গল্প ও অণুগল্প

আমার মা (দ্বাবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


ধুবুলিয়া বাজার ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে জাতীয় সড়ক থেকে বাঁদিকে বাঁক নিলেই মুড়াগাছার পথ। মোড়ের মাথায় একটা চা-এর দোকান, দোকানের মালিক তাপস একসময় ফুচকা বিক্রি করতো। তাপসকে কলেজে সবাই খুব পছন্দ করতো। ওর সুমিষ্ট ব্যবহারে সবাই খুশি হতো। আমার সহপাঠীরা অনেক চেষ্টা করেও আমাকে ফুচকা খাওয়াতে পারেনি। তাপসও অনেকদিন ওর নিজের হাতে তৈরী ফুচকা খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে। কিন্তু আমি কোনোদিনই ওর অনুরোধ রাখতে পারিনি। কখনও কখনও ওর অভিমানও হয়েছে আমি ওকে বলেছি - ”দেখ তাপু যেটা আমি পছন্দ করিনা সেটা কীভাবে খাই বল?”

তাপু বলেছে - হ্যাঁ দাদাভাই, তুমি ঠিকই বলেছো।

তাপসের বাড়ি ধুবুলিয়া ক্যাম্পে। আমাকে দেখামাত্রই চিনতে পারলো। ছুটে এসে আমাকে দাঁড় করিয়ে বললো - কী গো জয় দাদা, আমাকে চিনতে পারলেনা? আমি তাপস গো।

- বলিস কীরে তাপু তোকে চিনতে পারবোনা? তুই তো জানিস আমি একবার যাকে দেখি তাকে সহজে ভুলি না। আর তোর মতো একটা ছেলেকে ভোলা যায়, বল?

- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। তা এদিকে কোথায় চললে? এসো দোকানে একটু বসে যাও। তারপর দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে যেও। এবারে কিন্তু তোমাকে ফুচকা খেতে বলছি না।

- তাপু তোর সেকথা এখনো মনে আছে?

- হ্যাঁ দাদাভাই। সেসব দিনগুলোর কথা কী অত সহজে ভোলা যায়?

- আজও হয়তো তোর অনুরোধ রাখতে পারছি না। কেননা দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করার সময় নেই। তবে তুই যখন বলছিস তখন চল তোর দোকানে একটু বসি।

- দোকানে তো অবশ্যই তোমাকে বসতে হবে। এসো...

আমাকে একপ্রকার টানতে টানতে নিয়ে গেল ওর দোকানে। ওর দোকান বসানোর গল্প বলতে শুরু করলো। এক নিঃশ্বাসে সব বলে গেল। তার কতক আমার মাথায় ঢুকলো, কতক ঢুকলো না।

আমি বললাম - হ্যাঁ রে, তোর মা-বাবা কেমন আছে?

- বাবাকে হারিয়েছি প্রায় বছর পাঁচেক হলো। মা আছেন তবে শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। জানো তো জয় দাদা তোমার বৌমা খুব ভালো। ও মাকে খুব যত্ন-আত্তি করে। বলা যায় ওর যত্নেই মা এখনো আছেন। নাহলে - এই দেখো কেবলই আমার কথা বলে চলেছি।

- বল না তাপু। তোর কথাই বল। আমার শুনতে বেশ লাগছে। আমি তো মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা পেলাম না। অন্যের কথা শুনতে ভালোই লাগে।

- আচ্ছা জয় দাদা, তুমি তো চা খাও না তাহলে একটু ঘুগনি রুটি খাও। এই অনুরোধটা অন্তত রাখো। দেখো এ অঞ্চলে আমার হাতের তৈরী ঘুগনি খেতে অনেকেই আসে। সকালে একচোট হয়েছে, আবার বিকেলে প্রায় শ'খানেক লোক এসে জড়ো হবে।

খিদেও পেয়েছিল, কিছু একটা খাবার জন্য মনটাও উসখুস করছিল। তাপস আমার মনের ভাষা সহজে বুঝতে পেরেছে। আমি বললাম - এত প্রশংসা যখন করছিস তখন দে একটু টেস্ট করে দেখি। তোর অনুরোধটাও রাখা হবে তারপর খেতে খেতে আমার বৌমা আর কাকিমার গল্পটাও শোনা যাবে।

