[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ২৮
কবিপত্নী দোলনের স্বচ্ছন্দ ও আন্তরিক আচরণে ইসমাইল সিরাজী মুগ্ধ।
হিন্দু নারী হিন্দুত্ব বজায় রেখে মুসলমানের ঘরণী হয়েছেন সেটা তিনি জানেন। অবশ্য কবির নিজের ইচ্ছাতেই সেটা হয়েছে। হিন্দু মেয়ের মুসলমান ঘরে বিয়ে এই এলাকাতেও আকছার ঘটে। কিন্তু ধর্ম পছন্দ হোক বা না হোক, বিয়ে পড়ানোর আগে একবার কলেমা পড়িয়ে তাকে মুসলমান করিয়ে নেওয়া হয়, একটা মুসলমান নাম রাখা হয়। বহু ক্ষেত্রে তার মুসলমানত্ব ওই অবধিই থাকে, পাড়াগাঁয়ের গরিব ঘরে কে আর কার রোজা-নামাজ বজায় রাখে। কিন্তু হিন্দু থেকে আসা মেয়েটি রোজা নামাজ করে কিনা, গরুর মাংস খায় কিনা, সেই কৌতুহল সবার থাকে। ব্যক্তিগতভাবে সেটাও সিরাজী সাহেবের না-পছন্দ। মুসলমানের ঘরে বহু মানুষ নামাজ-কালাম জানে না। চাপড়ার দিকে অনেক বাড়িতে গরুর মাংস খাওয়ার চল নেই। বাড়িতেও মেয়েদের মধ্যে অনেকে মাংস খায়না। তাদের নিয়ে সমাজে কারো তেমন হেলদোল নেই। কিন্তু যেই একটি হিন্দু মেয়ে মুসলমান হলো, অমনি পাড়ার লোকে তার মুসলমানত্বের বিচার করতে বসে গেল।
- ভাবী কেমন আছেন আকবর ভাই?
দোলনের সহজ এবং আন্তরিক প্রশ্নটিতেও মুগ্ধ হলেন সিরাজী সাহেব। যতদূর ধারণা, আকবর উদ্দীনের স্ত্রীকে কবিপত্নী এখনো দেখেননি। তবু তার কথা মনে রেখেছেন, খবর নিচ্ছেন।
- ওকে বোধ হয় আর বাঁচানোর যাবে না ভাবী। যত দিন যাচ্ছে শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। বিছানা ছেড়ে একা আর উঠতেই পারে না। ছেলেটার জন্য খুব কষ্ট হয়। মনমরা হয়ে মায়ের কাছে পড়ে থাকে।
পরিবেশে একটা বিষণ্ণতা। নীরবে চায়ে চুমুক দেওয়া সিরাজী সাহেবের দিকে ফিরে হয়তো বাতাসের বিষন্নতা কাটাতে দোলন মন্তব্য করল, আপনাদের নিশ্চয়ই ভারি ভারি বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল। আমি এসে রসভঙ্গ করলাম।
'ও কথা বলবেন না', ইমাম সাহেবের কন্ঠে অকৃত্রিম কুন্ঠার প্রকাশ। দেশ জুড়ে আমাদের গর্ব যে কবি, আপনি তাঁর ঘরণী। আপনার লড়াইয়ের কথা, ত্যাগ স্বীকারের কথা আমাদের অজানা নাই। সত্যি বলতে কি আপনাকে সামনে থেকে দেখে আমার চক্ষু সার্থক হলো।
আচমকা দোলনের কন্ঠে একটা হাসির ঢেউ উঠে এলো। একেবারেই বালিকাসুলভ খিলখিল হাসির মতো। এক প্রকার ভুলে যাওয়া অভ্যাস ছাপিয়ে কী করে এমন হাসি এলো দোলন নিজেই বুঝে উঠতে পারল না। তবে হাসিটা চাপা না দিয়ে উপভোগ্য স্বরে বলল, আপনি তো বেশ সুন্দর করে কথা বলেন! মসজিদের ইমামেরা তো দেখি খুব রাশভারী গম্ভীর প্রকৃতির হয়ে থাকেন। খুব উচ্চ ভাষায় কথা বলেন।
- আমিও তো এটাই ভাবছি। দুটো কাগজের পাতা নিয়ে নজরুলের প্রবেশ। ছোটবেলা থেকে মসজিদে ইমামদের সাথে কাটিয়েছি, কিন্তু এখন ইমাম মৌলানাদের কথা উঠলেই কেমন ভয় ভয় লাগে।
