[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]
(এগারো)
রঞ্জুর চোখ এড়াতেই সৃজিত আজ মর্নিংওয়াকে জয়ন্তীর ভাঙা স্টেশনের দিকটায় যায়নি। ওর ওই দৃষ্টিটা আর লকডাউনের গল্পটা সৃজিতকে এক অন্য জগতে টেনে নিয়ে ফেলেছে। গতকাল লেখার সময় সৃজিত বুঝতে পারছিল যে তার উপন্যাস অন্যদিকে বাঁক নিতে চাইছে। ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের ক্রমবর্ধমান আঘাত-প্রত্যাঘাতের আড়ালে কোথাও যে দারুণ রকমের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক আঘাত আমাদের প্রত্যেকের জীবনকেই ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে এটা বোঝার এবং লেখার সময় বোধহয় এটা। ব্যক্তিগতভাবে সৃজিত বারবারই অনুভব করেছিল যে করোনা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক অভিসন্ধি। সমস্ত জনগণকে পুঁজিবাদের চরম নাগপাশে বাঁধতে এইরকমের এক আতঙ্কের খেলা শুরু করার খুব প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করতে। যখনই কোনও ভোটের গল্প সামনে এসেছে তখনই ম্যাজিকের মতো নেতা-নেত্রীদের মুখে করোনাভীতি শোনা যায়নি আর। মানুষ মরতে বড় ভয় পায় অথচ প্রতিমুহূর্তে মরে মরে বাঁচার অভিলাষে তারা কতবার, কতরকমভাবে যে মরে যায় তা বোধহয় কেউই অনুভব করে না। সৃজিতের মনে হয়, রঞ্জু আর মধুপর্ণার জীবন যেন এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে একইরকমের হতাশায় হাবুডুবু খাচ্ছে।

ভুটানি বস্তির সেই চায়ের দোকানটায় আজ অনেকক্ষণ ধরে বসে রইল সৃজিত। প্রথমে চা, তারপর ডিম সেদ্ধ, তারপর আবার চা-বিস্কুট খেয়ে পরপর দুটো সিগারেট শেষ করে সৃজিত হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। তার মাথায় বিদ্যুতের মতো ঝলক মেরে যায় একটা ভাবনা। আজ লেখাটার একটা বড় দিক শেষ করতে মারবে বলে মনে হচ্ছে সে। দোকানের সামনে ঘুরে বেড়ানো যে কুকুরটাকে সে বিস্কুট খাইয়েছিল সেটা অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার পিছু নেয়। রাস্তায় দু'বার দাঁড়িয়ে সৃজিত তাকে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করে। কুকুরটা তার পিছু ছাড়তে চায় না। এক্কেবারে সরুভাবে বয়ে যাওয়া জলধারার পাশে এসে কুকুরটা সৃজিতের মুখ চেয়ে থাকে। সৃজিত এবার মজা পেয়ে যায়।
- কী রে? যাবি আমার সঙ্গে?
ভৌ ভৌ করতে করতে কুকুরটা এক লাফে নদীটাকে পেরিয়ে যায়। উল্টোদিকে গিয়ে আবার সৃজিতকে ভৌ ভৌ করে ডাকতে থাকে। সৃজিত সবচেয়ে সরু জায়গাটা চিহ্নিত করে লাফ মারে। কুকুরটা ভৌ ভৌ করে সৃজিতের পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সৃজিত মায়ায় পড়ে যায়। হাঁটু গেড়ে নিচু হয়ে বসে। কুকুরটার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হোম-স্টে'র দিকে হাঁটা দেয়। একটু পরেই আবার শুনতে পায় 'ভৌ ভৌ'। পিছন ফিরে তাকায় সৃজিত। অবাক হয়ে দেখে কুকুরটা আবার নদী পেরিয়ে ভুটানি বস্তির দিকে গিয়ে তাকে বিদায় জানিয়ে হাঁটা দিয়েছে নিজের মনিবের দোকানের দিকে। এই একটা ঘটনা হঠাৎ করেই সৃজিতের মন ভালো করে দেয়। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হোম-স্টে'র সদর দরজাটা খুলে ঢুকে পড়ে।
- গুডমর্নিং সৃজিতবাবু। "সকালের আলোছায়া সন্ধের আবীর মেখে হাসে/ কাছের মানুষ জেনো দূরে যাবে বলে কাছে আসে।" আপনারই লেখা তো?
সৃজিত চমকে ওঠে। এভাবে তার কবিতার লাইন মনে রাখা পাঠক-পাঠিকার সন্ধান পেলে ভালো লাগে বইকী।
- মধুপর্ণা। তাই তো? কখন এলেন?
- আমাকে একদম আপনি বলবেন না। তুমি বলতে পারেন। তুই বললেও চলবে।
- সে হবে খন। চা খেয়েছেন?
- আবার আপনি! তুমি বলুন অথবা তুই।
- চা খেয়েছ? শ্যামলাল দিয়েছে?
- না বানাচ্ছে। আপনারটাও বলে দিই? একসাথে খাওয়া যাবে।
- নিশ্চয়। চলো, উপরে বারান্দায় বসে কথা বলি!
(ক্রমশ)
চিত্রঃ লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে কাল্পনিকভাবে তৈরি।
