
।। ১ ।।
৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১১।
বিশেষ কাজে বাড়ির বাইরে, কলকাতাতেই। ওদিকে সেদিনই আই-লীগ ২০১০-১১-র বড়ম্যাচ যুবভারতীতে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে ঠিক সাড়ে তিনটেয় কিসের এক অমোঘ টানে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম। টিভি চলছিল দেখে সেখানে বসে যাওয়া, খেলাটা দেখতে। প্রচুর ফাউল, কার্ড, গরম মেজাজ ছুঁয়ে এগোচ্ছিল ম্যাচটা। তারপর সঞ্জু প্রধানের পেনাল্টি গোলে সেদিনের ফেভারিট টিম ইস্টবেঙ্গলের এগিয়ে যাওয়া, মিনিট তেরোর মধ্যে। খেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল মোহনবাগান ক্রমশ, আর ম্যাচে চেপে বসছিল মর্গানের টিম।
মিনিট কুড়ি পরে হঠাৎই ডানদিক থেকে সুরকুমারের একটা অসামান্য সেন্টার কিছুটা উঁচু হয়ে ব্যারেটোর মাথা লক্ষ্য করে ছুটে যায় প্রথম পোস্টের সামনে, বক্সের বাইরে, আশপাশে দু' তিনজন প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার। মাঝ গোলে দাঁড়িয়ে গোল আগলাচ্ছিলেন তখন ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক, টপ ফর্মের সন্দীপ নন্দী। কয়েক সেকেন্ড সময়ের ব্যবধানে দুটো জিনিস ঘটে গেল। ব্যারেটোর স্পট জাম্পে বলটা মাথায় পেয়ে যাওয়া এবং সব হিসেবের বাইরে মাথায় বলে অসাধারণ একটা ফ্লিক। ফল?
মাঝ গোলে দাঁড়িয়ে থাকা সন্দীপ নন্দীকে নড়তে না দিয়ে দ্বিতীয় পোস্ট ঘেঁষে জালে মাথা ঠেকিয়েছিল বলটা। হতভম্ব সন্দীপ নন্দী আর ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্ডারদের অবিশ্বাস্য নির্বাক চাহনিই বলে দিচ্ছিল, কি অসম্ভব কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন ব্যারেটো, কয়েক মুহূর্ত আগে। তারপরে রাফ ওই ম্যাচে আর কিছু ঘটেনি, ১-১ ড্র হয় খেলাটা। অন্ততঃ ৫০ বার গোলটা দেখেছিলাম পরে, ইউটিউবে, কিন্তু সেভ করা হয়নি। এখন আর ইউটিউবে পাওয়া যায়না গোলটা, এটাই দুর্ভাগ্য।
অনেক পরে একটা ইন্টারভিউটে ব্যারেটোর নিজের মুখে তাঁর স্মৃতিতে অন্যতম সেরা ওই ম্যাচটা ছিল এই রকম -
"I-League Derby, February 2011 (Mohun Bagan: 1 East Bengal: 1)
It was a rough match. A glut of yellow cards and a couple of red cards too. East Bengal were the favourites to win that Derby. Trevor James Morgan was the coach of East Bengal and he built a very competitive and confident side. It was not easy to play East Bengal those days. Every team used to be scared of Morgan's men. Talking about the match, Sanju Pradhan had converted a penalty to give East Bengal an early lead. Twenty minutes later, I scored the equaliser off a Surkumar Singh centre. It was at the near post and I was the first to react. We did not win, but fought gallantly against a top-class side."
তাঁর সেই একই অ্যাটিচুড ছিল এবারেও "আমি এমন কি আর করেছি? টিমের জন্য এটা তো অবশ্যকর্তব্য।" আসলে এখনো মনে মনে বারো তেরো বছর আগের ওই সব দিনেই আটকে থাকি। বেরোতে দেন না ব্যারেটো। বেরোতে চাইও কি আদৌ?

