বিবিধ

মহাভারতের বিশিষ্ট প্রতিনায়কঃ দুর্যোধন



স্বপ্না সেন


ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দুর্যোধন হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসনে নিজেকেই উত্তরাধিকারী হিসাবে দেখতে চেয়েছিলেন। এই ব্যাপারে তিনি এতটাই অনমনীয় ছিলেন যে উদার, বীর, সাহসী, বন্ধুপ্রেমী এবং প্রজানুরঞ্জক হওয়া সত্ত্বেও পাণ্ডবদের ন্যায্য দাবি সম্পর্কে কোনও আপস করতে চাননি। অথচ সেকালের আইন অনুসারে দুর্যোধন কোনও ভাবেই রাজ্য পাওয়ার অধিকারী নন। কারণ বয়সে পাণ্ডুপুত্র যুধিষ্ঠির বড়ো। আবার ধৃতরাষ্ট্র রাজসিংহাসনে কাজেই দুর্যোধন রাজার ছেলে হিসেবে রাজ্য পাবেন এখানেও প্রশ্ন ওঠে। কারণ ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন। 'মনু সংহিতা'র অনুশাসন বলে অন্ধ ব্যক্তি রাজ্যশাসন করতে পারেন না। পাণ্ডুর মৃত্যুর পরে ধৃতরাষ্ট্র রাজপ্রতিনিধি হিসাবে রাজ্য চালাচ্ছিলেন। কাজেই সিংহাসনে দুর্যোধনের দাবী অযৌক্তিক।

ধৃতরাষ্ট্র পঞ্চপাণ্ডবকে অরণ্যবাসী ঋষিদের কথায় এবং বিদুরের পরামর্শে রাজবাড়িতে আশ্রয় দিলেন। কিন্তু অন্তরের অন্তঃস্থলে পাণ্ডবদের প্রতি তাঁর বিশেষ স্নেহ ছিল না। ভীষ্ম তখনও হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে সর্বেসর্বা। তাঁর তত্ত্বাবধানে কৌরব ও পাণ্ডব ভ্রাতারা যথোপযুক্ত শিক্ষা পেতে লাগলো। অবশ্য দুর্যোধন ভীমকে তাঁর শক্তিমত্তার জন্য অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। তিনি মনে করতেন যে ভীমকে মেরে ফেলতে পারলে তাঁর সিংহাসন লাভের অন্যতম কাঁটাটিকে তিনি উপড়ে ফেলতে পারবেন। এই লক্ষ্যে তিনি চেষ্টাও করেছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হন। ভীম এবং দুর্যোধনের পারস্পরিক ঘৃণা ও শত্রুতা কালক্রমে আরও বৃদ্ধি পায়। মাতুল শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন বারণাবতে দাহ্য পদার্থ দিয়ে এক জতুগৃহ নির্মাণ করেন। সেখানে কুন্তীসহ পাণ্ডুপুত্রদের প্রমোদ ভ্রমণে প্রেরণ করেন। গভীর রাতে জতুগৃহে আগুন লাগানো হয়। বিদুরের দূরদর্শিতায় কুন্তী ও পাণ্ডবরা সেযাত্রা রক্ষা পান।


কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে কুরু দরবারে দুর্যোধন কৃষ্ণকে অপমান করছেন। শিল্পীঃ রাজা রবি বর্মা।

ইতিমধ্যে হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কর্ণ নামে এক অধিরথপুত্র দুর্যোধনের গভীর বন্ধুরূপে হস্তিনাপুরে সমাসীন হয়েছেন। তিনি বীর এবং দুর্যোধন অঙ্গরাজ্যের রাজা হিসাবে তাঁকে মর্যাদা দিয়েছেন। দুর্যোধন, কর্ণ, শকুনি এবং দুঃশাসন একটা পাণ্ডববিরোধী গোষ্ঠীও তৈরি করেছেন। ধৃতরাষ্ট্র এদের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল। ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন সুবুদ্ধি দেওয়ার। কিন্তু সবই নিষ্ফল। অন্যদিকে বারণাবতে অগ্নিকাণ্ডের পরে দাবানলের মতো এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল যে কুন্তীসহ পাণ্ডবরা মৃত। ধৃতরাষ্ট্র ধুমধাম করে শ্রাদ্ধ করলেন। এখন তিনি নিশ্চিন্ত। দুর্যোধন রাজা হবেই। একমাত্র বিদুর নিশ্চুপ।

এর বেশ কিছুকাল পরে খবর আসে যে রাজা দ্রুপদ দ্রৌপদীর জন্য সয়ম্বর সভার আয়োজন করেছেন। যা পরিশেষে দ্রৌপদীর সঙ্গে পঞ্চপাণ্ডবের বিবাহে নিষ্পন্ন হয়। ফলে প্রকাশ পায় যে পাণ্ডবরা জীবিত আছেন। রাজনীতি ও ভাগ্যের চালে এখানে দুর্যোধন পরাস্ত হয়েছেন। ফলে কুরুকুলের বৃদ্ধদের চাপে ও জনমতের চাপে দুর্যোধনকে পিছু হটতে হল। ধৃতরাষ্ট্র রীতিমতো নম্র হয়ে দ্রৌপদীসহ পাণ্ডবদের আমন্ত্রণ করলেন। আর অর্ধেক রাজ্য হিসাবে পাণ্ডবদের হাতে ঊষর মরুক্ষেত্র তুলে দিলেন। কিন্তু সেই অনুর্বর মরুরাজ্যেই পাণ্ডবরা গড়ে তুললেন ইন্দ্রপ্রস্থ নগরী। এমনকি কৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রার সাথে অর্জুনের বিবাহ হওয়ার ফলে কৃষ্ণও পাণ্ডবদের শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠলেন। কালক্রমে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে, পাণ্ডবদের ঐশ্বর্যে এবং পরাক্রমে দুর্যোধন হিংসায় ছিন্নভিন্ন হতে লাগলেন।


