গল্প ও অণুগল্প

শুভ আর সেই আগন্তুক



পিন্টু পোহান


কয়েক মিনিটের মধ্যেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। হাওড়া ব্রিজের উপর একটা লোক দাঁড়িয়ে পড়েছে। ভয়ে ব্রিজের উপরেই গাড়ি ফেলে রেখে পালিয়েছে ড্রাইভাররা। ফলে সারা শহরেই যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানজট বেড়েই চলেছে। কমছে না।

লোকটা বেশ সন্দেহজনক স্থানীয় থানার পুলিশরা লোকটাকে সরাবার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তারা যত পা এগিয়েছিল এখন তারা ঠিক তত পা-ই পিছিয়ে এসেছে। নিত‍্যযাত্রীরা স্থানীয় থানায় বিক্ষোভ দেখালে থানার ওসি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেয়, মানববোমা নিষ্ক্রিয় করার কোনও প্রশিক্ষণই তাদের দেওয়া হয়নি। তারা বেঘোরে প্রাণ দিতে পারবে না। দরকার হলে চাকরি ছেড়ে দেবে।

শুভব্রত হোমটাস্ক ফেলে টিভি দেখছিল। এতক্ষণ পর টিভির ক্যামেরায় ধরা পড়েছে লোকটা। বেঁটেখাটো। চার-সাড়ে চার ফুট হবে। পরনে একটা সিল্কের ধুতি। আদুল গায়ে পৈতে ছাড়া আর কিছুই নেই।

শুভব্রত বলল, "লোকটা পাগল ছাড়া কিছু নয়। কেউ ওকে সরিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে"।

মা ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চে চাকরি করে। খুব মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখছিল। ছেলের এই পাকামি তার সহ্য হল না। তার ছেলে হয়ে এমন বোকা বোকা পাকামির কথা বলছে। মা ধমক দিল, "দিনে দিনে মাথাটাকে তুমি ডাল বানিয়ে ফেলছ। একটু বুদ্ধি খরচ করার চেষ্টা করো। দেখছ লোকটার ভুঁড়িটা। ওই ভুঁড়িটাই সন্দেহজনক আমার অভিজ্ঞতায় বলছে ওতেই বোমা আছে"।

মা'কে আবার কিছু বললেই বকুনি খেতে হবে। চুপ করে রইল শুভব্রত। লোকটাকে দেখে তার এখন বেশ মায়াই হচ্ছে। লোকটা যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছে। একটু ভয়ও পেয়েছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ভিড় দেখছে।

মা টিভির সামনে থেকে উঠে চলে গেল। সে পরিষ্কার শুনতে পেল মা সেলফোনে কাউকে বলছে, "আপনারা এখনও হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন! এক্সপার্টদের পাঠান। যখন-তখন বিস্ফোরণ হতে পারে। শুধু ব্রিজ নয়, হাওড়া স্টেশনের চিহ্নও হয়তো পাবেন না আর"।

লোকটাকে ছেড়ে টিভির ক্যামেরা এবার ধরেছে বড় বড় মন্ত্রীদের। এদের কাউকেই চেনে না শুভব্রত।

একজন বলল, "আমরা হাওড়া ও তার পাশ্ববর্তী এলাকায় 'রেড অ্যালার্ট' জারি করেছি। প্যারা মিলিটারি ফোর্স নামিয়ে হাওড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়ার কাজ জোর কদমে চলছে"।

আর একজন বলল, "গোয়েন্দা বিভাগের ব‍্যর্থতা প্রমাণিত হয়ে গেল। আমাদের আরও সজাগ থাকতে হবে এবার থেকে"।

ক্যামেরা এবার দেখাল ১৯৯/সি বাসের ড্রাইভারকে। তার পরিত্যক্ত বাসের সামনেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত থানায় বসে ড্রাইভার তার অভিজ্ঞতার কথা বলছে, "গাড়ি চালাতে চালাতে দেখি ঝুপ করে আকাশ থেকে পড়ল। কোনওরকমে ব্রেক কষে আমি গাড়ি থামাই"।

ক্যামেরায় আবার ধরেছে সেই লোকটাকে। মাথার সামনের দিকে টাক। পিছনে একটা বড় টিকি। একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা।