।। ২ ।।
১ এপ্রিল, ২০১২।
আই-লিগে ঘরের ম্যাচ। মোহনবাগান বনাম ডেম্পো। স্থান - যুবভারতী। দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে। সে মুহূর্তে একটি ঘটনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে যে ডেম্পো আই লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে। আর একটি ঘটনা পুরো নিশ্চিত হয়ে গেছে যে মোহনবাগানের হয়ে সেটাই শেষ বছর এক বিদেশীর। অফিস ম্যানেজ হয়ে গেল। ক্যামাক স্ট্রিট থেকে উজিয়ে যুবভারতীতে যখন ঢুকি, খেলার বয়েস ৫ মিনিট। বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী চোটের জন্য সেদিন প্রথম টিমে অনিশ্চিত ছিলেন মোহনবাগানের সেই শেষ মরশুমী বিদেশী জোস রামিরেজ ব্যারেটো।
কিন্তু দেখা গেল, ব্যারেটোকে প্রথমেই মাঠে নামিয়ে দিলেন মোহনবাগান কোচ সুব্রত ভট্টাচার্য। যথারীতি জঘন্য খেলছিল ওডাফা, ছেত্রী, নবী, সুরকুমার সমৃদ্ধ মোহনবাগান। গালাগালির বন্যার মধ্যেই ০-১ পিছিয়ে যায় তারা প্রথমার্ধের ৮ মিনিটে, রন্টি মার্টিনের পেনাল্টি থেকে করা গোলে। তারপরে আরও জঘন্য খেলা শুরু করে মোহনবাগান এবং হেনস্থা হতে থাকে রন্টি অ্যান্ড কোম্পানির কাছে। যখন তখন ২ গোল খাবার জন্য মোহনবাগান বলিপ্রদত্ত, এমন সময় আচমকাই একটা চেষ্টা শুরু হয় টিম ব্যারেটোর পক্ষ থেকে। হঠাৎই তীব্র আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে তারা। একটু আগে যারা টিমের কয়েক পুরুষ উদ্ধার করেছিলেন, তারাই অন্যদের বারণ করছেন গালাগালি দিতে, এটাও দেখলাম। কারণ, চোট নিয়েও ব্যারেটো আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন সবাইকে নিয়ে ডেম্পোর আগ্রাসন রুখে দিতে। ওই একটি মানসিকতার পরিবর্তনেই যাবতীয় গালাগালি আর ডেম্পোর আগ্রাসন শেষ হয়ে গেল।
ব্যারেটো হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো গালিগালাজ থামিয়ে নিজের ও টিমের নামে জয়ধ্বনি তোলালেন, প্রথমার্ধের ২৭ ও ৩৪ মিনিটে দুটি গোল করালেন ওডাফাকে দিয়ে, কমিটমেন্ট কাকে বলে দেখালেন। তার আগে একটা পেনাল্টিও নষ্ট করেছিলেন ওডাফা। এবং আবার তার পায়ে হাল্কা লেগে যাওয়ায় দ্বিতীয়ার্ধে ৭৫ মিনিটের মাথায় অনন্যোপায় হয়ে ব্যারেটোকে মাঠ থেকে তুলতে বাধ্য হলেন মোহনবাগান কোচ সুব্রত ভট্টাচার্য। তার জায়গায় মাঠে নামেন মনীশ মৈথানিকে আর এখানেই খেলা ঘুরে যায়। ৭৭ মিনিটে ডেম্পো ২-২ করেছিল ম্যাচটা, গোল করেছিলেন কোকো সাকিবো, রক্ষণের দোষে। সেবারের চ্যাম্পিয়ন ডেম্পোর কাছে অন্যথায় নিশ্চিত ৩/৪ গোলে হারা ম্যাচটা বাঁচিয়ে একটা অদ্ভুত শান্তি দিয়েছিলেন ব্যারেটো সেদিন।
ডেম্পো আই-লীগ জেতার পর ওদের ম্যানেজমেন্ট বলেছিল "সব থেকে কঠিন ম্যাচটা ছিল কলকাতায় মোহনবাগানের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে। সেদিন মোহনবাগান প্রথমার্ধে দুর্দান্ত খেলেছিল।"

