গল্প ও অণুগল্প

স্পর্শ (তৃতীয় পর্ব)



অচিন্ত্য সাহা


[পাঠকের অনুরোধে 'স্পর্শ' আখ্যানটির তৃতীয় পর্ব লেখা হলো, এই লেখা প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য সম্পাদকমন্ডলী লেখকের কাছে কৃতজ্ঞ।]

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে সিমরান। এটা নন্দিনীর স্কুলের একটা ব্রেক-আপও বটে! জেলায় প্রথম এবং রাজ্যে তৃতীয়। এই ব্যাচের বেশ কয়েকটা মেয়ের ফলাফল অপার্থিব আনন্দের অনুভূতি এনে দিয়েছে। নন্দিনীর বুকটা গর্বে স্ফীত হয়ে ওঠে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সহ-শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা আমূল-পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় - সবাই জানেন যে, এইরকম ফলাফলের মূল কাণ্ডারী নন্দিনী। তবু কেউ তাকে তার এই কৃতিত্বের জন্য প্রশংসা করবে না। নন্দিনী স্কুলে আসার পর অনেকগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে - ছাত্র-ছাত্রীদের সময়মতো স্কুলে আসা, স্কুল ইউনিফর্ম, ব্যাজ, আই কার্ড চালু করা এবং ছেলেমেয়েরা যাতে স্কুলের নিয়ম বহির্ভূত কোনো কাজের সাথে যুক্ত না হয় তার ব্যবস্থা করা। বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ বিষয়ে আলোচনা, বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা এবং গ্রামে গ্রামে গিয়ে অভিভাবক অভিভাবিকাদের সাথে কথা বলে তাঁদের সাথে স্কুলের নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলা সহ নানান কর্মসূচি। যাতে স্কুলের প্রতি তাদের আস্থা জন্মায়। এই কর্মসূচির ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া গেছে। স্কুল সম্পর্কে তাঁদের মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরী হয়েছে। গ্রামের মানুষ নন্দিনীকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা জানান কিন্তু স্কুলের সহকর্মীরা কেউ তার অবদানের কথা স্বীকার করেন না। বরং প্রচ্ছন্নভাবে তার প্রতি ঈর্ষা পোষণ করেন। তাতে নন্দিনীর কিছু যায় আসে না। বরং বাকিরা নিজের নিজের অহমিকা বজায় রাখার জন্য একদিন মানুষের মন থেকে মুছে যাবেন।

প্রধান শিক্ষক মহাশয় নন্দিনীকে ডেকে তার সাথে নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং পরামর্শ চান। বিষয়টি নিয়ে বাকিদের মধ্যে নানারকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায় - কেউ কেউ মুখ টিপে হাসেন, কেউ কেউ ফিসফাস করেন, কেউ আবার ঠেস দিয়ে বলেন - ইস! আমাদের কপালটা যদি নন্দিনী ম্যামের মতো হতো।

নন্দিনী সব বুঝতে পারে কিন্তু কিছু বলে না। সব মনের ভেতর জমিয়ে রাখে, সময় সুযোগ বুঝে একদিন সব কথার জবাব দেবে। নন্দিনীর ইচ্ছে করে - 'স্কুলটাকে নিজের মনের মতো গড়ে তুলি।' ইচ্ছে থাকলেও সব সময় পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সেই ইচ্ছেপূরণে বাধা দেয়।

সিমরানের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল গ্রামের মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে তাতে নন্দিনী বেশ খুশি হয়েছে। ওর আশা আগামীতে আরও অনেক সিমরান তৈরী হবে। নন্দিনী কোনোদিন কোনো ছাত্র-ছাত্রীর গায়ে হাত তোলেনি বরং তার নিকট থেকে ওরা পেয়েছে অকুণ্ঠ স্নেহ ও ভালোবাসা। তাই সবাই নন্দিনীকে যেমন ভালোবাসে তেমনি শ্রদ্ধা করে।

