গল্প ও অণুগল্প

নাকছাবি



দ্বিজরাজ সান্যাল


- জিনিসটা আমার হয়ে গেছে তুমি শুনছো?

এন. কে. মোবাইলের কলটা রিসিভ করে হ্যালো বলার আগেই আহ্লাদী গলায় গানের সুরে কথাগুলো বলে থামল মধুজা। সাত দশ বা পনেরো দিন পর হঠাৎ হঠাৎ ফোন করে এরকম নাটকীয় ধন্দ দিয়েই সে শুরুটা করে। মধুজার ফোন এলে খুবই ভালো লাগে এন.কে.-র। নিজের ভেতরের উত্তেজনা আড়াল করে শান্ত গলায় সে জিজ্ঞেস করলো,

- কোন জিনিষটা? ঠিক বুঝতে পারলাম না।

- গেইস করুন।

- যা প্যাচপ্যাচে গরম পড়েছে, এখন কিছু অনুমান করতে ভাল্লাগ্‌ছে না। তবে তোমার কথা শুনে অঞ্জন দত্ত-র গান, "চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো..."

মুখেরর কথা কেড়ে নিলো মধুজা,

- আরে ওটার প্যারোডি করেই তো গাইলাম। তাহলে পারলেন না তো। আপনি না ভীষণ হাঁদা।

"হাঁদার বেহদ্দ তো নিশ্চয়ই। তা না হলে জীবনের বারো আনা কাটিয়ে এসে বুড়ো বয়েসে তোমার মত একজন সদ্য যুবতীর প্রেমে পড়ি?"

কথাগুলো মনে মনে ভাবলো এন. কে. কিন্তু মুখে বলল,

- ফোনের শুরুতেই ওই যে আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করলে, তাতেই মন আমার ভরে গেল। এই নিয়ে মোট চারবার হলো আমাকে 'তুমি' বলে ডাকলে।

- ব্যাস, আমার কথার উত্তর না দিয়ে শুরু করে দিলেন তো সেই পুরোনো প্যানপ্যানানি। ধ্যাৎ।

এন. কে. জানে যে এরপর অন্য প্রসঙ্গে আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলেই তার এই ক্ষ্যাপাটে মেজাজি বান্ধবী ফটাস করে ফোনটা কেটে দেবে। তারপর আর মাসখানেক কোন ফোন বা মেসেজ করবে না। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে পিং করলে পড়বে কিন্তু কোন উত্তর দেবে না। তাই কালক্ষেপ না করে সে আত্মসমর্পণ করল মধুজার কাছে।

- না না ঠিক আছে, তোমার কথাতেই ফিরে যাচ্ছি। সত্যি বলতে তোমার এই হেঁয়ালিটা না আমি ঠিক ধরতে পারছি না। একটু খোলসা করে বলবে প্লিজ।

- না বলবো না। চেষ্টা করার আগেই হাল ছেড়ে দিলে হবে? ভাবুন - রিকালেক্ট করার চেষ্টা করুন আমাদের পুরোনো কথাবার্তা। আমি হোল্ড করে আছি।

মহা সমস্যায় পড়া গেল তো। বছর পাঁচেক হলো মধুজার সঙ্গে আলাপ এন. কে.-র। এর মধ্যে অনেকবারই দেখা হয়েছে তাদের। একসঙ্গে সিনেমা, মল, কফিসপ, বইমেলা, ফিল্ম-ফেস্টিভ্যাল, রায়চক, যাদুঘর, পার্ক সব জায়গাতেই তো ঘুরে বেড়িয়েছে তারা। ভুরি ভুরি কথা হয়েছে দুজনের মধ্যে। সেখান থেকে হঠাৎ করে খামচি মেরে প্রশ্ন করা হলে কি উত্তর দেবে সে। এ তো দেখা যাচ্ছে সেই ছাত্রবেলার বাংলা পরীক্ষায় পাঠ্য কবিতা থেকে লাইন তুলে প্রশ্ন করা- "কবির কোন কবিতা থেকে অংশটি নেওয়া হয়েছে এবং এর তাৎপর্য কি"? নিজের কর্মস্থল বা সংসারজীবনে এ ধরনের পাগলামি বা ক্ষ্যাপামিকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেয় না এন. কে.। কিন্তু মধুজার কাছে এলেই তার সবকিছু কেমন যেন ওলট পালট হয়ে যায়। ওর এসব বিচিত্র পাগলামিই তার প্রতি আকর্ষণ দিন কে দিন বাড়িয়ে চলেছে। এই পুচকে একটা মেয়ের প্রেমে সে এমন হাবুডুবু খাচ্ছে যে নিজের নামটা পর্যন্ত ছোট করে ফেলার অনুমতি দিয়ে ফেলেছে তার বান্ধবীকে। নিতাইকিশোরকে ছোট করে এন. কে.।

পরিচয় হওয়ার দিনকয়েকের মধ্যেই মধুজা গল্প করতে করতে হঠাৎ কথা থামিয়ে নিতাইকিশোরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,

- আপনি বেশ ভালো - মনের দিক থেকে আধুনিক, বোল্ড, নানান ব্যাপারে খোঁজখবর রাখেন, উৎসাহ দেখান, কিপটে নন। কিন্তু আপনার নামটা বড্ড সেকেলে, আজকের যুগে বেমানান। আমি আজ থেকে ছোট করে আপনাকে এন. কে. বলে ডাকবো। এনি অবজেকশন?

"আলবৎ আপত্তি আছে। তুমি কে হে যে বাপ মায়ের দেওয়া আমার নামটা পর্যন্ত্য ছোট করে দিতে চাও।" নিতাইকিশোরের প্রায় ঠোঁটের ডগায় এসে গেছিল কথাগুলো। কিন্তু সে ঢোঁক গিলে একগাল হেসে মধুজাকে সেদিন বলেছিল,

- নো কোয়েশ্চন। তোমার যে নামে ডাকতে ইচ্ছে করবে সেটাই ডেকো।

তারপর থেকেই মধুজার কাছে নিতাইকিশোর এন. কে.। ওর সঙ্গে এন. কে.-র প্রথম আলাপটা অনেকটা রূপকথার গল্পের মত। মোবাইল কানে চেপে ধরে এন. কে. যখন হারিয়ে যাচ্ছিল পেছনের দিনগুলোয় তখুনি ওপাশ থেকে মধুজা অধৈর্য গলায় বলল,

- কি হল ভেবে পেলেন কোন জিনিসের কথা বলছি?

- না মানে...

- থাক বোঝা গেছে। আপনি যে একজন নিরেট হাঁদা এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহই রইল না। সেটা অবশ্য ভাল। ছেলেরা একটু হাঁদা টাইপ হলে মেয়েরা সেফ ফিল করে। শুনুন নাকছাবিটা আমার হয়ে গেছে। বর আমাকে সেই হীরের নাকছাবিটা কিনে দিয়েছে। বলুন এবার - কোন নাকছাবির কথা বলছো বলতো?

