১৯৭৯ সালের শরৎকালে আপনাদের সঙ্গে আমার হঠাৎ দেখা হলে আমাকে চিনে নিতে হয়তো কিছু অসুবিধা হতো, তা সে সামাজিকভাবেই হোক বা জাতিগতভাবে। আমি তখন ২৪। মুখ দেখলে মনে হতো জাপানি, কিন্তু ব্রিটেনে সেসময় যে জাপানিদের দেখা যেত ঠিক তাদের মতো নয়। কাঁধ অবধি লম্বা চুল, আর দস্যুদের মতো ঝোলা গোঁফ। আমার কথা শুনে একমাত্র যে টান বোধগম্য হতো তা ইংল্যান্ডের দক্ষিণপ্রান্তের জেলায় বড় হয়ে ওঠা কোনো ব্যক্তির, স্বরের ওঠানামায় মাঝে মাঝে সেই কথনভঙ্গির সঙ্গে হিপি যুগের নির্জীব, সেকেলে ভাষার মিল। কথাবার্তা হলে আমরা হল্যান্ডের টোটাল ফুটবলার বা বব ডিলানের সাম্প্রতিক অ্যালবাম বা যেবছর সম্ভবত আমরা লন্ডনের গৃহহীন মানুষদের সঙ্গে কাজ করে সময় কাটিয়েছিলাম তা নিয়ে আলোচনা করতাম। কিন্তু জাপান নিয়ে কিছু বললে, সেদেশের সংস্কৃতির কথা জিজ্ঞাসা করলে আপনারা হয়তো লক্ষ করতেন যে আমার আচরণে ধৈর্যের অভাব ঘটছে। কারণ যেসব কারণে এবিষয়ে আমি আমার অজ্ঞতা স্বীকার করেছি তা হল পাঁচ বছর বয়সে দেশ ছাড়ার পর থেকে আমি সেদেশে পা রাখিনি, ছুটি কাটানোর উপলক্ষেও নয়।
সেই শরৎ-এ আমি আমার রুকস্যাক, গীটার ও বহনযোগ্য টাইপরাইটার নিয়ে নরফোক কাউন্টির বাক্সটন গ্রামে পৌঁছই। ছোট্ট সেই গ্রামে আছে একটি জলচক্র (ওয়াটার মিল), আর চারপাশে বিস্তৃত শস্যক্ষেত। আমার এখানে আসার কারণ আমি ইস্ট অ্যাঞ্জেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম বিষয়ে এক বছরের এক স্নাতকোত্তর পাঠক্রমের জন্য মনোনীত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় এখান থেকে দশ মাইল দূরে, গির্জা শহর নরউইচ-এ। আমার কোনো গাড়ি ছিল না, তাই যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল বাস, তা পাওয়া যেত সকালে একবার, দুপুরে একবার, আর একবার সন্ধ্যায়। কিন্তু অল্পকাল পরেই আমি দেখলাম তা তেমন কষ্টের কিছু ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রয়োজন সপ্তাহে দু'দিনের বেশি ছিল না। তাই আমি ছোট্ট এক বাড়িতে একটা ঘর ভাড়া নিলাম। বাড়ির মালিক ত্রিশোর্ধ এবং সদ্য বিপত্নীক। নিঃসন্দেহে সেই বাড়ি তাঁর কাছে এক নষ্ট স্বপ্নের প্রেতপুরী। অথবা আমার সঙ্গ হয়তো তাঁর অপছন্দের। যাই হোক দিনের পর দিন আমি তাঁর দিকে মুখ তুলে তাকাতাম না। অন্যভাবে বলতে গেলে, লন্ডনে দীর্ঘদিন পাগলপ্রায় জীবন কাটানোর পর, এখানে আমি অস্বাভাবিক এক শান্তি ও নির্জনতার মুখোমুখি, যা আমাকে একজন লেখকে রূপান্তরিত হতে সাহায্য করেছে।
সত্যি কথা বলতে কি আমার ছোট্ট এই ঘর একজন কুলীন লেখকের চিলেকোঠার থেকে কোনো অংশে কম নয়। ছাদের ঢাল এমন যে মনে হয় এই বুঝি আটকা পড়ে যাব। যদিও আঙুলের ডগায় ভর রেখে একটা জানলা দিয়ে তাকালে নজরে আসে দিগন্তে বিলীন হয়ে যাওয়া শস্যক্ষেত। এই ঘরে ছোট্ট এক টেবিল জুড়ে রয়েছে আমার টাইপরাইটার ও টেবিল ল্যাম্প। মেঝেয় বিছানার পরিবর্তে, একটা বড়, আয়তাকার, শিল্পে ব্যবহারযোগ্য ফোম যা ঘুমের সময় আমায় স্বেদসিক্ত করে, এমনকি নরফোক-এর তীর-শীতল রাতেও।
এই ঘরে বসে আমি গ্রীষ্মকালে লেখা দু'টি ছোটগল্প যত্ন-সহকারে দেখেছি, আর ভেবেছি তা আমার সহপাঠীদের পড়তে দেওয়ার উপযুক্ত কিনা। (আমাদের ক্লাস ছিল ছয়জনের, দেখাসাক্ষাৎ হ'ত প্রতি দু'সপ্তাহে একবার।) সেসময়ে আমি কথাসাহিত্যের ধারায় সেরকম কোনো খসড়া করিনি, পাঠক্রমের অঙ্গ হিসাবে বিবিসি-র জন্য একটি বেতারনাটিকা লিখে অমনোনীত হয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি আগে, ২০ বছর বয়সে, আমি রকস্টার হওয়ার দৃঢ় পরিকল্পনা করেছিলাম। অতি সম্প্রতি আমার সাহিত্য-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আমি পরিচিত হয়েছি। এখন যে দু'টি গল্প আমি খতিয়ে দেখছি তা লিখেছি আতঙ্কে, আতঙ্ক এই খবরে যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে মনোনীত হয়েছি। দু'টি গল্পের একটির বিষয় এক ভয়ানক আত্মহত্যা চুক্তি, অন্যটির বিষয় স্কটল্যান্ডে সড়কযুদ্ধ, যে স্কটল্যান্ডে আমি সমাজকর্মী হিসাবে কিছু সময় কাটিয়ে এসেছি। সেরকম ভাল হয়নি গল্পদু'টো। তাই বর্তমান বৃটেনের অন্যান্যদের দৃষ্টান্ত অনুকরণে একটা অন্য গল্প শুরু করলাম। গল্পের কেন্দ্রে এক কিশোর যে তার বিড়ালকে বিষ খাওয়ায়। তারপর এক রাতে, সম্ভবত সেই ছোট্ট ঘরে আমার দিনযাপনের তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহে, আমি কলম ধরলাম, এক নতুন ও ঐকান্তিক গরজে, এক গল্প রচনায়। গল্পের উপজীব্য জাপান, বিষয় নাগাসাকি, আমার জন্মভূমি, সময়কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কয়দিন।

কাজুও ইশিগুরো
এই যে তাগিদ, আমি বলতে চাই, আমার কাছে এক বিস্ময়। আজকের দিনে, পরিস্থিতি এইরকম যে মিশ্র সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী একজন উচ্চাভিলাষী তরুণ লেখকের কাছে আপন কাজে আপন উৎস অনুসন্ধান কার্যত এক সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা তখন এই ভাবনা থেকে বহু দূরে। ব্রিটেনে বহু-সাংস্কৃতিক সাহিত্যের বিস্ফোরণ হতে তখনও কয়েক বছর বাকি। তখনও অপরিচিত সলমন রুশদির একটি উপন্যাসের সমস্ত কপি নিঃশেষিত। অগ্রণী তরুণ ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক বলতে মানুষ মার্গারেট ড্যাবেল-এর নাম করবেন। পুরোনো লেখকদের মধ্যে রয়েছেন আইরিশ মারডখ, কিংসলে আমিস, উইলিয়াম গোল্ডিং, অ্যান্তনি বার্জেস, জন ফাউলেস প্রমুখ। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মিলান কুন্দেরা বা বোর্হেস-এর মতো বিদেশী লেখকদের পাঠক তখন খুব কম। আগ্রহী পাঠকের কাছে এই সব নাম অর্থহীন।