সিমরানের বাবার মত পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু সিমরানের স্বামী ইমরান এখনও তার পুরোনো চিন্তা আর অন্ধকারে পড়ে আছে। ওর ইচ্ছে সিমরান এখানেই পড়াশোনায় ক্ষান্ত দিয়ে পুরোপুরি সংসারে মন দিক। মেয়েকে নিয়ে জামাই-শ্বশুর দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটল। সিমরানের মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। ম্যামের স্পর্শে বাপজানের এই পরিবর্তন কিছুটা হলেও ব্যতিক্রমী। এই কৃতিত্বটা যে সম্পূর্ণ নন্দিনী ম্যামের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মা প্রথম থেকেই লেখাপড়ার বিষয়ে তাকে সাপোর্ট করে এসেছেন। ওদিকে ইমরানের আম্মুও ইমরানকে বোঝাতে শুরু করেছেন। কিন্তু ইমরানের এক গোঁ - কলেজে ভর্তি হলে অনেক ছেলেদের সাথে সিমরানের আলাপ হবে, ওর এখন কাঁচা বয়স। কখন কী করে বসে বলা যায় না।

ইমরানের আম্মু বলেন - এটা তোর একটা মিথ্যে বাহানা। এই ক'মাসে সিমরানকে আমি যতটা দেখেছি তাতে আমার কখনও মনে হয়নি সিমরান এমন কিছু একটা করতে পারে। মেয়েটা পড়তে চায়। আমরা ওকে সহযোগিতা না করলে কীভাবে ও ওর লক্ষ্যে পৌঁছাবে? সব মেয়েকে এক চোখ দিয়ে দেখিস না।

মায়ের সঙ্গে কথা বলে ইমরানের খুব একটা ভালো বোধ হয় না। মনের মধ্যে একটা গভীর টানাপোড়েন শুরু হয় - আমি কী সত্যি ভুল ভাবছি? সিমরান যে আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয় সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। তবুও ওকে ছেড়ে দিতে মন সায় দেয় না। একবার নন্দিনী ম্যামের সাথে কথা বলা দরকার। ওঁনার সাথে কথা বললে মন খানিকটা হালকা হবে। সিমরান এখন বাপের বাড়িতেই আছে। আগামীকাল স্কুলে গিয়ে ম্যামের সাথে কথা বলে আসবে।

আমাদের সমাজে মেয়েদেরকে পর্দানসীন করে রাখা, তাদের স্বাধীন ইচ্ছে পূরণ করতে না দেওয়া, অনিচ্ছা সত্ত্বেও একপ্রকার জোর করে হিজাব পরানো, সর্বোপরি শিক্ষার আঙ্গিনায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা - দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া এভাবেই চলে আসছে। তাই তো আমরা যেমন শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছি আমাদের মেয়েদেরকেও সেই পথে চালনা করছি। না যেভাবেই হোক এর একটা বিহিত করতে হবে। নাহলে কোনোভাবেই আমাদের অগ্রগতি সম্ভব নয়। সিমরানের সাথেও কথা বলতে হবে, ও হয়তো আমার ওপর ভীষণ রেগে আছে। এ ব্যাপারে ম্যামের কাছ থেকে কিছু পরামর্শ এবং আলোচনার প্রয়োজন।

আজ ইমরানকে একটু অন্যরকম মনে হলো। কিছুক্ষণ আগে নন্দিনী ম্যামের সাথে কথা বলে বেশ খুশি খুশি মন নিয়ে সিমরানদের বাড়িতে ঢুকলো। দূর থেকে ইমরানকে দেখে সিমরান ঘাবড়ে গেল। আবার এসেছে! একটা অজানা আশঙ্কায় মনটা চঞ্চল হয়ে উঠলো - কী বলবে কে জানে। যা-ই বলুক আজ ইমরানকে সাফ সাফ বলে দেবে - "আমার কথা যদি মেনে না নাও তাহলে আর কোনোদিনও এই বাড়িতে পা রাখবে না। আমিও তোমার বাড়িতে যাবো না। যতদিন আমার লক্ষ্যপূরণ না হবে ততদিন আমি এখানেই থাকবো। আর এঁরা যদি আমার ওপর জোর খাটানোর চেষ্টা করে তাহলে আমি আমার পথ বেছে নেবো।"

মনটাকে শক্ত করে বেঁধে নিয়ে সিমরান অপেক্ষা করে। আজ সারাদিন ঘর থেকে বের হয়নি। বসে বসে ভবিষ্যতের দিনগুলোর একটা খসড়া পরিকল্পনা করে চলেছে। বাড়িতে দুই একজন করে ছেলেমেয়েরা আসছে। সিমরানের কাছে পড়তে চায়। প্রতিদিন সকালে বিকালে টিউশন পড়ালে কিছু অর্থ আসতে পারে। তাতে ওর হাতখরচ এবং টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনতে পারবে। পড়াশোনা শুরু হলে তার জন্য যা খরচ তার কিছুটা সাপোর্ট এখান থেকে দিতে পারবে।