দুর্যোধন (সবুজ রঙের পোশাক পরিহিত) দুঃশাসনের নেতৃত্বে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করছেন। শিল্পীঃ রাজা রবি বর্মা।

পরশ্রীকাতরতায় অস্থির হয়ে শকুনি ও কর্ণের সাথে দুর্যোধন পরামর্শ করতে লাগলেন কিভাবে পাণ্ডবদের রিক্ত দরিদ্র করা যায়। এইখানে মহাভারতকার ব্যাসদেব ধীরে ধীরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দুর্যোধনের উগ্রস্বভাব এবং পাণ্ডববিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে মহাভারতের অন্তিম পর্বের ভূমি প্রস্তুত করতে লাগলেন।

যুধিষ্ঠির ধর্মরাজ কিন্তু পাশাখেলায় তাঁর তীব্র আসক্তি। অথচ পাশা খেলায় তিনি মোটেই নিপুণ নন। যুধিষ্ঠিরের এই দুর্বলতাকে অস্ত্র করে দুর্যোধন ধৃতরাষ্ট্রকে বাধ্য করলেন পাশা খেলার আয়োজন করতে। এ এক মর্মান্তিক পর্ব। যুধিষ্ঠির পাশাখেলায় রাজ্য, ভ্রাতা, দাসদাসী এমনকি দ্রৌপদীকে বাজি রেখে পরাজিত এবং নিঃস্ব হন। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতো লজ্জাজনক ঘটনা ঘটল কুরুকুলের যাবতীয় বৃদ্ধদের সামনে। একমাত্র কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে সেই অপমান থেকে রক্ষা করেন। দ্রৌপদীর তেজে ভীত হয়ে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডবদের ক্রীতদাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাণ্ডবদের বনবাসে যেতে হল, সঙ্গে শেষ এক বছর তাঁদের অজ্ঞাতবাস।

অজ্ঞাতবাস শেষে পাণ্ডবরা নিজেদের রাজ্য ফিরে পাওয়ার দাবি করেন। কিন্তু দুর্যোধন বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী হস্তান্তরেও সম্মত হননি। পরিস্থিতি এতই প্রতিকূল হয়ে উঠল যে অবশেষে স্বয়ং কৃষ্ণ দৌত্য করতে এসে জানালেন যে পাণ্ডবদের অর্ধেক রাজত্বের পরিবর্তে পাঁচটি গ্রাম হলেই চলবে। দুর্যোধন তাতেও অসম্মতি জানালেন। ফলে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। কুরুরাজ্যের ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপাচার্য, কর্ণ প্রত্যেকে প্রস্তুত হলেন। ভারতের অগুণতি রাজা এই যুদ্ধে যোগ দেন। পাণ্ডবরাও তাঁদের বাহিনী প্রস্তুত করেন। সর্বোপরি পরামর্শদাতা ও অর্জুনের সারথি হিসাবে থাকেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণের নিপুণ পরিচালনায় এবং তীক্ষ্ণ কূটবুদ্ধির কাছে পরাজিত হন কৌরব বাহিনী।


ভীমের সঙ্গে গদাযুদ্ধরত দুর্যোধন।

আঠারো দিনের যুদ্ধে সবাই যখন শেষ কৌরবপক্ষে, তখন একমাত্র বেঁচে আছেন দুর্যোধন। তিনি যখন সরোবরের জলে বিশ্রামরত তখন কৃষ্ণের প্ররোচনায় ভীম তাঁকে গদাযুদ্ধে আহ্বান জানান। দুর্যোধনকে ভীম যখন কিছুতেই পরাস্ত করতে পারছিলেন না, তখন কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম তাঁকে অন্যায়ভাবে উরুভঙ্গ করে হত্যা করেন।

পাণ্ডবরা যুদ্ধে জয়ী হন। ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা হবে এই তাঁদের লক্ষ্য। তাঁরা ন্যায্য পাওনা বুঝে নিয়েছেন। তবে তার জন্য খেসারত দিতে হয়েছে প্রচুর। কিন্তু তাঁদের জন্য স্বর্গলোক থেকে কোনও আশীর্বাণী বা শঙ্খধ্বনি হল না। অন্যদিকে স্বর্গলোক দুর্যোধনকে সাদরে আহ্বান জানালো। কারণ ক্ষাত্রধর্ম থেকে সরে এসে দুর্যোধন কখনও যুদ্ধ করেন নি। হস্তিনাপুরের প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ শাসক, সচ্চরিত্র এবং বন্ধুবৎসল। তিনি মনে করতেন কুরুকুলের সরাসরি প্রজন্ম তিনি। কাজেই হস্তিনাপুরের ওপর তাঁর ন্যায্য দাবি। পাণ্ডবরা পাণ্ডুর ঔরসজাত নয়। হস্তিনাপুরের সিংহাসনে তাই পাণ্ডবদের কোনও অধিকার নেই। নিজের অধিকার বজায় রাখার জন্য দুর্যোধন যুদ্ধ করেছেন। তিনি কাপট্য করেন নি। তাই স্বর্গলোকে দুর্যোধন আদৃত হয়েছেন।

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।