
কুন্তী, কৃষ্ণনগর নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে উঠল। মায়ের বাপের বাড়ির সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হবে। সম্পত্তির ভাগীদার ৩০ জন। ও যাচ্ছে সই-সাবুদের জন্য। মা থাকলে ওর যেতে হত না। নামবে দেবনাথপুর। বসার জায়গা পেয়েছে। গরমে ঘেমে নেয়ে একসা। ঝগড়া, চেঁচামেচি, বিড়ি সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধে - কুন্তীর মাথা ধরে গেছে। এখনো ১০ মিনিট পর বাস ছাড়বে। চোখ বন্ধ করে স্থির হয়ে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
"এই যে দিদি ভাড়াটা দিন" - কলম দিয়ে সিটের হাতলে ঠকঠক্ করে কন্ডাক্টর বলে ওঠে।
কুন্তী ব্যাগ খুলে একশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, "দেবনাথপুর বাজার"। চোখাচোখি হতেই সম্পদ বলে ওঠে, "কী ব্যাপার কুন্তী, এদিকে কোথায়?"
"দেবনাথপুর যাচ্ছি। তুমি কোথায় যাচ্ছো ?"
"চাপড়া ব্লকে পোষ্টিং। জলকল মথুরাপুরে মৃত কলিঙ্গ নদীর উপর একটা ব্রিজ হচ্ছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়রকে নিয়ে ভিজিটে যাচ্ছি। আমরা একটা স্টপেজ আগেই নামব। কলিঙ্গের উৎসটা দেখব। কুন্তী, তুমিও নামতে পারো আমাদের সঙ্গে।"
"কলিঙ্গ তো জলঙ্গির একটা শাখা ?"
"হ্যাঁ। উঠে এসো, আমরা এসে গেছি।"
নেমে পড়ল তিনজন। সম্পদ টোটো দাঁড় করায়।
"আমরা ন'মাইলে কলিঙ্গের উৎসে যাব। দেখা হয়ে গেলে, চাপড়া বাজারে নামিয়ে দেবে। কত দিতে হবে?"
"একশ টাকা দেবেন।"
"বেশি হয়ে গেল না। ঠিক আছে চল।"
"দিনে পাঁচ'শ টাকা আয় হলে, ঘরে তিনশো টাকা নিয়ে যেতে পারি। ভাড়ার টোটো। ২০০টাকা মালিককে দিতে হয়। ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা- সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয়। আমিও ইংরেজিতে এম এ। শেষ বয়সে একবার এস এস সি দিতে পেরেছিলাম। বি এড থাকলে হয় তো, হয়ে যেত । ছেলেটা ফিজিক্সে অনার্স, বি এড। মেয়েটা এন আর এসে নার্সিং-পড়তে ঢুকল। কী যে হবে ! এখন চারিদিকে যা পরিস্থিতি, কী যে হবে!"

কুন্তী মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিল। উত্তর দেওয়ার মতো কোনো কথা জোগালো না মুখে। বয়সের তুলনায় লোকটা অনেক বেশি বুড়িয়ে গেছে। কাশির দমকে টোটোর গতি ধীর হল। ইটভাটার সামনে নামিয়ে দিয়ে বলল, "ওই যে জলঙ্গি দেখা যাচ্ছে, ভাটার পাশ দিয়ে এগিয়ে যান। এই হচ্ছে সুইচ গেট। ২০০০ সালে এই বাঁধ ভেঙে বন্যার জল ঢুকেছিল। কৃষ্ণগঞ্জ, চাপড়া, কৃষ্ণনগর, হাঁসখালি, রানাঘাট ব্লকের মানুষদের কী দূর্গতিতেই না পড়তে হয়েছিল। এখন যদি ওরকম বন্যা হয়, জল সরে যেতে অনেক দিন লেগে যাবে।"
এবছর মার্চ মাস থেকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। চৈতালি ফসলের ক্ষতি যেমন হয়েছে, যথা সময়ে ধান-পাট বীজ বপনের সুবিধা হয়েছে। ইটভাটায় জোরকদমে কাজ হচ্ছে। তাদের বাচ্চারা কাদামাটি নিয়ে খেলছে। একটু বড়ো যারা, তাদের পরণে শুধু প্যাণ্ট। তেলহীন রুক্ষ চুল। মনের আনন্দে খেলছে।
"খুশি হওয়ার জন্য অনেক দামি উপকরণের দরকার পড়ে না, কুন্তী! ক্ষুদ্র-তুচ্ছ নয়তো কিছু, রসটুকু নিতে জানতে হয়। পেটভরে সকালে হয়তো খাওয়া জোটেনি। ওই দেখো, চারটি বাচ্চা একটা থালাতে ভাত খাচ্ছে। সকলের ছোটোটিকে তার থেকে বড়ো যে, সে খাইয়ে দিচ্ছে। বিপরীত মেরুর বাচ্চাদের দেখা যাচ্ছে প্রাচুর্যের চাপে শারীরিক, মানসিক অসুস্থতা। বিচিত্র ভারতবর্ষ !"