নন্দিনী ম্যামের কাছ থেকে তাঁর জীবনের রোমহষর্ক কাহিনি শুনে ইমরানের মনে পরিবর্তন আসে। নন্দিনী ম্যামকে বলেছিল,

- ম্যাম, আপনি তো জানেন সিমরানকে আমি কতটা ভালোবাসি। ও লেখাপড়া শিখুক এটা আমিও চাই। কিন্তু ওকে একা একা ছাড়তে মন সায় দেয় না। এ ব্যাপারে আপনি যদি কিছু পরামর্শ দেন তাহলে আমি সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করতে পারি।

- দেখ ইমরান, ভালোবাসা অন্যায় নয়। তুমি যদি সত্যি সত্যি ওকে ভালোবাসো তাহলে ওর মনে সেই বিশ্বাস জাগাতে হবে। ওকে ভরসা করতে হবে। সবসময় ওর পাশে থেকে যতটা পারবে সাপোর্ট করবে। যখন সিমরান বুঝতে পারবে যে তুমি সবসময়ই ওর পাশে আছো তখন ও তোমাকে মন থেকে মেনে নেবে। এটা সম্ভব হলে তোমার মন থেকে সব দুশ্চিন্তা মুছে যাবে। আর এটার জন্য তোমাকে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। ওর মনটাকে বুঝতে হবে, আসলে ও কী করতে চায়, তাড়াহুড়ো করে কোনো কাজ হবে না।

- ম্যাম, সিমির যদি কোনো বিপদ হয় তাহলে?

- ইমরান তুমি মেয়েদের কী মনে করো বলো তো? সিমির বিপদ মানে? সব সময় নেগেটিভ ভাবনা করো কেন? মেয়েরা কি নিজেরা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না?

তাহলে তোমাকে আমার জীবনের একটা সত্য ঘটনার কথা বলি, মন দিয়ে শোনো। এটা গল্প নয় একেবারে কঠিন বাস্তব - অষ্টম শ্রেণি পাস করার পরে যখন নবম শ্রেণিতে ভর্তি হলাম তখন থেকেই আমি একা একাই বাড়ি ফিরতাম। কলকাতায় আমাদের একটু বেশি স্বাধীনতা ছিল। তাছাড়া মা পুরোপুরি গৃহবধূ, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে খুব একটা বেরোতে চাইতেন না। বাবা তাঁর গবেষণা নিয়ে সবসময় ব্যস্ত। আমাকে সময় দেবার মতো অবসর তাঁদের কারোরই ছিল না। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর স্কুল কার ছেড়ে দেওয়া হলো। আমাকে একা একাই স্কুলে যাতায়াত করতে হতো। স্নাতক স্তরে ইংরেজিতে সাম্মানিক নিয়ে যাদবপুর থেকে পাশ করলাম, স্নাতকোত্তরেও যাদবপুরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একদিন বাড়ি ফেরার পথে ইচ্ছে হলো বাবার সাথে দেখা করে যাই। বাবা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে গবেষণার কাজে ব্যস্ত। শীতকালের বিকেল, ম্লান সূর্যালোক পশ্চিম আকাশকে রঞ্জিত করে তুলেছে। আমার ছায়ার দিকে তাকিয়ে আমিই চমকে উঠলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনের দিকে চলেছি হঠাৎ দেখি চার পাঁচটি ছবি আমার পাশে চলতে চলতে আমার ছবিটাকে পা দিয়ে মাড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি যতই ওদেরকে এড়িয়ে চলতে চাইছি ওরা আরও বেশি করে আমার পিছু নিচ্ছে। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও কিছুক্ষণ পর আমি সচকিত হয়ে উঠলাম। বাবার সাথে দেখা করার বাসনা ত্যাগ করে ঘুরপথ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফিরে বাথরুমে গিয়ে ভালো করে মাথায় জল ঢেলে মাথাটা ঠাণ্ডা করলাম। ব্যাপারটা প্রথম বলে কাউকে কিছু বললাম না। কিন্তু মনে মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধলো।