এন. কে.-র কিন্তু সত্যি এখনো মনে পড়ছে না নাকছাবি নিয়ে তাদের মধ্যে সত্যিই কোনদিন আলোচনা হয়েছিল কিনা। তবু তাকে এই মুহূর্তে মধুজাকে বলতেই হল,

- না না একটা নাকছাবি পরার সখ তো তোমার অনেকদিনের। বাঃ দারুন ব্যাপার হয়েছে।

বুড়ো বয়েসে প্রেম করতে এসে রোজই নতুন কিছু না কিছু শিখছে সে। আজ যেমন শিখলো, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কথোপকথন তা যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন প্রেমিককে শুনতে হবে খুব মনোযোগ দিয়ে কারণ তাতেই ভালোবাসা আর আনুগত্য প্রমাণিত হয়। একটু বেশিই অনুগত হয়ে এন. কে. তাই বলল,

- আমার ইচ্ছে করছে এখনি তোমার কাছে গিয়ে দেখি, নাকছাবি পরে কেমন দেখাচ্ছে তোমায়।

- চলে আসুন, আমি তো বাড়িতেই আছি।

-সত্যি?

মধুজার এই আচরণ এন. কে.-র কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত। এতদিন যখনই এন. কে. মধুজার সঙ্গে দেখা করার আর্জি জানিয়েছে মধুজা সময় চেয়ে নিয়ে হয় অন্যদিন মিট করেছে নিজের সুবিধেমতো। নয়তো বাতিল করে দিয়েছে সাক্ষাৎ। এক এক দিন দেখা করতে চেয়ে রীতিমত কাকুতি মিনতি করেছে এন. কে. তবু মন ভেজাতে পারেনি মধুজার। আর আজ, একবার যাওয়ার কথা বলতে না বলতেই সে শুধু রাজিই নয় উলটে তাগাদা করছে,

- কি আসছেন তো? বাড়িতে আমি একাই আছি। ছেলেটা কোলে বসে ঢুলছে, এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে।

- আচ্ছা যাচ্ছি।

আজ কি হচ্ছে এসব! একটা ঘোরের মধ্যে মধুজার বাড়ি যেতে রাজি হয়ে গেল এন. কে.।

এর মধ্যে মধুজার হঠাৎ মনে পড়েছে,

- আরে আজ তো উইক-ডে, অফিস নেই আপনার?

- অফিসেই আছি। একটা হাফ-ডে সি.এল. রেখে বেরিয়ে যাব।

কিছুটা গলা নামিয়ে মধুজা এবার জিজ্ঞেস করে,

- এখন কোথায়? আশেপাশে অনেক লোকজন?

- অনেক না হলেও চার পাঁচ জন তো আছেই। বলো...

- বলছি। তার আগে আপনি ফোন নিয়ে ফাঁকা জায়গায় আসুন। হট্টগোলের মধ্যে সব কথা বলা যায় না।

আজ যে মধুজার সঙ্গে এন. কে. কথা বলছে সে যেন একদম আলাদা। কোন হিসেব মিলছে না। বাড়িতে হঠাৎ জরুরী কাজ পড়ে গেছে এই অজুহাতে সেকশনে হাফ-ডে সি.এল. জমা রেখে ফাঁকা জায়গায় এসে দাঁড়াল এন. কে.।

খিলখিল করে হেসে মধুজা এবার ফাটালো বোমাটা,

- আচ্ছা আপনি আসছেন ভালো কথা। কিন্তু এসে কি শুধু নাকছাবির দিকেই তাকিয়ে থাকবেন?

- মানে?

- মানে হচ্ছে আফটারনুন ডিউটি সেরে অনি ফ্ল্যাটে ফেরা পর্যন্ত আপনি আধঘন্টা সময় পাবেন আমার কাছে থাকার। অতক্ষণ একটানা নাকছাবির দিকে তাকিয়ে থাকলে তো বোর হয়ে যাবেন, চোখও টনটন করতে পারে।

মধুজার কথায় এখন অন্য গন্ধ পাচ্ছে এন. কে.। বাইশ বছরের সংসার জীবন তার। ছেলে এইচ,এস পড়ছে। আজ হঠাতই কি নিজেকে বেআব্রু করে ফেলতে চাইছে মধুজা? রেস্তোরায় গিয়ে যে মেয়ে কখনো তার পাশে নয় মুখোমুখি বসেছে সবসময়, আজ সেই মেয়েই প্রলুব্ধ করছে এন. কে.-কে। এন. কে.-ই বরং নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে এখনো পর্যন্ত।

- কি হল আসার পর কি করবেন বললেন না তো?

যতই ভদ্দরলোক হোক সে তবু তো রক্ত মাংসের মানুষ। এবার ধিকি ধিকি আগুন জ্বলতে শুরু করেছে এন. কে.-র শরীরে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে চোখ পিটপিট করছে যেন তার ভেতরের পশুটা। তবু নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রেখে সে বলে,

- মধুজা, তুমি কিন্তু আমায় লোভ দেখাচ্ছো।

- যাক এই ইঙ্গিতটা অন্ততঃ বুঝতে পেরেছেন। একজন মেয়ে হয়ে এতটা বলার পরেও 'কি-কেন-মানে' এসব বলে যদি তোতলাতেন, তাহলে আপনাকে আমি যা করতাম না...

ফোনের অন্যপ্রন্তে এন. কে. চুপ।

- হ্যালো হ্যালো, কি হল হ্যালো...

নিজের পরিশীলিত মনের খোলস ছেড়ে বেরোনোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে এন. কে.

- আছি।

মধুজার ছোট্ট হুমকি,

- কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকলে আমি কিন্তু ফোন কেটে দেব।

- না না বলো, তুমি বলো।

- আমি তো বলব না। বলবে তো তুমি।

- তুমি ফ্ল্যাটের দরজা খোলা মাত্রই জড়িয়ে ধরে তোমার নাকে চুমু খাব।

কথাগুলো মুখ থকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে এন. কে. বুঝল সে ধেড়িয়ে ফেলেছে।

- এঁ, চুমু খাওয়ার আর জায়গা পেলেন না? এনি ওয়ে - তারপর?

- তারপর তোমার ঠোঁটে কিস করব। অনেকক্ষণ ধরে।

- এই তো ভেরি গুড। নেক্সট?

প্রেমিকার পরের পর উস্কানিতে আর মাথা ঠিক রাখতে পারল না এন. কে.। সমস্ত বাঁধ ভেঙে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল নারীর প্রতি পুরুষের কামনা ভর্তি লিপ্সা। মধুজার শরীর সম্পর্কে তার মনে জমে থাকা যাবতীয় ফ্যান্টাসি গর গর করে বলে চলল সে।

শেষ পর্যন্ত মধুজাকেই রাশ টেনে ধরে বলতে হল,

- আচ্ছা এবার থামুন। বাকিটা দেখা হলে হবে।

শরীর আর কান থেকে আগুন বেরোচ্ছে এন. কে.-র। হাপরের মত ওঠানামা করছে তার বুক। অসহায় শিশুর গলায় সে আকুতি করল মধুজার কাছে,

- আদর করায় সময় তুমি প্লিজ আমাকে আপনি বোলো না।

- অতটা আনরোমান্টিক আমি নই। কিন্তু আপনিও দয়া করে গুনতে বসবেন না কতবার তুমি বলছি আমি আপনাকে।

মধুজা একথা বলেই জিজ্ঞেস করল,

- আপনি কি মেট্রোতে ঢুকে গেছেন?