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব মৃদুভাষী। এতক্ষণ দেখছিলেন, শুনছিলেন- এবার মুখ খুললেন।
"আচ্ছা সম্পদবাবু, বলুন তো এতগুলো সন্তান হওয়াটা কী উচিত? অভাব যাবে কী করে?"
"হ্যাঁ, উচিত নয়। লেখাপড়ার সুযোগ পায়নি। সচেতনতার অভাব। উড়িষ্যা, বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে ইটভাটায় কাজ করতে আসে। একশ্রেণির দালাল এক ভাটা থেকে অন্য ভাটায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়, ওদের। অনেকটা যাযাবরদের মতো এদের জীবন। সাবধানে নামতে হবে কলিঙ্গের উৎসে।"
শীর্ণ নদী কোনো রকমে বয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক কলিঙ্গের উৎস আগাছায় ঢাকা। জলঙ্গী তার অনেক নীচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ইটভাটা দুইদিক থেকে চেপে ধরেছে কলিঙ্গের মুখ থেকে বাঁধ পর্যন্ত।"
কুন্তী বলে ওঠে, "কলিঙ্গের হাঁ বন্ধ করার আয়োজন ত্রুটিহীন।"

স্নানের ঘাটে এক বয়ষ্কা মহিলা কাপড় ধুচ্ছেন। নদীর ওপাড়টা গড়ছে। ঢাল জমিতে সবুজ শষ্যক্ষেত। নিস্তব্ধ চারিদিক। দূরে দেখা যাচ্ছে সবুজঘেরা গ্রাম। মেঘমুক্ত আকাশ। ওপারের ধ্যান গম্ভীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, কুন্তী তন্ময় হয়ে দেখছে। ভাঁটার বাচ্চারা হৈ হৈ করে নদীর ঘাটের দিকে ছুটে আসছে। কুন্তীর সম্বিৎ ফিরে আসে। ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেট, লজেন্স বের করে বাচ্চাদের দেয়। এইটুকু পাওয়াতে কত খুশি ঝরিয়ে দিল, ওই শিশুরা।
"জলঙ্গীনদী নিয়ে জোর আন্দোলন করছে অনেক সংগঠন"। সম্পদদা তুমি কী এদের কোনোটার সঙ্গে যুক্ত আছো?
কিছুদিন আগে দৈনিক বর্তমানে একটা খবর বেরিয়েছিল- পদ্মার মিষ্টিজল জলঙ্গি, কলিঙ্গ, ইছামতী হয়ে সুন্দরবনে নিয়ে যাবে। মিষ্টি জলের অভাবে সমুদ্রের নোনাজল সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ভীষণভাবে লঙ্ঘিত করছে, সেই সমস্যা সমাধানের জন্য। সম্ভব?"
"অসম্ভব বলে কিছু হয় না। পৃথিবীর অনেক দেশ মৃতনদীকে বাঁচিয়ে তুলেছে । অন্যদেশ পারলে আমরা কেন পারব না? জলসম্পদ সভ্যতার চালিকা শক্তি। নদীমাতৃক দেশ আমাদের, সৎ, দায়িত্ববান লোক, পর্যাপ্ত অর্থ দরকার। নিঃস্বার্থ লোকবল চাই। এই দপ্তরে কাজ করতে এসে অনেক অভিজ্ঞতা হল। কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প খাতে কত টাকা আসে। খাল-বিল সংস্কার, কৃষির উন্নতির জন্য। অবশ্য খাতা কলমে সব হয়ে যায়।"
"কালো বিড়ালটা আসলে নেতা- মন্ত্রীরা। আমলারা পুতুল। আমরা ভিখারি হয়ে পড়েছি। অনুদান, ভাণ্ডার, শ্রী - একেবারে শেষ করে দিল বাঙালি জাতটাকে।"
কুন্তী আর সম্পদ নদীকূলে নেমে এলেও, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব উপর থেকে ছবি তুলতে ব্যস্ত। ক্যামেরায় চোখ রেখে কুন্তী- সম্পদের অন্দরের দূরত্ব মাপার চেষ্টা করছে। তেমন বৈসাদৃশ্য কিছু চোখে পড়ল না।
কুন্তী কলিঙ্গর উৎসের ছবি তুলে নিল। ইটভাটার ও ন' মাইলের বাঁধের ছবি। নদী ধ্বংসে যাদের অবদান রয়েছে, তাই বা বাদ পড়ে কেন!
সম্পদ কুন্তীকে বলে, "চল আমাদের সঙ্গে , মৃত কলিঙ্গকে দেখবে।"
"যাওয়া যেতে পারে। মৃত কলিঙ্গ, জলঙ্গীর জল ইছামতীতে বয়ে নিয়ে যাবে, খবরটা পড়ার পর থেকে নদীটাকে দেখার ইচ্ছা জেগেছিল; সুযোগ যখন এসে গেল, হাত ছাড়া করছি না।"
সম্পদ টোটোওয়ালাকে বলে, "দাদা, এবার মথুরাপুর যাবার টোটোস্ট্যাণ্ডে নামিয়ে দিলেই হবে।"
"মথুরাপুরের কোথায় যাবেন?"
"কলিঙ্গের উপর ব্রিজ হচ্ছে, সেখানে।"
"আগে বলবেন তো। আমার বাড়ি কৃষ্ণপুর। আপনাদের একেবারে খেয়াঘাটে নামিয়ে দেব। খেয়াঘাটে ব্রিজ হচ্ছে। পঁচিশ টাকা করে ভাড়া। মোড়ের মাথায় মিনিট পাঁচেক দাঁড়াব। আর দুইজন যাত্রী নেওয়া যাবে।"
কুন্তী বলে, "ডুমরে, কৃষ্ণপুরের আর একটা নাম, আমি মায়ের কাছে শুনেছি। ওখানকার খেয়ামাঝিদের সঙ্গে মামার বাড়ির ভালো সম্পর্ক ছিল। চেনেন নাকি আপনি?"
