বিবিধ

সুখ-দুঃখের দোলাচলে - চৈতন্যের সন্ধান



সৌমিত্র মজুমদার


মহাভারতের একটা শ্লোকে লেখা আছে -

"সুখং বা যদি বা দুঃখং প্রিয়ং বা যদি রাপ্রিয়ম্।
প্রাপ্তং প্রাপ্ত মুপাসীত হৃদয়ে না পরাজিতা।।
"

অর্থাৎ সুখ-দুঃখ, প্রিয়-অপ্রিয় জীবনে যা আসুক সেটাকে অপরাজিত হৃদয়ে ধারণ করে নিও।

কিন্তু সুখ-দুঃখের এতই মহিমা যে দুঃখ লুকিয়ে হাসা গেলেও সুখ লুকিয়ে কাঁদা যায় না। কারণ দুঃখ সুখের সন্ধানে থাকে অথচ সুখ দুঃখ থেকে পালিয়ে বেড়ায়।

"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।
"

এক দুঃখী মনের বিরহ যন্ত্রণায় বিষাদ জনিত দুঃখে প্রশ্ন জাগে কার শান্তি? কিসের শান্তি? এমতাবস্থায় কার আনন্দ? কিসের আনন্দ? -সবই কি এক বিশাল শূণ্যতার অদৃশ্য হাতছানি না মরীচিকার চিরকালীন শাশ্বত সান্ত্বনা?

গীতা এই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন -

"আত্মৌপম্যেন সর্বত্র সমং পশ্যতি যোহর্জুন।
সুখং বা যদি বা দুঃখং স যোগী পরমো মতঃ।।
"

অর্থাৎ হে অর্জুন, সুখই হোক, দুঃখই হোক যিনি নিজের তুলনায় সকলের (অন্যের) প্রতি সমদর্শন করেন সেই যোগীই আমার মতে শ্রেষ্ঠ। (গীতা ৬-৩০/৩১/৩২)

অর্থাৎ দেখতে হবে, খুঁজতে হবে তোমার চাইতে বেশি দুঃখী কে বা কারা। তাদের দুঃখে বিচলিত হলে, সমব্যথী হলে, সহায়তা করলে অনেকাংশে দুঃখ লাঘব হবে। আনন্দের প্রাপ্তি হবে।

"আনন্দাদ্ধোব খদ্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে" এবং "আনন্দং প্রয়ন্তি অভিসংবিশন্তি।” (তৈত্তেরীয় উপনিষদ ৩/৬) কিন্তু সেই আনন্দ দুঃখকে বর্জন করে নয়। দুঃখকে আত্মসাৎ করার আনন্দ। সুখ শব্দটার অর্থ তখনই হারাবে যদি এটি দুঃখের সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ না হয়। জীবন দেবতার সঙ্গে জীবনের সুখকে পৃথক করে দেখলেই দুঃখ, মিলিয়ে দেখলেই আনন্দ বা মুক্তি। রবীন্দ্রনাথও জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছেন। তিনি নিজেই লিখেছেন "দুঃখের আঁধার বারে বারে এসেছে আমার দ্বারে।" তাই তিনি বলেছেন "সংসারকেই বড় আশ্রয় বলে ভেবো না এবং কঠিন দুঃখ বিপদে ভক্তির সঙ্গে তাঁকে প্রণাম করে তাঁর কাছে আত্মসমর্পন করতে শেখো। প্রতিদিনের সুখ-দুঃখে তাঁকে প্রণাম করার অভ্যাস রেখো। নিজেকে দুঃখী বলে চিন্তা করলে দুঃখের কালিমা বেড়ে ওঠে।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন "এই দেহ ধারণ করে কত সুখে-দুঃখে-কত সম্পদ-বিপদের তরঙ্গে আলোড়িত হবি। কিন্তু জানবি, ও-সব মুহূর্তকাল স্থায়ী। ওই সকলকে গ্রাহ্যের ভেতরে আনবিনি, 'আমি অজর অমর চিন্ময় আত্মা।'-এই ভাব হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে জীবন অতিবাহিত করতে হবে। 'আমার জন্ম নেই, আমার মৃত্যু নেই, আমি নির্লেপ আত্মা'-এই ধারণায় একেবারে তন্ময় হয়ে যা। একবার তন্ময় হয়ে যেতে পারলে দুঃখ-কষ্টের সময় আপনা আপনি ওই ভাব মনে পড়বে, চেষ্টা করে আর আনতে হবে না।" (বাণী ও রচনা- স্বামী বিবেকানন্দ ৯ম খণ্ড পৃষ্ঠা ৯৬)