- হ্যাঁ এই ঢুকছি গত্তের ভেতর।

- তাড়াতাড়ি এসো, আমি অপেক্ষা করছি তোমারই জন্যে।

অভিসার মদে মত্ত মধুজার কণ্ঠস্বর বেশ গাঢ়। একের পর এক অঘটন যেন ঘটেই চলেছে। মধুজা নিজের মুখে বলছে সে এন. কে.-র জন্যে অপেক্ষা করছে, তাও আবার তুমি করে। স্টেশনে নামার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন ঢুকল। ট্রেনে ওঠার মুহূর্তে নিজের শরীরি ভাষা এন. কে.-র কাছে আর পাঁচটা দিনের চেয়ে অনেক বেশি চনমনে।

আজ ভোর থেকেই আকাশ মন খারাপ করা মেঘলা। এখন আবার ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এন. কে. নাগেরবাজার অটো স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। এখান থেকে অটোতে দমদম স্টেশনে মেট্রো ধরে সে সোজা নামবে সদন, মানে রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনে। তারপর পাতাল থেকে ওপরে উঠে এসে দুপা হাঁটলেই তার অফিস। অফিসটাইমে এই দমদম রুটে এমনিতেই নিত্য জ্যামজট হয়। তার মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে তালগোল পাকিয়ে গেছে সবকিছু। লাইন ক্রমশঃ বড় হচ্ছে কিন্তু অটো নেই একটাও। আজ তাড়াতাড়ি অফিস পৌঁছনোটা খুব জরুরী ছিল। নিতাইকিশোর লক্ষ্য করেছে যেদিনই তার তাড়া থাকে কোন না কোন বিপত্তি এসে হাজির হয়। ছাতা মাথায় তার সমনে দাঁড়িয়ে লম্বা ছিপছিপে একটা মেয়ে খুব ছটফট করছে আর গজগজ করছে নিজের মনে। কমবয়েসী ছেলেমেয়েরা আজকাল বড় অধৈর্য্য। সবুর করার ব্যাপারটা বুঝি তাদের অভিধানে নেই। সবকিছু চায় এক্ষুণি, ফটাফট। বছর পঁয়তাল্লিশের এন. কে. ঠান্ডা মাথায় ভাবছে কোন বিকল্প পথে দমদম স্টেশনে পৌঁছবে, অমনি একটা রিক্সো 'মেট্রো মেট্রো' হাঁক দিয়ে দাঁড়াল একদম তার গা ঘেঁষে। মুহূর্তের মধ্যে রিক্সোটায় চড়ে কত কী ভাড়া কিচ্ছু জিজ্ঞেস না করে নিতাই হুকুম করল,

- চলো দমদম মেট্রো চলো।

তখনো স্ট্যান্ডে অটো ঢোকেনি একটাও। চালকের পায়ের চাপে রিক্সোর প্যাডেলটা আদ্ধেকও ঘোরেনি এমনসময় পেছন থেকে আর্তস্বরে নারীকন্ঠ,

- রিক্সো রিক্সো, প্লিজ একটু দাঁড়ান।

পেছন ঘুরে কে ডাকছে বোঝার আগেই নিতাইকিশোর দেখলো তার সামনে লাইনের সেই মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে।

- আঙ্কেল, আমাকে আপনার সঙ্গে নেবেন? আমার একটু তাড়া আছে। ভাড়া শেয়ার করব আমি।

অনুমতি পাওয়ার আগেই অবশ্য মেয়েটি ছাতা বন্ধ করে ছাতার গায়ের জল ঝেড়ে রিক্সোয় ওঠার জন্যে একপায়ে খাড়া। মনে মনে হেসে মেয়েটিকে উঠতে বলে সামান্য সরে বসল নিতাই। এভাবে শেয়ারে রিক্সো চড়ার অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম। সিটে বসেই পার্স খুলে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে নিতাই এর দিকে এগিয়ে দিয়ে মেয়েটি বলল,

- আমার শেয়ারের ভাড়াটা নিয়ে নেবেন? একদম খুচরো নেই আমার কাছে।

- বসো, পরে নিচ্ছি।

এই বলে রিক্সোওয়ালাকে দেখিয়ে এন. কে. নিচু গলায় বলল,

- কত ভাড়া নেবে তাড়াতাড়িতে জিজ্ঞেস করা হয়নি।

সামান্য হেসে কোন প্রত্যুত্তর না দিয়ে মেয়েটি তাকিয়ে থাকল সামনের দিকে।

যানজটের ঝকমারি পার করে রিক্সো এবার কিছুটা গতি নিয়েছে। এখনো অনেকটা পথ বাকি। আড়চোখে তাকিয়ে মেয়েটিকে পর্যবেক্ষণ করছে নিতাই। লম্বাটে মু্খ,‌ বড় বড় চোখ, বেশ ফর্সা, স্লিম চেহারা, ফিটফাট ব্র্যান্ডেড পোশাক, সব মিলিয়ে মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দর। বয়েস কুড়ির মধ্যেই হবে। শুধু চুলের ব্যাপারে দেখা যাচ্ছে কিছুটা উদাসীন সে। একটা মাত্র রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো মাথার চুল তার যত্নহীন, অবিন্যস্ত। হঠাৎ করে নিতাই খেয়াল করে মেয়েটি তার পাশে নিজেকে গুটিয়ে না রেখে বেশ ছড়িয়েই বসেছে। বয়েসে যতই বড় হোক না কেন একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত পুরুষের পাশে গায়ে গা ঘেঁষে যেভাবে নিশ্চিন্তে বসে যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে অচেনা সওয়ারিদের সঙ্গে শেয়ারে রিক্সো চড়ার অভ্যেস আছে মেয়েটার। নিতাই জিজ্ঞেস করে,

- তুমি কি মাঝেমাঝেই এরকম শেয়ারে রিক্সো চড়ো?

- না তো। এই প্রথমবার।

এ তো আরও বিপজ্জনক। অপরিচিত পুরুষের সামনে প্রথম সাক্ষাতেই এর সাবলীল বোধ করা একজন সদ্যযুবতীর পক্ষে প্রয়োজনের থেকে বেশি সাহসী পদক্ষেপ। প্রায় নিজের ছেলের বয়েসী মেয়েটিকে একটু সাবধান করে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করল নিতাইকিশোর। বলল,

- তুমি তো আমায় চেনো না। একজন অচেনা অজানা মানুষের সঙ্গে রিক্সোয় চড়তে ভয় করল না তোমার?

- ভয় করবে কেন?

- না মানে পেপারে টিভিতে রোজ আমরা যা সব পড়ছি দেখছি। আমি ভালোমানুষ না বদলোক তা তো তুমি জানো না।

নিতাই এর চোখে চোখ রেখে এই প্রথম মেয়েটি বলল,

- আমি মানুষ দেখলেই চিনতে পারি। আপনি যে বদলোক নন আমি বুঝে গেছি।

মেয়েটির আত্মপ্রত্যয় দেখে নিতাই থ। প্রসঙ্গ পালটে আটপৌরে কথোপকথনে ফিরে এল সে।

- কোন কলেজে পড়ো?