টোটোওয়ালা বলে ওরা আমাদের জ্ঞাতিগুষ্টি। সকালে ষষ্টীমাঝির ছোটোছেলের সঙ্গে দেখা। মটরডাল আর গম ভাঙাতে মাধবপুর এল। আমাদের গ্রামের ডাক নাম ডুমরে। কাগজপত্রে কৃষ্ণপুর আছে। মুসলমানরা হিন্দু দেবতার নাম নেবে না; তাই ডুমরে নাম দেয়।"
চাপড়া, বাঙালজি, কলিঙ্গ, পলিয়ানপুর পেরিয়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে পাকা রাস্তা। দুইবছরে রাস্তায় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। টোটোওয়ালা সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে। ডুমরের মোড়ের মাথায় দুজন যাত্রী নেমে গেল। ছোট্টো বাজার পেরিয়ে সম্পদরা নেমে পড়ল। টোটোওয়ালার সঙ্গে তিনজন ঢালাই- এর রড বাঁধা হচ্ছে, সেখানে এসে দাঁড়াল। মাথার চাঁদি ফেটে যাবার মতো রোদ। অগত্যা ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে মাথার উপর ধরল, যে যার। দুই ধার দিয়ে হাঁটু সমান পাটগাছ। জলহীন মধ্যবর্তী নিম্নভূমিতে গরু-মোষ চরে বেড়াচ্ছে।
সম্পদ কুন্তীকে বটগাছের ছায়ায় গিয়ে দাঁড়াতে বলে।
"চলুন দাশগুপ্তবাবু সেকসানগুলো দিয়ে বর্ষার সময় ঠিক মতো জল পাশ হবে কিনা দেখে আসি। আপনার নক্সা অনুসারে কাজ হচ্ছে কিনা, মেপে দেখা যাক।"
দাশগুপ্তবাবু হেড মিস্ত্রীকে ফিতে নিয়ে নক্সা অনুয়ায়ী মাপ ঠিক আছে মেলাতে গিয়ে থমকে যান। ম্যাপে তিনটে সেকশান থাকলেও দুটো সেকশান। আয়তনেও ছোটো।
"মিস্ত্রী এটা কী করে হল, খাতাকলমে নক্সা অনুয়ায়ী মেটিরিয়ালের খরচ দেখানো হয়েছে। বাস্তবের সঙ্গে তো মিলছে না।"
"টেণ্ডারের মালিকের নির্দেশ মতো কাজ করতে হচ্ছে। আপনার প্রশ্নের উত্তর উনিই দিতে পারবেন।"
বুলেট থেকে নামল ষণ্ডামার্কা রঙিন সানগ্লাস পরা দুজন লোক। এগিয়ে আসছে সম্পদের দিকে। মিস্ত্রী বলে, "ওদের সঙ্গে কথা বলুন।"
"নমস্কার স্যার, নমস্কার। আপনারা ভিজিটে আসবেন, আমাকে জানালে টোটোতে কষ্ট করে আসতে হত না। আমাদের ছেলেরা বাইকে করে নিয়ে আসত। রোদ-গরমে খুব কষ্ট হয়েছে। ফকির- ডাব, ঠাণ্ডা যা পাবি নিয়ে আয়।"
সম্পদ প্রতিবাদী কণ্ঠে বলে ওঠে, "আমাদের ওসবের দরকার নেই। আমাদের কাজ এটা। ব্যস্ত হতে হবে না।"
"নিরাশ করবেন না। স্যারের কাছে খবর চলে যাবে। সমস্যায় পড়তে হবে। অত মাফজোকের কী আছে ! কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা দেখে নিন।"
অনুনয়- বিনয় , "স্যার, রিপোর্টে ফল্ট দেখালে উপরমহলের চাপ আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের উপর পড়বে।"
সম্পদ বলে, "আমরা বাস্তবে যা দেখছি রিপোর্ট তাই হবে। ২০০০ সালের বন্যার কথা ভুলে গেলে চলবে না। বন্যা হলে, বিপদে এই অঞ্চলের লোকেরা পড়বে।"
দাশগুপ্ত বাবু বলে ওঠেন "দরকার হলে কাজ বন্ধ রাখতে হবে। সম্পদবাবু ঠিকই বলেছেন।"

কুন্তী, টোটোওয়ালার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক কিছু জেনে নিচ্ছে। কলিঙ্গ সম্পর্কে প্রশ্ন করতেই, টোটোওয়ালা বলে, "কলিঙ্গ, ষষ্ঠী মাঝির ছোটোছেলে মদনমোহনের নখদর্পনে। কাছেই বাড়ি। দেখা করে যান। বলছেন আপনার মামাবাড়ির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক।
"আপনার বাড়ি কতদূর?"
"এক কিলোমিটার হবে।"
"ওনারা আসলে, একসঙ্গে যাব। আপনি স্নান-খাওয়া করে নিন। আমাদের আবার বাসস্ট্যাণ্ডে পৌঁছে দেবেন।"
(ক্রমশ)
আলোকচিত্রঃ লেখিকার কাছ থেকে প্রাপ্ত।
