গল্প ও অণুগল্প

মা



পম্পা বিশ্বাস


সিঁড়ির নিচেই জল...। গঙ্গা। তুমি নেমে যাচ্ছিলে আমার পাশ দিয়ে। সিঁড়ির ধাপে চঞ্চল পদপল্লব। ছন্দে উদ্বেল শাড়ি। পায়ের নিটোল গোছ আর নিখুঁত গোড়ালি চকিতে চকিতে দৃশ্যমান। আমি জানি, তুমি স্নানে যাচ্ছো। বিকেলের স্নান। ভারি খুশি... ভারি আনন্দ তাই। আমার মাথায় তোমার উড়ন্ত আঁচলের স্নেহস্পর্শ। বলতে বলতে নামছিলে,

"বসে থাক্। পিছু পিছু আসিস না যেন।"

...বসেইতো রইলাম। বরাবরই বাধ্য। শান্ত। কে বলবে, তোমার মতো উচ্ছ্বল এক নারীর আত্মজা আমি!

বসে বসে দেখছি, জলের উপর আলোর খেলা। আর তোমার খেলা জলের সঙ্গে। কতো সুন্দর তুমি! মৎসকন্যা যেন! চুলগুলো ক্ষণে ক্ষণে জলজ শ্যাওলা...। চকচকে জলে গড়া বাহু। ছলছল আঁচলের উন্মাদনা। এইভাবে দীর্ঘ উপভোগ এক। চূড়ান্ত ভেজা রক্তিম আঁখি। দেখলাম তাকিয়ে আছো আমারই দিকে। হাত নেড়ে ইশারায় বললে, "বাড়ি চলে যা।"

এক্কেবারে না-পসন্দ্ হলো কথাটা আমার। নিঃশব্দে শরীরী ভাষায় বললাম,

"প্লি-ই-ই-ই-জ..."

হেসে ফেললে। হাতও নাড়লে। বুঝিয়ে দিলে নিঃশব্দে, "আচ্ছা, বেশ।"

তারপর লাগালে সাঁতার... প্রথমে চিত, পরে ডুব।

...যোজন যোজন গঙ্গা নদী এভাবে পার হবে নাকি? ভয় করছে আমার। চেঁচালাম, "মা-আ-আ-আ। ফিরে এসো-ও-ও। সন্ধ্যে হয়ে যাচ্ছে-এ-এ।"

আমি বসেই রইলাম ঘাটে। কোথায় তুমি? হৈচৈ, গোলমাল উঠলো। আশপাশ থেকে জলে ঝাঁপালো বেশ ক'জন জওয়ান। আমার দৌড় তখন বাড়ির দিকে।

* * * *

এরপর থেকে রোজইতো ঘাটের সিঁড়িতে সর্বক্ষণ...। চার-চারটে যুগতো কেটেই গেল। কই, তুমিতো আর ফিরে এলে না!

বসে বসে হয়রান অবস্থা আমার।

...সিঁড়ির সবক'টা ফাটল মাথার ভেতরে আঁকা হয়ে গেছে। শ্যাওলাধরা ঘাটটার যতো-রাজ্যের পোকামাকড়ের বংশগতি, বাস্তুতন্ত্র, সব...সব মুখস্থ।

...ফ্রকের বদলে অঙ্গে বহুদিনই ম্যাক্সি। আর, যদিও অনেকদিন হলো সব চুলই সাদা, তবুও লাল ফিতের দুই-বিনুনি আমার চুলে...। নইলে হঠাৎ জল থেকে উঠে এসে তুমি আমায় চিনবে কেমন করে, মা?

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।