- কলেজে নয়, কোলকাতা ইউনিভার্সিটতে পড়ি।

- সরি, আমি ভেবেছিলাম ফার্স্ট কি সেকেন্ড ইয়ার।

- আপনার মত অনেকেই ভাবে। আসলে চোদ্দ বছরেই মাধ্যমিক পাশ করে গেছি আমি।

- তোমার সাবজেক্ট কি?

- সংস্কৃত।

- ওরে বাবা।

এবার মুচকি হাসল মেয়েটা।

নিতাই ও হেসে বলল,

- এতক্ষণ কথা বলছি, তোমার নামটা কিন্তু জানা হয়নি। অবশ্য যদি আপত্তি না থাকে তোমার।

এ-ও আমার নাম মধুজা। বেশ সুন্দর নাম না? আমার বোনের নামটা আরও সুন্দর, অনুজা। বেশ একটা বনেদী অথচ আধুনিক স্মেল আছে বোনের নামটার মধ্যে।

সোজা সাপ্টা কথাবার্তা মেয়েটির। ভান ভনিতা নেই। সরল অথচ অনুভাবী মন আছে মনে হচ্ছে। হাসলেও ভারি সুন্দর লাগে। মধুজার সঙ্গে কথা বলতে বেশ লাগছে নিতাই এর। দ্বিতীয় পর্বের কথা কিভাব শুরু করা যায় সে ভাবছে এমন সময় মধুজা জানালো,

- এবার আমাদের নামতে হবে আঙ্কেল। দমদম স্টেশন এসে গেছে।

- সরি। গল্পে এত মশগুল হয়ে গেছিলাম আমি খেয়াল করিনি কখন পৌঁছে গেছি।

কিছুটা লজ্জা পেয়ে সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করল নিতাইকিশোর।

- নো প্রবলেম। আমার শেয়ারের ভাড়াটা।

মেয়েটি আবার এগিয়ে দিল সেই পঞ্চাশ টাকার নোটটা।

- ওটা ঢুকিয়ে রাখো পার্সে। আজ না হয় আঙ্কেলই লিফট দিল তোমায়।

- থ্যাঙ্ক ইউ। আমি তাহলে এগিয়ে গেলাম।

রাস্তা পেরিয়ে মধুজা দ্রুত হারিয়ে গেল মেট্রোগামী নিত্যযাত্রীদের ভিড়ে। নিতাই কিন্তু এখনো রাস্তা পেরোতে পারেনি। বৃষ্টি অনেকক্ষণই থেমে গেছে। গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরমে আচমকা ঠান্ডা হাওয়ার মত মধুজার কিছুক্ষণের সান্নিধ্যে নিতাই এর শরীর পুরোপুরি অবশ হয়ে গেলেও মনের ভেতরটা তার কেমন যেন আনচান করছে যুবাকালের মত। আজ জরুরী কাজ না থাকলে সে নির্ঘাৎ অফিস ঢুব দিয়ে কোন পার্কে গিয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে বসে কাটিয়ে দিত সারাটা দিন। নিজেকে কোনমতে ঠেলে ঠুলে নিরুপায় নিতাই এসে উঠলো দমদম মেট্রোর প্ল্যাটফর্মে। প্রতি ছ মিনিট অন্তর ট্রেন, তবু যাত্রীর ভিড় যেন কমে না অফিস টাইমে। অন্যদিনের মত ভিড় ঠেলে ট্রেনের প্রথম কামরায় আজ আর উঠতে ইচ্ছে করছে না তার। কটা বাজছে দেখার জন্যে পকেট থেকে মোবাইলটা সবে বের বের করেছে অমনি পেছন থেকে ডাক শুনল,

- আঙ্কেল, আঙ্কেল।

হাসতে হাসতে মধুজা এগিয়ে আসছে তার দিকে।

- একি তুমি এখনো দাঁড়িয়ে?

- হ্যাঁ আপনাকেই তো খুঁজছিলাম। আমার ফ্রেন্ড ফোন করে জানালো ফার্স্ট ক্লাসটা হচ্ছে না তাই দাঁড়িয়ে গেলাম আপনার জন্যে।

বেশ জোরেই কথাগুলো বলছিল মধুজা।

তারই বয়েসি দুজন লোক ড্যাব ড্যাব করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে নিতাই মধুজাকে কিছুটা ফাঁকায় সরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলো,

- আমায় খুঁজছিলে কেন?

- আপনার নাম আর ফোন নাম্বারটা বলুন। তাড়াতাড়ি... আমাদের ট্রেন ঢুকছে।

সেভ করে রাখার জন্যে মধুজা ফোন বের করলো পকেট থেকে। নিজের নাম আর নম্বর দিলো নিতাইকিশোর।

- মিসড কল দিলাম, সেভ করে রাখবেন। ইচ্ছে করলে ফোন করবেন। বাই।

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার যান্ত্রিক শব্দের মধ্যেই অনেকটা গলা তুলে কথাগুলো বলে একছুটে অন্য কামরায় উঠে উধাও হয়ে গেল মধুজা।

"তুমি চলে যেও না মধুজা। আমার সঙ্গে থাকো, প্লিজ।" - চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছিল নিতাই-এর। অনেক বছর পর আজ আবার সে বোধ করল বিরহের যন্ত্রণা। এভাবেই রূপকথার মায়াজালে আটকে নিতাইকিশোরের মত একজন শান্তশিষ্ট ছাপোষা সংসারী চাকুরে মানুষ প্রথম দিনেই তার অর্ধেক বয়েসি মধুজাকে ভালোবেসে ফেলেছিল।

পরপর দুটো অটো পালটে দমদম ক্যান্টনমেন্টে পৌঁছলো এন. কে.। অটো থেকে নেমে মধুজার দেওয়া নির্দেশ মতো মেন রাস্তা দিয়ে এগিয়ে দত্ত ফার্মেসির সাইনবোর্ড দেখতে পেল। পাঁচতলা একটা নীল-সাদা ফ্ল্যাটবাড়ির গ্রাউন্ডফ্লোরে এই মেডিসিন শপ। এই বাড়িরই তিনতলাতে দুটো ফ্ল্যাট জুড়ে থাকে মধুজা, অনিরূদ্ধ আর তাদের বছরখানেকের ছেলে অঙ্কুশ। একতলার গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার পর এন. কে.-র যেন একটু নার্ভাস লাগছে নিজেকে। ফোনে মন শরীর নিয়ে অনেক ফ্যান্টাসি করা সম্ভব কিন্তু বাস্তবে? সিঁড়ি দিয়ে ধীর পদক্ষেপে তিনতলায় উঠে দুদণ্ড জিরিয়ে বেল টিপল সে। দ্রুত নিশ্বাস ওঠানামা করছে তার। আধ মিনিট বাদে দরজা খুলল নিঃশব্দে। সামনে দাঁড়িয়ে এলোচুলে মেকাপ ছাড়া প্রায় নিরাভরণ মধুজা। গায়ে মফ কালারের ফুলছাপ দেওয়া সুতির হাতকাটা ম্যাক্সি। নিটোল ফর্সা বাহুতে এখনো চানের জল লেগে আছে। শরীর জুড়ে ম ম করছে সাবান আর শ্যাম্পুর সুগন্ধ। মাথার ভিজে চুল যেন ইচ্ছে করেই কিছুটা ছড়িয়ে মুখের খানিক অংশ তার ঢাকা। রহস্যময়ী নারী শরীরের পসরা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার ভালোবাসার পুরুষের কাছে। মধুজার চোখের স্থির গভীর চাহনি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে এন. কে.-র ভেতরটা। প্রবল ঝড়ের ঠিক আগে থমথমে প্রকৃতির মত দুটো শরীর নিঃশব্দে বেশ কয়েকমুহূর্ত তাকিয়ে থাকল মুখোমুখি। 
তারপর মধুজাই প্রথম হেসে বলল,