যখন আমি প্রথম জাপান-কেন্দ্রিক গল্প শেষ করি, এইরকম ছিল সাহিত্যের বাতাবরণ। আমার সমস্ত চেতনায় তা এক গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিশার আবিষ্কার বলে মনে হলেও তখনই এই ভাবনা আমার মাথায় এল যে এই ব্যত্যয়কে আত্মপ্রশ্রয় বলে দেখা হবে না তো যদি আমি আরও 'স্বাভাবিক' বিষয়বস্তুতে দ্রুত না ফিরে আসতে পারি। তাই যথেষ্ট সংশয়ের পর আমি গল্পটা এখানে-ওখানে দেখাতে লাগলাম। দৃঢ় উৎসাহমূলক প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করার জন্য আমি আজ পর্যন্ত গভীরভাবে কৃতজ্ঞ আমার সব সহপাঠী, দুই শিক্ষক ম্যালকম ব্র্যাডবারি ও অ্যাঞ্জেলা কার্টার, আর ঔপন্যাসিক পল বেইলি, সে'বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের 'রাইটার-ইন-রেসিডেন্স', সবার কাছে। তাঁদের মনোভাব কিঞ্চিৎ নেতিবাচক হলে আমি হয়তো আর জাপান নিয়ে লিখতাম না। ইতিবাচক সাড়া মিলেছিল বলে আমি ঘরে ফিরে অবিরাম লিখে চললাম। ১৯৭৯-৮০ সালের শীতে এবং বসন্তেও আমি কার্যত যে কয়জন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলিনি তারা হল আমার ক্লাসের পাঁচ সহপাঠী, গ্রামের মুদী যার থেকে আমি বাঁচার রসদ - জলখাবারের শস্য ও ভেড়ার কিডনি - সংগ্রহ করতাম, এবং আমার বান্ধবী (বর্তমানে স্ত্রী) লোরনা যে প্রতি দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত। জীবনটা খুব একটা সুস্থিত না হলেও এই চার-পাঁচ মাসে আমি আমার প্রথম উপন্যাস, 'আ পেল ভিউ অফ হিলস', অর্ধেক লিখে ফেললাম। এই উপন্যাসের পটভূমিও নাগাসাকি, আর অ্যাটম বোম ফেলার পর পুনর্গঠনের কয়েক বছর এই গল্পের উপজীব্য। মনে আছে, এই সময়টায় মাঝে মাঝে জাপান-কেন্দ্রিক নয় এমন কিছু ছোটগল্পের ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিলাম, কিন্তু দেখতাম আগ্রহ খুব দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে।
সেই কয়েক মাস আমার কাছে বেশ সংকটময় ছিল এই কারণে যে এই কয়মাস বাদ দিলে সম্ভবত আর লেখক হওয়া হয়ে উঠতো না। তখন থেকে আমি বেশ কয়েকবার ফিরে তাকিয়েছি আর নিজেকে প্রশ্ন করেছি: ঠিক কী ঘটে চলেছে আমার সঙ্গে? এই অদ্ভুত জীবনীশক্তি এল কোথা থেকে? আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম যে জীবনের ঠিক এই সন্ধিক্ষণে, আমি জড়িয়ে পড়েছি গুরুত্বপূর্ণ এক সংরক্ষণের কাজে। তা ব্যাখ্যা করতে গেলে আমায় খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে সময়ের সরণীতে।
১৯৬০ সালে, এপ্রিল মাসে, পাঁচ বছর বয়সে, বাবা-মা ও বোনের সঙ্গে, আমি সারে কাউন্টির গিল্ডফোর্ড শহরে পৌঁছই। স্টকব্রোকার-অধ্যুষিত প্রাচুর্যময় এই অঞ্চল লন্ডন শহরের তিন মাইল দক্ষিণে। আমার বাবা ছিলেন একজন বিজ্ঞান গবেষক, ব্রিটিশ সরকার নিয়োজিত একজন সমুদ্রবিদ্যা বিশারদ। যে যন্ত্র আবিষ্কারের কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন, প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তা আজ লন্ডনের বিজ্ঞান প্রদর্শশালার স্থায়ী সংগ্রহের অংশ।
ইংল্যান্ডে পৌঁছনোর পর আমাদের যে ছবি তোলা হয়েছিল তা এক হারানো যুগকে মনে করিয়ে দেয়। পুরুষদের পোশাক গলাবন্ধ সহ ভি-গলার পুলওভার, গাড়ির পাশ-দরজায় পাদানি, পিছনে অতিরিক্ত চাকা। সমাসন্ন বিটলস্ পর্ব, যৌনবিপ্লব, ছাত্র-প্রতিবাদ, বহুসংস্কৃতিবাদ। আমার পরিবার যে ইংল্যান্ডকে প্রথম দেখেছিল বা যে ইংল্যান্ড সম্বন্ধে আঁচ পেয়েছিল, এই সেই তা বিশ্বাস করা শক্ত। ফ্রান্স বা ইতালি থেকে আগত দু'একজন বিদেশির সাক্ষাৎ যথেষ্ট উল্লেখ করার মতো হলেও একজন জাপানি পর্যটকের দর্শন - নৈব নৈব চ।
আমার পরিবার বারো-বাড়ির এক কানাগলিতে বাস করত ঠিক যেখানে পাকা রাস্তার শেষ আর গ্রামাঞ্চল শুরু। ধীরে-সুস্থে হাঁটলে স্থানীয় খামারবাড়ি এখান থেকে ঠিক পাঁচ মিনিট। আর সেখানে, এমাঠ থেকে ওমাঠে, মাঝের রাস্তা দিয়ে কাকেদের অলস পদচারণা। দুধ নিয়ে ঘোড়া ও গরুর গাড়ির দৌড় আপন গন্তব্যে। এছাড়া ইংল্যান্ডে আসার প্রথম দিন থেকে ছবির মতো আমার মনে গেঁথে আছে অতি সাধারণ এক দৃশ্য। তা হল রাস্তার ধারে পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ সজারু - চতুর, কাঁটাওয়ালা, নিশাচর এই জীব সেদেশে তখন প্রচুর - রাতের গাড়িতে পিষ্ট, শিশিরসিক্ত সকালে সাফাইওয়ালার অপেক্ষায় শুয়ে আছে।

কাজুও ইশিগুরো যৌবনে।
আমাদের সব প্রতিবেশীরা গির্জায় যেত। আমি যখন ওদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলতে যেতাম, দেখতাম যে ওরা খাওয়ার আগে ছোট্ট এক প্রার্থনা করে। আমি রোববারের স্কুলে ভর্তি হলাম। খুব শীঘ্রই আমি গীর্জার গায়কদলে গাইতে শুরু করলাম। আর দশ বছর বয়সে আমি গিল্ডফোর্ডে প্রার্থনাসংগীতমন্ডলীর প্রথম জাপানি প্রধান গায়ক। আমি স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে গিয়ে দেখলাম যে একমাত্র আমিই ইংরেজ শিশু নই, খুব সম্ভবত স্কুলের ইতিহাসে তা প্রথম। আর এগারো ক্লাস থেকে আমি নিকটবর্তী এক শহরে, 'ব্যাকরণ শিক্ষার' স্কুলে, ট্রেনে যাতায়াত শুরু করলাম। প্রত্যেক সকালে সেই গাড়িতে আমার সঙ্গী নানান শ্রেণীর মানুষ, পিনস্ট্রাইপ পোশাকে আর বোলার হ্যাট মাথায় লন্ডনে যে যার অফিসের পথে।
এই পর্বে ইংরেজ মধ্যবিত্ত বালকদের থেকে সেকালে যে ধরণের আচরণ আশা করা হতো সেবিষয়ে আমার সম্যক প্রশিক্ষণ হয়েছিল। জানতাম যে বন্ধুর বাড়ি গেলে ঘরে কোনো বয়স্ক ব্যক্তির উপস্থিতিতে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াতে হবে। খাওয়ার সময় টেবিল ছেড়ে উঠতে গেলে অনুমতি নিতে হবে। আশপাশে একমাত্র বিদেশী হওয়ার ফলে, স্থানীয় স্তরে কিঞ্চিৎ নামডাক ছিল। অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হওয়ার আগে থেকেই ওরা জানতো আমি কে। অচেনা বয়স্ক মানুষেরা রাস্তায় বা স্থানীয় দোকানে আমায় নাম ধরে ডাকতেন।