মানুষের সুখ-দুঃখের অনুভূতি কোথায়, কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি? এর উত্তরে সুখ-দুঃখের অনুভূতি ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মনো-বৈজ্ঞানিকরা তিন ধরণের নিউরো ট্রান্সমিটারের কথা বলেছেন। সেগুলো হোল 'ডোলাসিন', 'সেরোটনিন' এবং 'নরত্রপিনেফ্রোইন'। আরো অনেক জটিল কিছু আছে কিন্তু প্রধানতও এই তিনটিকেই মুখ্য বলা হয়। এ নিয়ে বৈজ্ঞানিকরা এখনও রিসার্চ করে চলেছেন কিন্তু এখনও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। সুখ-দুঃখ পরিমাপের কোনো সঠিক পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হয়নি। এখন এ-আই টেকনোলজিও মানুষের মন নিয়ে রিসার্চ করছে। কেন মানুষ অতিরিক্ত সুখ বা দুঃখ সহ্য করতে পারে না?

এখন সংক্ষেপে সুখ এবং দুঃখকে পৃথক ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করব। যদিও সুখ ও দুঃখ টাকার এ পিট আর ওপিট। সেই আদিকাল থেকে মুনি-ঋষিরা, দার্শনিকরা, বৈজ্ঞানিকরা সুখের সন্ধানে প্রকৃত সুখ কি তা জানতে চেয়েছেন।

ছন্দোগ্য উপনিষদে (৭/২৩) অধ্যায়ে "নারদ-শনৎকুমার সংবাদে" ভূমাতত্ত্বের কথা জানতে পারি। 'ভূমা' শব্দের অর্থ বিশালতা, ব্যাপকতা, বা অসীমতা। সর্ববিদ্যাবিশারদ, ভক্তি শিরোমণি নারদ আত্মবিদ্যা লাভের জন্য ঋষি সনৎকুমারের কাছে এসেছেন। প্রণাম করে নারদ বললেন "প্রভু আমি অনেক মন্ত্র, অনেক গ্রন্থ আবৃত্তি করেছি কিন্তু আত্মবিদ্যা আমার আয়ত্ত হয়নি। তাই আমি শোকগ্রস্থ'। আপনি আমাকে উপদেশ দিন। সনৎকুমার উপদেশ দিলেন "যো বৈ ভূমা তৎ সুখম। নায়ে সুখমস্তি। ভূমৈব সুখম।" (ছান্দোগ্য উপ: ৭/২৩/১) ভূমাই সুখ (আনন্দ) অল্পে (অন্য কিছুতে) সুখ নেই। সুতরাং "ভূমা ত্বৈব বিজিজ্ঞসিতব্য।" অর্থাৎ তুমিই তোমার উপলব্ধির বিষয় হওয়া উচিৎ। সীমার মধ্যে সুখ নেই- "ভূমৈব সুখম"। কিন্তু ভূমাকে কোথায় পাব? তিনি সুখের স্বরূপ ভূমানন্দের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে বলেছেন "ভূমাকে আহারে-বিহারে, আচারে-বিচারে, ভোগে-নৈবেদ্যে, তন্ত্রে-মন্ত্রে লাভ করা যায় না। -তাকে পেতে হয় বিশুদ্ধ জ্ঞানে, বিশুদ্ধ প্রেমে, বিশুদ্ধ কর্মে। এর জন্য সাধনার প্রয়োজন- তবে অনুষ্ঠানে নয়, নিজের চিন্তায় ও কর্মে সেই পরম ভূমার সাধনা। আমার মধ্যে যে মহান আত্মা আছেন, যিনি জরা-মৃত্যু-শোক-ক্ষুধা-তৃষ্ণার অতীত তাঁকে অন্বেষণ করতে হবে। বাউল কবি সেই কথাই বলেছেন - "মনের মানুষ মনের মাঝে করো অন্বেষণ"।

