গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

অবয়ব



মৌসুমী চক্রবর্তী


বহুদিন পর দেশে এসেছি। এবার একেবারে সব পিছুটান ছিন্ন করে ফিরে যাব, এমনটাই ইচ্ছে। কর্মসূত্রে প্রবাসী হলেও জন্মভূমির টান আমার পুরোমাত্রায়। তাই এখানে একবার শেষবারের মতো ফিরে আসার লোভ ছাড়তে পারলাম না। আসার সাথে সাথেই পুরোনো বন্ধুরা এসে জুটেছে আড্ডার আশায়। আজ আড্ডা আমার পৈতৃক বাড়িতেই। এখন আর মা বাবা, কাকা জ্যাঠা কেউ নেই। খালি পড়ে আছে বাড়িটা, যেন হাঁ করে গিলতে আসে। গতকালই কথাবার্তা সব ফাইনাল হয়ে গেছে। সইসাবুদ শেষ। এবার সম্পত্তি হস্তান্তর করে বরাবরের মতো চলে যাব এ দেশ ছেড়ে।

বৈঠকখানা ঘরে আড্ডা দিতে বসেছি। বাইরে আকাশ কালো করে বৃষ্টির দাপট। চা তেলেভাজা সহযোগে আড্ডা চলছিল। হঠাৎ শিবু আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

- বাপন, তুই তো অনেক জায়গায় ঘুরেছিস। বল না, তোর বেড়ানোর অভিজ্ঞতা।

- কীরকম অভিজ্ঞতা শুনতে চাস বল।

নেপু একটুক্ষণ ভেবে নিলো। তারপর বলল,

- দেখ, কম বেশি আমরা সবাই ঘোরাঘুরি করি। তোর ঝুলিতে যদি কোনও অদ্ভুত, অস্বাভাবিক বা ভূতের অভিজ্ঞতা থাকে, তো বল।

সত্যি বলতে কি, এমন বৃষ্টিমুখর দিনে এই ধরনের গল্পই জমে ভালো। দুঃসাহসী হিসেবে বরাবরই আমার সুনাম। তাই অনন্যসাধারণ বেশ কয়েকটা অভিজ্ঞতার সাক্ষী আমি। ওদের আবদারে চা হাতে নিয়ে জমিয়ে বসলাম।

তারপর শুরু করলাম...

সেবার... তখন আমার কলকাতাতেই পোস্টিং। খাই দাই, চাকরি করি, সন্ধ্যেবেলায় আড্ডা মারি... মানে মজার জীবন। মাঝে মাঝে ঘুরতে বেরোই, কখনও একা আবার কখনও বন্ধু সহযোগে। সেই সময়ে একবার...

বেশ মনোযোগ সহকারে আবহ সৃষ্টি করে গল্প শুরু করতে চলেছি, অমনি লোডশেডিং। উঠে বাতি কোথায় খুঁজে আনতে যাব, বিশাল বলল,

- ছেড়ে দে বাপন। এসব গল্প একটু আলো-আঁধারিতেই জমে ভাল। তুই কন্টিনিউ কর।

সকলে সমস্বরে রাজি হলে বের করলাম আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে অত্যাশ্চর্য এক কাহিনী।

শহুরে জীবনে থাকতে থাকতে বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। তার ওপর কলকাতার গ্রীষ্ম মানে যা ভ্যাপসা গরম! এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বহুদিন থেকেই ছটফট করছিলাম মনে মনে। শেষমেষ রবিবার তাসের আসরে তুলেই ফেললাম কথাটা। শুনেই হৈ হৈ করে উঠল ইয়ার দোস্ত সকলে। তক্ষুনি যে যার ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ঝুলি সবকিছু ঘেঁটে নিদান দিল "ডুয়ার্সের দিকে যাও ভায়া। মনের শান্তি, প্রাণের আরাম দুইই মিলবে।" নিজেও একটু আধটু জ্ঞান আহরণ করে নিলাম মোবাইল ঘেঁটে। দেখলাম পাহাড়, জঙ্গল, নদী সবকিছুরই দেখা পাওয়া যাবে এমন জায়গায়। তার ওপর তরুণ বলল, "শোন, আমার বন্ধুর একটা কটেজ আছে ওখানে। বোধহয় তোর জন্য ব্যবস্থা করে দিতে পারব।" সব মিলিয়ে মনে ধরল কথাটা। অতএব নির্দিষ্ট দিনে ব্যাগপত্তর গুছিয়ে রওয়ানা দিলাম তিলাবাড়ির উদ্দেশ্যে।

সন্ধ্যের মুখে পৌঁছে গেলাম কটেজে। এই কটেজ দেখাশুনা করেন বিভাসদা। তবে সারাদিন কটেজে থেকে রান্না, বাজার, পরিষ্কারের ভার বাহাদুরের হাতে। সেই বাহাদুরের হাতে ধোঁয়া ওঠা গরম চা আর চিকেন পকোড়া খেয়ে ট্রলি ব্যাগ টেনে ঢুকলাম ঘরে। ইচ্ছে, জানলা থেকে সন্ধের প্রকৃতিকে একবার প্রাণ ভরে দেখে নেওয়ার।

জানলাটা খুলে দিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। বিরাট ওই কটেজের সামনের দিকে রয়েছে এক মস্ত জলাশয়। এ যেন কোলাহলহীন এক শান্তির রাজ্য! পাখিরা যে যার বাসায় ফিরেছে। আর তার মধ্যেই আশ্চর্য নীরবতা ভেদ করে শুরু হয়েছে ঝিঁঝির কলতান।

জানলার কাছ থেকে সরে এলাম। সারাদিন ক্লান্তির শেষে শরীর চাইছে নরম বিছানা। তার আগে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে যাচ্ছি, দরজার বাইরে অন্ধকার করিডোরে কার ছায়া!

- ক্কে, কে ওখানে!

- বাবু, খেতে দিয়েছি, আসেন।

চমকে উঠেছিলাম। কী নিঃশব্দে চলাফেরা করে বাহাদুর! ওর পেছন পেছন নীচে নামলাম ডাইনিং হলে। দেখলাম আচার সহযোগে পরোটা ও দেশী মুরগির ঝোল রাখা আছে টেবিলে। তৃপ্তি সহকারে আঙুল চেটে খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম,

- এখান থেকে বাজারটা কত দূরে বাহাদুর?

- কাছেই।

- বাজারে সবরকম শাকসবজি পাওয়া যায়?

- হুম।

একি রে! এত কম কথা বলে কেন? আরও দু'চারটে কথা বলে আলাপ জমাতে চেষ্টা করলাম তার সাথে কিন্তু বাহাদুর এমন সংক্ষেপে উত্তর দিতে শুরু করল যে কথোপকথন আর বেশি দূর এগোলো না। আমিও অমৃত সমান খাবার উদরস্থ করে লাফ দিলাম বিছানায়। এক ঘুমে রাত কাবার।

বিভাসদার সাথে কথা বলে গাড়ি ঠিক করে রেখেছিলাম। সকাল হতেই তিলক এসে গেল গাড়ি নিয়ে। আমি ব্রেকফাস্ট সেরে কিছু খাবার দাবার টিফিন বক্সে ভরে রওয়ানা দিলাম মূর্তি নদীর উদ্দেশ্যে।

মূর্তি নদীর সৌন্দর্যের গল্প শুনেছিলাম এখানে আসার আগে থেকেই। এবার চাক্ষুষ করলাম। মেঘ রোদ্দুরের আলো আঁধারিতে নদী যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয় যেন শরতের আকাশ। জায়গাটা বেশ ফাঁকা। অনেকক্ষণ বসে রইলাম নদীর জলে পা ডুবিয়ে। শরীরের সব ক্লান্তি উধাও হলো নিমেষেই। অল্পস্বল্প লেখালিখি করার অভ্যাস আছে আমার। স্বর্গীয় শোভা উপভোগ করতে করতে লিপিবদ্ধ হলো কবিতা। এতকিছু করতে করতেই ঘড়িতে দেখলাম দুপুর আগতপ্রায়। টিফিন বাক্স খুলে দ্বিপ্রাহরিক আহার সেরে চলতে শুরু করলাম নদীর পার ঘেঁসে।

একা আনমনে এগিয়ে যাচ্ছি। একটু এগোতেই ডান দিকে গরুমারা রিভার টেন্টস ছাড়িয়ে দেখলাম মূর্তি ব্রিজ। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝরঝর ধারায় মূর্তি নদী। পাথরে ঢাকা সে নদী এখানে বেশ স্রোতস্বিনী। দেখতে দেখতে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলাম।

