বিবিধ

শত শতাব্দীর জাদুবিদ্যা (দ্বাবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



জাদুকর শ্যামল কুমার


আমেরিকায় জাদুবিদ্যা (১৭৩৪-১৮৭৫)

"শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ও ক্লাব পারফর্মাররা"

জাদুর জগতে যত নতুন কৌশল আর জটিল হাতসাফাই আবিষ্কার হতে থাকে, ততই শিল্পীদের জন্য সবকিছু রপ্ত করা কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে অনেক খ্যাতিমান জাদুকর নির্দিষ্ট কিছু শাখায় বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন এবং সেখানেই তাঁদের খ্যাতি চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

এদের মধ্যে একজন বিখ্যাত জাদুকর ছিলেন টি. নেলসন ডাউনস (T. Nelson Downs 1867-1938) - 'কিং অফ কয়েনস' নামে যিনি বিখ্যাত হন। তাঁর আশ্চর্যজনক কয়েন-এর খেলা তাঁকে বিচিত্রানুষ্ঠান বা ভাউডেভিল (Vaudeville) মঞ্চের উজ্জ্বল শিল্পীতে পরিণত করে। একসঙ্গে ত্রিশ-বত্রিশটি হাফ-ডলার সহজেই পরিচালনা করার দাবি তাঁকে কিংবদন্তি বানায়। সহকর্মী জাদুকরদের সঙ্গে মত বিনিময়ে তিনি সবসময় আনন্দ পেতেন। জন নর্দার্ন হিলিয়ার্ড (John Northern Hilliard)-এর সঙ্গে যৌথভাবে তিনি 'The Art of Magic' (১৯০৯) গ্রন্থটি লেখেন, যা এখনও জাদুকরদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।

আরেক দিকপাল নেট লিপজিগ (Nate Leipzig 1873-1939) ছিলেন কার্ড ও কয়েন খেলার ওস্তাদ। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি ভাউডেভিল (Vaudeville) মঞ্চ ও ব্যক্তিগত আসরে অসামান্য খ্যাতি অর্জন করেন। আমেরিকার শ্রেষ্ঠ প্রেস্টিডিজিটেটরদের মধ্যে তাঁর নাম সবসময় উজ্জ্বল হয়ে আছে।

কিন্তু মঞ্চে নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ও নিপুণতার দিক থেকে অনন্য ছিলেন কার্ডিনী (Cardini - Richard V. Pitchford 1899-1973) ওয়েলস (Wales) থেকে লন্ডনে এসে তিনি জাদুর দুনিয়ায় প্রবেশ করেন এবং দ্রুতই সাফল্য পান। লন্ডন-এর গামেজ (Gamage's)  ম্যাজিকের দোকানে তাঁর কেরানি হয়ে কাজ শুরু। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় শো-এ সাফল্য লাভ করেন। আর তখন থেকেই তিনি নিজেকে কার্ডিনী (Cardini) বলা শুরু করেছিলেন। তাঁর হাতে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে দেখা যেত - হাতে হঠাৎ বিলিয়ার্ড বল দেখা দিত বা মিলিয়ে যেত, সংখ্যা বাড়ত বা রঙ বদলাত। সিগারেট যেন হঠাৎ করেই উপস্থিত হতো। আর রুমাল নিজে নিজে গিঁটে পরিণত হতো। দর্শকরা এই অদ্ভুত রহস্য দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারতেন না। আরেকজন অ্যাডে ডুভাল (Ade Duval) ছিলেন সিল্কের উপর এক দক্ষ, মহান উদ্ভাবক ও বিশেষজ্ঞ।

অন্যদিকে, একেবারেই ভিন্ন ধারার জাদু পরিবেশনায় খ্যাতি পান 'সেনেটর' ক্লার্ক ক্র্যান্ডাল ('Senator' Clark Crandall), ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা। তাঁর দ্রুতবুদ্ধি, মজার মন্তব্য আর রহস্যে মোড়া জাদু দর্শকদের মন জয় করে নেয়। বহু বছর ধরে তিনি 'The New Tops' পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন এবং আমেরিকার নানা প্রান্তে শো করে দর্শকদের আনন্দে ভরিয়ে দিতেন।

'মাইন্ড রিডিং ও মেন্টালিজম'-এর জাদুকর

মন পড়া ও মেন্টালিজম-এর জগতে তৎকালীন সময়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন থিওডোর অ্যানম্যান (Theodore Annemann), যিনি নিউইয়র্কের বিখ্যাত ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়ায় শো করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি 'The Jinx' নামের এক প্রভাবশালী জাদু-পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, যেখানে তাঁর অসাধারণ মানসিক প্রভাবের কৌশল প্রকাশিত হতো। আজও 'The Jinx' ম্যাগাজিনকে মেন্টালিজম চর্চায় এক অমূল্য ভাণ্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর লেখা বই 'Practical Mental Effects' (নিউ ইয়র্ক, ১৯৪৪) জাদুকরদের জন্য আজও পথপ্রদর্শক।

কিন্তু আরও দীর্ঘ সময় ধরে আলো ছড়ানো একজন কিংবদন্তি ছিলেন জোসেফ ডানিংগার (Joseph Dunninger), যিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত মেন্টালিজমের দুনিয়ায় রাজত্ব করেন। নিউ ইয়র্কের ইস্ট সাইডের দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম নিয়েও শৈশব থেকেই তিনি জাদুর প্রতি আকৃষ্ট হন। কিশোর বয়সে শখের খাতিরে শুরু করা সেই শিল্প তাঁকে একদিন পেশাদার জাদুকরে রূপান্তরিত করে। প্রথমে তিনি সাধারণ জাদুঘরে ও ছোটখাটো ক্লাবে পারফর্ম করতেন। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের শুরুতেই তাঁর চমকপ্রদ মানসিক খেলাগুলো তাঁকে জনপ্রিয় ও বহুল চাহিদাসম্পন্ন করে তোলে। ব্যক্তিগত আসর থেকে শুরু করে অভিজাত ক্লাব - সবখানেই ডানিংগারের ছিল দারুণ সমাদর।

