ভ্রমণ ও দেশ-বিদেশ

মেঘ কুয়াশার বাড়ি



ইতিকা সাহা


পাহাড়ের কোলে ছিমছাম সুন্দর একটি জায়গা। তার চেয়ে বলা ভালো শহরের ভিড় থেকে দূরে ছোট্ট এক পাহাড়ী গ্রাম।

যেখানে শহরের কোলাহল নেই যানজট নেই। নিসর্গ সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলায় সজ্জিত শান্ত মনোরম পার্বত্য অঞ্চল, যেখানে পর্বতের শরীরে মেঘ কুয়াশার খুনসুটি চলে সারাক্ষণ।

দমবন্ধ করা ব্যস্ত জীবন থেকে সাময়িক ফুরসৎ পেতে চলে গিয়েছিলাম উত্তরবঙ্গে ক'টা দিনের জন্য। থাকার জন্য প্রথমেই বেছে নিয়েছিলাম তিনটে দিন লাভাতে। পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং জেলার অন্তর্গত লাভা গ্রাম যাকে এখন প্রায় আধা-শহরও বলা চলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,২০০ ফিট (২,১৯৫ মিটার) উচ্চতায় পাইন, ফার আর বার্চ গাছের ঘন অরণ্যে ঘেরা মেঘেদের বাড়ি এই জাদুকরী গ্রাম। জায়গাটি নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্ক-এর প্রবেশদ্বার হিসেবেই পরিচিত।

পৌঁছে গিয়ে আমাদের নির্দিষ্ট হোটেলে উঠলাম। হোটেলটা ছিল ঠিক পাহাড়ের গা ঘেঁষে লাভা মনাস্ট্রির (ক্যাগিউ থেকচেন লিং মনাস্ট্রি) একদম কাছেই। কাঁচে ঘেরা খোলামেলা রুম। তারই সামনে দিয়ে অপরিসর দীর্ঘ এক সড়ক বয়ে গেছে। বহু দূরে পাহাড়ের গায়ে এঁকেবেঁকে যেতে যেতে মিলিয়ে গেছে এক সময়।

পড়ন্ত বিকেলে একফালি পানসে রোদ্দুর যখন কুয়াশার দাপটে খেই হারিয়ে ফেলে ডুবে যেত, আবছা আলো আঁধারে কাঁচের খোলা জানালার ধারে বসে দেখতে বেশ লাগত সে দৃশ্য, এক অদ্ভুত অনুভূতি হতো। হালকা হিমের স্পর্শে মনটাও কেমন উদাসী হয়ে এঁকে বেঁকে চলে যাওয়া পথটার শেষ বিন্দুতে পৌঁছে যেত। ছুটে গিয়ে ছুঁতে চাইত কল্পনার জগৎ। কোনও অজানা কারণে মনে হতো ওই বিন্দুটার ঠিক ওপারেই না জানা কোনো মুগ্ধতা লুকিয়ে আছে! লুকিয়ে আছে আমার স্বপ্নের রাজ্য।

পাহাড়ের এক অপরূপ লাবণ্য আছে তা যেন তার কঠিন পাষাণের গা বেয়ে চুঁইয়ে পড়তে থাকে। পাহাড়ের প্রতিটি খাঁজে গোপন মাদকতা লুকিয়ে থাকে যেন আর সবুজ বনানী সেই মদিরতায় ডুবে আছে আজন্মকাল ধরে! গিরিশৃঙ্গগুলি নারীর সুডৌল উন্মুক্ত বক্ষযুগলের মোহ সৃষ্টি করে রেখেছে কোন কাল থেকে। পাহাড়ের পৌরুষ তাতেই ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে যুগ যুগান্তর ধরে।

