
মা, বাবা আর দাদিবু রহিমাকে নিয়েই নাবিলাদের ছোট্ট সংসার। শহরতলির নিঃশব্দ পাড়ায় বসবাস করা সেই ঘরে বাহ্যিক চাকচিক্য না থাকলেও ছিল একরাশ উষ্ণতা আর নিরলস ভালোবাসা।
তবে তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি অদৃশ্য ভার-যেটা ছিল দাদিবুর চাহিদা, আর মায়ের নিঃশব্দ ত্যাগের বেদনা।
তখন নাবিলা বেশ ছোট। বয়স এতটাই কম যে স্মৃতির গায়ে স্মৃতি সবেমাত্র গুছিয়ে বসতি গড়তে শিখছে।
সে শুধু দেখত, আর অনুভব করত, দাদিবুর অনন্ত চাহিদার তালিকা যেন শেষই হতে চায় না।
- "আজ ওটা খাবো না, ওটা খাবো।"
- "ঘুম আসছে না, গল্প করো।"
- "এখানে যাবো না, ওখানে নিয়ে চলো।" ইত্যাদি ইত্যাদি।
এইসব কথা মা সবসময় মুখ বুজে মেনে নিতেন। চোখে কখনো বিরক্তি ছিল না, কণ্ঠে কোন অভিমানও না। নাবিলা ছোট হলেও বুঝত, মা ক্লান্ত। তবু হাসিমুখে দাদিবুর বায়না মেটান।
আর দাদিবু? যেন এক রাজরানী - সবকিছুর কেন্দ্রে তিনি। এমনকি ছোট্ট নাবিলার জন্য কেনা আইসক্রিমেও দাবি জানাতেন, "এক কামড় দাও তো, বুনু!"
তার সেই শিশুসুলভ অভিমান, শুয়ে শুয়ে গল্প করতে চাওয়ার বায়না, কখনো চুলে তেল দিয়ে বুনুর চুল বাঁধা - সবকিছুতেই যেন ছিল একটা অবিচ্ছেদ্য অধিকারবোধ।
নাবিলার ভিতরে মাঝে মাঝে ক্ষোভ জমত। মনে হতো,
- "কেন দাদিবু মায়ের এতটা সময় ও মনোযোগ কাড়েন?"
- "কেন মায়ের ভালোবাসার ভাগ তাকে দিতে হয়?"
- "কেন সে ছোট নাবিলার ভালোবাসার অংশটুকুও নিয়ে নেয়?"
তার তো দরকার ছিল মা'কে - একটু একান্ত সময়, একটু মায়া, একটু গল্প, একটু গলা জড়িয়ে ধরে থাকা।
তবুও মা চুপ থাকতেন। অনেক সময়ই ইচ্ছা করতো দাদিবুকে কিছুদিনের জন্য কাকিমার বাড়িতে পাঠাতে। কিন্তু দাদিবুর ছিল না যাওয়ার হাজারটা অজুহাত।
- "আমি তো তোমার বড় মেয়ে, তোমায় ছেড়ে থাকবো কেমন করে!"
- "তোমার বাড়ি পাহারা দিবে কে?"
- "বুনুর চুল বেঁধে দিবে কে?" ইত্যাদি ইত্যাদি।
এভাবেই কখনও তার চুল আঁচড়ে দেওয়া, কখনও শুকিয়ে যাওয়া পিঠ চুলকে দেওয়া, কখনও হাতে বা হুগলিতে পান মুড়িয়ে দেওয়া - এইসব মায়ামাখা খুনসুটিতে চলছিল তাদের ছোট সংসার। ভালোবাসার সাথে অদৃশ্য এক ক্লান্তির সমান্তরাল ধারা।
কিন্তু এক ভোরবেলায় সবকিছু বদলে যায়।
সেই কাকডাকা ভোরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় নাবিলার। চারপাশে কুয়াশার মতো স্তব্ধতা। পাশে তাকিয়ে দেখে - দাদিবু তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু সেই আলিঙ্গনে ছিল না আগের উষ্ণতা। ছিল একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, নিঃসাড়, এক প্রকার শীতল ভার। নাবিলা বলে,
"ও দাদিবু, উঠো না! উঠো!"
কিন্তু দাদিবুর ঘুম আর ভাঙেনি সেদিন!
সেদিন ছোট্ট নাবিলা প্রথমবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়।
চারদিকে কান্নার রোল। এমনকি সেই কাকিমাও বারংবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন - যিনি বেঁচে থাকতে একবারও দাদিবুর খবর নেননি। যার কাছে গিয়ে দাদিবু একটা বারের জন্যও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারেনি। নাবিলা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখের সামনে দাদিবুর ঠাণ্ডা হাত, মাথার ধপধপে সাদা চুল, ফেলে যাওয়া পানের টুকরো। তখন তার মনে জেগে উঠেছিল হাজারটা প্রশ্ন -
"মৃত মানুষের হাত এত ভারী হয়ে যায় কেন?"
"যারা বেঁচে থাকতে ভালোবাসা দেয় না, তারাই কেন মরে গেলে এত কান্না করে?"