যখন আমি ফিরে তাকাই, ভাবি যে কুড়ি বছরও কাটেনি একটা বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে যেখানে জাপানিরা ছিল ব্রিটিশদের ঘৃণ্য শত্রু। অথচ ইংল্যান্ডের সাধারণ মানুষ যে অকপট ভাব ও সহজাত ঔদার্যে আমাদের পরিবারকে গ্রহণ করেছিল তা ভাবলে অবাক লাগে। ব্রিটেনের সেই সব অধিবাসী যাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসে পরবর্তীকালে এক উল্লেখযোগ্য নতুন কল্যাণব্রতী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের প্রতি আজ পর্যন্ত আমার যে স্নেহ, শ্রদ্ধা ও কৌতুহল রয়েছে তা অর্থপূর্ণভাবে সেই সব দিনগুলোতে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে প্রসূত।
কিন্তু এই সব সময়ে আমি বাড়িতে আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে কার্যত একটা অন্য জীবন কাটিয়েছিলাম। বাড়িতে ছিল ভিন্ন নিয়ম, ভিন্ন প্রত্যাশা, ভিন্ন ভাষা। আসলে আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল যে এক-দুই বছর পর আমরা জাপানে ফিরে যাব। সত্যি বলতে কি ইংল্যান্ডে আমাদের প্রথম এগারো বছর ধরে 'পরের বছর যাব' এই ভাবটা বরাবর বজায় ছিল। ফলে আমার বাবা-মায়ের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একজন ভ্রমণকারীর, কোনো অভিবাসীর নয়। তাঁরা প্রায়ই স্থানীয় লোকজনের অদ্ভুত রীতিনীতি নিয়ে মত বিনিময় করতেন কিন্তু তা গ্রহণ করার কোনো তাগিদ অনুভব করতেন না। দীর্ঘকাল ধরে এটাই ধরে নেওয়া হয়েছিল যে একটু বেশি বয়সে আমি জাপানে ফিরে যাব এবং আমার জাপানি শিক্ষার দিকটা নিয়ে বেশ তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। প্রতি মাসে জাপান থেকে একটা পার্সেল আসত, তাতে থাকত গত মাসের কমিকস, সাময়িক পত্রিকা এবং শিক্ষামূলক সারসংগ্রহ, সেই সব আমি সোৎসাহে গিলতাম। অল্পবয়সে কিছুদিন এই পার্সেল আসা বন্ধ হয়েছিল, সম্ভবত আমার দাদামশায়ের মৃত্যুর পর, কিন্তু আমার বাবা-মা পুরোনো বন্ধু ও আত্মীয়দের কথায় বা জাপানে তাঁদের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ের গল্প বলে সমানে আমার শিশুমনে কল্পনাশক্তির উন্মেষ ও রেখাপাতের কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর সবসময়েই ছিল আমার আপন স্মৃতির ভান্ডার - বিস্ময়করভাবে ব্যাপ্ত ও স্পষ্ট: দাদু-দিদিমার, ফেলে আসা প্রিয় খেলনার, আমাদের সাবেকি জাপানি বাড়ির (আমি এখনও তা মনের মধ্যে ঘর ধরে ধরে গড়ে তুলতে পারি), আমার শৈশবের পাঠশালার, স্থানীয় ট্রাম স্টপেজের, সেতুর কাছে ঘুরে-বেড়ানো হিংস্র কুকুরের, নাপিতের দোকানে শিশুদের জন্য আয়নার সামনে রাখা হুইল লাগানো বিশেষ চেয়ার।
সব মিলিয়ে মোদ্দা কথা এই হল যে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে, গদ্যে এক কল্পনার জগৎ তৈরি করব - একথা মনে দানা বাঁধার অনেক আগে, আমার মনে আমি তৎপর হয়ে গড়ে তুলছিলাম সম্যকরূপে পল্লবিত এক স্থান, নাম 'জাপান' - কোনোভাবে আমি যে ভূমির অংশ আর যেখান থেকে আমি কিছুটা হলেও আহরণ করেছি আমার পরিচিতি ও প্রত্যয়বোধ। সেই সময়ে সশরীরে কখনও জাপান না যাওয়ার ঘটনা ওই দেশ সম্বন্ধে আমার কল্পনাকে আরও স্পষ্ট ও ব্যক্তিগত করে তুলতে সাহায্য করেছে।
অতঃপর প্রয়োজন সংরক্ষণ। এই জন্য যে সেসময়ে আমি মধ্য-কুড়িতে পৌঁছে গেছি যদিও স্পষ্ট করে সেকথা আমি কখনও বলিনি তখন আর কিছু মৌলিক বিষয় আমি বুঝতে পারছিলাম। আমি মেনে নিতে শুরু করেছিলাম যে আমার 'জাপান' বোধহয় উড়োজাহাজে চেপে যে সব জায়গায় যাওয়া যায় সে সব দেশের সঙ্গে খুব একটা মেলে না; যে ধরনের জীবনযাত্রার কথা বাবা-মা বলতেন, যা ছোটবেলা থেকে আমি শুনে আসছি, তা ছয় ও সাতের দশকে অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে; যে কোনও রকমেই হোক আমার মানসপটে আঁকা জাপানের ছবি স্মৃতি, কল্পনা ও ভাবনার মিশেলে এক শিশুমনের আবেগ দিয়ে গড়া। আর সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ হল, বছর বছর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, আমার জাপান, যে চমৎকার দেশে আমি বড় হয়ে উঠেছি, তার স্মৃতি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠেছে।
আমি এখন নিশ্চিত যে 'আমার' জাপান অনন্য এবং একই সঙ্গে তীব্রভাবে ভঙ্গুর এই অনুভূতি বাইরে থেকে যে অনুভূতির সত্যতা প্রতিপাদন সম্ভব নয় - তা আমাকে নরফোকের এই ছোট্ট ঘরে কাজে বসতে বাধ্য করেছে। আসলে আমি যা করছিলাম তা হল আমার মন থেকে পুরোপুরি মুছে যাওয়ার আগে আমি এই জগতের বিশেষ রং, রীতিনীতি, আদবকায়দা, মান-মর্যাদা, ভুলত্রুটি এবং এই স্থান সম্বন্ধে আমি এযাবৎ যা ভেবেছি তা কাগজে লিখে রাখছিলাম। কল্পকাহিনীতে জাপানের পুনর্নিমাণ করব এই ছিল আমার ইচ্ছা, আমার দেশের স্মৃতি যেন নিরাপদ থাকে, আমি যেন কোনো বইয়ের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারি: 'হ্যাঁ, এই আমার জাপান, আমার বইয়ের ভিতরে।'
বসন্ত ১৯৮৩, সাড়ে তিন বছর পর। আমি আর লোরনা তখন লন্ডনে থাকি, এক উঁচু, সরু বাড়ির একদম উপরের তলায়, দু'টি ছোট ঘরে। বাড়িটা আবার শহরের এক অন্যতম উঁচু জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে। কাছে একটা টেলিভিশন টাওয়ার। যখনই আমরা টার্নটেবিলে রেকর্ড বাজাতাম, অদ্ভুত ভৌতিক সম্প্রচার-ধ্বনি মাঝেমধ্যে স্পিকারের ভেতর ঢুকে পড়ত। আমাদের বসার ঘরে ছিল না কোনো সোফা বা আরামকেদারা - কেবল মেঝেতে রাখা দুটি গদি, তার ওপর কুশন। বড় একটা টেবিল ছিল, দিনে সেখানে আমি লিখতাম, রাতে আমরা খেতাম। বিলাসবহুল কিছুই ছিল না, কিন্তু আমাদের সেই জীবনটা বেশ পছন্দের ছিল। আগের বছরই আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছিল, আর আমি তখনই একটা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছি, যা খুব শিগগিরই ব্রিটিশ টেলিভিশনে দেখানো হবে।
প্রথম উপন্যাসটি নিয়ে কিছুদিন আমি যথেষ্ট গর্বিত ছিলাম, কিন্তু সেই বসন্ত নাগাদ একধরনের বিরক্তিকর অস্বস্তি আমাকে গ্রাস করল। সমস্যাটা ছিল এটাই - আমার প্রথম উপন্যাস আর প্রথম টিভি চিত্রনাট্য যেন অদ্ভুতভাবে একে অন্যের মতো। বিষয়বস্তু নয়, কিন্তু পদ্ধতি ও শৈলীতে। যতই দেখছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল আমার উপন্যাস আসলে একরকম চিত্রনাট্যের মতো - সংলাপ আর নির্দেশনার সমাহার। কিছুটা পর্যন্ত তা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু এখন আমার ইচ্ছে হলো এমন গদ্য লেখা, যা কেবল বইয়ের পাতায়ই সম্পূর্ণরূপে জীবন্ত হতে পারে। যদি কেউ টেলিভিশন চালিয়ে সেই একই অভিজ্ঞতা লাভ করে, তবে উপন্যাস লেখার মানেটাই বা কী? চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে লিখিত সাহিত্য কীভাবে টিকে থাকবে, যদি সেটির মধ্যে মৌলিক কিছু না থাকে? যে মৌলিকতা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়?
এই সময়েই আমি এক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন বিছানায় পড়ে রইলাম। অসুস্থতার সবচেয়ে খারাপ পর্যায় কেটে যাবার পর ঘুম ঘুম ভাবটা কিছুটা চলে গেলে, হঠাৎ লক্ষ করলাম আমার চাদরের ভেতর ভারি এমন কিছু একটা আছে যা কিছুদিন ধরে আমাকে বিরক্ত করছে। সেটা খুলে দেখি - মার্সেল প্রুস্তের 'অতীতের স্মৃতিচারণ' বইটির প্রথম খণ্ড (তখন এভাবেই অনূদিত হতো)। বইটা যেহেতু হাতের কাছেই ছিল, শুরু করলাম পড়তে। আমার জ্বরজর্জর শরীরের হয়তো এক্ষেত্রে একটা ভূমিকা ছিল। কিন্তু আমি 'প্রস্তাব' আর 'কমব্রে' অংশ পড়ে সম্পূর্ণ মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বারবার পড়তে লাগলাম সেগুলো। শুধু ভাষার সৌন্দর্য নয়, প্রুস্ত যেভাবে এক পর্ব থেকে আরেক পর্বে এগিয়ে যান, তাতে আমি বিস্মিত হলাম। ঘটনাগুলির বিন্যাস কোনো ক্রমানুসারে নয়, কোনো সরল কাহিনির দাবিও মেনে চলে না! বরং স্মৃতি ও চিন্তার টানাপোড়েনই লেখাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমি ভাবতে লাগলাম: এই দুটি আপাতভাবে সম্পর্কহীন মুহূর্ত লেখকের মনে পাশাপাশি কেন এসেছে? হঠাৎই আমার চোখ খুলে গেল - দ্বিতীয় উপন্যাসটা লেখার এক নতুন, মুক্ততর পদ্ধতির ইঙ্গিত পেলাম আমি। এমন এক উপায়, যা পাতার ভেতরেই এক বিশেষ গতি ও গভীরতা তৈরি করতে পারে - এমন কিছু যা পর্দায় ধরা সম্ভব নয়। যদি আমি বর্ণনাকারীর চিন্তা ও স্মৃতির ভেসে বেড়ানো সূত্র মেনে এক অংশ থেকে আরেক অংশে যেতে পারি, তাহলে আমি এক বিমূর্ত চিত্রশিল্পীর মত হয়ে উঠতে পারি - যিনি ক্যানভাসে রঙ ও আকার স্থাপন করেন নিজের অন্তর্দৃষ্টির টানে। আমি চাইলে দুই দিনের এক দৃশ্যকে বিশ বছর আগের কোনো মুহূর্তের পাশে রাখতে পারি। পাঠককে উৎসাহ দিতে পারি তাদের মধ্যে সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে। এইভাবে, আমি ভাবতে শুরু করলাম, হয়তো কোনো মানুষের নিজের সম্পর্কে ধারণা ও অতীত-স্মৃতিকে ঘিরে থাকা আত্মপ্রবঞ্চনা ও অস্বীকারের বহু স্তর আমি তুলে ধরতে পারব।
মার্চ, ১৯৮৮। আমার বয়স তখন তেত্রিশ। এখন আমাদের ঘরে একটা সোফা এসেছে, আর আমি সেটার উপর গা এলিয়ে শুয়ে আছি - টম ওয়েটস-এর একটা অ্যালবাম শুনছি। আগের বছরই লোরনা আর আমি লন্ডনের দক্ষিণ প্রান্তের এক অনাড়ম্বর কিন্তু মনোরম এলাকায় নিজেদের একটা বাড়ি কিনেছিলাম। সেই বাড়িতে প্রথমবারের মতো আমার নিজস্ব একটি পড়ার ঘর হয়েছিল। ঘরটা ছোট ছিল, দরজাও ছিল না, কিন্তু নিজের কাগজপত্র ছড়িয়ে রেখে প্রতিদিনের শেষে সেগুলো গুছিয়ে রাখতে হতোনা বলে তা আমার কাছে ছিল বিশাল আনন্দের বিষয়। আর সেই ঘরেই - আমার তাই বিশ্বাস - সদ্য তৃতীয় উপন্যাস শেষ করেছি। এটা ছিল আমার প্রথম উপন্যাস, যার পটভূমি জাপান নয়। আগের দুই বইয়ে আমার 'নিজস্ব জাপান' তেমন ভঙ্গুর ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি নতুন বইটি যা পরিচিত হবে "দ্য রিমেইনস অফ দ্য ডে" নামে, ছিল একেবারে ইংরেজি ধাঁচের। যদিও আমি সচেতনভাবে চেষ্টা করেছিলাম যেন তা পুরোনো প্রজন্মের অনেক ব্রিটিশ লেখকের মতো একঘেয়ে না হয়। আমি চেয়েছিলাম এমনভাবে লিখতে, যেন পাঠকরা ইংরেজ না হলেও সহজে বুঝতে পারেন, যেন কেবল ইংরেজ সমাজের সূক্ষ্ম টানাপোড়েনের সঙ্গে পরিচিত না থাকলেও বইটি তাদের কাছে অর্থবহ হয়। তখনকার ব্রিটিশ সাহিত্যেই সলমন রুশদি আর ভি. এস. নাইপল এক নতুন দিক খুলে দিয়েছিলেন - একটু বেশি আন্তর্জাতিক, বহির্মুখী সাহিত্য, যা আর ব্রিটেনকে ইংরেজি সাহিত্যের কেন্দ্র হিসেবে ধরে নেয় না। তাঁদের লেখাকে বিস্তৃততম অর্থে বলা যায় 'উপনিবেশ-পরবর্তী সাহিত্য'। আমিও তাদের মতোই এমন আন্তর্জাতিক সাহিত্য লিখতে চেয়েছিলাম যা সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সীমানা সহজে পেরিয়ে যেতে পারে - এমনকি গল্পটি যদি একেবারে ইংরেজি বাস্তবতার মধ্যে স্থাপন করা হয়। আমার ইংল্যান্ড এক রকমের পৌরাণিক ইংল্যান্ড - যার রূপরেখা, আমি বিশ্বাস করতাম, পৃথিবীর অনেক মানুষের কল্পনাতে আগে থেকেই ছিল, এমনকি যারা এদেশে কখনও আসেনি তাদের মনেও।
যে গল্পটি সম্প্রতি শেষ করলাম তা ছিল এক ইংরেজ বাটলারকে নিয়ে - যিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝতে পারেন, তিনি ভুল মূল্যবোধ নিয়ে নিজের পুরো জীবন যাপন করেছেন। উপলব্ধি করেছেন, জীবনের সেরা সময় তিনি একজন নাৎসি-সমর্থক অভিজাতের সেবায় নষ্ট করেছেন; নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে, প্রকৃত অর্থেই নিজের জীবনটিকে অপচয় করেছেন। আরও বলতে গেলে নিজেকে 'নিখুঁত সেবক' করে তোলার লক্ষ্যে তিনি ভালোবাসার বা ভালোবাসা পাওয়ার অধিকারকেও অস্বীকার করেছেন। উপেক্ষা করেছেন সেই একমাত্র মহিলাকে যার তিনি খেয়াল রাখতেন।
আমি পাণ্ডুলিপিটি বহুবার পড়ে দেখেছি, এবং মোটামুটি সন্তুষ্টও ছিলাম। তবুও মনে হচ্ছিল কিছু একটা যেন নেই সেখানে।
তারপর এক সন্ধ্যায়, আমি সোফায় শুয়ে টম ওয়েটস শুনছিলাম। হঠাৎ বাজতে শুরু করল গানটা - "রুবিস আর্মস" হয়তো তোমাদের কেউ কেউ গানটা শুনেছ। (আমি ভেবেছিলাম এই মুহূর্তে একটু গেয়ে শোনাই, কিন্তু পরে মন বদলেছি।) এটা এক পুরুষ, সম্ভবত এক সৈনিককে নিয়ে এক গীতিকবিতা, যে ঘুমন্ত প্রেমিকাকে বিছানায় ছেড়ে চলে যায়। সকালে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়, ট্রেনে ওঠে। গল্পে নতুন কিছু নেই। কিন্তু গানটি গাওয়া হয়েছে এক কর্কশ কণ্ঠে, এক আমেরিকান ভবঘুরের কণ্ঠে, যে নিজের গভীর অনুভূতি প্রকাশে একেবারেই অভ্যস্ত নয়। গানের মাঝখানে এক মুহূর্ত আসে - যখন সে বলে তার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। আর সেই মুহূর্তটি প্রায় অসহনীয় রকমে আবেগময়, কারণ অনুভূতিটা এতটাই গভীর যে তা প্রকাশ করতে যতটা প্রতিরোধ ভাঙতে হয়েছে, তার চাপও ততটাই স্পষ্ট। টম ওয়েটস সেই লাইনটা এমন এক মুক্তির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গেয়ে ওঠেন যে, মনে হয় এক কঠিন, গম্ভীর জীবনের জমে থাকা সব সংযম মুহূর্তে ভেঙে পড়ছে গভীর বেদনায়।
গানটা শুনতে শুনতে আমি হঠাৎ বুঝলাম - আমার লেখায় কী এখনও বাকি। আমি অনেক আগেই অবচেতনে ঠিক করে ফেলেছিলাম, আমার ইংরেজ বাটলার তার আবেগের দেয়াল কখনও ভাঙবে না, গল্পের একদম শেষ পর্যন্ত সে দেয়ালের আড়ালেই থাকবে। এখন বুঝলাম - আমাকে সেই সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হবে। গল্পের একেবারে শেষদিকে, খুব নিখুঁতভাবে বেছে নেওয়া এক মুহূর্তে, আমাকে তার বর্মে একটা ফাটল ধরাতে হবে। এক বিশাল, বেদনাময় আকাঙ্ক্ষার ঝলক পাঠককে দেখাতে হবে - যে আকাঙ্ক্ষা এতদিন লুকিয়ে ছিল সংগোপনে।
এখানে একটা কথা বলা দরকার - গায়কদের কণ্ঠ থেকে আমি একাধিকবার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছি। আমি শুধু তাদের গানের শব্দের কথা বলছি না, বরং গায়কীর কথাই বলছি। মানুষের কণ্ঠ, যখন গানে রূপ নেয়, তখন তা এক অনির্ণেয় জটিল অনুভূতির মিশ্রণ প্রকাশ করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে, আমার লেখার বিভিন্ন দিক প্রভাবিত হয়েছে বব ডিলান, নিনা সিমোন, এমিলু হ্যারিস, রে চার্লস, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, জিলিয়ান ওয়েলচ, আর আমার বন্ধু ও সহশিল্পী স্টেসি কেন্ট-এর কণ্ঠে। তাদের কণ্ঠে কোনো এক বিশেষ অনুভূতির স্পর্শ পেয়ে আমি নিজেকে বলেছি - "হ্যাঁ, এটাই তো! ঠিক এটাই আমার ওই দৃশ্যে ধরা দরকার, ঠিক এমন কিছু।" অনেক সময় সেই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, কিন্তু সেটা থাকে গায়কের কণ্ঠে - আর সেটাই আমাকে লক্ষ্য ঠিক করে দেয়।
অক্টোবর, ১৯৯৯। আন্তর্জাতিক আউশউইৎজ কমিটির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জার্মান কবি ক্রিস্টোফ হিউবনার, কয়েকদিনের জন্য সাবেক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প পরিদর্শন করতে। আমার থাকার ব্যবস্থা ছিল আউশউইৎজ যুব মিলন কেন্দ্রে। কেন্দ্রটি যে রাস্তায় তার একদিকে প্রথম আউশউইৎজ ক্যাম্প, আর অন্যদিকে দু'মাইল দূরে মৃত্যু-শিবির বিরকেনাউ। আমাকে এই দুই জায়গা দেখানো হল। আমি অনানুষ্ঠানিকভাবে শিবির-ফেরত তিনজন জীবিত ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। মনে হচ্ছিল, ভৌগোলিকভাবে হলেও, আমি এসে দাঁড়িয়েছি সেই অন্ধকার শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে যার ছায়ার নিচে আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। বিরকেনাউয়ে, এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম গ্যাসচেম্বারগুলির ধ্বংসস্তূপের সামনে - অদ্ভুতভাবে পরিত্যক্ত, যত্নহীন। এগুলো প্রায় সেই অবস্থাতেই পড়ে আছে, যেভাবে নাৎসিরা রেখে গিয়েছিল - রেড আর্মির আগমনের আগে নিজেরাই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালানোর পর। এখন সেগুলো কেবল ভিজে, ভাঙা কংক্রিটের চাঁই - পোল্যান্ডের কঠোর আবহাওয়ায় প্রতি বছর আরও ক্ষয়ে যাচ্ছে।
আমার আমন্ত্রণ কর্তারা এক গভীর দ্বিধার কথা বললেন। এই ধ্বংসাবশেষগুলো কি সংরক্ষণ করা উচিত? ওপরে স্বচ্ছ কাঁচের গম্বুজ বানিয়ে কি ঢেকে রাখা উচিত যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চোখে দেখার জন্য এগুলো টিকে থাকে? নাকি এগুলোকে ধীরে ধীরে, স্বাভাবিকভাবে মাটিতে মিশে যেতে দেওয়া উচিত? আমার মনে হল, এই প্রশ্নটিই যেন এক বৃহত্তর সংকটের প্রতীক। এমন স্মৃতি আমরা কীভাবে সংরক্ষণ করব? কাচের গম্বুজ কি এই অশুভ ও যন্ত্রণার নিদর্শনগুলোকে জাদুঘরের মতো নিস্তেজ নমুনায় পরিণত করবে না? আমরা কী বেছে নেব - স্মরণ, না বিস্মরণ? আর কখন, সব ভুলে গিয়ে এগিয়ে চলাটাই শ্রেয়?
