গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

আমার মা (ষট্‌বিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


গ্রামটা শহর থেকে দূরে হলেও বেশ শান্ত এবং নির্জন। শহরের দূষণ নেই, কোলাহল নেই, গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজ নেই, সর্বোপরি নাগরিক সভ্যতা থেকে অনেক দূরে নিশ্চিন্তে নীরবে বাস করছেন কিছু মানুষ। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, সন্ধেবেলায় গ্রামের বারোয়ারী মণ্ডপে কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে হ্যারিকেন বা প্রদীপের আলোয় গান-বাজনা করেন। সকাল সকাল রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এখানে খগেন বাবুদের মতো কেউ নেই। সবাই সবার কাজ নিয়ে থাকেন, বিপদে-আপদে একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লোকালয় থেকে কিছুটা এগিয়ে মাঠের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালীমন্দির। এখানে অনেকেই বলেন - 'কালীমন্দিরে যে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে তিনি অতিশয় জাগ্রত। তাঁর নিকট যে যা মানত করেন তা পূরণ হয়। কাউকে নিরাশ করেন না এই দেবীমাতা।'

দূরদূরান্তর থেকে মানুষ এখানে আসেন এবং তাঁদের মনোবাসনা ব্যক্ত করেন। জনশ্রুতি আছে যে, কোনো এক সময়ে কৃষ্ণনগরের অধিপতি রাঘব রায়ের আমলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘকাল পেরিয়ে আজও পর্যন্ত এই মন্দিরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দেবীমাতার উদ্দেশ্যে স্তোস্ত্রগীত, পূজা এবং যজ্ঞের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সন্ধ্যার পর আর কেউ ওদিকে যান না। তখন দেবীমাতা মন্দিরে একাকী নিশিযাপন করেন। শিউলি এবং তার ভাই সন্ধ্যার পর কমল কাকুর মায়ের কাছে বসে গ্রামের নানারকম ইতিহাস শোনে। কমল কাকুর মা প্রতিমা দেবী যেন সাক্ষাৎ দেবীমাতা। যেমন তাঁর কথা তেমনই তাঁর চেহারা। তিনি অন্ধকার ঘরে বসে থাকলেও মনে হয় - ঘর আলো করে বসে আছেন একজন দেবী আর তাঁর শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে অদ্ভুত এক জ্যোতি। শিউলির ভাই সুকান্ত কে মুড়াগাছা হাইস্কুলে ভর্তি করে দেবার ব্যবস্থা করে গেছেন কমল বাবু। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রথীন বাবু ওনার বাল্যবন্ধু। তিনিই সুপারিশ করে সুকান্তকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। রথীন বাবু কথা দিয়েছেন স্কুল খুললেই তিনি সুকান্তকে তাঁর স্কুলে ভর্তি করে নেবেন। শিউলি ভর্তি হতে চায়নি কেননা শিউলি স্কুলে ভর্তি হলে কমল বাবুর বাবা-মাকে ঠিকঠাক সেবাযত্ন করা সম্ভব হবে না। তার চেয়ে ভাই পড়াশোনা করে মানুষ হতে পারলে শিউলির মাথা থেকে অনেকটা বোঝা নেমে যাবে। প্রতিমা দেবী অবশ্য বলেছিলেন - যা রে শিউলি মা এই সুযোগ হাতছাড়া করিস না।

- না ঠাম্মি, আমি ভর্তি হব না। প্রথমত এখান থেকে স্কুল অনেকটা দূর। তাছাড়া তোমাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। যে কারণে আমার এখানে আসা সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। কমল কাকু বলে গেছেন আপনাদের খেয়াল রাখতে। আমি আমার দায়িত্ব নিয়ে ছেলেখেলা করতে চাই না।

শিউলির কথা শুনে প্রতিমা দেবী খুব খুশি হয়েছিলেন। এই মেয়েটির দায়িত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠার প্রতি তিনি আরও বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এমন মেয়ে কিনা পৃথিবীতে অনাহারে, অনাদরে, অবহেলায় ঘরের এককোণে পড়ে পড়ে কাঁদবে? এমনটা হতে দেওয়া যায় না। তিনি পরম মমতায় ওদেরকে কাছে টেনে নেন। কমল কাকুর বাবা সুশীল বাবু। একসময় স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। এই মুড়াগাছা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন নদীয়ার মহান বিপ্লবী বসন্ত বিশ্বাস। তাঁর মহান আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে সুশীল বাবু বিপ্লবী দলে নাম লিখিয়েছিলেন। তিনিও পুলিশের অত্যাচার থেকে রেহাই পাননি। পুলিশী অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি ও তাঁর আরও তিন বন্ধু সমরেশ, সমিত এবং শরীফ। সমরেশ পুলিশের গুলিতে মারা যান। সমিত এবং শরীফকে পুলিশ আটক করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। সুশীল বাবু পালিয়ে যান পাটনায়। ওখানে এক আত্মীয়ের কাছে আশ্রয় নিয়ে মোহন বসু ছদ্মনাম নিয়ে আত্মগোপন করে বিপ্লবী কাজকর্ম চালিয়ে যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে আসেন নিজের গ্রাম মুড়াগাছায়। শরীফ এবং সমিত বন্দীদশা থেকে মুক্তি পান। নানা অত্যাচারের চিহ্ন তাঁদের শরীরে বর্তমান। সুকান্ত দাদুর কাছে বসে পড়াশোনা করে স্কুলে ভর্তির প্রস্তুতি নেয় আর বিপ্লবী আন্দোলনের কথা শোনে। সুশীল বাবু বলেন - জানিস দাদুভাই দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে কিন্তু অত্যাচার আজও সমানভাবে বজায় আছে। নকশাল আন্দোলন কিছুটা আশার আলো জাগিয়েছিল, কিন্তু কিছু নেতার বিশ্বাসঘাতকতা সেই আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়। সুকান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকি, মাস্টারদা সূর্য সেনের নাম শুনেছে কিন্তু নকশাল আন্দোলনের সম্পর্কে কিছুই জানে না। সুশীল দাদুকে প্রশ্ন করে - দাদু নকশাল আন্দোলন কী?