ভূমাকে লাভ করার জন্য লোকালয় ত্যাগ করে গিরি-গহ্বরে যাবার প্রয়োজন নেই। ভূমার জন্য যে সাধনার প্রয়োজন তা হল মানসিক সাধনা অর্থাৎ মন যাকে স্বীকার করে তাই। ভূমা বা আনন্দ আছে মানুষের মনে। এই সুখ অনাবিল সুখ নয় সুখ-দুঃখ মিশ্রিত। মানব জীবনের তিনটি পর্যায় বা স্বরূপ- শান্তম, শিবম, অদ্বৈতম। শান্তম হল নিরবিচ্ছন্ন সুখের পর্যায়, শিবম- জীবন সংগ্রামের পর্যায় (অর্থাৎ সুখ-দুঃখ ভরা) অদ্বৈতম হল- সুখ বা আনন্দের পর্যায় অর্থাৎ জীবনের সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা, শোক ইত্যাদিতে সবকিছুতেই আনন্দ (সুখ)। তাই সুখও আনন্দ, ব্যথা-বেদনা ভরা সংঘাত মুখর সুখ (আনন্দ)। -"রুদ্র যত্তে দক্ষিনং মুখং পাহি নিত্যম। অর্থাৎ দুঃখকে স্বীকার করেই তাকে অতিক্রম করতে হবে তাহলেই সুখ বা আনন্দকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে।

পৃথিবীতে পশ্চিম দেশেও বিভিন্ন দার্শনিকরা সুখের অন্বেষণ করেছেন এবং নিজের মতো করে মত ব্যক্ত করেছেন। সংজ্ঞা নিরুপণ করেছেন। পরন্ত সুখের সন্ধানে তাদের মতবাদ সর্বমান্য হয়নি। এরা সবাই এক বিষয়ে ঐক্যমত যে জীবনের পরম কাম্য বস্তু অর্থাৎ সুখ কামনা করা এবং দুঃখকে ত্যাগ করা মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। সুখ ও দুঃখ। এই কথাটি বিখ্যাত দার্শনিক 'মিল' এক অর্থে ব্যবহার করেছেন। সকলের সুখ আমাদের কাম্য সে বিষয়ে প্রমাণ দিয়ে 'মিল' বলেছেন যে প্রত্যেক ব্যক্তির সুখ তার কাছে ভালো তাই সকলের সুখ সমষ্টিগতভাবে সকলের ভালো। মিলের সঙ্গে 'বেস্থামের' প্রধান পার্থক্য ছিল সুখের গুণগত বিভাগ রেখে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। তাই প্রাণের ধর্ম ও প্রাণিজগতের ক্রমিক অভিব্যক্তির ধারা সম্বন্ধীয় ইতিহাসের জ্ঞান না থাকলে জীবনের আদর্শ ও কর্তব্যগুলো নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। সুখ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন 'জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত সরল করে না আনতে পারলে জীবনে যথার্থ সুখ পাওয়া যায় না।' কিন্তু যথার্থ সুখ বলতে কি বুঝি?

প্রকৃত সুখ একটা মানসিক অবস্থা। যা অনুভূতি, ভালোবাসা, তৃপ্তি, সন্তুষ্টি এবং আনন্দ বা উচ্ছ্বাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ম্যাথু রিকার্ড মাত্র ৬৪ বৎসর বয়সে একজন অণুজীব বিজ্ঞানী হিসাবে পরিচিত। তিনি একাধারে লেখক, আলোক-চিত্রশিল্পী, গবেষক, অনুবাদক ও একজন ধর্মপ্রাণ ভিক্ষু এই মানুষটিই নাকি বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। তাঁর ধ্যানমগ্ন জীবনদর্শনই প্রকৃত সুখের চাবিকাঠি। সুখের উৎস এবং পরিমাপ করা আধুনিক বিজ্ঞানে চেষ্টা চলছে কিন্তু এখনও সফলতা অর্জন করা যায়নি। অষ্টাদশ শতকে সুখ বলতে বোঝা যেত 'সমৃদ্ধি, উন্নতি এবং সুস্থতা'। ভারতীয় দর্শন বলছে সুখ বাইরে নেই। জাগতিক সুখ প্রকৃত সুখ নয়। মানুষকে নিজের মধ্যেই সুখ খুঁজতে হবে।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন- “সংসারে সুখ তো দেখছো যেমন আমড়া, কেবল মাটি আর চামড়া" তাদের মধ্যে নৈতিকবিধি কেবল প্রাণীবিদ্যার (Biology) নীতি থেকে লাভ করা যায় ইত্যাদি। হার্বাট স্পেন্সারের মতে প্রাণীজগতের ক্রমিক পরিবর্তনের এক বিশেষ অবস্থায় মানুষের আবির্ভাব। তিনি বলেন প্রাণশক্তি এক বিশেষ শক্তি। এটি এক আত্মরক্ষা এবং বংশ ও জাতি রক্ষা করার শক্তি। তাঁর মতে বংশরক্ষা এবং সুখপূর্ণ সুদীর্ঘ জীবন লাভ করা প্রাণীদের একমাত্র উদ্দেশ্য। যখনই প্রাণী প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করতে সমর্থ হয় সে সুখ অনুভব করে। যখন সে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করতে অসমর্থ হয়, তখন সে দুঃখ ভোগ করে। সুখলাভ দুঃখের হাত থেকে মুক্তি জীবের একমাত্র কাম্য।