ভোরের আলো ফোটার আগেই পাখির রাজ্যে সুরেলা পাখির কন্ঠস্বর হাল্কা সুরে আধো ঘুমে কানে অনাবিল আবেশের সৃষ্টি করত। শীতের জড়তা আষ্টেপৃষ্টে থাকা ঘরটায় সদ্যোজাত সূর্যের নরম আলো পর্দার ফাঁকফোকর দিয়ে টুক করে কখন যেন ঢুকে পড়ে ঘুমের রেশ কাটিয়ে উষ্ণতার ছোঁয়ায় বন্ধুত্ব করতে চাইত। ঐ চিকন একফালি আলোক রশ্মিই ভাঙিয়ে দিত ঘুমটা। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতেই ব্যালকনিতে উঠে চলে আসতাম নীরব শৈল পাথরের সরসতার টানে। প্রথম দিনই ব্যালকনিতে এসেই বহুদিনের গচ্ছিত স্বপ্ন সার্থক হয়ে উঠল। ঝকঝকে আকাশ, কুয়াশাও কেটে গেছে অনেকটাই। তারই ফাঁকে দেখি হিমালয়ের হিমকন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা তার কাঞ্চনবরণ রূপ চোখের সামনে উন্মুক্ত করে মেলে ধরেছে। উল্লাসে ফেটে পড়লাম। দীর্ঘদিনের সাধ যে এভাবে অযাচিত ভাবেই ধরা দেবে তা ভাবনার অতীত ছিল। কারণ এর আগের উত্তরবঙ্গ ভ্রমণে কাঞ্চনকামিনী শিখরমালা তার রূপকে অলক্ষ্যেই রেখেছিল। সোনার বরণ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সাধ অপূর্ণই থেকে গেছিল। দু'চোখ ভরে দেখলাম অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। সার্থক হলো আমার চোখ। সময় গড়িয়ে ফিকে রোদ্দুর একটু গাঢ় হতেই তার রূপ-বর্ণ-এর পরিবর্তন নজরকে মোহিত করে তুলল। শীতের পরশ ভুলে সম্মুখে শুধুই সোনার আভরণ-এর মুগ্ধ দৃষ্টি। কড়া নেড়ে গরম চায়ের বার্তায় হুঁশ ফিরল। সত্যিই বড্ড প্রয়োজন ছিল এই এক কাপ উষ্ণ চায়ে চুমুকের।

এরপর আমার আলস্য ভরা দিনের পর্যবেক্ষণে দেখতাম শীতল রাতের জড়তা কাটিয়ে নিঃশব্দ পরিবেশকে। হাতে গোনা কিছু লোকের কোলাহলে ব্যস্ত হয়ে ওঠা ধীরে ধীরে। অফিস কাছারির বালাইহীন জীবনে ওখানকার বেশিরভাগ স্বামী-স্ত্রীই মিলিত ভাবে হোমস্টে বা খাবার হোটেল চালায়, ফলে বেলা বাড়ার সাথে খানিক ব্যস্ততা তাদেরও বাড়ত বইকি। হাতের অঢেল সময় খুঁটিয়ে সেসব দেখার সুযোগ করে দিত। ফর্সা টুকটুকে গুলুমোলু দু' চারটে বাচ্চা শীতের ইউনিফর্ম পরে হেলতে দুলতে স্কুলের পথে যেতে যেতে এক দু' জায়গায় জড়ো হয়ে একটু খেলেও নিত কেমন, দেখতাম, মজা পেতাম অনাবিল শৈশবকে প্রত্যক্ষ করে। ব্যস্ততা ভুলে এভাবেই ক'টা দিন দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রত্যক্ষ করা অখণ্ড অবসরে।

সূর্য পশ্চিমে ঢলে যেতেই সন্ধ্যে যেন ঝুপ করে নেমে আসত। রাতের অন্ধকার যত ঘনাতো তীরবেঁধা শীতল হাওয়ার গতিবেগও ততই বাড়তে থাকতো সোঁ সোঁ শব্দে। তাড়াতাড়ি করে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় কম্বলের ভেতরে ঢুকে নিজেকে র‍্যাপ করে নেওয়া ছাড়া উপায় কি! কিন্তু ব্যস্তময় শহুরে জীবনে লেট নাইট শোওয়া মানুষের চোখে কি ঘুম আসে অত সহজে? মোবাইল ঘাঁটার পরিসরও তো কম অনেকখানি নেটওয়ার্কের সমস্যার দরুণ। তাই পর্দার ফাঁক দিয়ে কাঁচের জানলা ভেদ করে আধো অন্ধকারে দৃষ্টি চলে যেত বাইরের দিকে। কিছুটা দূরে দু'একটা লাইটের আলো জ্বলতে দেখা যেত আর ছাড়া ছাড়া মৃদু দু'একটা কথার শব্দে মায়াবী মনে হতো রাতকে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর কোনো রাতচড়া পাখির হালকা শিসের সুর আলতোভাবে ভেসে বেড়াত বাতাস ছুঁয়ে রাতের পাহাড়ের গায়ে গায়ে। সেই মিঠে সুর ঘুমপাড়ানি হয়ে ধীরে ধীরে নিদ্রা জড়িয়ে দিত দুই চোখের পাতায়।

লাভার পাহাড় প্রকৃতি মানুষের সরল জীবনযাত্রা আজও রেখাপাত করে আছে মনের মাঝে। সর্বোপরি মোহময়ী কাঞ্চনজঙ্ঘা তার রূপের মোহজালে আচ্ছন্ন করে রেখেছে আজও আমায়। তাই পাহাড়ের টান অনুভবে, হৃদয়-মন জুড়ে ত্রিশঙ্কু শৈলমালার হাতছানি। এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা।