প্রবন্ধ/নিবন্ধ

গোলাপ ফুল সুন্দর হয় কি করে! ভ্রান্তিবিলাস (চতুর্থ পর্ব)



সুভাষ রবিদাস


।। ৪ ।।

'বিন্দু' চমৎকার জিনিস। এর অস্তিত্ব আছে কিন্তু পরিমাপ নেই। ক্ষেত্রফলও নেই। এই মহাবিশ্ব কি তেমনি একটা বিন্দু!

আধ্যাত্মিক পর্বে প্রথম দিকে মানসপটে দেখা যায় অসীম অন্ধকার। তার মধ্যেই একসময় দেখা যায় ক্ষুদ্র এক আলোক বিন্দু। ভীষণ চঞ্চল, একে স্থির করে রাখা একটা চ্যালেঞ্জ। যে একে গ্রহণ করতে পারে সে অব্যক্ত সুখে সুখী হয়। মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হলে এই ক্ষেত্রফলহীন বিন্দুতে হারিয়ে যাবে তখন বেলভিয়ারের অ্যাপোলো হোক বা শাহজাহানের তাজমহল কিংবা গোলাপ ফুল কোনোটাই আর সুন্দর থাকবে না। সমগ্র বিশ্বসত্তার অস্তিত্ব তখন শূন্য। জগৎ মিথ্যা এবং মায়া।

হিগস বোসন কণার মত অস্তিত্ববান কণাকে কোথায় পাওয়া যাবে তার ঠিকানা নেই। পিটার হিগস ও সতেন্দ্রনাথ বোস বিশ্বাস করতেন এমন এক কণা আছে যা অন্য কণাকে প্রভাবিত করে। যদি বলি জীবদেহে এমন এক সত্তা আছে যা জীবদেহকে প্রভাবিত করে। কথাটা বালখিল্য মনে হয়। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ এটা ভেবে থাকে। সত্যের ধারণা অনুযায়ী একটি নাকচ করলে অপরটি নাকচ হয়ে যায়, তাই রক্তদান অঙ্গদান করা সম্ভবপর হয়, তবে এক শরীরে ভিন্ন ভিন্ন আত্মা অবস্থান করে? যদি বলি হ্যাঁ করে! আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষগুলো এক একটি আত্মা। এরা স্বাধীন এবং সক্ষম। এরা সংঘবদ্ধ ভাবে একটি মহাবিশ্ব গঠন করেছে যার নাম শরীর। কোষগুলো অণুজীব। কাজেই চৈতন্যময়। এই চৈতন্যকে নিয়ন্ত্রণ করে আরও উচ্চ পর্যায়ের শক্তি বা পরমাণু। আত্মা।

যন্ত্র বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় যন্ত্র হিগস বোসন কণা ধরা যন্ত্র। ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় যা ঘটেছিল বলে অনুমান সেটা ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এই যন্ত্রে। এটি স্থাপন করা হয়েছিল ভূগর্ভে। প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষে দুটি প্রোটন কণা ধ্বংস হয়ে সৃষ্টি হল যে কণা সেটাই হিগস বোসন কণা। বিজ্ঞানীরা নাম দিলেন 'গড পার্টিকলস'। ঈশ্বর কণা।

তাহলে ঈশ্বর এসে ধরা দিল মনে। এভাবেই আত্মাকে শরীরে আরোপ করা হয়েছে। যা বাস্তবে নেই কিছু শক্তির রূপভেদ রূপে বিদ্যমান।

দূর শ্রবণ, দূর দর্শন যন্ত্রবিজ্ঞান ছাড়াও যে হয়ে থাকে তা বিশ্বাস করতে দ্বিধা নেই। উচ্চ মার্গের ব্যক্তি ভিন্ন কিছু বিশেষ প্রাণীর এই ক্ষমতা সহজাত। বাদুড় শব্দতরঙ্গ উৎক্ষেপণ করে দূরবর্তী শিকারের অস্তিত্ব অনুধাবন করতে পারে। সেকেন্ডে দেড় লক্ষ বার কম্পাঙ্ক তৈরি করে বুঝতে পারে কোথায় কী আছে। তাদের চোখ থাকলেও তারা দেখতে পারে না। যত বস্তুর কাছে যায় ততই তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ছোট হয় এবং অভ্রান্ত ভাবে বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করে।