স্ত্রীর প্রসঙ্গটা চাপা পড়ে যাওয়ায় আকবরউদ্দিনও কিছুটা হালকা ও স্বস্তিবোধ করছেন। মজার স্বরেই বললেন, বিদ্রোহী কবিও ভয় পান! তবে আমাদের ইমাম সাহেব অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা। মক্তব-মাদ্রাসায় পড়ুয়াদের কিংবা তাদের শিক্ষকদের তো দেখি - কোরান শরীফের কিছু সূরা মুখস্ত করানো আর কিছু হাদিস গ্রন্থের ব্যাখ্যা শোনানো - এর বাইরে পড়ার জগত নেই। তাও আবার বাধ্যতামূলক উর্দু, বাংলার যেন প্রবেশ নিষেধ। বাংলাটা পড়তেই যদি না পারে, সে 'মোসলেম ভারত' হোক কিংবা 'ছোলতান' তাদের কাছে দুটোই সমান। কোন পার্থক্য নেই, মূল্যও নেই। এর মধ্যে ইসমাইল সাহেবকে একপ্রকার ব্যতিক্রমীই বলা যায়।
বিগলিত হাসি ছাড়া সিরাজী সাহেব কোনও ভাষা খুঁজে পেলেন না।
নজরুল বললেন এটা আমাদের সৌভাগ্য যে কৃষ্ণনগরের মসজিদে অন্তত একজন বুঝদার ইমাম আছেন। আপনাদের সামনেই চিঠিখানা পেশ করি। ইব্রাহিম খান প্রিন্সিপাল মানুষ। স্কুলে তো পড়িনি, তাতে কলেজের প্রিন্সিপাল। ভাব ভাষা সবই বেশ উচ্চমানের। যত্ন করে রেখে দিয়েছি।
নজরুল নিজেই প্রতিটি লাইন পড়ে শোনাতে লাগলেন। মাঝে মাঝে দু একটা মন্তব্য।
ভাই নজরুল ইসলাম,
তোমায় কখনো দেখিনি। অনেকবার দেখা করার সুযোগ খুঁজেছি, সে সুযোগ ঘটে উঠে নাই, দূর হতে শুধু তোমার লেখা পড়েছি, মুগ্ধ হয়েছি অন্তরের অন্ত:স্থল হতে ওই প্রতিভার কাছে বারবার মস্তক নত করেছি আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি, "প্রভো, এ কাঙাল বাঙালি মুসলিম সমাজে যদি একটি রত্ন দিয়েছ ওকে রক্ষা করো - সমাজকে দিয়ে ওর কদর করে নিও। তোমায় এত আপন ভাবি, এত কদর করি বলেই আজ অকুণ্ঠিত চিত্তে তোমায় 'তুমি' বলে সম্বোধন করছি। তোমার গুণমুগ্ধ, তোমার প্রীতি- আকাঙ্ক্ষী, তোমার ভক্ত ভাইয়ের এই আবদার তুমি রক্ষা করবে, তাও জানি।
আজ তোমায় কয়টা কথা বলব, গুরুরূপে নয়, ভাইরূপে, ভক্তরূপে। এ কথাগুলি বলব বলে অনেকবার তোমার সাক্ষাৎ খুঁজেছি, পাই নাই; কিন্তু কথাগুলি বুকের তলে অনুদিন তোলপাড় করছে; তাই পত্র মারফতই বলতে চেষ্টা করছি।
আমি আগেই বলেছি বাংলার মুসলিম সমাজ কাঙাল শুধু ধনে নয়, মনেও। তাই বাংলার অমুসলিমরা তোমার যে কদর করেছেন, মুসলিমরা তা করেন নাই, করতে শেখেন নাই। এ কথা ভেবে অনেক সময় লজ্জায় মাথা নত করেছি, সমাজকে নিন্দা করেছি। বন্ধু মহলে রোষ প্রকাশ করেছি। কিন্তু সে শুধু-নিন্দায় ফায়দা কি, শুধু-আস্ফালনে ফল কি? সমাজ যে পতিত, দয়ার পাত্র। তাই সেই ভাবে তাকে কখনো স্নেহের হাত বুলিয়ে, কখনো জোরে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে হবে, পথে আনতে হবে। আর সমাজের কাছে তো আমার সে আবদারের অধিকার নাই যে আবদার তোমার কাছে আমি করতে পারি। তাই এবার সমাজকে ছেড়ে তোমার দিকে