- কি হলো, বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে এসো।

মন্ত্রমুগ্ধের মত ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকল এন. কে. পায়ের জুতো না খুলেই। ছিটকনিটা ভেতর থেকে লাগিয়ে মধুজা এবার এন. কে.-র দিকে রহস্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার মুখের ওপর ঝুলে থাকা চুলের গোছাটা সরালো। ঘাড় এলিয়ে নিজের তর্জনী দিয়ে নাকের বাঁদিকের পাটায় হাত রেখে বলল,

- এইটা।

এন. কে. স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সাপের মাথায় বৈদুর্য্যমণির মত সোনার নাকছাবির ওপর ছোট্ট হিরের টুকরো থেকে কামনার মায়াময় দ্যুতি মধুজার মুখ, মুখ থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় নিজেকে সামলে রাখা অর্থহীন। ঝটিতি মধুজাকে নিজের শরীরের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে উন্মাদের মত চুমু খেতে শুরু করল এন. কে.। ঠোঁট, নাক, গলা,‌ চোখ, কপাল, কানের লতি সর্বত্র। অশান্ত প্রেমিক তার প্রেমিকার শরীরের দীর্ঘদিনের জমে থাকা সবটুকু ভালোবাসা শুষে নিতে চায় আজ, এক্ষুনি। মধুজাও এন. কে.-র দুবাহুতে হাল্কা হাত বোলাতে বোলাতে আদর খাচ্ছে প্রাণ ভরে। এভাবে দুটো শরীর কতক্ষণ লেপটে ছিল তারা দুজনেই জানে না। হঠাৎ মধুজা এক ঝটকায় সরিয়ে দেয় এন. কে.-কে।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে এন. কে. বলে,

- কি হলো!

- নাকছাবিটা নেই।

সত্যিই তো। মধুজার নাকে নাকছাবিটা নেই।

নাকছাবিহীন নাকের পাটায় হাত বোলাতে বোলাতে মধুজা এন. কে.-কে বলে,

- উফ, যা আদরের চোট আপনার।

- কি হবে এখন? - ভীষণই ঘাবড়ে গেছে এন. কে.।

- কি আবার হবে। খুঁজে বের করতে হবে। থম মেরে বসে না থেকে নিজের জামা প্যান্ট ধরে ঝাড়া দিন, দেখুন কোথাও আটকে আছে কিনা।

নিজের ম্যাক্সি ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মেঝের দিকে লক্ষ্য করে কথাগুলো বলল মধুজা। এন. কে.-ও নিজের ইন করা হাফহাতা জামা ট্রাউজার থেকে বের করে জোরে ঝাড়া দিল। জামার পকেট দেখল খুঁটিয়ে। প্যান্টের সামনের পকেট তো বটেই পেছনের দুটোও দেখছে উলটে পালটে। খুব তাড়াতাড়ি পাওয়া দরকার নাকছাবিটা। হাতে তাদের সময় আর বড়জোর পঁচিশ মিনিট। তার বেশীরভাগটাই এই নাকছাবি খুঁজতে কেটে গেলে ভালোবাসাবাসির দফা রফা হবে। নিষিদ্ধ প্রেমের দুর্লভ মুহূর্ত কি বার বার ফিরে আসে? মধুজা, এন. কে. দুজনেই আলাদা করে একথা ভাবছে আর আকুল হয়ে নাকছাবি খুঁজছে।

- আপনি একটু বসুন এখানে আমি এখুনি আসছি।

এন. কে.-কে ডাইনিং এর চেয়ারে বসতে বলে শোবার ঘরে চলে গেল মধুজা। চেয়ারে না বসে সেটা সরিয়ে এন. কে. খুঁটিয়ে দেখতে লাগল মেঝের আশপাশটা। কিছুক্ষণ পরে একখানা ফুলঝাড়ু হাতে ফিরে এসে মধুজা এই ডাইনিং-কাম-ড্রইং রুমের আসবাবপত্রের আনাচ কানাচ, যেমন ফ্রীজের পেছন, বুকসেলফের তলা যেখানে হাত বা চোখ যায় না সেখানে ঝাড়ু চালিয়ে নাকছাবি বের করার চেষ্টা করতে লাগল। এত ছোট জিনিস সাধারণতঃ এরকম ঘুপচিতেই গা ঢাকা দেয়। কিন্তু পাওয়া গেল না। হতাশ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এন. কে.-র হাতে ঝাড়ুটা ধরিয়ে দিয়ে মধুজা বলল,

- আমি নাগাল পাব না। আপনি লম্বা আছেন, ওই সোফাটার পেছনদিকটা একটু ঝেঁটিয়ে দেখুন তো, পান কিনা?

ফুলঝাড়ু হাতে এন. কে. ডান পা-টা অনেকটা তুলে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল সোফার পেছনে। হি হি করে হেসে ফেলে মধুজা তার নিজস্ব ভঙ্গীতে বলল,

- ঈস্‌, এই পোজে আপনার একটা ছবি তুলে রাখলে ভাল হতো। বিবাহিত কচি প্রেমিকার সঙ্গে অভিসারে এসে কি হাল হয়েছে দেখো গো প্রেমিক বাবাজীবনের।

মধুজার ওপর রাগ করার মত পরিস্থিতি এখন নয়। এন, কে-কে যেভাবেই হোক নাকছাবিটা খুঁজে বের করতেই হবে। যাবে কোথায় জিনিষটা। বন্ধ দরজা খুলে তো আর বেরিয়ে যেতে পারে না। এখানে আর বড় জোর মিনিট পনের থাকতে পারবে সে। তার অসংযত আচরণের জন্যেই সবকিছু গুবলেট হয়ে গেল। নিজের ওপরেই তাই এখন সবথেকে বেশি রাগ হচ্ছে এন. কে.'র।

- এঃ দেখেছেন এটা এখানে পড়েছিল।

মধুজার হাতে ঝুল আর ময়লা ভর্তি একটা ভোটার কার্ড। টিভি শো-কেসের পেছনটা ঝাড় দিতে গিয়ে বেরিয়েছে ওটা। পরিষ্কার করতে করতে মধুজার আক্ষেপ,

- এটা হারানোর জন্যে বরের কাছে কি গালাগালিটাই না খেয়েছি। সেই বারাসাতে গিয়ে কত দৌড়ঝাঁপ করে ডুপ্লিকেট বানাতে হয়েছে।

মধুজার শেষ কথাগুলো আর এন. কে. শুনতে পেল না। তার মাথায় বিদ্যুৎঝলকের মত খেলে গেল এক নতুন আশঙ্কা। আতঙ্কের সুরে মধুজাকে সে বলল,

- আচ্ছা নাকছাবিটা আমার পেটে চলে যায়নি তো?