নদীর ধার বরাবর একটা সরু রাস্তা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। ডুয়ার্সে আসার অনেক কারণের মধ্যে একটি অন্যতম কারণ হলো কিছু ভাল ছবি তোলা। তাই ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে মশগুল হয়ে ছবি তুলতে তুলতে চলছিলাম। কতক্ষণ হেঁটেছি সেই পথে, খেয়াল ছিল না। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে আমার চারপাশ। আকাশের দিকে তাকাতেই বুঝলাম এ হল বৃষ্টির পূর্বাভাস। ক্যামেরা ও নিজেকে সামলাতে না সামলাতেই শুরু হল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। কোনোরকমে আশ্রয় নিলাম একটা শাটার টানা দোকানের সামনে, অল্প ঢাকা দেওয়া জায়গাটুকুতে।

অবিরাম বৃষ্টি হয়েই চলেছে। রাস্তায় জনমানব নেই বললেই চলে। কখনও বৃষ্টির ছাট বাঁচিয়ে ছবি তুলছি। মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাই সেটাকে চার্জে বসিয়ে ঘরে রেখে এসেছি। ভেবেছিলাম যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ডুবে থাকব যখন, তখন আর ফোন সাথে নিয়ে অযথা প্রাইভেসি নষ্ট করা কেন? কিন্তু এখন এই পরিস্থিতিতে রীতিমত উপলব্ধি করলাম তার একাধিক প্রয়োজনীয়তা।

জায়গাটা ঘন গাছগাছালিতে ঢাকা। মূর্তি সেতু পার করলেই গরুমারা অভয়ারণ্য। আশপাশে তেমনভাবে বসতি নেই। আমি বুঝতে পারছিলাম হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছি পার্কিং এরিয়া থেকে। এখন তিলকের সাথে যোগাযোগ করা বা পার্কিং এরিয়ায় ফিরে যাওয়া দুইই অসম্ভব। অগত্যা গুটিশুটি মেরে দরজার সামনে এক কোণে বসে রইলাম।

চলছে অবিরাম বৃষ্টি। আর তার সাথে প্রবল হাওয়া। ভিজে গিয়েছিলাম ভালোমতোই। এবার শিরশিরে কাঁপন শুরু হলো। কোনওমতে হাত দুটো বুকের সামনে ভাঁজ করে বসে রইলাম। একটানা বৃষ্টির একঘেয়ে শব্দ। যতদূর চোখ যায় ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেন মনে হচ্ছে এই অন্ধকারই আমায় গ্রাস করবে যে কোনও মুহূর্তে। আশপাশে কোথাও খসখস শব্দ হলে চমকে তাকাই। কে জানে, জঙ্গল থেকে বুনো জন্তু না বেরিয়ে আসে! মাঝে মাঝে ক্যামেরার লেন্সটা চোখের সামনে ধরি। লেন্সের ভেতর দিয়ে বৃথা ছবি তোলার চেষ্টা করি।

বসে থাকতে থাকতে ঢুলুনি এসে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দে সজাগ হয়ে উঠলাম। অজানা একটা শব্দ আসছে নদীর ধার বরাবর। চোখ দুটো বিস্ফারিত করে দেখার চেষ্টা করলাম। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কিছুই চোখে পড়ল না। আওয়াজটা ক্রমশঃ বাড়তে লাগল। মনে হল, বিশালাকৃতির কোনও ভারী বস্তু বোধহয় কেউ টানতে টানতে এদিকেই নিয়ে আসছে। আর তার সাথে সঙ্গত দিচ্ছে প্রকৃতি। সে যেন আরও ভয়াবহ হয়ে তাণ্ডব শুরু করেছে চারপাশে।

চোখ কচলে তাকালাম। কিছুই বুঝতে পারলাম না। হঠাৎ প্রকৃতি যেন দানবীয় মূর্তি ধারণ করল! দূরে নদীর দিক থেকে কিসের আওয়াজ দেখার জন্য সাথের বাইনোকুলারে চোখ রাখলাম। যা দেখলাম তাতে আঁতকে উঠলাম! স্তম্ভিত হয়ে গেলাম অবর্ণনীয় এক দৃশ্য দেখে!