- সে অনেক কথা। এখন তুমি বুঝতে পারবে না। বড়ো হও তখন বলবো।

- আচ্ছা। আমি কিন্তু শুনবো। আমাকে অবশ্যই বলবে।

সুশীল বাবু মনে মনে হাসেন। এতটুকু একটা শিশুর মধ্যে জানার আগ্রহ কতখানি। অথচ আজকের যুবসমাজের মনে একবারের জন্যও প্রশ্ন ওঠে না। এরা নিজের ভবিষ্যত গঠনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। কী ভয়ংকর দিন আসছে, ভবিষ্যত প্রজন্মের সামনে কী বার্তা রেখে যাবে তা এরা জানে না। বেশির ভাগই প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে। আমাদের একটা সময় ছিল বটে! আমিও কখনো নিজেকে নিয়ে ভাবিনি কীভাবে দেশ ও দশের কাজে নিজের জীবন উৎসর্গ করা যায় সেটাই ছিল আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র। আর আজ? হায়রে আমার অভাগা দেশমাতা, তুমি কী এমন সন্তানের জন্ম দিতে চেয়েছিলে? সুশীল বাবুর চোখে জল এসে যায়।

ভোরের আলো ফোটবার আগেই সুশীল বাবু হাঁটতে বেরোন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যান মুড়াগাছা বাজার, সেখান থেকে রেললাইন পেরিয়ে কামারহাটি কলোনির মধ্যে ঢুকে ওখানকার গরীব কয়েকটি পরিবারের খোঁজ খবর নিয়ে বেউলো নদীর ধারে গিয়ে জেলে মাঝিদের মাছ ধরা দেখেন। কখনও কখনও পছন্দ মতো টাটকা মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ওদের সাথে গল্প গুজব করে কিছুটা সময় কাটিয়ে বাজার ঘুরে বাড়ি আসেন। এখানে বেউলো ও গড়গড়ি নদীর জ্যান্ত মাছ, মাঠের সতেজ ও তরতাজা শাক-সবজি, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু এবং বাগানের টাটকা ফলমূল জীবনকে পৃথকভাবে সজ্জিত হতে সাহায্য করেছে। এ এমন একটা জীবনপ্রবাহ যেখানে প্রতিটি মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে এক নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধন। তাইতো গ্রাম ছেড়ে যেতে মন চায় না। কলকাতার দমবন্ধ করা পরিবেশে সুশীল বাবু বড্ড বেমানান। কমল বাবু অনেকবার বাবাকে বলেছেন - বাবা, তুমি আমার কাছে গিয়ে থাকবে চলো।

কিন্তু সুশীল বাবু রাজি হননি। গ্রামের এই নির্জন, নিস্তব্ধ, শান্ত, স্নিগ্ধ, শীতল পরিবেশ ফেলে চলে যাওয়া তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর। পাশাপাশি এখানকার মানুষগুলো তাঁকে যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান জানান তা অন্য কোথাও গেলে পাওয়া যাবে না - এদের সাথে তিনি যেন এক অদৃশ্য নাড়িরটান অনুভব করেন। তাছাড়া এই গ্রামের সাথে জড়িয়ে আছে তাঁর বিগত দিনের গৌরবময় স্মৃতি। যে স্মৃতি তাঁকে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। মুড়াগাছার মূল বাজার থেকে বেশ কিছুটা দূরে বামন পাড়া হলেও কাছাকাছি প্রসিদ্ধ গ্রাম বেলপুকুর, মায়াপুর, বামুন পুকুর, রাজাপুর। এই সব এলাকায় বেশ কিছু শিক্ষিত এবং বিদ্বজ্জনের বাস যাঁরা বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় বিশেষ অবদান রেখেছেন। সুশীল বাবু মাঝে মধ্যে তাঁদের সঙ্গে সাহিত্যচর্চায় যোগ দেন, কখনও কখনও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য নিয়ে আলোচনাও করেন। সব মিলিয়ে এই অঞ্চল তাঁর নিকট একটা সাধন ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

(ক্রমশ)