তাঁর পরিবেশনায় দর্শকদের ছোট ছোট কাগজে নিজেদের নাম, সংখ্যা বা গোপন বার্তা লিখতে হতো। সেগুলি ভাঁজ করে প্রত্যেকে নিজের কাছে রাখলেও, কোনোভাবে তিনি সঠিক উত্তর দিয়ে দিতেন। এমনকি চোখ বাঁধা অবস্থায়ও তিনি বারবার এমন নিখুঁত উত্তর দিতেন যে দর্শকরা হতবাক হয়ে যেত।

পরবর্তীতে ডানিংগার তাঁর কার্যক্ষেত্র প্রসারিত করেন রেডিও ও টেলিভিশনে, যেখানে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। কখনও তিনি লাইভ শো-তে দর্শকদের মনে লেখা শব্দ পড়ে ফেলতেন, আবার কখনও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে যাওয়া শিরোনাম আগে থেকেই বলে দিতেন। তিনি সিরিয়াল নম্বরযুক্ত ডলার, লকড্ ভল্টে রাখা জিনিসপত্রের সঠিক অবস্থাও জানিয়ে দিতেন। লক্ষ লক্ষ দর্শক তাঁর টেলিপ্যাথি ও ভবিষ্যদ্বাণীমূলক খেলাগুলো দেখে বিস্মিত হতো।

কিন্তু মঞ্চের বাইরে ডানিংগার ছিলেন একেবারেই ভিন্ন মানুষ। গম্ভীর ভঙ্গি সরিয়ে রেখে তিনি হয়ে উঠতেন সহজ-সরল, প্রাণবন্ত ও বন্ধুবৎসল। তাঁর অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত কয়েন শিল্পী ও ম্যাজিক ডিলার আল ফ্লোসো (Al Flosso) এবং আরও অনেকে।

অসংখ্য জাদুকরের মতে, জোসেফ ডানিংগারই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মেন্টালিস্ট। কয়েক বছর আগে তাঁর মৃত্যু হলেও, তাঁর বহু গোপন রহস্য হয়তো চিরতরে তাঁর সঙ্গেই চলে গেছে।

এই সময়ের আরও বহু শিল্পী ছিলেন, যাঁরা মূলত বক্তৃতা মঞ্চ বা ক্লাব-শো-তে পারফর্ম করতেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম আল বেকার (Al Baker), যিনি একজন সর্বগুণসম্পন্ন বিনোদনশিল্পী। জাদুর পাশাপাশি তিনি দক্ষ ভেন্ট্রিলোকুইস্টও ছিলেন এবং বিশেষভাবে শিশুদের জন্য জাদু পরিবেশনায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আশি বছর বয়স পর্যন্ত তিনি রীতিমতো সক্রিয় ছিলেন। তাঁর লেখা বই 'Magical Ways and Means' জাদুশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে।

'সাইলেন্ট' মোরাহ্ এবং জন মুলহোল্যান্ড

Redpath সম্প্রদায়ের এক বিখ্যাত জাদুকর, যিনি সহকর্মী জাদুকরদের কাছ থেকে বিপুল সম্মান পেয়েছিলেন - তিনি হলেন 'সাইলেন্ট' মোরাহ্ ('Silent' Mora)। শিকাগো থেকে আগত হলেও তিনি সবসময় চীনা পোশাকে অভিনয় করতেন। মোরাহ্ নিজেই তাঁর চীনা ধাঁচের জাদু সামগ্রী তৈরি করতেন, যেগুলো ছিল অভিনব ও চমকপ্রদ। আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর হাতে বানানো সেই কৌশলী সামগ্রীর কিছু কিছু এখনও পাওয়া যায়।

আরেকজন বহুমুখী শিল্পী, যাঁর নাম জাদুশিল্পের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, তিনি হলেন জন মুলহোল্যান্ড (John Mulholland)। শুরুতে তিনি ছিলেন শিক্ষক, কিন্তু ধীরে ধীরে বক্তৃতার মাধ্যমে জাদুর জগতে প্রবেশ করেন। ক্লাব ও বিভিন্ন সমাজে তিনি একাধারে ছিলেন দক্ষ বক্তা ও জনপ্রিয় জাদু-শিল্পী। বহু বছর তিনি 'The Sphinx' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, যা সেই সময় আমেরিকার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ জাদু বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ছিল।

জন মুলহোল্যান্ড ছিলেন এক নিখুঁত পারফর্মার, জাদুর ইতিহাসের এক নিষ্ঠাবান গবেষক এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা জাদুগ্রন্থ, সামগ্রী ও স্মারক সংগ্রাহক। তাঁর রেখে যাওয়া ঐতিহ্য আজও জাদুকরদের কাছে অমূল্য সম্পদ। নিউ ইয়র্কের 'দ্য প্লেয়ার্স' ক্লাবের গ্রন্থাগারে এখনও সংরক্ষিত আছে জন মুলহোল্যান্ড কালেকশন - যেখানে জাদুবিদ্যার বিস্ময়কর সব বই, সামগ্রী ও স্মৃতিচিহ্ন রাখা আছে।

(ক্রমশ)