তখন আমার বয়স ছিল ৪৪। তখনও পর্যন্ত আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ - তার ভয়াবহতা ও বিজয় - সবকিছুকেই ভাবতাম আমার বাবা-মার প্রজন্মের সম্পত্তি। কিন্তু সেদিন প্রথম মনে হল - অচিরেই হয়তো সেই মানুষগুলো, যারা সরাসরি এই বিপুল ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করেছিলেন, আর বেঁচে থাকবেন না। তখন? তখন কি স্মরণ করার দায়িত্ব এসে পড়বে আমাদের প্রজন্মের ঘাড়ে? আমরা তো যুদ্ধের সময়টা দেখিনি, কিন্তু এমন বাবা-মার সন্তান, যাদের জীবন সেই ঘটনায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। তাহলে কি আমি, একজন গল্পকার হিসেবে, এক নতুন দায়িত্বের মুখোমুখি - যে কথা আগে কখনও ভাবিনি? আমাদের বাবা-মার প্রজন্মের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব?
এর কিছুদিন পর, আমি টোকিওতে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিচ্ছিলাম। সেখানে এক শ্রোতা প্রশ্ন করলেন - খুব সাধারণ - আমি এবার কী নিয়ে কাজ করছি। আরও নির্দিষ্টভাবে, তিনি বললেন - আমার বইগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় এমন সব চরিত্র, যারা তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বেঁচে থেকেছে। আর পরে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে নিজেরই লজ্জা বা অন্ধকার স্মৃতির সঙ্গে লড়াই করেছে। জানতে চাইলেন - আমার ভবিষ্যতের বইগুলোও কি এই একই বিষয় নিয়ে চলবে?
অপ্রস্তুত অবস্থায় আমি উত্তর দিলাম। বললাম - হ্যাঁ, আমি প্রায়ই এমন চরিত্রদের নিয়েই লিখেছি, যারা স্মৃতি ও বিস্মৃতির মধ্যে আটকে যায়। কিন্তু ভবিষ্যতে আমি সত্যিই এমন এক গল্প লিখতে চাই যেখানে একটি জাতি বা সমাজ কীভাবে এই সব প্রশ্নের মুখোমুখি হবে তা বলা হবে। একটি জাতি কি একজন ব্যক্তির মতো একইভাবে স্মরণ করে বা ভুলে যায়? না কি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কোনো পার্থক্য আছে? জাতির স্মৃতি বলতে ঠিক কী বোঝায়? সেগুলো কোথায় রাখা থাকে? কে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে? আর কোনো কোনো সময়, বিস্মৃতিই কি একমাত্র উপায় - হিংসার চক্র থামাতে, কিংবা সমাজকে বিশৃঙ্খলা বা যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে? অন্যদিকে, স্বেচ্ছা বিস্মৃতি বা হতাশাময় বিচারের ভিত্তিতে কি স্থিতিশীল, মুক্ত জাতি সত্যই গড়ে তোলা যেতে পারে? আমি তখন প্রশ্নকর্তাকে বলেছিলাম - আমি চাই এই বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে, কিন্তু তখনও একথা জানতাম না যে কীভাবে তা সম্ভব।
২০০১ সালের গোড়ায় এক সন্ধ্যা। উত্তর লন্ডনে, আমাদের বাড়ির অন্ধকারাচ্ছন্ন সামনের ঘরে (তখন আমরা সেখানে থাকি), আমি আর লোরনা দেখতে শুরু করলাম ১৯৩৪ সালের এক সিনেমা, হাওয়ার্ড হকস পরিচালিত "বিংশ শতাব্দী"। আমরা দেখছিলাম যথাযথ মানের একটা ভিএইচএস টেপে। প্রথমেই জানতে পারলাম, ছবির শিরোনামটি আমাদের সদ্য পেরোনো শতাব্দীকে নয়, বরং সেই সময়ের এক বিখ্যাত বিলাসবহুল ট্রেনের নাম - যা নিউ ইয়র্ক আর শিকাগোকে যুক্ত করত। কেউ কেউ হয়তো জানেন - এটি এক ঝোড়ো গতির কৌতুকচিত্র, যার অধিকাংশ ঘটনাই সেই ট্রেনের ভেতরে ঘটে। এক ব্রডওয়ে প্রযোজক মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে তার প্রধান অভিনেত্রীকে হলিউডে গিয়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করা থেকে আটকাতে। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জন ব্যারিমোর - তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, অঙ্গভঙ্গি, উচ্চারণ - প্রতি মুহূর্তে রসিকতা, আত্মভ্রম, আত্মনাটকীয়তার জটিল স্তর। এক কথায়, এক অসাধারণ অভিনয়। তবু অদ্ভুতভাবে আমি গল্পের সঙ্গে কোনো যোগ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। প্রথমে এতে বিস্মিত হলাম। সাধারণত ব্যারিমোরের অভিনয় আমার ভালো লাগে, আর হাওয়ার্ড হকসের "হিজ গার্ল ফ্রাইডে" বা "অনলি এঞ্জেলস হ্যাভ উইংস" ইত্যাদি ছবির ভক্ত আমি। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টা দেখার পর হঠাৎ এক সরল অথচ তীক্ষ্ণ ভাবনা মাথায় এলো - "উপন্যাস, চলচ্চিত্র বা নাটকের এত উজ্জ্বল, বাস্তব চরিত্র আমাকে কেন ছুঁতে পারে না?" উত্তরটা পরিষ্কার: চরিত্রগুলোর মধ্যে আকর্ষণীয় মানবিক সম্পর্ক নেই; একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত নয়, যেভাবে আমরা বাস্তবে যুক্ত থাকি। আর সঙ্গে সঙ্গে এক চিন্তা আমাকে নাড়া দিল - "যদি আমি চরিত্র নিয়ে কম চিন্তা করে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বেশি করি?"