নদীর জল থেকে উঠে আসছে এক বিকটাকার প্রাণী। অবশ্য তাকে প্রাণী বলব না মানুষ, সে বলতে পারি না! মুখটা তার মানুষের মতো অথচ গঠন দানবীয়। আকৃতিতে সে যেন একটা বিশালাকার বাইসন। আসছে সে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে মন্থর গতিতে। যেন মনে হচ্ছে কিছু খুঁজতে খুঁজতে পথ চলছে। আমি নিজেকে আড়াল করার জায়গা খুঁজতে থাকি অথচ সামনে খোলা বিস্তৃত জঙ্গল ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। মরিয়া হয়ে দোকান ঘরের সামনে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে পড়লাম। নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে আছি। শুধু একমনে ভগবানের নাম জপ করে চলেছি। কিছুক্ষণ পর মনে হল, ধুপধাপ পায়ের শব্দ আমার সামনে দিয়ে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল।

আস্তে আস্তে উঠে বসলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে ওই দশাসই প্রাণীটা কোথায় গেল ভাবছি, এমন সময় এক মহিলাকণ্ঠের হৃদয় বিদারক চিৎকার! মনে হল পাশে জঙ্গলটা থেকেই আসছে, আর সেটা খুব একটা দূরে নয়। আতঙ্কিত সেই গলার স্বরে কেঁপে উঠলাম আবারও। বুঝতে পারলাম, ওই অদ্ভুত জীবটা কোনও মহিলাকে বোধহয় আক্রমণ করেছে। সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই আওয়াজ লক্ষ্য করে।

দূর থেকে যেন গাছ উপড়ে ফেলার আওয়াজ পাচ্ছি। তাড়াতাড়ি বায়নাকুলারটা চোখে লাগাই। যা দেখি তাতে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে! সামনে ঘন গাছপালায় আড়াল করা এক প্রশস্ত প্রান্তর। আর সেখানে মহিলার ওপর সঙ্গমরত ওই অজানা প্রাণী! ভারি বর্ষণের আওয়াজেও ঢাকা পড়ছে না শীৎকারের তুমুল আওয়াজ।

হাড় হিম হয়ে গেল এমন দৃশ্য দেখে! হাতের ক্যামেরা হাতেই রয়ে গেল, ছবি তোলার কথা মাথাতেও এলো না।

কতক্ষণ যে ওইভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম খেয়াল নেই। তারপর আবার ধুপধাপ পায়ের শব্দে সম্বিত ফিরে পেলাম। তাড়াতাড়ি লুকোলাম ঘন গাছের আড়ালে। ওই অজানা জীব এবার উৎকট উল্লসিত আওয়াজ নিক্ষেপ করল আকাশে। থরথর করে কেঁপে উঠল আশপাশ। পৈশাচিক অট্টহাসি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। তারপর যেমনভাবে এসেছিল ঠিক তেমনভাবেই গাছপালা, মাটি, ভূমি তছনছ করতে করতে চলে গেল সে নদীর দিকে।

থম মেরে গিয়েছিলাম। বুদ্ধি বিবেচনা আর কাজ করছিল না। কোনোরকমে টলতে টলতে দোকান ঘরের সামনে গিয়ে বসে পড়লাম।

কতক্ষণ ওইভাবে ছিলাম জানি না, তিলকের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলাম।

- বাবু, গাড়িতে চলুন। আপনাকে বাংলোয় পৌঁছে দিই।

টলতে টলতে গাড়িতে গিয়ে বসেছি। গন্তব্য বিমানদার কটেজ। মনের মধ্যে তখনও ঘুরপাক খাচ্ছে ওই আশ্চর্যজনক অভিজ্ঞতা। শরীরে, মনে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই, শুধু কতক্ষণে ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেব সেই চিন্তা করছি।

কটেজ গেটের সামনে নামিয়ে দিল তিলক। আমার অবস্থা ঠিক যেন মদ্যপ মানুষের মতো। টলতে টলতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। করিডোরটাতে কেন যে আলো রাখেনি কে জানে! বড্ড ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘরে ঢুকে আলোর সুইচটা দিলাম। বড় আলোটা জ্বলল না। বোধহয় বাল্ব কেটে গেছে। কাল বিভাসদাকে বলতে হবে। এবার নাইট ল্যাম্পটা জ্বালালাম। টিমটিমে আলোয় সে তার অস্তিত্ব জানান দিল।