- ধ্যাৎ, নাকছাবি খাবেন কি করে? গলায় ঢুকলেই তো বুঝতে পারবেন।

- না মানে যদি কোনভাবে...

- কি আর হবে, বের করতে হবে পেট কেটে। সবাই তখন জানবে নিতাইকিশোর বাবু নাকছাবি খেয়ে ফেলে গর্ভযন্ত্রণায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কার নাকছাবি কিভাবে কোন পরিস্থিতিতে পেটে গেল সে ব্যাপারে সবার আগে আপনার বউ, ছেলে তারপর চেনা মানুষরা জানতে চাইবে।

একথা বলে এবার ঠোঁট টিপে হাসলো মধুজা।

- হেসো না তো। সবসময় রসিকতা ভাল লাগে না। একটু তো সিরিয়াস হও কখনো কখনো।

বেশ বিরক্ত হল এন. কে.। গম্ভীর গলায় মধুজা এবার বলল,

- আমি যথেষ্টই সিরিয়াস। নগদ এগার হাজার টাকায় নাকছাবিটা কিনে অনি প্রেজেন্ট করেছে আমাকে। অতি আহ্লাদে হুটোপুটি করে আপনার চুমু খাওয়ার চোটে সেটা মিস্‌প্লেসড হয়েছে। আমরা দুজনে খুঁজছি, এ পর্যন্ত্য ঠিক আছে। কিন্তু তার মধ্যে আপনি যদি গিলে ফেলার আষাঢ়ে গল্প ফাঁদেন তাহলে এ ছাড়া আমার আর কী বলার থাকতে পারে বলুন।

এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতেই হতাশ গলায় এন. কে. বলে,

- তাহলে গেল কোথায় ওটা?

- ছিটকে এদিক ওদিক কোথাও পড়েছে। খুঁজে দেখছি আমি। কিন্তু সরি, আপনাকে তো আর ফ্ল্যাটে অ্যালাও করতে পারছি না। অনি এসময়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ে।

দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে এন. কে. পা বাড়াল বাইরের দিকে। উদ্বেগের গলায় বলল,

- তুমি কিন্তু খুঁজে পেলেই আমাকে কল কোরো।

- আচ্ছা করবো।

- আমি কিন্তু মারাত্মক দুশ্চিন্তায় থাকব।

- বললাম তো করবো।

সদর দরজার ছিটকিনি খুলে এন. কে. চৌকাঠে সবে পা রেখেছে অমনি মধুজা পেছন থেকে হাত ধরে তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে সান্ত্বনার সুরে বলল,

- কিছুই তো হলো না। এসো তোমাকে একটু আদর করে দি।

এন. কে.-র ঠোঁট গাল কপালে বেশ কয়েকটা চুমু খেল মধুজা। নিরুত্তাপ এন. কে. নিস্তেজ ভঙ্গীতে গ্রহণ করল সেই আদর। উত্তেজনা তার তো অনেক আগেই মিইয়ে গেছে। মস্তিষ্ক জুড়ে একটাই উদ্বেগ এখন ক্রমশঃ গ্রাস করছে তাকে- নাকছাবিটা সে খেয়ে ফেলেনি তো?

তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে প্রথমে বুক ভরে শ্বাস নিল এন. কে.। কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছল রুমাল দিয়ে। মধুজাদের ফ্ল্যাটেও অন্যান্য ফ্ল্যাটবাড়ির মত আলো ঢোকে কম। তাই বাইরের সূর্যের আলোয় নিজের জামা প্যান্টের পকেটগুলো উলটে পালটে নাকছাবিটা খোঁজার চেষ্টা করে আরও একবার নিরাশ হয় সে। ইন করা জামাটা তো আগেই তুলে ফেলেছিল, এবার গেঞ্জিটাও ট্রাউজারের ওপরে তুলতে যেতেই দেখল ওষুধের দোকানে দাঁড়ানো এক খদ্দের লক্ষ্য করছে তার হাবভাব। গেঞ্জিটা আর না তুলে দ্রুতপায়ে হাঁটা লাগালো এন. কে.। মধুজা কিন্তু কথাটা খারাপ বলেনি। মাছের সামান্য কাঁটা মুখে ঢুকলেই বেশ মালুম হয় আর আস্ত একখানা নাকছাবি গলা পেরিয়ে পেটে চলে গেলে টের পাবে না সে? কিন্তু সত্যিই যদি চলে যায়? একদম কেলোর কীর্তি হয়ে যাবে। ডাক্তার জানবে, বৌ ছেলে জানবে, আত্মীয় পরিজন বন্ধুবান্ধব অফিস কলিগ সব্বাই জেনে যাবে। ঢি ঢি পড়ে যাবে চারদিকে। লজ্জায় তখন সে মুখ দেখাবে কি করে? আমাদের মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজ অসবর্ণে বিবাহ তো কবেই মেনে নিয়েছে। মামাতো খুড়তুতো পিসতুতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়েকেও নিমরাজি হয়ে মান্যতা দিয়েছে। ইদানীং সমলিঙ্গে বিবাহবন্ধনও স্বীকৃত। কিন্তু বৌ বাচ্চা থাকতে অন্য নারীসঙ্গ বা পরস্ত্রীকে ভালোবাসার সম্পর্ককে কোনদিনই ভালোচোখে দেখেনা কেউ।

সাত সতের ভেবে কূল না পেয়ে এন. কে. মনস্থির করল নিজে থেকেই একটা ইউ.এস.জি. করিয়ে নিশ্চিত হবে। মোবাইল ফোনবুকে সেভ করা ডায়াগ্‌নোস্টিক সেন্টারের নম্বরটা খুঁজতে খুঁজতে এন. কে. ভাবছে - কি বাসনা নিয়ে বেরিয়েছিল অফিস থেকে আর কি করতে হচ্ছে এখন তাকে।

- হ্যালো, আপনাদের ওখানে এখন ইউ.এস.জি. হবে? আপার নয়, ফুল অ্যাবডোমেন করাবো। আমি এখন নাগের বাজারের কাছাকাছি আছি। চারটের মধ্যে যেতে হবে? টাইমটা আর একটু ডেফার করা যাবে না? না না ঠিক আছে আমি চারটের মধ্যেই পৌঁছচ্ছি। আমার নাম নিতাইকিশোর সেন। এজ্‌ ফিফটি। হ্যাঁ একটা ফুল অ্যাবডোমেন ইউ.এস.জি. বুক করে রাখুন।

এখনই সাড়ে তিনটে বাজে। এখান থেকে ফুলবাগানে সেন্টারে চারটের মধ্যে যেতে হলে ট্যাক্সি ছাড়া গত্যন্তর নেই। ট্যাক্সিতে উঠেই এন. কে. তৃতীয়বার ফোন করল মধুজাকে।

 -হ্যালো, পেয়েছো খুঁজে?