মা ফিরে এসে বসল টিভির সামনে। বলল, "শেষ মুহূর্তে লোকটার নিজের জীবনের উপর খুব মায়া হচ্ছে। সেজন্যই সময় নিচ্ছে। পেটের ভিতর এক্সপ্লোসিভ ঠাসা। লোকটা এখন ভেবেও কিছু করতে পারবে না"।

ক্যামেরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন লোকজনকে ধরছে। তাদের মতামত নিচ্ছে। একজন বলল, "হেলিকপ্টারে করে উপর থেকে গ্যালন গ‍্যালন জল ঢেলেই একমাত্র লোকটাকে নিষ্ক্রিয় করা যেতে পারে"।

স্বরাষ্ট্র সচিব বললেন, "দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি লোকটা সম্বন্ধে কেউ কোনও তথ্য দিতে পারে কি না। দুঃখের বিষয় লোকটা সম্পর্কে কেউ কোনও তথ্য এখনও দিতে পারেনি"।

পথচলতি এক ফ‍্যাশন ডিজাইনারকে জিজ্ঞেস করা হল, জাতির এই মহাবিপদের সময় দেশবাসীর কী করা উচিৎ?

সে দু'হাত দুদিকে ছড়িয়ে বলল, "আমি এক্সাইটেড হয়ে পড়েছি। লোকটার পরনের ধুতিটা দেখেছেন। আমি খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ করেছি। ওটা এ যুগের হতে পারে না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে বাংলার তাঁত শিল্পীরা এরকম..."।

মা আর সহ্য করতে পারল না। "ননসেন্স!" বলে চ্যানেল ঘুরিয়ে দিল।

শুভব্রত হিসেব করে নিল। শশিভূষণ দে স্ট্রিট থেকে সেন্ট্রাল হয়ে লালবাজারের পাশ দিয়ে বড়বাজার হয়ে হাওড়া ব্রিজ, সাইকেলে আজ মাত্র দশ থেকে পনেরো মিনিট-ই লাগার কথা। লোকটাকে যখন সে চিনতে পেরেছে একবার চেষ্টা করে দেখতেই পারে।

সে তার ঘরে ঢুকে স্কুলের নাটকের জন্য তৈরি মন্ত্রীর পোষাকটা পরে নিল। মা অন্য চ্যানেলে সেই একই খবর দেখছে মন দিয়ে। মা-কে কিছু না বলে সে নিচে নেমে এল। গ্যারেজ থেকে সাইকেল বের করে ছুটল হাওড়া ব্রিজের দিকে। প্রাণচঞ্চল কলকাতা আজ যেন শ্মশান। ব্রিজের উপর উঠে সে দেখল ক্যামেরা হাতে গুটিকয়েক সাংবাদিক ছাড়া আর কেউ নেই ধারেকাছে।

সাইকেলটা ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সে এগিয়ে গেল। লোকটা অবাক চোখে তাকাল তার দিকে। সে বলল, "আরে! মহাপণ্ডিত গোপাল ভাঁড় যে! তা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভা ছেড়ে হঠাৎ এখানে"?

এতক্ষণে লোকটার মুখে হাসি ফুটল। বলল, "যমরাজকে বললুম, অনেকদিন মহারাজকে দেখিনি। আমাকে একবার মর্ত‍্যে পাঠান। পাঠাল তো পাঠাল এই একেবারে বিদেশবিভুঁইয়ে। একটা মানুষের দেখা নেই। প্রথমে ভয় পেয়েই গেছিলাম। বাবা! দেখি কী এসব রঙিন রঙিন বাড়িঘর ছুটোছুটি করছে। খোকা তুমি আমাকে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে নিয়ে যেতে পার"?

শুভব্রত হেসে বলল, "সে হবে'খন। তার আগে আপনি আমার গৃহে চলুন। কয়েকদিন বিশ্রাম নেবেন"।

শুভব্রতের মা একা একা বসে টিভি দেখছিল। এতক্ষণ সন্দেহ হচ্ছিল। এখন সে নিশ্চিত সাইকেলের পিছনে বসিয়ে লোকটাকে যে ছেলেটা তার বাড়ির সামনে নিয়ে এসেছে সে তার শুভ-ই।