গল্প ও অণুগল্প

বন্ধু



তারকনাথ সাহা


পরীক্ষায় ফেল করে দীপু ঠিক করল, সে আর বাড়ি ফিরবে না। পাছে কেউ দেখে ফেলে তাই জঙ্গলের পথ ধরে নদীর দিকে এগিয়ে চলল। সে জানতো নদীর উপর দিয়ে একটা রেল ব্রিজ আছে, যেখানে সব ট্রেন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে যায়। ঘন্টাখানেক পরে সে ঐ জায়গায় পৌঁছে অপেক্ষা করতে থাকে। আরও আধঘন্টা পর ট্রেন এসে দাঁড়ালো। ঝোলানো লোহার ছোট সিঁড়ি বেয়ে সে ট্রেনে উঠে বাথরুমের ধারে বসে পড়ল। ট্রেন চলতে শুরু করল। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল তার। ছোট বোনটা তাকে খুব ভালবাসে। সে হয়তো খুব কান্না শুরু করেছে এতক্ষণে। কিন্ত তার উপায় নেই। তার পরের ভাই পড়াশোনায় খুব ভাল। বাবা-মা সব ব্যাপারে তার প্রশংসা করে, আর তার জন্য জোটে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। আজ বাড়ি ফিরলে বেদম পিটুনি কপালে ছিল। তার নিজের মা তার জন্মের সময় মারা যায়। বাবা কোনোদিন তাকে ভাল চোখে দেখতেন না। সে-ই নাকি তার মায়ের মৃত্যুর কারণ। সে অপয়া। বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করে মাসিকে ঘরে এনেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সে মাসিকেই মা বলে জানে। প্রথমটা মায়ের আদর যত্ন সে ঠিকই পেত। ভাইয়ের জন্মের পর থেকে তিনি ভাইকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এই অবহেলা থেকে সে ভিতরে ভিতরে অন্যমনস্ক হয়ে পড়তে থাকে। ফলে যে কোনো কাজই সে পণ্ড করে ফেলত। শুধু বকাঝকা নয় মারধোরও খেত। রোজ স্কুলে গেলেও পড়াশোনায় তার মোটেই মন বসত না। তাই স্কুলের মাষ্টারমশাইদের কাছেও নিপীড়ন সহ্য করতে হতো। সহপাঠীরা তাকে নিয়ে মজা করত। পিছনে লেগে অতিষ্ঠ করে তুলত। আপন বলতে তার ছোট বোনটা সবার অলক্ষ্যে তাকে লুকিয়ে খাবার এনে খেতে দিত। তার সাথে লুডো খেলত, আর দীপু রোজ হেরে যেত।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে দীপু কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই। তার থেকে বয়সে একটু বড় একটা ছেলে তাকে ডেকে তুলে জিজ্ঞাসা করল, "কি নাম তোর"? দীপু চুপ করে থাকে। ছেলেটি বলল, "আমার নাম মিরাজ, তুই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিস তো"। ঘাড় নেড়ে সে বলল, "আমি দীপু"। মিরাজ বলল, "খাওয়াদাওয়া তো কিছু হয়নি, নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে"? দীপু মাথা নিচু করে থাকে। মিরাজ একটা ছোট ঝাঁটা দীপুর হাতে দিয়ে বলল, "ডান দিকে বগিটার সিটের নীচে পর্যন্ত ভাল করে ঝাঁট দিবি, আর পয়সা চাইবি, কেউ কিছু দিলে কপালে জোড় হাত করে পকেটে ঢোকাবি, না দিলে কিছু বলবি না। আধ ঘন্টায় পুরো বগি সাফ করে, বেসিনের পাশের ডাস্টবিনে ময়লা ফেলে এখানে এসে দাঁড়াবি। যা দেরি করিসনা"। কাজ শেষে দীপু জায়গায় ফিরে আসতে মিরাজ বলল, "এই বেসিনটায় ভাল করে হাত মুখ ধুয়ে নে"। তার দিকে এক টুকরো সাবান এগিয়ে দিল মিরাজ। তারপর রেলের হকারদের থেকে খাবার কিনে দুজনে গল্প করতে করতে খেয়ে নিল। দীপু বলল, "জীবনে এত ভাল বন্ধু আমি পাইনি"। মিরাজ শুধু হাসলো। সারাদিনের ক্লান্তিতে একধারে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দুই বন্ধু, দীপু আর মিরাজ। ট্রেন ছুটে চলল অজানার দেশে।