স্পেন্সার সুখবাদী হলেও আত্মমুখবাদী ও পরসুখবাদের এক সমন্বয় করেছেন।

স্পেন্সারের মতবাদ এবং স্টিফেন ও আলোকজান্ডারের মতবাদের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে পার্থক্য বিদ্যমান। ওদিকে সিজউইক (Sidgwick)। তিনি একজন সুখবাদী। তবে তার সুখবাদ বেস্থাম ও মিলের সুখবাদের ন্যায় মনোবিজ্ঞান সম্মত সুখবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। তিনি মনোবিজ্ঞান-সম্মত সুখবাদ খণ্ডন করেন। তিনি বলেন সুখকাঙ্খা দুঃখ সৃষ্টি করে। এভাবে তিনি প্রমাণিত করেছেন যে মনোবিজ্ঞান সম্মত সুখবাদ যুক্তিসঙ্গত মতবাদ নয়।

কিন্তু সুপ্রাচীন ভারতীয় বৈদিক দর্শন বিশ্বের সমস্ত প্রাণীদের 'বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায়' প্রসঙ্গে বলেছেন -

"সর্বেহত্র সুখিনঃ, সর্বে সম্ভ নিরাময়াঃ।
সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্ত মা কশ্চিৎ দুঃখ মাথুয়াৎ।।
"

সকলে সুখী হোক, সকলে নীরোগ হোক, সকলের মঙ্গল হোক। কেউ যেন দুঃখ প্রাপ্ত না হয়।

সুখের বিপরীতে দুঃখের অবস্থান। দুঃখ প্রসঙ্গে স্বামী প্রেমেশানন্দ উপনিষদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন "মানুষের দুঃখ তিন প্রকার আধ্যাত্মিক। আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক।

আধ্যাত্মিক: আত্মার অর্থাৎ নিজের দেহ-মন-বুদ্ধিতে যে দুঃখ উৎপন্ন হয় তাহা আধ্যাত্মিক দুঃখ। যেমন দেহে রোগ-জরা-মরণ; মনে রাগ, দ্বেষ, লোভ; বুদ্ধিতে- জ্ঞানী, অজ্ঞান, উচ্চনীচ, ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, গৃহস্থ, সন্ন্যাসী ইত্যাদি ভেদ বুদ্ধিজাত বেদনা।

আধিভৌতিক: ভূতগন অর্থাৎ জীবগণ হতে যে দুঃখ জন্মে যেমন মশা, মাছি, চোর-ডাকাত, হিংসুক, নিন্দুক প্রভৃতির উপদ্রব।

আধিদৈবিক: যে দুঃখ দেবতার কোপে হয়ে থাকে। অনাবৃষ্টি, ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, বজ্রপাত ইত্যাদি প্রাকৃতিক উপদ্রব- একে ত্রিতাপ বলে।

এই তিনপ্রকার দুঃখ জ্ঞান হলে সম্পূর্ণ রূপে দূর হয়। জীবন পথের পথিক আমরা, কিন্তু এই পথেরও শেষ আছে। মহাসিন্ধুর ওপারে ওই যে দেখা যায় আনন্দধাম।

"পুত্রদারাপ্তবন্ধুনাং সঙ্গমঃ পাসঙ্গমঃ।
অনুদেহং বিয়ন্তেতে স্বনো নিদ্রানুগো যথা।।
"
(শ্রীমদ্ভাগবত ১১/৭/৫৩)

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভাগবতে ভক্ত উদ্ভবকে বলেছেন 'প্রিয় উদ্ভব, এ সংসার আত্মীয়-পরিজন বেষ্টিত এক পান্থশালা। এতে ভুলে থেকো না, এসবই অনিত্য, ক্ষণভঙ্গুর। আমরা আসি, নিজ নিজ কর্ম শেষে যে যার গন্তব্যে চলে যাই। এখানে কেউ কারো সঙ্গী নয়। দুদিনের রঙ্গমঞ্চ মাত্র।