যখন ট্রেনটা পর্দায় পশ্চিমের দিকে এগিয়ে চলেছে, আর জন ব্যারিমোর ক্রমেই উন্মত্ত হয়ে উঠছে, আমি ভাবছিলাম ই. এম. ফস্টারের বিখ্যাত ধারণার কথা - 'ত্রিমাত্রিক' ও 'দ্বিমাত্রিক' চরিত্রের পার্থক্য। ফস্টার বলেছিলেন, কোনো চরিত্র তখনই ত্রিমাত্রিক হয়ে ওঠে, যখন সে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমাদের অবাক করে। কিন্তু এখন আমার মনে প্রশ্ন জাগল - যদি কোনো চরিত্র ত্রিমাত্রিক হয়, অথচ তার সম্পর্কগুলো না হয়? ফস্টার তাঁর বক্তৃতায় এক মজার চিত্র ব্যবহার করেছিলেন - একটা উপন্যাস থেকে গল্পরেখাকে টেনে বের করা যেন এক কেঁচোর মতো যা চিমটেতে ধরে আলোর নিচে পরীক্ষা করা যায়। আমি ভাবলাম - আমি কি তেমনভাবেই একটা গল্পের বিভিন্ন সম্পর্ককে আলাদা করে আলোর নিচে ধরতে পারি না?
নিজের গল্পগুলোতেও? যেমন ধরো - এই শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কটা। এটা কি নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি দেয়? না কি একটু ভালো করে তাকালে বোঝা যায় - এটা সেই পুরোনো ক্লান্ত ছাঁচ - কতশত মাঝারি মানের গল্পে তা দেখা যায়। আর এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বন্ধুর সম্পর্কটা? এটা কি সত্যিই প্রাণবন্ত? এর কি কোনো আবেগময় গভীরতা আছে? এটা কি বিকশিত হয়, নাকি থেমে থাকে এক জায়গায়? এটা কি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বিস্ময় তৈরি করে? এটা কি আদৌ ত্রিমাত্রিক? হঠাৎ মনে হল, এটাই সেই জায়গা যেখানে আমার আগের অনেক লেখাই ব্যর্থ হয়েছিল - যেখানে আমি চরিত্রের ভিত খুঁজেছি, কিন্তু তাদের মানবিক সম্পর্কের জাল উপেক্ষা করেছি। জন ব্যারিমোরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছিলাম - সব ভালো গল্পই, তা যতই নতুন বা প্রথাগত হোক, পাঠককে নাড়ায়, হাসায়, রাগায় বা অবাক করে - কারণ তার ভেতরে থাকে সম্পর্ক, যা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো ভবিষ্যতে আমি যদি এই সম্পর্কগুলির দিকে বেশি মন দিই, আমার চরিত্রগুলো নিজেরাই নিজেদের সামলে নেবে।
এখন এই কথা বলতে গিয়ে মনে হচ্ছে - সম্ভবত আমি এমন একটা সত্য বলছি, যা তোমাদের কাছে বরাবরই স্পষ্ট। কিন্তু আমার নিজের লেখকজীবনে এই উপলব্ধিটা এল বেশ দেরিতে - তবুও আমি এখন একে একটা বড় বাঁকবদল হিসেবে দেখি, অন্যসব গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মতোই। তারপর থেকে আমি গল্পের কাঠামো নতুনভাবে গড়তে শুরু করলাম। যেমন, "নেভার লেট মি গো" লিখতে গিয়ে শুরু থেকেই আমি ভাবছিলাম তার কেন্দ্রীয় সম্পর্কের ত্রিভুজের কথা, তারপর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অন্য সব সম্পর্ক।
একজন লেখকের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সব মোড় - হয়তো অন্য অনেক পেশাতেও - এমনই হয়। প্রায়ই সেগুলো ছোট, এলোমেলো মুহূর্ত। নিঃশব্দে একান্ত আলোকপ্রাপ্তির ঝলক। খুব ঘন ঘন আসে না, তবে যখন আসে, কোনো পরামর্শদাতা বা সহকর্মীর অনুমোদন ছাড়াই আসে। অনেক সময় মনোযোগ আদায়ের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হয় আরও জোরালো, আরও জরুরি দাবির সঙ্গে। কখনও তাদের প্রকাশ স্বভাববিরুদ্ধভাবে প্রচলিত জ্ঞানবুদ্ধির বিপরীতে চলে যায়। কিন্তু যখন সেগুলো আসে, তখন তাদের চেনা, তাদের গুরুত্ব বোঝা দরকার - নইলে তারা হাতছাড়া হয়ে যায়।
আমি এখানে ছোট আর ব্যক্তিগত বিষয়গুলোর ওপর জোর দিচ্ছি, কারণ মূলত এটাই আমার কাজ। এক ব্যক্তি, এক নিঃশব্দ ঘরে বসে লিখছে - অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার জন্য, যে হয়তো অন্য এক নিঃশব্দ (বা হয়তো খুব বেশি নিঃশব্দ নয় এমন) ঘরে বসে পড়ছে। গল্প বিনোদন দিতে পারে, কখনও শেখাতে পারে, কখনও কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারে। কিন্তু আমার কাছে আসল ব্যাপারটি হলো, গল্প যেন অনুভূতি পৌঁছে দেয় - সীমান্ত ও বিভাজন ছাড়িয়ে আমাদের মধ্যে যে মানবিক বন্ধন, সেটিকে ছুঁতে পারে। গল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল ও ঝলমলে শিল্পগোষ্ঠী - বইয়ের শিল্প, সিনেমা শিল্প, টেলিভিশন, নাট্যমঞ্চ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্প মানে একজন মানুষের আরেকজন মানুষকে বলা: "আমার কাছে এটা এমন লাগে। তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কী বলছি? তোমারও কি এমন লাগে?"