।। ৩ ।।
৬ মে, ২০১২, রবিবার।
এবং কি আশ্চর্য... আজও বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দেওয়া দিনটা চোখের একদম সামনে। আগের দিন সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচ দেখেছি ইডেনে। পুনে বনাম কলকাতা। আইপিএলে। কৃত্রিম মায়া ছেড়ে ঐ একদিনই বোধহয় যথার্থ ক্রিকেট আবেগে জারিত হয়েছিল আইপিএল। সে অন্য গল্প।
পরের দিনের গল্প-র 'মুখবন্ধ' এবার শুরু। আজ আমার সীমিত ক্ষমতায় মনে পড়ছে কলকাতা ফুটবলে বিশ্বমানের একটাই দীর্ঘদিনের জাদুকর - বার বার স্বচক্ষে দেখা একটাই নাম। আর সেই নামটার বিদায়বেলা। সেদিন ছিল ফুটবলের প্রেক্ষিতে আমার 'নিঃস্ব বাংলা'। সেদিন ভিজে চোখে আমিও যে মাঠে ছিলাম। সকাল থেকেই দ্রিম দ্রিম বুকের মধ্যে। থেকে থেকেই মনের মধ্যে 'অজানা কষ্ট, কি যাচ্ছেতাই।' পুনে এফসি-র বিরুদ্ধে মোহনবাগানের হয়ে বিদায়ী ম্যাচ (আই-লীগে) তাঁর, বিকেল ৪টে থেকে যুবভারতীতে। 'বুকের জ্বালা বুকে গোপন' করে মাঠে গেলাম। গোগ্রাসে গেলা ম্যাচটা ফ্রেম-টু-ফ্রেম মনে আছে আজ, তেরো বছর পরেও। প্রায় ষাট হাজার দর্শকের সামনে তিনি করেছিলেন প্রথম গোলটা দুরূহ কোণ থেকে 'সার্জিকাল প্লেসিং'-এ, দ্বিতীয়টা ওডাফা-র, সম্ভবত তাঁরই পাস থেকে। ২-০ জিতেছিল মোহনবাগান। ও হ্যাঁ, প্রতিপক্ষের গোলে ছিলেন তখন ভারতের এক নম্বর গোলরক্ষক সুব্রত পাল।
তার আগের ১১ বছর (১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৩-২০০৪ আর ২০০৬-২০০৭ থেকে ২০১১-২০১২) চোখের মণির মতো মোহনবাগানকে আগলে রাখা, তখনও আগ্রাসী ফর্মে থাকা এদেশের সেরা বিদেশী রিক্রুট সেই শেষবারের মতো খেলছেন মোহনবাগানের হয়ে, ভাবাই যাচ্ছিল না। ঈশ্বরের আবার অবসর হয় নাকি? এখনও আমার মতো কত মোহনবাগান প্রেমীর ঘরের আর হৃদয়ের দেওয়াল জুড়ে যে তাঁর ছবি, তার জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী আছে ফেসবুকের এক দেওয়াল থেকে লক্ষ লক্ষ দেওয়াল।
তার এই অপরিণত 'বিদায়'-এর নেপথ্যে ছিলেন তখনকার কর্তারা। কি লাভ হলো এতে ক্লাবের বা তাদের, আজ সবাই হাড়ে হাড়ে বোঝে! ২০০৪-এ অবশ্য ক্ষমতাসীন ছিল অন্য কর্তাদের দল। সোজা কথায়, সবুজ মেরুনের এই 'শীত গ্রীষ্ম, বর্ষার ভরসা'-কে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন তখনকার কর্তারা। আমরা, অখুশী সমর্থকরা নিরুচ্চার কান্নাতে বুক-চোখ ভেজানো ছাড়া বিশেষ কিছু করতে পারিনি সেদিন। মুখ বুজে অন্যায়টা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। পরের দু'বছরে ২০০৫-এর কলকাতা লীগ ছাড়া কিছু জেতেনি মোহনবাগান। চোখের জলে চিরদিনই অভিশাপ নামক একটা ইনগ্রেডিয়েন্ট জড়িয়ে থাকে যে!