সময়ের স্রোত থেমে থাকে না। দিন যায়, বছর যায়।
ক্লাস নাইনে পড়া ১৪ বছরের নাবিলা একদিন প্রাইভেট শেষে ফিরছিল। হঠাৎ রাস্তায় এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখে থমকে যায়-ধপধপে সাদা চুল, ভাঙা শরীর, আধময়লা শাড়ি, কাঁপা হাতে দুটি ব্যাগ ধরে রেখেছেন।
বৃদ্ধাকে দেখে তার মনে পড়ে যায় দাদিবুর কথা। চোখের কোণে আলতো করে ভেসে ওঠে তখন দাদিবুর ফেলে যাওয়া স্মৃতি। বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়,
- "এই তো, সময় এভাবেই মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। হয়তো আমিও একদিন কারো কাছে ভুল হয়ে যাবো! কেবল স্মৃতি হয়ে থাকব; হয়তো বা তাও থাকব না!"
বৃদ্ধার ব্যাগ নিতে গেলে, তিনি বলেন, "বু, এইটাও নাও বু। এর মধ্যে পান আছে!"
পানের ব্যাগ দেখে নাবিলা আর হাসি ধরে রাখতে পারে না। বলে, "নিজেই ঠিকঠাক মতো চলতে পার না তার মধ্যেও তোমার পানের নেশা কাটে না।"
জানতে পারে, বৃদ্ধা বড় ছেলের বাড়ি গিয়েছিলেন। বউ খোঁটা দিয়েছে,
- "শুধু খেতে আর শুতে আসেন, কাজের সময় তো হাওয়া!"
তাই অভিমানে ফিরে এসেছেন। কিন্তু কোথাও যাওয়ার মতো আপন ঠাঁই নেই। আবার যেতে হবে ছোট ছেলের ঘরে, যেখানে অবহেলা আর অপমান অপেক্ষা করে রোজকার রুটিনের মতো।
নাবিলা তখন ভাবতে থাকে -
- "বয়স হলে কি মানুষ সত্যিই এভাবে ভেসে যায়?"
- "কোথাও ঠাঁই মেলে না?"
- "কেউ আপন থাকে না? কেউই না?"
নাবিলা খুব যত্ন করে বৃদ্ধাকে একটি পরিচিত ভ্যানে তুলে দেয় তার তিক্ত অভিজ্ঞতার গন্তব্য পানে।
আরও কিছু বছর পেরিয়ে যায়।
এখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এক রাতে 'পথের পাঁচালি' পড়তে পড়তে তার চোখ আটকে যায় দুর্গার ঠাকুমার চরিত্রে। যেন রাস্তার সেই বৃদ্ধা, তার দাদিবু, সবকিছু একাকার হয়ে মিশে গেছে দূর্গার ঠাকুমাতে। একাকীত্বের, অবহেলার, অপাঙক্তেয় হয়ে পড়ার সেই যন্ত্রণা, তার সমস্ত চিত্র যেন একাকার হয়ে আছে। সে ভাবে,
- "সবশেষে কি সবারই এই একই পরিণতি? একাকীত্ব? পরিত্যাগ? সমাজের বোঝা হয়ে যাওয়া?"
নিজেকেই প্রশ্ন করে - "আমিও কি একদিন এমন হবো? নিঃস্ব, একা, অপ্রয়োজনীয়? এর নাম কী? কী এই নিঃসঙ্গতা?"
সে উত্তর খুঁজে না পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
স্বপ্নে সে নিজেকেই দেখে এক বৃদ্ধার রূপে। সংসার নেই, স্বামী-সন্তান নেই, শুধু অপেক্ষা - নাতির কোলে নতুন শিশুকে দেখার আশায়। কিন্তু সেই আশাও যেন এক মরীচিকা।
মানুষকে পরিত্যক্ত করে ফেলার, আপনজনের চোখে অচেনা হয়ে যাওয়ার, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার এই যন্ত্রণা কি সবার জীবনে আসে?
এই উপলব্ধির পরের দিন সকালে, সে একাকী বসে দাদিবুর পুরনো কাঠের চিরুনিটা হাতে নেয়। খুব সাবধানে, ভালোবাসা মেশানো কৌতূহলে চিরুনির গায়ে মুখ ঘষে।
দাদিবুর হাতের গন্ধ কি এখনো লেগে আছে কি না, যেন অনুভব করতে চায়। ড্রয়ারে লুকানো সোনালি টিকলি - যেটা নিয়ে একদিন দাদিবু আর সে হেসেছিল প্রাণ খুলে - তাও বের করে।
নাবিলা জানে, দাদিবু আর নেই। কিন্তু তার ছোঁয়া, তার মায়া, তার গল্পের গন্ধ, সেই নির্ভরতার ভার সবই রয়ে গেছে হৃদয়ের গভীরে।
নাবিলা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলে,
- "দাদিবু, তুমি ছিলে বলেই বুঝতে পেরেছি, ভালোবাসা মানে শুধু সময়ের গহিনে হারিয়ে যাওয়া নয় - ভালোবাসা মানে সঙ্গে থাকা, শেষ পর্যন্ত ঠিক যেমন তুমি ছিলে!"
কিন্তু আমরা পারি কই? বয়স বাড়লে সময়ের স্রোতে ভেসে যায় মানুষ, ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সে ভাবে,
- "কিন্তু তারা কি সত্যিই অপ্রয়োজনীয়? নাকি আমরা, এই সমাজ - ভুলে যাই ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ?"
তার প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা - এই ভুলে যাওয়ার, ফেলে আসার, ছুঁড়ে দেওয়ার, উপেক্ষার নামই কী অস্তিত্ব সংকট?
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