এখন বর্তমানের প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি আমার মনে হলো, আমি কিছু বছর ধরে যেন এক প্রকার বুদবুদের মধ্যে বাস করছি। আমার চারপাশের অনেক মানুষের হতাশা আর উদ্বেগ আমি খেয়ালই করিনি। বুঝলাম, যে জগৎটাকে আমি ভেবেছিলাম সভ্য, উদ্দীপনাপূর্ণ, বুদ্ধিদীপ্ত ও উদারচিন্তার মানুষে ভরা - সেটি আসলে অনেক ছোট এক জগৎ। ২০১৬ সাল - ইউরোপ ও আমেরিকার কাছে চমকপ্রদ, কিন্তু আমার কাছে হতাশাজনক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বছর; সারা দুনিয়া জুড়ে জঘন্য সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড - আমাকে একথা মেনে নিতে বাধ্য করল যে, ছোটবেলা থেকে যেসব উদার মানবতাবাদী মূল্যবোধের অগ্ৰগতি আমি স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছিলাম, তা হয়তো নিছক এক ভ্রম।
আমি এক আশাবাদী প্রজন্মের মানুষ। কেন হব না এমন? আমরা দেখেছি, আমাদের পূর্বসূরীরা ইউরোপকে একনায়কতন্ত্র, গণহত্যা আর অভূতপূর্ব রক্তক্ষয় থেকে বদলে ফেলেছেন এক প্রায় সীমান্তহীন বন্ধুত্বপূর্ণ উদার গণতন্ত্রের পরিবেশে। আমরা দেখেছি পুরোনো ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমর্থনপুষ্ট নিন্দার্হ ধারণাগুলোও ধ্বংস হচ্ছে। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি নারীবাদ, সমকামী অধিকারের আন্দোলন, আর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নানা ফ্রন্টে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। আমরা বড় হয়েছি এমন এক প্রেক্ষাপটে, যেখানে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মধ্যে এক মহাযুদ্ধ - আদর্শগত ও সামরিক - চলছিল, এবং আমরা মনে করেছিলাম, তার এক সুখকর পরিসমাপ্তি ঘটেছে।
কিন্তু এখন, ফিরে তাকালে, বার্লিন প্রাচীর ভাঙার পরের যুগটা মনে হয় আত্মতুষ্টির যুগ - এক বিশাল সুযোগ হারানোর সময়কাল। দেশ ও দেশের ভিতরে সম্পদের ও সুযোগের বিপুল বৈষম্য বেড়ে উঠেছে। বিশেষ করে, ২০০৩ সালের ভয়াবহ ইরাক আক্রমণ এবং ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক ধসের পর সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো দীর্ঘ সংযম নীতিগুলো আমাদের এনে দিয়েছে এমন এক বর্তমান, যেখানে অতি-ডানপন্থী মতবাদ ও উপজাতীয় জাতীয়তাবাদ নতুন করে মাথা তুলছে। বর্ণবাদ - তার পুরোনো রূপে এবং নতুন, মসৃণতর, বিপণন-যোগ্য রূপে - আবার ছায়ার নিচ থেকে জেগে উঠছে, যেন সভ্য শহরের নিচে ঘুমন্ত দানবের পুনর্জাগরণ। এখন আমরা এমন এক সময়ের মুখোমুখি, যখন কোনো প্রগতিশীল উদ্দেশ্য আমাদের একত্রিত করে না। বরং, পশ্চিমের ধনী গণতান্ত্রিক সব দেশেও আমরা ভেঙে যাচ্ছি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে। লিপ্ত হচ্ছি নিজেদের স্বার্থ বা ক্ষমতার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায়।
আর সামনেই - নাকি আমরা এরমধ্যেই কাটিয়ে উঠেছি সেই সংকট? - অপেক্ষা করছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাশাস্ত্রে বিস্ময়কর অগ্রগতির জোয়ারে আসা নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ। নতুন জেনেটিক প্রযুক্তি - যেমন জিন-সম্পাদনার কৌশল (Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats) - আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রোবোটিক্সের উন্নতি আমাদের এনে দেবে বিস্ময়কর, জীবনরক্ষামূলক সুবিধা; কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো হয়তো সৃষ্টি করবে নির্মম মেধাভিত্তিক সমাজ যার সঙ্গে বর্ণবৈষম্যের মিল পাওয়া যাবে। ভয়াবহ বেকারির ঢেউ থেকে আজকের পেশাগত অভিজাতরাও মুক্তি পাবে না।
তাই আমি এখানে - একজন ষাটোর্ধ্ব মানুষ - চোখ মুছে, কুয়াশার ভেতর তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি সেই পৃথিবীর রেখাচিত্র, যার অস্তিত্বের কথাই আমি হয়তো গতকালও জানতাম না। আমি কি, এক ক্লান্ত লেখক, এক মানসিকভাবে ক্লান্ত প্রজন্মের প্রতিনিধি, এখনও শক্তি খুঁজে পাব এই অপরিচিত জগতের দিকে নতুন করে তাকাতে? আমার মধ্যে কি এখনও কিছু অবশিষ্ট আছে, যা সমাজের এই ব্যাপক রূপান্তরের লড়াই, তর্ক, ও সংঘর্ষে কোনো বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা আবেগময় পরত এনে দিতে পারে?
আমাকে এগিয়ে যেতেই হবে, যতটা পারি, ভালোভাবে। কারণ আমি এখনো বিশ্বাস করি যে সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ - এবং এই কঠিন পথ পরিক্রমায় তা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে আমি চাইব নবীন প্রজন্মের লেখকেরাই আমাদের অনুপ্রেরণা দিক, আমাদের পথ দেখাক। এ সময়টা তাদের, আর এদের মধ্যেই আছে সেই জ্ঞান ও প্রবৃত্তি, যা আমার নেই। আজকের বই, সিনেমা, টেলিভিশন ও নাটকের জগতে আমি দেখি রোমাঞ্চকর, সাহসী প্রতিভা - নারী ও পুরুষ, চল্লিশ, ত্রিশ, এমনকি কুড়ির কোঠায়। তাই আমি আশাবাদী। কেনই বা হব না?
তবু শেষ করার আগে একটা আবেদন জানাতে চাই - আমার 'নোবেল আবেদন' বলা যেতে পারে। গোটা পৃথিবীকে একেবারে ঠিক করে ফেলা খুব কঠিন। কিন্তু আমরা নিজেদের এই ছোট্ট কোণটা - এই 'সাহিত্যের' কোণটা - নিয়ে কী একটু ভাবতে পারি না? এই কোণটুকু জুড়ে আমরা পড়ি, লিখি, প্রকাশ করি, সুপারিশ করি, সমালোচনা করি, বইকে পুরস্কার দিই। যদি আমরা এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চাই, যদি আজ ও আগামীদিনের লেখকদের সেরাটা পেতে চাই, তবে আমাদের আরও বৈচিত্র্যময় হতে হবে। আমি দু'টি নির্দিষ্ট অর্থে এই বৈচিত্র্যের কথা বলেছি।
প্রথমত, আমাদের সাধারণ সাহিত্যজগৎকে আরও প্রসারিত করতে হবে - প্রচলিত অভিজাত প্রথম বিশ্বের সাংস্কৃতিক সীমানার বাইরে থেকে আরও বহু কণ্ঠস্বরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের আরও উদ্যমীভাবে খুঁজতে হবে সেই অনালোচিত সাহিত্য-সংস্কৃতির রত্ন, তা সে দূরদেশে হোক বা আমাদের নিজস্ব সমাজে।
দ্বিতীয়তঃ আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে যেন আমরা ভালো সাহিত্য বলতে যা বুঝি, তার সংজ্ঞাটা খুব সংকীর্ণ বা রক্ষণশীল না হয়। আগামী প্রজন্ম নানা নতুন, কখনো কখনো হতবুদ্ধিকর উপায়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর গল্প বলবে। আমাদের মন খুলে রাখতে হবে তাদের জন্য, বিশেষ করে শৈলী ও রূপের বিষয়ে, যাতে আমরা তাদের সেরাগুলিকে লালন ও উদ্যাপন করতে পারি। বিভেদের ভয়ানক বাড়বাড়ন্তের এই সময়ে, আমাদের শোনার অভ্যাস করতে হবে। ভালো লেখা ও ভালো পাঠ মানুষে মানুষে বিভেদের বাধা ভেঙে দেবে। হয়তো আমরা নতুন কোনো ভাবনা, এক মহান মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাব, যার চারপাশে আমরা একত্র হতে পারব।
সুইডিশ একাডেমি, নোবেল ফাউন্ডেশন এবং সুইডেনের জনগণ - যারা যুগে যুগে নোবেল পুরস্কারকে মানবজাতির মঙ্গলসাধনের উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত করেছেন - তাঁদের জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
[কাজুও ইশিগুরো জাপানী বংশোদ্ভূত নোবেলবিজয়ী খ্যাতনামা ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক।]

(ভাষান্তরঃ গৌতম চক্রবর্তী)