।। ৪ ।।
১ ডিসেম্বর, ২০১৩।
স্থান - যুবভারতী। প্রেস বক্সের বাঁদিকটায়। একটা আই-লিগ ম্যাচে রাংদাজিয়েদের কাছে সদ্য ০-২ গোলে হেরে গিয়েছে মোহনবাগান। মনখারাপের মেঘ মেখে মাঠ থেকে বেরোব বেরোব। এমন সময় গ্যালারির ছাউনির নীচেও বৃষ্টি নামল, কান্নার। একটি বছর পনেরোর কিশোর দেখি কং-গ্যালারিতে (না, কংগ্রেস না, কংক্রীট) শুয়ে পড়েছে আর অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। পাশে দুটো বয়ামে লজেন্স আর বাদাম রাখা। ওকে তোলা হল। একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, যাদবপুরে কলোনিতে থাকে। এই লজেন্স আর বাদাম বিক্রি করে কলোনিতে মা আর নিজের সংসার টানে। বাবা গত হয়েছেন দুরারোগ্য অসুখে, বছর পাঁচেক আগে, সামান্য কিছু টাকা রেখে। ছেলেটা আরও বললো, ওর পৃথিবীতে একটাই রঙ - মোহনবাগান। একটাই দেবতা - ব্যারেটো। ওদের ছোট্ট আট বাই আটের একমাত্র ঘরটার চার দেওয়াল জুড়ে ব্যারেটো আর ব্যারেটো। আর ব্যারেটো থাকলে নাকি এই ম্যাচটাও বের করে দিত।
আমরা কয়েকজন মিলে ছেলেটাকে তুলে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম। তারপরে নিজে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, ও তো আমার আর আমাদের কথাই বলেছে। ব্যারেটো থাকলে হয়ত এই ম্যাচটাও বের করে দিত। তার আর উপায় ছিল না অবশ্য। তার আগের বছরই তাঁকে অবসর নিতে বাধ্য করে সে বছর ভবানীপুরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মহান মোহনবাগান কর্তারা।

।। ৫ ।।
১৭ জানুয়ারি, ২০০০।
মারগাওতে ডেম্পোর বিরুদ্ধে দশ নম্বর সবুজ-মেরুন জার্সি পরে ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার করেছিলেন তাঁর প্রথম গোল। আর ধারাবাহিক সাফল্যের সেই ইতিহাস ৬ মে, ২০১২ তারিখে থেমে গিয়েছিল পুণের সুব্রত পালকে টপকে, নিজের ২২৪তম গোলে। তার ১২ বছর আগে দেশের 'এক নম্বর টিম'-এর বিরুদ্ধে গোল করে ব্যারেটো তাঁর আগমনের ঘোষণা করেছিলেন। আর দেশের 'এক নম্বর গোলকিপার'-এর নাগাল এড়িয়ে অনবদ্য একটা গোল করে শেষ হয়েছিল মোহনবাগানে ব্যারেটোর রাজ্যপাট। মোহনবাগানের নৌকায় চড়ে ৩৯৮টি ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি এবং আমার বুকের বাঁদিকের স্থায়ী মঞ্চে প্রবেশ করেছিলেন অনায়াসেই।
যে প্রবেশের পরে আর কোনো প্রস্থান হয়না, হয়নি তার অবসরের পরে গত ১৪ বছরেও।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
