওয়াজ পরিস্কার হচ্ছে সৃজিতের কাছে। সুরটাও ক্রমশ পরিস্কারভাবে ধরা দিচ্ছে। আজ কোনো অচেনা পাহাড়ি গানের সুর বাজাচ্ছে না গোপাল।... "জিনে কে লিয়ে সোচা হি নেহি/ দর্দ সামহালনে হোঙ্গে/ মুঞ্জুরায়ে তো মুঞ্জুরান কী/ কর্জ উতাড়নে হোঙ্গে"... গোপালের বাঁশির সুরে সৃজিতের বুকের মধ্যে এক ভয়ানক চাপ অনুভূত হয়। এই যে পালিয়ে আসা, এই যে একা থাকা, এই যে ভালো থাকা নিজের পছন্দের ভাবনায়, কাজে তার জন্য কি জীবনের কাছে তার অনেক ঋণ জমা হচ্ছে প্রতিদিন? কীসে সে ঋণ শোধ হবে তার? উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সৃজিত। লিখতে বসলে সচারচর তার এমনটা হয় না। একের পর এক চরিত্র তার গল্পে নিজের নিজের কাজ করে যায়, কথা বলে যায়। ঋণ শোধ করে আর ঋণ রেখেও বিদায় নেয়। তাকে নিয়ে কে লিখছে এই জীবন? তাকে দিয়ে কী করাতে চায় সে? বাঁশির সুর মিলিয়ে গেছে জয়ন্তী নদীর ভাঙা সাঁকোর ছায়ায়। বারান্দায় বসে সৃজিত তার বেসুরো গলায় গানটা গাইতে চেষ্টা করে। দু'লাইন গাইবার পর একটা কান্না গলার ভিতরে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে আসে। সে থেমে যায়। শ্যামলালের পায়ের আওয়াজ উঠে আসে দোতলার বারান্দায়।

- সাবজী, কাল থেকে এখানে একটা মেলা বসে। ওই পিছন দিকের রাস্তা ধরে গেলে একটা বড় মাঠ আছে। ওখানেই। ভোর থেকেই লোকজন আসে। আপনি যদি কাল মর্নিংওয়াকে যান তাহলে ওদিকটায় যেতে পারেন। ভাল লাগবে।

- কীসের মেলা?

- বজরংবলী পুজোর মেলা। বড় হাটও বসে। নদীর টাটকা মাছ পাওয়া যায়। পছন্দ হলে কিনে আনবেন। আমি রান্না করে দেব।

- আচ্ছা ঠিক আছে। ঘরে দু'বোতল জল আছে কি না একবার দেখে নাও।

শ্যামলাল ঘরে ঢুকে বোতল দুটো নিয়ে সাথে সাথে বেরিয়ে আসে।

- সরি সাহাব, একদম জল নেই। আমি এক্ষুণি এনে দিচ্ছি।

পিকুটা এবার শ্যামলালের সঙ্গে তড়তড়িয়ে নিচে নেমে যায়। কিছুক্ষণ পরে শ্যামলাল জল নিয়ে উঠে আসে কিন্তু পিকু আসে না। সৃজিত লক্ষ্য করল সবটা। পিকুকে কিছুক্ষণ বারান্দার রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়ে খুঁজলও। তারপর আবার নিজেকে নিয়ে নিজে অবাক হল। এই তিনদিনে পিকুর প্রতি এই যে এতটা টান সে অনুভব করছে তা কি নিজের প্রতি ভালবাসা থেকে? অঞ্জনার অভিযোগ মিলিয়ে দেখে নিতে চাইছে সে। সংসারের অভ্যাস থেকে আজ এখানে একা হয়ে পড়ার মধ্যে পিকুর সান্নিধ্য কি শুধুমাত্র সেই অভ্যাসের বিকল্প হিসেবে তৈরি করে নিয়েছে তার অবচেতন? অঞ্জনার থেকে দূরে এসে আজ অঞ্জনার অভিযোগগুলো তার সত্যি বলে মনে হচ্ছে। নিজেকে সত্যিই খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে। আবার সাথে সাথেই সৃজিতের মাথায় এল, এই যে কিছুক্ষণ আগেই সে সোহিনীর কথা ভাবছিল। আচ্ছা এই ভাবনা কি মেয়েকে ভালবাসা থেকে নয়? নাকি বাড়িতে প্রতিটি কাজে মেয়ের যত্নের অভাব বোধ করছে সে এখানে? সময়মতো জল এগিয়ে দেওয়া, ওষুধ মনে করিয়ে দেওয়া বা খানিক বাদে বাদে চায়ের জন্য জিজ্ঞাসা করার লোকের অভাববোধ থেকেই কি সোহিনীর জন্য তার মনখারাপ? এসব মাথায় এলেই তার নিজেকে ঘৃণ্য বলে মনে হয়। বাড়িতেও অঞ্জনার একই অভিযোগ বারবার শোনার পর যে এই একইরকম অনুভূতি হতো না তা নয়। তবু মেয়ে বাড়ি থাকলে বাবার পাশে দাঁড়াত আর এইসব ভাবনা যা সৃজিতকে প্রতিমুহূর্তে ভেঙেচুরে গুঁড়ো করে দেয় তা দূরে সরে যেত। এখানে সেসব হবার চান্স কম। অবসাদ কাটাতে এখানে পাশে পাশে ছিল পিকু। আজ নেই। তাই জীবনের অন্ধকার হতাশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না সৃজিত।