গীতাতে দুঃখ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে -

"দুঃখেযুনুদ্ধিগমনাঃ সুখেন্দু বিগত স্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধ স্থিতধীমুনিরুচ্যতে।।
"
(গীতা ২/৫৬)

হয়। অর্থাৎ যিনি দুঃখে উদ্বেগ শূণ্য, সুখে যিনি স্পৃহা শূণ্য যার অনুরাগ, ভয় এবং ক্রোধ নিবৃত্ত হয়েছে তাঁকে স্থিত প্রজ্ঞ বলা হয়।

কিন্তু গীতার এই বাণী কি সাধারণ শোকগ্রস্থ মানুষকে এত সহজে শাস্তি প্রদান করতে পারে? মানুষের মধ্যে যে দুঃখ আছে কিন্তু তার মতো করে কি কেউ সে দুঃখ বুঝতে পারে? সমব্যথী হতে পারে? 'চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে'?

হ্যাঁ অবশ্যই পারে। মহাকালের চিরন্তন সান্তনা-

"সত্য মঙ্গল প্রেমময় তুমি, ধ্রুবজ্যোতি তুমি অন্ধকারে।
তুমি সদা যার হৃদে বিরাজ, দুঃখ জ্বালা সেই পাশরে -
প্রভু দুঃখ জ্বালা সেই পাশরে।
"

সন্ত কবীর বলেছেন যে মুর্খরাই নিজ অন্তরের পরিবর্তে বাইরে সুখ ও শান্তির সন্ধান করে থাকে। আমাদের কর্তব্য হল চেতনার অন্তরালে সেই চৈতন্যর সন্ধান করা, যাকে বলা হয় পরম চৈতন্য। প্রত্যেকেই অসীম সুখ এবং শান্তি চায়, অথচ সেই পরম সত্যটি আমাদের সকলের মধ্যেই বর্তমান। বাইরের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুগুলি শুধুমাত্র অস্থায়ী সুখের সন্ধান প্রদান করে, যা কখনও চিরস্থায়ী হয় না।

তবুও দেখি -
"আপন সৃষ্টির' পরে
বিধাতার নির্মম অন্যায়।
কিংবা এ কি মহাকাল
কল্পকল্পান্তের দিনে রাতে
এক হাতে দান করে ফিরে
ফিরে নেয় অন্য হাতে।
সঞ্চয়ে ও অপচয়ে
যুগে যুগে কাড়াকাড়ি যেন -
কিন্তু কেন?
তার পরে চেয়ে দেখি
মানুষের চৈতন্য জগতে
ভেসে চলে সুখ-দুঃখ
কল্পনা ভাবনা কত পথে।
কোথাও বা জ্বলে ওঠে
জীবন উৎসাহ,
কোথাও বা সভ্যতার
চিতাবহ্নিদাহ
নিভে আসে নিঃস্বতার
ভষ্ম অবশেষে
নির্ঝর ঝরিছে
দেশে দেশে...
কিন্তু কেন?
"
(রবীন্দ্রনাথের 'কিন্তু কেন' কবিতার কিছু অংশবিশেষ)

এই বিশ্বসংসারের মানুষদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ১৮৮৪ সালের ১লা জানুয়ারি অসুস্থ শরীরে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে বৃক্ষের নীচে উপস্থিত ভক্তদের আশীর্বাদ করে বলেছিলেন "তোমাদের চৈতন্য হোক।” যে চৈতন্য লাভ করতে হলে মানুষকে কঠিন সাধনা করতে হয়, সেটাই সহজ লভ্য করে দিলেন কল্পতরু হয়ে। সেই থেকে আজও ১লা জানুয়ারি কল্পতরু উৎসব পালিত হয়।

কিন্তু কি এই চৈতন্য?

চৈতন্য একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ চেতনা। এর অর্থ আত্মা, বুদ্ধি, শক্তি, উৎসাহ বা সংবেদন। -যোগে প্রকাশিত ব্রহ্মের মৌলিক স্বরূপই চৈতন্য। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছিলেন "অদ্বৈত জ্ঞান না হলে চৈতন্য দর্শন হয় না। চৈতন্য দর্শন হলে তবে নিত্যানন্দ। পরমহংস অবস্থায় এই নিত্যানন্দ।"