- না, পেলে তো আমিই ফোন করতাম।

- আগের দুবার ফোন বেজে বেজে থেমে গেল। ফোন করলে আজকে অন্ততঃ ফোনটা ধ'রো।

- ছেলে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। ওকে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে আবার খুঁজবো। আপনি কোথায়?

- ইউ.এস.জি. করাতে যাচ্ছি।

- সেই গেলেনই। সত্যি বাবা, আর চাপ নিতে পারলেন না? ও.কে. বাই।

ফোন কেটে দিল মধুজা।

লেকটাউনে জয়া সিনেমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটা লোক হঠাৎ করে ট্যাক্সিটার সামনে পড়ে যায়। জোরে ব্রেক কষে জোর মুখ খিস্তি করে ড্রাইভার।

নিজেকে নিয়েই এখন খুব সমস্যায় আছে সে। এর মধ্যে আর বাড়তি উটকো ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তাই এন. কে. বলল,

- আরে ভাই একটু আস্তে চালান।

- যাঃ বাবা আপনিই তো উঠে বললেন জলদি যেতে। - হিন্দি টানে সটান উত্তর ড্রাইভারের।

কথাটা সত্যি। ওভাবে বলাটা এন. কে.-র ঠিক হয়নি কিন্তু সে তো মরিয়া। সোনোগ্রাফিটা তাকে করাতেই হবে আজ। পকেটে মোবাইল বাজতেই মধুজার ফোন ভেবে তাড়াতাড়ি বের করল এন. কে.। নাকছাবি কি তবে খুঁজে পেয়েছে?

নাঃ মধুজা নয়, ফোন করেছে অনু মানে এন. কে.-র স্ত্রী। এসময় বৌ এর ফোন মোটেই আশা করেনি সে। মনের বিরক্তি গোপন রেখে ফোনটা ধরে এন. কে.।

- বলো।

- তুমি কোথায়?

মুখ দিয়ে এন. কে.-র প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল - অফিসে। কিন্তু আশপাশের নানান আওয়াজ ফোনের ওপারে শোনা যেতে পারে আন্দাজ করে উত্তর দিল,

- একটু বাইরে বেরিয়েছি, অফিসের কাজে।

- ওফ্‌ সেইজন্যেই এত আওয়াজ পাচ্ছি হর্নের। শোন না, ফেরার পথে বাজারে নেমে দুটো বেগুন এনো না, টুবলুর আজ রাতে বেগুনপোড়া খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। ও হ্যাঁ, মুড়ির একটা বড় প্যাকেটও আনবে।

- আচ্ছা আনব।

- তোমার কি ফিরতে রাত হবে? - অভ্যেসমত জিজ্ঞেস করে অনু।

- না, সময়েই ফিরব।

অনুর ফোন কেটে দিয়ে খানিক দ্বিধা করে মধুজাকে আবার মোবাইলে ধরল এন. কে.। মধুজা নিজে কিন্তু এ পর্যন্ত একবারও ফোন করেনি তাকে। এখন গত্তে পড়েছে সে, তারই গরজ। তিন চারবার রিং হওয়ার পর ফোনটা কেটে দিল মধুজা। ফোন কাটছে কেন? সে কি এন. কে.-র অসহায় অবস্থাটা বুঝতে পারছে না নাকি বুঝতে চাইছে না। ট্যাক্সি উল্টোডাঙার ব্রিজে উঠছে। আর দু তিনখানা সিগনাল পেরোলেই ফুলবাগান। আশা করছে চারটের ভেতরেই পৌঁছে যেতে পারবে সে। নিজের মানসিক চাপ কমাতে মধুজার সঙ্গে নিজের পুরনো দিনের সুন্দর কিছু মুহূর্ত খাপছাড়া ভাবে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল এন. কে.।

সিনেমা দেখতে গিয়ে প্রথমদিন মধুজার থেকে সম্ভ্রম দূরত্ব রেখে পাশের সীটে বসেছিল এন. কে.। মসগুল হয়ে সিনেমা দেখার ফাঁকে তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মধুজা বলেছিল,

- একি আপনি ওরকম সিঁটিয়ে বসে আছেন কেন?

বলেই এন. কে.-র ডান হাতটা ধরে টেনে নিয়েছিল নিজের কোলে। যেদিন ইউনিভার্সিটি আর অফিস ফাঁকি দিয়ে দুজনে আউটিং এ গেছিল দূরপাল্লার বাসে, রাস্তায় টিফিন কৌটো খুলে মধুজা তার নিজের হাতে রান্না করা সুস্বাদু কষা মুরগির মাংস খাইয়েছিল এন. কে.-কে। মাঝপথে আবদার করে এন. কে.-কে দিয়ে সবেদা কিনিয়েছিল নিজে খাবে বলে নয়, মাকে তাঁর প্রিয় ফল খাওয়াবে বলে। আর একদিন দেখা করে টানতে টানতে রেস্তোরায় নিয়ে গিয়ে ফিস্‌ চেলো কাবাব খাইয়েছে তাকে যার অসাধারণ স্বাদের হদিস মধুজা না থাকলে এন. কে. হয়তো পেতই না কোনদিন। এন. কে. কে সঙ্গে নিয়ে একদিনে পরপর তিনটে ফেস্টিভ্যাল মুভি দেখেছে খুব মন দিয়ে। বইমেলায় গিয়ে ছেলেমানুষি উচ্ছাস নিয়ে দাপাদাপি করেছে এ স্টল থেকে ও স্টলে। এন. কে. একটু তফাতে গেলেই অধৈর্য্য হয়ে বলেছে,

- এদিক ওদিক বারবার কোথায় ছিটকে যাচ্ছো তুমি, সঙ্গে থাকো না।

সেদিনই এন. কে.-কে প্রথম তুমি বলে ডেকেছিল মধুজা। এসব করে বছর দুয়েক চলার পরে একেবারেই হঠাৎ করে ফোনে একদিন মধুজা বলেছিল - সে বিয়ে করছে।

বিয়ের নেমন্তন্ন কার্ড হাতে করে নিয়ে এসে রেস্তোরায় বসলেও কোন খাবার সেদিন খেতে চায়নি মধুজা। শুধু পরপর বেশ কয়েকটা নিজের লেখা কবিতা শুনিয়েছিল এন. কে.-কে। মনের তাগিদ না থাকলেও মধুজার বিয়েতে গেছিল এন. কে.। ছাতনাতলায় বসেই তাকে দেখে একগাল হেসে ইঙ্গিতে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল মধুজা। নবোঢ়ার সাজে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল ওকে।

- আসুন সাব, ফুলবাগান এসে গেছে।

ড্রাইভারের আওয়াজে ঘোর কাটল এন. কে.-র। ভাড়াটা মিটিয়েই সোজা দৌড় লাগালো ডায়াগ্‌নোস্টিক সেন্টারের দিকে। এর ফাঁকেই সে চট করে একটা দু লিটারের জলের বোতল কিনে নিয়েছে। ঘড়িতে এখন কাঁটায় কাঁটায় চারটে। রিসেপশনে নিজের নাম জানিয়ে তাদের নির্দেশমত এন. কে. চলে গেল ক্যাশ কাউন্টারে। পকেটের ওয়ালেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে এগিয়ে দিল ক্যাশিয়ারের দিকে,

- একটা ফুল অ্যাবডোমেন ইউ.এস.জি. হবে।

- আপনার নাম?