পরদিনই ছোড়দাকে ফোন করে জানালাম। ছোড়দা আর আমি কেশব দত্তগুপ্তের নিকটে ক্যারাটে শিখেছিলাম। ও আমার থেকে বছর চারেকের বড়ো, অনেকটা আমার বন্ধুর মতো। তাই ওকেই ব্যাপারটা জানিয়েছিলাম। প্রথমে তো ও গুরুত্বই দিল না, একেবারে হেসেই উড়িয়ে দিলো। কিন্তু তারপর প্রায়ই এই ঘটনা ঘটতে লাগলো। একদিন সত্যি সত্যি দেখি ওরা আমার ওপর চড়াও হলো।

ইমরান জিজ্ঞেস করে - তারপর কী হলো ম্যাম?

- কী আর হবে? দু'টোকে ঘাড়ে দুই রদ্দা মেরে মাটিতে শুইয়ে দিলাম। বাকিদের দিকে এগোতেই ওরা ভয়ে চম্পট দিল। ওই দু'টোকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলাম অটো স্ট্যান্ডে। ওখানে আমার কয়েকজন পরিচিত অটো চালক ছিল। ওদের কাছে জানতে চাইলাম ওরা এদেরকে চেনে কী না। দুই একজন পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বলল। তারপর জানালো যে, দিদিভাই এরা খুব সাংঘাতিক একটা গ্যাং। মাঝে মাঝেই কলেজ ইউনিভার্সিটির মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে। সুযোগ বুঝে মেয়েগুলোকে কিডন্যাপ করে। তারপর সে মেয়ের হদিস পাওয়া যায় না। এরা যখন ইচ্ছে যা খুশি করতে পারে। শোনা যায় এদের পিছনে হোমরাচোমরা কোনো ব্যক্তির হাত আছে। তাই এদের কেউ খুব একটা ঘাঁটাতে চায় না। আমরা গরীর মানুষ এখানে অটো চালিয়ে কিছু রোজগার করে বেঁচে আছি। ভয়ে আমরা কিছু বলতে পারি না। বেশ কিছুদিন ধরে এখানে মেয়েদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

- যাদবপুর থানা থেকে কোনো স্টেপ নেওয়া হয়নি?

- কে থানায় যাবে দিদিভাই, কার এমন বুকের পাটা আছে? তাছাড়া এরা স্থানীয় বাসিন্দাদের খুব একটা বিরক্ত করে না। যারা বাইরে থেকে পড়তে আসে তাদেরকে অনুসরণ করে তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেবে একটা অটোরিকশাতে ওদের দু'জনকে নিয়ে আমি থানায় গেলাম। অভিযোগ জানালাম কিন্তু কর্তব্যরত অফিসার খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। ওদেরকে থানায় বসিয়ে আমি চলে এলাম। পরদিন গিয়ে শুনতে পেলাম কে একজন ফোন করে ওদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।

অফিসার জানালেন - আপনি একটু সাবধানে থাকবেন ম্যাম। ওরা কিন্তু আবারও আপনাকে অ্যাটাক করতে পারে।

ব্যাপারটা যে খুব সহজ নয় সেটা বুঝতে পারলাম। ছোড়দা তখন পুলিশে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওকে সমস্ত বিষয়টা জানাতেই বললো - চিন্তা করিস না, আমি তোর খেয়াল রাখবো। আর ভয় পাচ্ছিস কেন? আমরা ক্যারাটের প্রশিক্ষণ নিয়েছি।

মনে মনে ভাবলাম - সত্যিই তো। সারাজীবন তো আর ছোড়দা আমাকে বাঁচাতে আসবে না। তখন একটা কথা মনে এসেছিল - আসলে ওরা ভীতু। একবার ঠিকঠাক আঘাত করতে পারলে ওরা কাছে ভিড়বে না। তারপর ওরা অনেকবার আমাকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হয়নি। কিছুটা আমার সাহস আর কিছুটা ছোড়দার নজরদারির জন্য। তারপর বাবাকে মাঝে মাঝেই ফোন করে বিরক্ত করতো। বাবা আমাকে কিছু জানাননি। যখন জানতে পারলাম তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে।

যাইহোক জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে সেগুলোকে একটু সাহসের সাথে মোকাবিলা করলে অনেক বিপদ বাঁধা আপনাআপনি দূর হয়ে যায়।

ম্যামের কাছ থেকে তাঁর নিজের জীবনের ঘটনা শুনে ইমরান বুঝতে পারে তার কী করা উচিত।

 * * * *

- সিমি, বাড়ি আছো? সি-ই-ই-মি-ই-ই-ই...