ঘুগনি মুখে দিয়ে বুঝতে পারলাম তাপস সত্যি কথাই বলেছে। আমি গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। বিষয়টা লক্ষ্য করে তাপস বললো - সকালে বোধহয় কিছু খাওয়া হয়নি তোমার, তাই না জয় দাদা? তা কী রকম লাগছে? খাওয়া যাচ্ছে তো? একটা রুটি দিই? হাতরুটি আছে।

- তা বলছিস যখন দে একটা।

একটার কথা বলে তাপু আমার প্লেটে দুটো রুটি দিল। পেট ভরে ঘুগনি রুটি খেয়ে একটা দীর্ঘ ঢেকুর তুলে তাপসকে বললাম - বুঝলি তাপু ঘুগনিটা তুই ভালোই করেছিস।

- না গো দাদা। এতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। সবটাই আমার মায়ের কাছে শেখা। মা আমাকে হাতে ধরে ধরে শিখিয়ে দিয়েছেন। একদিন মা বললেন - 'খোকা ফুচকা বিক্রি করে যতটা লাভ হয় তাতে খাটুনির পয়সা ওঠে না। তারপর সারাদিন তোর এই পরিশ্রম আমি মা হয়ে কী করে সহ্য করি বল? তার চেয়ে বরং হাই রোডের ধারে একটা দোকান কর। চা,বিস্কুট, ঘুগনি, রুটি এটা দিয়েই শুরু কর। এতে খাটুনিটাও কম আর রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-জলের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।' ব্যাস মায়ের কথামতো লেগে পড়লাম। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। জানো দাদা, মা আমার সাক্ষাৎ দেবীমাতা।

মনে মনে তাপসের এই মানসিকতাকে শ্রদ্ধা না করে পারলাম না। মুখে বললাম - হ্যাঁ রে তাপু এমন মাকে আগলে রাখিস। পরের বার এসে তোর মায়ের সাথে দেখা করে যাবো। ভালো থাকিস।

- জয় দাদা, ফেরার পথে এসো কিন্তু।

- আচ্ছা তাপু তোর মনে আছে আমাদের সাথে একটা ছেলে পড়তো বেজপাড়ায় বাড়ি? তোকে খুব জ্বালাতন করতো।

- হ্যাঁ, মনে থাকবে না কেন? সুমিতদা তো?

- হ্যাঁ রে, আমাদের সুমিত।

- শুনেছি কী একটা বড়ো মাপের চাকরি করে। কলকাতায় থাকে। এদিকে কোনোদিন আসতে দেখিনি।

- আর ওর মা?