জীব দেহে এক মিটার স্নায়ুর রোধ হল এক হাজার ছয় শত কোটি কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের তামার তারের রোধের সমান। স্নায়ুগুলো অতি সূক্ষ্ম মেডুলেটেড তন্তু দিয়ে বাঁধা। সেগুলো রক্ষিত হয় মাইওলিম নামক আবরণ দ্বারা ফলে দুই বা একাধিক স্নায়ু তন্তুর সাথে শর্ট সার্কিট না হয়। সারা শরীরের সব স্নায়ুকে এক লাইনে জুড়ে দিলে ৯০,০০০ মাইল অতিক্রান্ত হয়ে যাবে। তাহলে এই স্নায়ু তন্তু তপস্বীদের দূর শ্রবণ ও দূর দর্শনে সাহায্য করবে না কেন!

শরীর একটি বায়ো ইলেক্ট্রম্যাগনেট রেডার। আর মস্তিষ্ক হল মিরর অফ মাস্টার ভিসন। তপস্বীরা মন নামক সত্তাকে দিগন্তপারে পাঠিয়ে দিতে পারে, আর কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তেই তারা সুক্ষ্ণ দেহে আকাশ পরিভ্রমণ করে। এই সুক্ষ্ণ সত্তা আসলে চেতনা। শরীর যখন বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে অন্তর্জ্ঞানে জাগ্রত হয় তখন শরীর নামক রেডার চেতনায় বিশ্ব চেতনার সাথে মিলিত হয়। এভাবেই তপস্বী মহাবিশ্বের সাথে শুধু যুক্ত হয় তা নয়, মহাবিশ্বের অনন্ত রহস্য পর্যন্ত জানতে পারে।

অন্তর্চেতনায় জেগে উঠলে ব্যক্তি অদ্ভুত সুগন্ধ লাভ করে। মস্তিষ্ক থেকে এক প্রকার রস ক্ষরিত হয়, যাকে এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে মস্তিষ্ক মেরুজল বলে। যোগীর ভাষায় এটাই অমৃত। এই রস শরীর পুষ্ট রাখে।

সত্য, সুন্দর, বুদ্ধি, বিশ্বাস চৈতন্য নিরপেক্ষ নয়। এগুলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তাই আইনস্টাইনের মনে হয়েছে গোলাপ ফুল আদৌ নেই। তাই সুন্দর হবার কথায় ওঠে না। এটাই মায়া।

জীবনে মায়া আবশ্যক। মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন এই মহাবিশ্ব। আচ্ছন্ন জীবজগৎ। মায়া যেখানে ভেঙে যায় সেখানেই সেই বস্তু ও বিষয়ের পরিসমাপ্তি।

পূর্ব প্রবন্ধ "দেহ মন বুদ্ধি"তে আমি কেন্দ্র - প্রান্ত সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছিলাম চিত্র সহযোগে। এখানে দেখব কীভাবে কেন্দ্র প্রান্ত সম্পর্ক E = mc/sq. হতে পারে।

মনে করা হোক একটি বন্দুক থেকে বুলেট বেরিয়ে দেয়ালে লাগলো, ফলে দেয়াল থেকে কিছু পদার্থ বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এবার যদি বুলেটটি রিভার্স নেওয়া যায়, তবে প্রান্তের দিকে ছুটে যাওয়া পদার্থ পুনরায় কেন্দ্রে এসে মিশে যাবে।

[ছবি (ক)]

[ছবি (খ)]

এই তত্ত্ব মহাবিশ্বে সম্ভব কেননা মহাবিশ্ব হল স্থিতিস্থাপক সত্তা। এক্ষেত্রে m variable c = 0/1.

(ক্রমশ)

চিত্র: লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।