ফিরছি। সমাজ মরতে বসেছে; তাকে বাঁচাতে হলে চাই সঞ্জীবনী সুধা; কে সেই সুধার পাত্র হাতে এনে এই মরণোন্মুখ সমাজের সামনে দাঁড়াবে, কোন সুসন্তান আপন তপোবলে গঙ্গা আনয়ন করে এ অগণ্য মানব গোষ্ঠীকে পুনর্জীবন দান করবে, কাঙাল সমাজ উৎকণ্ঠিত চিত্তে করুন নয়নে সেই প্রতীক্ষায় চেয়ে আছে। কে জানিনা, কিন্তু মনে হয় তোমায় বুঝি খোদা সে সুধাভান্ডারে কিঞ্চিত দান করেছেন, অন্তরের অন্তরালে বুঝি সে সাধনার বীজ জমা আছে। হাত বাড়াবে কি? একবার সাহসে বুক বেঁধে সে তপশ্চারণে মনোনিবেশ করবে কি?"
সাহিত্যের ভাষা দেখেছেন? কত সাবলীল, মার্জিত, উন্নত। প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু আদত বক্তব্য কি দেখুন -
"কিন্তু ভাই, তোমায় জিজ্ঞাসা করছি, কোন ব্রতে তোমার সে কণ্ঠস্বর তুমি নিয়োজিত করেছ? তোমার প্রতিভা অদ্ভুত, কিন্তু তারও চেয়ে গুরুতর তোমার দায়িত্ব। কড়ির মালিক যে, তার নিকাশ না দিলে বড় আসে যায় না; কিন্তু মাণিকের মালিকের নিকাশ দিতেই হবে; তোমার প্রতিভাকে তো তোমায় সার্থক করতে হবে।"
এতো সাহিত্য প্রতিভার কথা, এতো উদারতার কথার পরে ঘুরেফিরে ঠিক সেই জায়গায় - কড়ির মালিক আর মানিকের মালিকের মধ্যে হিসাব নিকাশের কথার ভিতরেই প্রিন্সিপাল সাহেবের ভাবনা সীমাবদ্ধ থেকে গেল। মালিকের কাছে প্রতিভা বন্ধক রেখে কি সাহিত্যের সৌন্দর্য সৃষ্টি করা যায়? তার উল্লেখ এই হিসেবটা যে মানুষেরই প্রাপ্য, সাধারণ মুসলিম সে তো দরিদ্র বঞ্চিত মানবেরই অংশ - সেই ভাবনাটা তিনি কোথায় যেন হারিয়ে ফেললেন।
'কথার মধ্যে কথা বলার জন্য মাফ করবেন', ইসমাইল সিরাজী বলেন, 'প্রিন্সিপাল সাহেবের মূল লক্ষ্যটা কিন্তু, যতটা আমার মনে হয়েছে, বঞ্চিত এবং অন্ধকারে থাকা সাধারণ মুসলমানের দিকেই। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের প্রতিফলনে তাঁর এ কথাগুলি এইভাবে প্রকাশ পেয়েছে, কড়ি এবং মানিকের তুলনার মাধ্যমে।'
'আপনার বিবেচনার তারিফ করি', নজরুল এক মুহূর্ত নীরব থেকে কথাটি বললেন। 'কিন্তু ইমাম সাহেব, একজন কবির সার্থকতা কিসে সেটি কি পাণ্ডিত্য দিয়ে বুঝিয়ে দেবার বিষয়? কবি তো সুন্দরের স্রষ্টা, তার সার্থকতা সুন্দরের আরাধনায়। সঙ্গে থাকবে সার্বিক মানবের কল্যাণ পরের কথাগুলো শুনলেই বুঝতে পারবেন আমার অস্বস্তিটা কোথায়, কষ্টটা কোথায়।'
"কোন পথে সে সার্থকতা তুমি অন্বেষণ করবে? বিদ্রোহে? উত্তম; কিন্তু বিদ্রোহকেও সুনিশ্চিত উদ্দেশ্যযুক্ত করতে হবে, শুধু তোমার 'যখন চাহে এই মন যা' 'উন্মাদ ঝঞ্ঝার' মতো চললে তোমার জীবনের সার্থকতার নৈকট্য কোথায়?... এখন বিচার করতে হয়, তুমি বাঙালি, তুমি কবি, তুমি মুসলমান, বাংলার কোন কল্যাণ সাধনে তোমার আগে অগ্রসর হওয়া দরকার। বাঙ্গালীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অজ্ঞ, সবচেয়ে বেশি আত্মভোলা, তোমারই ভাই এই মুসলিমগণ! আর বাঙলায় সবচেয়ে কলঙ্কিত, সবচেয়ে নিন্দিত, কুলিখিত বিষয় ইসলাম।... ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কিছু নাই; ইসলাম আধুনিকতম উন্নততম ধর্ম; তবে-যে বাংলার মুসলিমরা অনেক কুসংস্কারে পড়েছে, সে ইসলামের দোষ নয়; এই হতভাগারা ইসলামের সাথে ঐ কুসংস্কারগুলি পোষণ করছে।... বাঙলার মৌলানা রুমির আসন খালি পড়ে রয়েছে; তুমি এসে তাই দখল করে ধন্য হও, বাংলার মুসলিমকে, বাংলার সাহিত্যকে ধন্য কর।"
মুসলিম কবি হলেই কি তাকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব গুণগান করে যেতে হবে? অমুসলমান কবি হলে কি তার উপর কেউ সেই দায়িত্ব আরোপ করে? হ্যাঁ, আমি সুযোগ পেলেই ইসলামের গৌরবগাঁথা কাব্যে তুলে ধরি। কিন্তু সেটি ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে নয়। বাংলার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মানুষ মুসলমান। তাদের ধর্মীয় গৌরবগাঁথা, সংস্কার, রীতিনীতিগুলো সম্পর্কে শিক্ষিত অমুসলমান জানুক, পরিচিত হোক। পরস্পরের ধর্মকে না জানলে, তার জনজীবনের চেহারা না দেখলে, দুই সম্প্রদায় পরস্পরকে চিনবে কী করে? সেই জন্য ইচ্ছে করে আমি কাব্যে লেখায় আরবি ফারসি শব্দ ব্যবহার করি। এই শব্দগুলির মাধ্যমে একটা প্রতিবেশী ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস, তার ভাবনার গতি প্রকৃতি সম্পর্কে অমুসলমানের একটা ছবি তৈরি হবে, অপরিচয় কমে আসবে। এই পথেই হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির পথ, মিলনের পথ তৈরি করা হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।
বেশ কিছুক্ষণ ঘরের বাতাসটা যেন থমকে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো। নজরুল জানলার দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। গোয়াড়ি বাজারের দিকে একটা মালবাহী ঘোড়ার গাড়ি ধীর পায়ে খটাস খটাস করতে করতে এগিয়ে গেল। কিন্তু নজরুলের দৃষ্টি যেন সেসবে নেই। বহুদূরের কোনও মরুপ্রান্তরে তাঁর চোখ যেন ভেসে বেড়াচ্ছে। শ্রোতা দুজন নীরব।
ইমাম সাহেবই নীরবতা ভঙ্গ করলেন।
'কবি সাহেব, আপনার উদ্দেশ্যে অনেকদিন থেকে অনেক কথা জমিয়ে রেখেছিলাম বুকের মধ্যে। কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি আপনি কৃষ্ণনগরে আসবেন, আপনার সামনে বসে কথা বলার মতো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে। সবই আল্লাহর মহিমা। আজ যা শুনলাম, এরপরে আর বলার মতো ভাষা আমার নাই।'
সহসা নজরুল যেন ঘরের মধ্যে ফিরে এলেন। পুরো স্বাভাবিক, হাস্যময়।
'না না, আপনি বলুন। আপনার সাথে কথা বলে আমিও যেন একটু আরাম পাচ্ছি। মনের কথা শোনার লোক কই? আমার ভালোই লাগছে'।