- জানি না গো দাদা, ওর মায়ের কথা বলতে পারবো না।

- আচ্ছা ঠিক আছে। আজ তবে চলি রে, আবারও আসবো।

তাপস কে বিষন্ন গোধূলির মতো ম্লান দেখায়। ওর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি ও আমার কাছে কিছু একটা লুকোচ্ছে। আমার দ্বিচক্রযানটিকে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। মনের ভেতর একটা সন্দেহ ঘোরাফেরা করছে - সুমিত কী তাহলে ওর মাকে নিয়ে গেছে? তাপস যেভাবে বললো তাতে মনে হচ্ছে সুমিত ওর মাকে নিয়ে যায়নি। তাহলে তাপস নিশ্চয় কথাটা গোপন করতো না। কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে একটা স-মিল। ওখানে দাঁড়িয়ে স-মিলের কাঠ চেরাই করা দেখতে লাগলাম। কী নিপুণ কৌশলে মিস্তিরির দল কাঠ চেরাই করছে! আমি অবাক হয়ে গেলাম। কতটা সাবধানে কাজটা করতে হয়! একটু অসতর্ক হলেই মুহূর্তের মধ্যে যা-কিছু ঘটে যেতে পারে। শৈশবে অনেকবার কাঠ চেরাই দেখেছি কিন্তু আজকের দেখা একটু অন্যরকম। মানুষগুলোকে চেনা যাচ্ছে না। কাঠের গুঁড়ো ওদের সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়েছে। মাথায় একটুকরো কাপড় বাঁধা, নাক মুখকে কাঠের গুঁড়ো থেকে বাঁচাতে যে কাপড়টা ব্যবহার করেছে সেটা চেনা দুঃসাধ্য ব্যাপার। ওটা তখন চটের বস্তার আকার নিয়েছে। গায়ে পোশাক আছে কী না তা অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে দেখতে হবে। কী অমানুষিক পরিশ্রম! শুধু পরিশ্রম নয় পদে পদে জীবন চলে যাওয়ার সংকেত। জানিনা এরা এদের খাটুনির উপযুক্ত পারিশ্রমিক পায় কী না। আমাদের দেশে তো এমনই প্রথা প্রচলিত আছে যে, যে যত কম পরিশ্রম করে তার বেতন বা পারিশ্রমিক তত বেশী। আর যারা দিনরাত এক করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তারা তত কম পারিশ্রমিক পায়। মানুষ এটা নিয়ে খুব বেশী ভাবার সময় হয়তো পান না। তাই এরা বঞ্চিত, অবহেলিতই থেকে যায়। ওদের এবার খাবার সময় হয়েছে খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজে নামবে। আমি চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। অনেকটা জায়গা জুড়ে স-মিল। চারপাশে প্রাচীরের ধার ঘেঁষে শাল, সেগুন, মেহগনির গাছ লাগানো। এগুলো বড়ো হলে এদেরকে বলি দিয়ে কাঠের রূপ দিয়ে কোনো বিত্তশালী বা মধ্যবিত্তের বাড়ির শোভাবর্ধন করবে। জায়গাটি বেশ শান্ত স্নিগ্ধ শীতল। দক্ষিণ দিকে বিস্তৃত মাঠ, সর্ষে ফুলের হলুদ রঙের বাহারে একটা অনুপম রূপ সৃষ্টি করেছে। পিছন ফিরে দেখতে পেলাম সবাই একসাথে খেতে বসেছে। ওদের খাবার দেখে আমার চোখে জল এসে গেল - সবাই গোল হয়ে বসে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা এবং সামান্য একটু লবণ নিয়ে জলে ভেজানো ভাতে মাখিয়ে খাচ্ছে। কেউ কেউ হয়তো অল্প পরিমাণ ডাল বা সবজি দিয়ে ভাত মাখিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে গলাধঃকরণ করছে। মনে হয় শত শত বছরের খিদে পেটে নিয়ে খেতে বসেছে। মনে পড়ে গেল আমার বিগত দিনের কথা - এভাবে আমিও কতদিন জল দেওয়া ভাত পেঁয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে মেখে চপ বা চানাচুর সহযোগে ভক্ষণ করেছি। আমি যেন আজ ওদের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। এদের বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা কী খাচ্ছে তা জানতে চাইলে ওদের একজন বললো - দাদাভাই আমাদের কথা কে ভাবে বলো? দু'বেলা দু'মুঠো ভাতই ঠিকমতো জোগাড় করতে পারি না তো মাছ মাংস পাবো কোথায়?

ঠিক কথা। এদেরকে নিয়ে মানুষের ভাবার সময় কোথায়! যাঁরা প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসিয়ে দেন, বৈতরণী পার হয়ে গেলে তাঁদের টিকিটিও দেখতে পাওয়া যায় না। যে অন্ধকারে এদের জীবন শুরু হয়েছিল সেই অন্ধকারেই পড়ে থাকে এরা। নজরুল ইসলামের কবিতার একটি পঙক্তি মনে পড়ে গেল - 'যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ওই বাষ্পশকট চলে/ বাবুরা এসে চড়িল তাহাতে কুলিরা পড়িল তলে।' সত্যি এই দধীচিদের কথা আমরা ভাবি না, ভাবতে পারি না। নিজের গর্ভধারিনীর কথাই ভাবি না এরা তো কোন ছার!

গর্ভধারিণী মা আমার কত কষ্টেই না আছেন! বাঙালি মায়ের মনটা এইরকমই হয়। মা না হয় লেখাপড়া শেখেননি কিন্তু আমি তো পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে মানুষ গড়ার কারিগর হয়েছি। অথচ নিজেকেই ঠিকঠাক গড়তে পারিনি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম মা'কে এবার সত্যি সত্যি নিজের কাছে এনে রাখবো। হ্যাঁ, জোর করেই নিয়ে আসবো। আগে বারবার কেবল অনুরোধ করেছি এবার নিজের অধিকারেই তাঁকে নিয়ে আসবো। শেষ বয়সটা তাঁর শান্তিতে ও নিশ্চিন্তে কাটুক এটাই চাই।

দ্বিচক্রযানের গতিবেগ বাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম মুড়াগাছা স্টেশনের কাছে। সামনেই বেউলো নদী। খেয়ামাঝিকে ডাক দিতেই তিনি এসে হাজির হলেন।

(ক্রমশ)