ইমরানের ডাক শুনে সিমরানের মা বেরিয়ে আসেন - এসো,

- সিমি বাড়িতে নেই?

- হ্যাঁ আছে। এসো...

ইমরান বাড়ির ভিতরে ঢুকে বারান্দায় রাখা একটা চেয়ারে বসে। ওর হাতে কাগজে মোড়া একটা বই। নন্দিনী ম্যাম কিনতে বলেছিলেন ডেল কার্নেগির লেখা একটি বই - 'How to Win Friends and Influence People'. এই বইটা সিমরানের খুব প্রিয়। নন্দিনী ম্যামের কাছ থেকে নিয়ে কিছুটা পড়েছিল। সিমরান তখন জানতে চেয়েছিল - ম্যাম, বইটা কোথায় কিনতে পাওয়া যাবে?

সিমরান নীচে নেমে আসে। ইমরান ওর কাছে এগিয়ে যায়। বইটা হাতে তুলে দিয়ে বলে,

- সিমি আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। তোমার ইচ্ছাকে আমি সম্মান জানাই। এখন থেকে তোমার পড়াশোনার জন্য যা যা সহযোগিতা দরকার তার সবটাই আমি করবো। বইটা রাখো। এটা পরে পড়ে নিও।

- কিছু মনে করোনা ইমরান। এখন এখানে বলছো ঠিকই কিন্তু বাড়ি গেলে তোমার আসল চেহারা বেরিয়ে পড়বে। তোমার বই তুমি নিয়ে যাও। আমি আমার মনস্থির করে ফেলেছি। আমাকে আমার পথে চলতে দাও।

- সিমি, আমাকে আর একবার সুযোগ দাও। আমি এইমাত্র নন্দিনী ম্যামের সাথে কথা বলে এসেছি। ওঁর স্পর্শ আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। সত্যি সত্যি যদি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো তাহলে আমার কাছে এসো। আমি এখন চলে যাচ্ছি। তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করবো।

ভরদুপুরে প্রখর সূর্যের আলোয় ইমরান মাথা নীচু করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সিমরানের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। কিন্তু...

সিমরানের মা একটা প্লেটে কিছু খাবার সাজিয়ে নিয়ে নিয়ে এসে দেখেন ইমরান নেই। তিনি মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন,

- ইমরান চলে গেল? এই ভরদুপুরে ছেলেটা...

- যেতে দাও মা। ও আবার আসবে।

এই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেল। কিন্তু ইমরানের দিক থেকে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সেদিনের পর থেকে সিমরানও একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে। মাঝে একদিন ম্যাম এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন - ইমরান সত্যি সত্যি তোকে ভালোবাসে, তোর পাশে দাঁড়াতে চায়। তোর মনে হলে ওকে অন্তত একটা সুযোগ দিতে পারিস।

বিকেলের দিকে সিমরান একটা ব্যাগে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে মা-কে বলে,

- মা আমি আসছি।

- হঠাৎ কোথায় যাচ্ছিস সিমি?

- যার স্পর্শে আমার জীবন সত্যি সত্যি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে আমি তার কাছেই যাচ্ছি মা।

ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে সিমরান ধীরে ধীরে সদর দরজা পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় এসে উঠল। পিছন পিছন সিমরানের মা এসে দেখতে পেলেন - একটা অটোরিকশায় উঠে সিমরান এগিয়ে চলেছে। যতদূর দৃষ্টি যায় ততক্ষণ তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর গাড়িটা কখন যেন একটা বিন্দু হয়ে দূরে কোথায় মিলিয়ে গেল। সেদিকে তাকিয়ে তাঁর চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাতদুটোকে উপরে তুলে অস্ফুটস্বরে বললেন - সুখী হও মা, জীবনে মানুষের মতো মানুষ হও।

(সমাপ্ত)


* 'স্পর্শ'-র প্রথম পর্ব জুন সংখ্যায় ও দ্বিতীয় পর্ব জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।