'সত্য স্বীকার করি, আমি অত পড়াশোনা করা মানুষ না। আপনার বিদ্রোহী কবিতা কিংবা ধূমকেতুর খবর কিছুই জানতাম না। 'ইসলাম দর্শন' পত্রিকায় জনাব সায়েফুল ইসলামের একটি দীর্ঘ লেখা পড়ে আপনার সম্পর্কে জানলাম। ভিতরে ঝড় সৃষ্টি হলো, সে ঝড় থামে নি এখনো। তারপর থেকে আকবর ভাই যা পড়ান, সবই পড়ি। মন দিয়ে পড়ি। সবটা বুঝিনা, তবু বোঝার চেষ্টা করি। হিন্দুয়ানি কবিতা, দেবদেবীর গুণগান আপনি লেখেন, সে আমার না-পছন্দ হলে পড়ব না। কিন্তু আপনার প্রতিভা, সাধারণ মানুষের জন্য আপনার ভালোবাসা, আপনার জেদ, আপনার জেলখাটা - এগুলোর কি কোনো মূল্য নেই। বিখ্যাত গুণী মানুষ মুনশী রেয়াজুদ্দিন সাহেবের মতো মানুষও যে তীব্র ভাষায় আপনাকে আক্রমণ করেছেন, কুকথার ভাষা প্রয়োগ করেছেন - এতে খুবই মর্মাহত হয়েছি। নরাধম পাপিষ্ঠ বলে অভিশাপও দিয়েছেন অনেকে। তার চেয়েও বড়ো কথা, হিন্দুসমাজেও আপনার প্রতি হিংসা আর অপমান কম নাই। শনিবারের চিঠিও পড়তে পাই, বুঝতে পারি। আমি শুধু ভাবতাম, কবি সাহেবকে পেলে বলব - আপনি আপনার অন্তরে কোরাণ-পুরাণ দেবদেবতা নিয়ে যত খুশি লিখুন, কোনো ক্ষতি নাই। শুধু লাখো হাজার মুসলমানের বুকে কষ্ট আসে, বিশ্বাসে ধাক্কা খায়, সেইরকম বাক্য ও শব্দ কিছু যদি না লেখেন, বাদ দিয়ে রাখেন, তাহলে আমাদের সমাজের উপকার হয়। যাদের জন্য আপনার এতো লড়াই, তারাই যদি আপনাকে পর ভেবে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তাহলে করবেন কার জন্য? গোস্তাকি মাফ করবেন, ছোটো মুখে কত বড়ো বড়ো কথা বলে ফেললাম।'
নজরুল একদৃষ্টিতে সিরাজী সাহেবকে দেখছিলেন, কথাও শুনছিলেন নিশ্চয়। আকবর উদ্দীন যোগ করলেন, ঠিক ভুল জানিনা কাজী সাহেব। ইমাম সাহেবের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। আমারও একই আবেদন। আরও একটা অনুরোধ - চুপচাপ না থেকে ইব্রাহিম খান সাহেবকে পত্রের একটা উত্তর দিন।
নজরুল খানিকক্ষণ চুপচাপ। দৃষ্টি না সরিয়ে যেন স্বগতোক্তির মতো বললেন, আপনারা জানেন, মনের ভিতর থেকে সাড়া না পেলে কোনো পরামর্শ কিংবা অনুরোধই আমাকে আমার বোধ থেকে, আমার ভাবনা থেকে টলাতে পারেনা। তবু স্বীকার করি, সিরাজী সাহেবের কথা কিছুটা হলেও আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। এভাবে ভাবতে কোনোদিন চাইনি, কিন্তু আজ ভাবনাগুলো কোথায় যেন দোল খাচ্ছে। কথার মধ্যে মহিমা আছে।
'কথার মধ্যে মহিমা! এতো আমাদের চাপড়ার সিরাজী পীরের লোকজন বলে! আশ্চর্য!' ইসমাইল সিরাজী বলেন।
'আমিও তো এক সিরাজী পীরের খানদানের সামনে বসে আছি!' নজরুলের ঠোঁটে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি।
বিদায় নেবার পূর্বে আকবর উদ্দীন বলেন - আপনি প্রকৃতই একজন বিস্ময়কর মানুষ!
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