দরজাটা ঠেলা মেরে খুললাম। একটা ভ্যাপসা গন্ধ ঝাপটা মারল নাকে। বোধহয় সারাদিন বৃষ্টি পড়েছে, জানলাগুলো খোলা হয়নি... তাই। ঘরে ঢুকে জানলাগুলো খুলে দাঁড়ালাম।

বাইরে ঘন অন্ধকার। দূর থেকে অস্পষ্ট আলো যতটুকু আসছে তাতে দেখতে পেলাম কালো রঙের জলে টলটল করছে সামনের জলাশয়। একটা শিরশিরে ঠান্ডা বাতাস আসছিল বাইরে থেকে। একে সারাদিন ভিজেছি... কাঁপুনি ধরছিল। একটু গরম চা পেলে মন্দ হতো না। অথচ বাহাদুরকে তো আশেপাশে দেখাই গেল না!

জানলার সামনে থেকে সরে আসছি, এমন সময় হঠাৎ জলের পাড় থেকে কিছু বাচ্চার কলরব। এত রাতে! জানলার বাইরে ঝুঁকে দেখবার চেষ্টা করলাম। তেমন কিছু দেখতে পেলাম না। এবার মোবাইলের টর্চটা ফেললাম যেদিক থেকে আওয়াজটা আসছিল, সেইদিকে।

আবার সেই ভয়াবহ দৃশ্য! শুধু এবারে ছোট আকৃতির! মুখগুলো মানুষের মতো আর অবয়ব বাইসনের। সেই বিকৃত দেহের দানবগুলি নিচে কোলাহল করে খেলা করছে। তাদের কলরবে এত ঠান্ডাতেও আমি ঘামতে লাগলাম দরদর করে।

এখানেও!

ভয়ে কাঁপা স্বরে ডেকে উঠলাম...

- বাহাদুর...

পর্দার পেছনে একটা খসখস শব্দ।

- ক্কে, কে ওখানে!

পর্দাটা নড়ে উঠলো। ঘরের আবছা আলোয় ঘরে ঢুকল বাহাদুর। মুখটা তার, আর দেহটা বিশালাকার বাইসনের! সেই বিভৎস মূর্তি... সেই অর্ধেক মানুষ অর্ধেক জন্তু! চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

কতক্ষণ ওইভাবে পড়েছিলাম জানি না। যখন জ্ঞান এল, তখন সকালের আলো ফুটছে ধীরে ধীরে।

সকাল হতেই মনে পড়ল রাতের বীভৎস অভিজ্ঞতা। নিজের মনেই বলে উঠলাম, "এখানে আর নয় বাবা। বাঁচতে চাইলে পালাতে হবে।" ব্যাগটা গোছানোই ছিল। তুলে নিয়ে ঘর থেকে সোজা বেরোতে যাচ্ছি, খাটের ওপর চোখ পড়ল। আমার ঘরেই খাটের উপর শুয়ে আছে একজন কে! সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা তার দেহটা। এগিয়ে গেলাম সেদিকে ভাল করে দেখার জন্য।

মুখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম! এ মুখ আমার যে বড় চেনা! খাটের পায়ের দিকে একটা বড় আয়না ছিল। তাকালাম সেদিকে। আঁতকে উঠলাম! দেখলাম ফ্যাকাশে আমি খাটের ওপর পড়ে আছি, গায়ে সাদা কাপড় ঢেকে। কাপড়টা গা থেকে একটু সরাতেই চিৎকার বেরিয়ে এলো আমার গলা দিয়ে। দেহটা বাইসনের!

* * * * *

অস্ফুটে একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো বিশালের গলা দিয়ে। নেপু চিৎকার করে উঠল "বাপন! তুই...!" একটা ঠান্ডা বাতাস যেন ঘুরপাক খাচ্ছিল এতক্ষণ ঘরের চার প্রকোষ্ঠে। ছাড়া পেয়ে জানলার গরাদ দিয়ে হুস করে বেরিয়ে যেতেই কারেন্ট এসে গেল। আর সেই ঝকঝকে আলোয় তিন বন্ধু আবিষ্কার করল, ঘরের চতুর্থ অর্থাৎ রকিং চেয়ারটা ফাঁকা। আর সেটা দুলছে অত্যন্ত ধীরে ধীরে।