ট্যাব খুলে বসে লেখার চেষ্টা করল। কিন্তু লেখার মধ্যে ডুবে যেতে পারছে না। অঞ্জনার অভিযোগগুলো বারবার তাকে ভেঙে চুরে দিচ্ছে। এতদিন একটা বিশ্বাস ছিল তার। নিজেকে একা পেলে, লেখার সময় কেউ ডিস্টার্ব না করলে সে লিখে যেতে পারে অবিরাম। আজ তাও হচ্ছে না। স্মৃতিগুলো তাকে ভেঙেচুরে খানখান করে দিচ্ছে। তার সমস্ত আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে। নিজেকে সে আজ সত্যিই অপদার্থ মনে করছে। একজন অসফল মানুষ অথবা একজন সফল পরজীবী। অঞ্জনার ঘাড়ে ভর দিয়ে সে জীবনের এতগুলো দিন পার করে এসেছে। মেয়েটার জন্যও কিছু করতে পারেনি। না দিতে পেরেছে সময় না ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক সঞ্চয়। এখন কী হবে? জয়ন্তীর ওই ভাঙা সাঁকোটার মতো তার সংসারও ভেঙে পড়ে থাকবে। পর্যটকের মতো কিছু বন্ধুবান্ধব আসবে, ঘুরে যাবে। কিন্তু সাঁকোটার ভবিষ্যত তাতে বদলাবে না। কারণ? ভুটান আর ভারতের মধ্যেকার খনিজপদার্থের আদানপ্রদানের চুক্তি শেষ হওয়ায় যেমন এই জমজমাট জয়ন্তী আজ শুধুমাত্র পাহাড়ি গ্রামে পরিণত হয়েছে ঠিক তেমনই অঞ্জনার সাথে সৃজিতের সংসারের সাধারণ চুক্তিগুলো ভেঙে গেছে। হয়ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে দোষ সৃজিতের। তবু সত্যি এটাই যে সংসারটা ভেঙে গেছে। আর, ভাঙা সাঁকোটার মতো সংসারটাকে ছবির মতো করে তুলতে চাইছে সোহিনী। পারছে না। ছবিটাও ঠিকমতো ফুটে উঠছে না। কোথাও আলো কম, কোথাও অন্ধকার বেশি। পাতাহীন কিছু গাছ জয়ন্তী নদীর উপর একসময় দাঁড়িয়ে ছিল সফল সময়ের কথা বলার জন্য। আজ নেই। তাদের কেটে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে নদীচরে। কোভিড, লকডাউন সবই যেন সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির উপর ভরসা রেখে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। অবসাদ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অঞ্জনার সহ্যক্ষমতারও একটা সীমা আছে। আর সেই সীমা অতিক্রম করে আজ ভাঙন ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সংসারে। যে কোনো বিষয়ের আলোচনাই একসময় সৃজিত আর অঞ্জনার মধ্যেকার ঝগড়ায় পরিণত হয়। সৃজিতের বিরক্ত লাগে। সে পালিয়ে যায়। তার লেখার জগতে পালিয়ে যায়। লেখা থেকে রোজগার না হলেও শান্তি পাওয়া যায়। একজন সৃষ্টিশীল মানুষের সাথে একজন সাধারণ মানুষের এই পার্থক্যটা থাকে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদার বাইরেও যে জীবনে সাময়িক আনন্দ এবং শান্তি লাভের একটা পথ খোলা থাকে তা অঞ্জনা বুঝতে পারলেও হয়ত মেনে নিতে পারে না। তার মানসিক এবং শারীরিক পরিশ্রমের পর সে চায় সুজিত যাবতীয় দায়ের ভাগীদার হোক। সৃজিত ইদানিং সেই চাপ নিতে পারে না। ক্রমশ লিখে উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ পড়াশোনা থেকেই ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে। বই না পড়লে লেখকেরা বাঁচবে কীসে এই প্রশ্নের উত্তর সবার জানা কিন্তু সবাই এড়িয়ে যেতেই ভালবাসে। ক্রমশ সংকট ঘনিয়ে আসছে। সৃজিত এমন কিছু জানে না যে সেখান থেকে সে কিছু রোজগার করবে আর লেখা দিয়ে রোজগারের পথ ইদানিং তার কাছেও বন্ধ। এই অজ্ঞাতবাস পর্বে সে যদি কোনও উপন্যাস লিখেও ফেলে তা থেকে কোনো উপার্জন সম্ভব কি না তা তো সে জানে না। তাহলে বাড়ি ফিরে যেতে হলে সে কী বলবে অঞ্জনাকে? এই দীর্ঘ সময়ের মানসিক চাপ নেবার পর অঞ্জনা তো আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে সৃজিতকে দেখে। আরও বেশি প্রতিক্রিয়ায় ঝাঁঝরা করে দেবে সৃজিতের মন ও মনন। তাহলে?

ভৌ... ভৌ... পিকু চলে এসেছে। দরজা বন্ধ করে সবে সৃজিত শোবার চেষ্টা করছিল। দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে পিকুকে কোলে তুলে নেয় সৃজিত। রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে চাঁদের হালকা আলোয় নদীর ওপারে ভুটানি বস্তিতে যাবার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। পিকুর গায়ে হাত বোলায়। নিঃশব্দে চোখের জল গাল বেয়ে পিকুর মাথার উপরে পড়তেই পিকু আবার চিৎকার করে উঠল। ভৌ... ভৌ...

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।