নিতাই কিশোর সেন। মেল, বয়েস ফিফটি।

এন. কে. এতক্ষণে একেবারে অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে। সে চাইছে ইউ.এস.জি. করিয়ে এক্ষুনি একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক। ক্যাশিয়ার জিজ্ঞেস করল,

- ডাক্তারের প্রেশক্রিপশনটা দিন।

- প্রেশক্রিপশন নেই। লিখুন সেল্‌ফ।

মাথা তুলে এন. কে.-র দিকে একবার তাকাল ক্যাশিয়ার। তারপর কম্পিউটারে খানিক খটখট করে বিল বের করে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,

- চোদ্দশ টাকা চার্জ করছি কার্ডে।

মাসের শেষে অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে গেল। কিন্তু কিই বা আর করার আছে।

নির্ধারিত ঘরে ঢুকতেই এন. কে.-র হাত থেকে বিলটা নিয়ে একজন মহিল অ্যাটেনডেন্ট তাকে প্রচুর পরিমাণ জল খেতে বলল। অনুর গলস্টোন অপারেশনের সময় ইউ.এস.জি.-র আগে ওকে লিটার লিটার জল খাওয়াতে হয়েছিল,। এন. কে. সেটা জানত বলেই তাড়াহুড়োর মধ্যেও জলের বোতলটা কিনতে ভোলেনি। আগে লাইনে থাকা দুজন পেশেন্টের পর যখন ওর ডাক পড়ল দু লিটার জল খেয়ে তখন এন. কে.-র আইঢাই অবস্থা। এর মধ্যে মধুজাকে আরও একবার ফোন করেছিল এন. কে. কিন্তু সে ধরেনি। একটা যন্ত্র তার জেল মাখানো চটচটে পেট জুড়ে ঘোরাফেরা করছে, ডক্টর মনিটর স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে নিবিষ্ট মনে যা দেখার দেখছেন। এন. কে. আড়চোখে লক্ষ্য করছে ডাক্তারের মুখ। পেটের ভেতর ফরেন বডি দেখলে যদি কোনভাবে তাঁর মুখের ভাব পরিবর্তন হয়, যদি কপাল কুঁচকে ওঠে। কিন্তু নাঃ মানুষটি দেখা যাচ্ছে একেবারেই ভাবলেশহীন। যেমনটা হয় আর কি। সোনোগ্রাফি শেষ করে বেড থেকে নেমে টিসু পেপার দিয়ে পেট মুছে জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে এন. কে. সরাসরি জিজ্ঞেসই করে বসল ডক্টরকে,

- কিছু পেলেন স্যার ইউ.এস.জি.-তে?

- সন্ধ্যেবেলা রিপোর্ট পেয়ে যাবেন।

- না মানে মনিটরে কিছু দেখতে পেলেন কি?

খাতায় নোট নিচ্ছিলেন ডক্টর। লেখা থামিয়ে বললেন,

-ওভাবে বলা বারণ। রিপোর্টেই সব ফাইন্ডিংস লেখা থাকবে।

তার মানে আরও আড়াই তিন ঘন্টা অপেক্ষা। আরো দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকা। পায়ে জুতোটা গলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে লাউঞ্জে একটা ফাঁকা চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিল এন. কে.।

এতক্ষণের মানসিক ধকলে শরীর তার পুরোপুরি বিপর্যস্ত। কয়েক মিনিট এভাবে কাটানোর পর এন. কে.-র পকেট কেঁপে উঠল। ইউ.এস.জি. রুমে ঢোকার আগে মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে করে দিয়েছিল সে। আর ফোন ধরে কি হবে? বেশ কয়েকবার কেঁপে থেমে গেল ফোন। দ্বিতীয়বার কাঁপতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে মোবাইলটা বের করে দেখল স্ক্রীনে মধুজার নাম। ফোন ধরে ক্লান্ত নিস্পৃহ গলায় এন, কে বলল,

- বলো।

ওপাশ থেকে ফিসফিসে গলায় মধুজা উত্তর দিল,

- নাকছাবিটা পেয়ে গেছি!

কথাটা শুনেই তড়াক করে এমন লাফিয়ে উঠল এন. কে. যে আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল চেয়ার থেকে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

- তার মানে? সত্যি পেয়েছ?

- হ্যাঁ সত্যি।

- কোথা থেকে পেলে?

- গেইস্‌ করুন।

আবার মধুজার সেই রহস্যময়ী কণ্ঠস্বর।

- ওসব গেইস টেইসের হেঁয়ালি ছাড়ো। বলোনা কোথায় ঢুকে ছিল?

- বলছি বলছি...আমার ম্যাক্সির ভেতরে বাঁ দিকের ইয়ের মধ্যে।

- ইয়ে মানে?

- জানি না। - এরপর বেশ গলা চড়িয়ে মধুজা আরও বলে,

- ঠিক জানতাম, এরকমই একটা বোকা বোকা প্রশ্ন করবেন আপনি। সাধে কি আর হাঁদা গঙ্গারাম বলি আপনাকে। এই বুদ্ধি নিয়ে কি করে আপনি পরকীয়া প্রেম করার সাহস পেলেন বলুন তো?

- ঈস্‌...গভীর হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে আর কিছু না পেয়ে এন. কে. সঙ্গে থাকা খালি জলের বোতলটাই হাতের প্রবল চাপে দুমড়ে মুচড়ে ফেলল। ওপাশ থেকে মধুজা জানতে চাইল,

- ঈস্‌ কেন? অভিসারে ব্যর্থ হওয়ার দুঃখে নাকি অনেকগুলো পয়সা খামোকা খরচা হয়ে গেল সেইজন্যে?

- বলতে পারো দুটোই। - শান্ত গলায় উত্তর দিল এন. কে.।

- কিন্তু এই ঈস্‌টা তো আমার বলার কথা।

- কেন?

- কারণ আমি তোমায় প্রথম রাউন্ডের পর ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু তারপরও তো তুমি আবার আমায় জাপটে ধরে এক্সপ্লোর করতে পারতে। তখন অনায়াসেই বেরিয়ে পড়ত নাকছাবিটা।

হেসে ফেলে নিতাইকিশোর,

- মধুজা, তুমি কিন্তু আবার লোভ দেখাচ্ছ আমাকে।

- বেশ করছি। বার বার দেখাবো। ভিতুরাম কোথাকার।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।