চৈতন্য দুই প্রকার। উপহিত (আহত, নষ্ট বা বিগ্নিত) চৈতন্য জীব ও অনুপাহিত চৈতন্য পরমাত্মার একই চৈতন্য-সত্তায় পর্যবসিত হয়। এই জ্ঞান যখন অনুভূত হয় তখন সেই স্ব-স্বরূপে স্থিত জ্ঞানীকে কোনোরূপ ক্লেশ স্পর্শ করতে পারে না। শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বলেছেন-

"স্বপ্নজাগরিতে সুপ্তিং ভাবাভাবৌ ধিয়াং তথা।
যো বেত্যবিক্রিয়র সাক্ষাৎ সোহমিত্যবধারয়।।
" (২২)

অর্থাৎ যে অধিকারী-সত্তা জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি এবং বুদ্ধি সমূহের ভাব ও অভাবকে সাক্ষাৎ রূপে জানেন, সেই চৈতন্যই আমি এরূপ অবধারণা করো।

'ত্বম্' পদে যে চৈতন্যসত্তা লক্ষিত হয়, তা অবধারণের জন্য সাক্ষী চৈতন্যকে অবধারণ করতে বলেছেন।

সাধারণ দৃষ্টিতে মন-বুদ্ধির কার্য দেখে তাদের চৈতন্য বলে ধারণা হয়। পরন্তু ওইগুলি চৈতন্যের সান্নিধ্যে তদ্ধত ক্রিয়াশীল হয়। শ্রীরামকৃষ্ণদেব যেমন বলতেন- অগ্নিযোগে আলু-পটল জড় হলেও লাফায়। সেরূপ মন- বুদ্ধি যে চৈতন্যের সান্নিধ্যে ক্রিয়াশীল। সেই চৈতন্য সত্তাই জীবের প্রকৃত স্বরূপ ও 'ত্বম্' পদের লক্ষ্যার্থ।"

এইভাবে দেহী হলো চেতন, আত্মা। আত্মা যে চেতন সে সম্বন্ধে শ্রুতি বলছেন- "সত্যং জ্ঞান মনন্তং ব্রহ্মা" শ্রীরামকৃষ্ণাদেব এই কথাটাই সহজ করে বলেছেন "চৈতন্যের দ্বারা চৈতন্যের সাক্ষাৎ।"

তিনি বলতেন "ছোকরাদের এত ভালোবাসি কেন জান? ওরা খাঁটি দুধ, একটু ফুটিয়ে নিলেই হয়- ঠাকুরসেবায় চলে। জোলো দুধ অনেক জ্বাল দিতে হয়- অনেক কাঠ পুড়ে যায়।

ছোকরারা যেন নতুন হাড়ি- পাত্র ভালো- দুধ নিশ্চিত হয়ে রাখা যায়। তাদের জ্ঞানোপদেশ দিলে শীঘ্র চৈতন্য হয়। বিষয়ী লোকদের শীঘ্র হয় না। দইপাতা হাড়িতে দুধ রাখতে ভয় হয়।"

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন চৈতন্যকে জড়ের ভূমিতে টেনে না এনে- জড়কে চৈতন্যে পরিণত কর। অন্ততঃ প্রত্যহ একবার করে সেই চৈতন্যরাজ্যের- সেই অনন্ত সৌন্দর্য, শান্তি ও পরিত্রতার রাজ্যের একটু অভ্যাস পাবার এবং দিনরাত সেই ভূমিতে বাস করবার চেষ্টা কর। অস্বাভাবিক আলৌকিক কিছু খুঁজো না, ওগুলো পায়ের আঙুল দিয়েও স্পর্শ করো না। তোমাদের আত্মা দিবারাত্র অবিচ্ছন্ন তৈলধারার ন্যায় তোমাদের হৃদয় তোমাদের হৃদয়সিংহাসনবাসী সেই প্রিয়তমের পাদপদ্মে গিয়ে সংলগ্ন হতে থাকুক, বাকী যা কিছু, অর্থাৎ দেহ প্রভৃতি- তাদের যা হবার হোক গে।"

"কি কাজে এসেছি কি কাজে গেল,
কে জানে কেমন কি খেলা হল।
প্রবাহের বারি রহিতে কি পারি,
যাই-যাই-কোথা? কুল কি নাই,
কর হে চেতন কে আছ চেতন,
কত দিনে আর ভাঙ্গিবে স্বপন?
কে আছ চেতন ঘুমাও না আর,
দারুণ এ ঘোর নিবিড় আঁধার।
কর তম নাশ হও হে প্রকাশ
তোমা বিনে আর নাহিক উপায়
তব পদে তাই শরণ চাই।।
"

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।